ঢাকা, শনিবার 10 December 2016 ২৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্বাধীনতার অগ্রপথিক তিতুমীর ও তার বাঁশের কেল্লা

মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল : এই বাংলার বুকে সুদূর অতীতে জন্ম হয়েছিল স্বনামধন্য এক বীরের। যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সারা বাংলায় দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ইংরেজরা যার নামে শঙ্কিত ও ভীত হয়ে পড়ত। আমি সেই বাংলার বীর তিতুর কথাই বলছি। তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি সর্বপ্রথম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে শহীদের মর্যাদা লাভ করেন। তিতুমীরই সর্বাগ্রে বাংলার একাংশে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।
তিতুমীরকে জানতে হলে শত শত বছরের ব্যবধান পার হয়ে সুদূর অতীতে ফিরে যেতে হবে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদের আগুন সর্বপ্রথম পূর্ণ শক্তিতে জ্বলে উঠে এই বাংলার বুকে। জমিদার, ইউরোপীয় নীলকর এবং ইংরেজ সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ একটা গণআন্দোলন পরিচালনা করেন তিতুমীর। উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তিতুমীরের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে।
সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর চব্বিশ পরগণা জেলার বারাসাতপুর মহকুমার অন্তর্গত চাঁদপুর গ্রামে ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল সৈয়দ মীর হাসান আলী আর মা আবেদা রোকাইয়া খাতুন। সৈয়দ মীর হাসান আলী ছিলেন বারাসাতের চাঁদপুর গ্রামের একজন সামান্য কৃষক। তিতুমীরের বাল্যকাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তিনি অসাধারণ দৈহিক শক্তির অধিকারী ছিলেন। ব্রিটিশ বেনিয়াদের অত্যাচারে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ তখন জর্জরিত, নিস্পেষিত। সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর স্বচক্ষে বাংলার মানুষের হতভাগ্য নিরন্ন কৃষকের করুণ মুখচ্ছবি ও রুগ্ন চেহারা দেখে কৈশোর থেকেই ব্যথিত হয়ে উঠেন। ব্্িরটিশের বিরুদ্ধে তার মনে বিদ্রোহের অনল দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ইংরেজ বেনিয়াদের উপর তার মনে প্রবল ঘৃণার সঞ্চার হয়। হতভাগ্য মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দশার কথা চিন্তা করে তিনি বৃটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেন। ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি পবিত্র মক্কা শরীফে হজ্ব পালন করতে যান। মক্কায় সৈয়দ আহমেদ বেরলভির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় এবং ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের প্রতি তার গভীর ভালবাসার বন্ধন আরো সুদৃঢ় হয়। তিনি সৈয়দ আহমদে বেরলভির শীষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পবিত্র মক্কায় হজ্ব শেষে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি এক জমিদার কন্যাকে বিবাহ করেন। নিজের স্বাচ্ছন্দ্য তুচ্ছ করে তিতুমীর স্বদেশের লোকের মর্মান্তিক দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্য কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ সময় তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ মুসলমানদের দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। তার হৃদয়ে সে সময়ে প্রবল স্বদেশপ্রেম জেগে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেও একজন দক্ষ লাঠিয়াল ও কুস্তিগীর হয়ে উঠেন।
অজস্র বাঁশের সমাহার, বাঁশ বেড়িয়া গ্রাম। এখানেই তৈরি করেন তিতুমীর তার বাঁশের কেল্লা। তিতুমীরের নিজের হাতে তৈরি এক আশ্চর্য বাঁশের কেল্লা। বাঁশের দুর্গ বলা যায়। সম্পূর্ণ বাঁশ ও মাটি দিয়ে তৈরি। বলা যায়, বাংলার এক অনবদ্য লোকজ শিল্প।
বাঁশ বেড়িয়া গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তৈরি হয়েছিল এই গড়। বৃহৎ বিস্তীর্ণ এক আ¤্রকানন। পলাশীর সেই আ¤্রকাননের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় বাঙালির মনে। বলা যায়, পলাশীর আ¤্রকাননের যুদ্ধক্ষেত্রের এই তিতুর দুর্ভেদ্য বাঁশের কেল্লা। চারদিকে গড় কেটে বাঁশ পুঁতে দিয়েছিল। কেল্লার ভেতরটা একেবারে রাজপ্রসাাদের মতই জাঁকজমকপূর্ণ। এখানে ছিল তিতুর খাস কামরা, দরবার কক্ষ, সৈন্যদের থাকার জন্য ব্যরাকের মতই সারিসারি ঘর সাজানো। অগণিত সৈন্য বাহিনীর কোলাহল। ঘরে ঘরে প্রদীপের সমাহার। আলোকিত চারদিক। ঘরগুলোতে রাত্রি যাপন করত তার সৈন্যরা। শাহী দরবার কক্ষে বসত গণআদালত, বিচারকার্য সমাধা হতো। অপরাধীদের শাস্তি প্রদান করা হতো দরবারে।
মক্কা থেকে ফিরে এসেই তিতু ক্রমে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, দরিদ্র কৃষক, চাষী, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে নিগৃহীত শোষিত হচ্ছে অত্যাচারী ইংরেজ ও জমিদারদের যাঁতাকলে। তাই তিনি তাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ডাক দিয়েছিলেন সংগ্রামের। তিতুমীরের এই একাতবদ্ধ হয়ে সংগ্রামের সিদ্ধান্ত বারাসতের ম্যাজিস্ট্রেটের কানে পৌঁছে। তিনি দু’শ’ লাঠিয়াল ও পাইক, তিনশ’ সড়কিওয়ালা এবং একজন দারোগাকে পাঠালেন তিতুকে ধরতে। দারোগা তিতুকে ধরতে গিয়ে তার হাতে প্রাণ হারালেন। দারোগার সঙ্গী-সাথীরাও অনেকে নিহত হলো। মারাত্মকভাবে শত্রু সেনারা তিতুর হাতে আহত হলো অনেকেই। এই সাফল্যে তিতুর মনোবল আরও বেড়ে গেল। দিন দিন তার সুখ্যাতি ও জনবল আরো বাড়তে লাগল। দলে দলে লোক তিতুর পতাকাতলে সমবেত হতে লাগল। অন্যায় ও অধর্মের বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার হয়ে উঠলো। তিতুর নাম ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। এই সাফল্যে তার মনোবল আরও বেড়ে গেল। গোবরাডাঙ্গা ও আশপাশের আরো দু’তিন গ্রামের খাজনা আদায় করতে লাগলেন তিতুমীর। তখন ৭০০-৮০০ লোক তিতুমীরে আজ্ঞাবহ। তিতুমীর তাদর প্রাণপ্রিয় নেতা। তারা তাদের নেতার কথায় হাসি মুখে প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে। বাংলার স্বাধীনতার জন্য জীবন দান করতে পারে। বারাসতের কৃষকরা তিতুমীরের নেতৃত্বে ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তৎকালীন অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। এ সময় বাংলার বুকে ইংরেজ বলীয়ান বিখ্যাত জমিদার রামনারায়ণ বাবু (তারা গুনিয়া), কৃষ্ণদেব রায় (পূর্ণিয়া), গৌরপ্রসাদ চৌধুরী (নাগরপুর) ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী। প্রজাদের খাজনা আদায়ের জন্য তারা কৃষক ও সর্বশ্রেণির লোকদের উপর অত্যন্ত জুলুম করতেন। অত্যাচারি কৃষ্ণদেব রায় জমিদার সেকালে মুসলমানদের দাড়ির উপর ট্যাক্স বসান। এতে তিতুমীর অত্যন্ত ক্ষিপ্ত ও রাগান্বিত হন। তিতুমীর কৃষ্ণদেবের জমিদারী আক্রমণ করেন। তিনি পূর্ণিয়ার, পুড়ার কৃষ্ণদেবের জমিদারীর প্রভূত ক্ষতি সাধন করেন। সেখানে বাজারে প্রকাশ্যে দিবালোকে গরু জবাই করেন। তিতুমীরের আশ-পাশের এসব অত্যাচারী জমিদার একত্রে মুসলমানদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিদারী দখল করে নিতে থাকে। এতে তিতুমীর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও রাগান্বিত হয়ে ওঠেন। তিনি সে সময় অত্যাচারী এসব জমিদারদের বিচারের জন্য তার সুদক্ষ সেনাপতি গোলাম মাসুদকে ইংরেজ কালেক্টরের কাছে পাঠান। কিন্তু তিতুর সেনাপতি গোলাম মাসুদ ইংরেজ কালেক্টরের কাছে কোন সুবিচার না পেয়ে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। এতে তিতুমীর ইংরেজ কালেক্টরের ওপর অত্যন্ত মনোক্ষুণœ হন। তিতু ইংরেজদের এদেশ থেকে বিতাড়িত করার জন্য তার সৈন্যদের সংঘবদ্ধ করেন। দেশপ্রেমের মন্ত্রে সৈন্যদের উজ্জীবিত করতে থাকেন। তারা ইংরেজদেরে সম্পূর্ণ এদেশ থেকে বিতাড়িত করে বাংলার বুকে হৃত স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার জন্য দৃঢ় সংকল্পে বলীয়ান হয়ে ওঠেন। তিতুর সঙ্গে প্রথম যুদ্ধ করতে আসেন ইংরেজ সেনাপতি আলেকজান্ডার। সঙ্গে পাঠান পাইক, বর কন্দাজ প্রায় ৭৫০ জন। সাহেবের হাতে বন্দুক। কিন্তু তিতুমীরের বাহিনীর হাতের সড়কি ও বল্লমের অব্যর্থ নিশানায় ইংরেজ সাহেবের পক্ষের বহু পাইক বরকন্দাজ প্রাণ হারায়। প্রায় ৫০০ ইংরেজি সৈন্য ও তাদের পোষ্য জমিদার সৈন্য সবাই পরাজয় বরণ করে। ইংরেজ সেনাপতি আলেকজান্ডার যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পান।
দ্বিতীয় বার যুদ্ধে আসেন কর্নেল স্কট। লন্ডনের মিলিটারী একাডেমী থেকে পাস করার লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্কট। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নবেম্বর মধ্যরাতে সুশিক্ষিত ইংরেজ সৈন্যরা বাঁশ বেড়িয়ায় পৌঁছায় এবং তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা ঘিরে ফেলে। বহু গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তারা তিতুমীরের দলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে এলো তিতুমীরের সৈন্যরা। বিষ মাখানো অজস্র তীর আর বর্শা ইংরেজ সৈন্যদের বিদ্ধ করতে লাগলো। তারা একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে লাগলো। কর্ণেল স্কটের হুকুমে বাঁশ বেড়িয়ার বালাকোটের ময়দানে মধ্যরাতে নিস্তব্ধতার বুক চিরে গর্জে উঠলো ইংরেজদের কামান। মুর্হুর্মুহু কামানের গোলায় ভেঙ্গে পড়লো তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা। শত চেষ্টায় ইংরেজদের কামানের গোলার সঙ্গে তিতুমীর কিছুতেই পেরে উঠলো না। বীরের মতো যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ হারালেন তিতুমীর। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও মাথা নত করলেন না তিতুমীর। শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে বীরের মতো মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন। দিনটি ছিল ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নবেম্বর বালাকোটের ময়দান। বাঙালি ইতিহাসের এক ব্যর্থ স্বাধীনতার স্মরণীয় দিন। ইতিহাস হয়ে রইলো বাঙালির অসীম বীরত্বের এক জয় দীপ্ত গান। তিতুমীরের সুদক্ষ সেনাপতি গোলাম মাসুদ যুদ্ধে বন্দি হন। পরে ইংরেজদের বিচারে তার ফাঁসি হয়। পরবর্তীতে তিতুমীরের ২২৫ জন অনুসারির বিচারে জেল হয়। অবিভক্ত বঙ্গের বিপ্লবী বীররা সেদিন শহীদ হলেন ইংরেজ সৈন্য, দেশীয় দালাল ও পাদ্রীদের প্রত্যক্ষ আক্রমণে। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ছিলেন সে সময় বাংলার গভর্নর।
বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের তৎকালীন অগ্রপথিক, নির্ভীক বীর, জাগ্রত সিপাহ সালার সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীরকে আমরা সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে আজও স্মরণ করি।
যতদিন বাংলা দেশ থাকবে, ততোদিন তিতুমীর আমাদের হৃদয়ে ঝংকার তুলবে দীপ্ত শপথের গৌরবোজ্জ্বল মহিমায়। বাঙালি তথা এই উপমহাদেশের শৃঙ্খল মুক্তির আকাক্সক্ষার জন্যই তিতুমীরকে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে অভিহিত করা যায়।
লেখক : সাহিত্যিক, গবেষক ও ইতিহাসবিদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ