ঢাকা, সোমবার 08 May 2017, ২৫ বৈশাখ ১৪২৩, ১১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঢাকার চারপাশের নদীদখল ও নদী দূষণ : একটি ভৌগোলিক সমীক্ষা

-আখতার হামিদ খান
॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
সকল শিল্প কারখানায় বর্জ্য যুক্ত পানি তুরাগ নদীতে মিশে নদীর পানি দূষিত করছে। দূষিত হওয়ার কারণে মানুষ তাদের প্রয়োজনে নদী পানি ব্যবহার করতে পারছে না। শিল্পবর্জ্য যেখানে বিষাক্ত পানির কারণে নদীর মাছসহ সকল প্রচার জলজপ্রাণী মরে যাচ্ছে। এতে নদী তীরবর্তীসহ আশপাশের মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মিটাতে পারছে না। মানুষের শরীরে দেখা দিচ্ছে নানা রকম চর্মরোগ। এমনকি নদীর পচা পানির দুর্গন্ধ তীরবর্তী এলাকা দিয়ে লোকজন হেঁটে পর্যন্ত যেতে পারছে না। নদীর তীরবর্তী জনগণ তাদের নিত্য ব্যবহারের প্রয়োজনীয় পানির অভাবে পড়ছে। যমুনা নদীর পানি যে ধলেশ্বরী নদী হয়ে তুরাগ নদীতে আসত, সে নদীর মুখে তারাকান্দি নামক স্থানে বাঁধ নির্মাণ করার ফলে এখন আর এ নদীতে পূর্বের ন্যায় পানি প্রবাহিত হয় না। ফলে তুরাগ নদীতে চর পড়ে নদীর অস্তিত্ব হারাতে চলেছে।
নদী ভরাট হওয়ার ফলে কার্তিক অগ্রহায়নে নদীর অনেকাংশে পানি থাকে না। ফলে এ অঞ্চলের কৃষক সেচের অভাবে তাদের কৃষি কাজে চাহিদা মোতাবেক পরিচালনা ও ফসল উৎপাদন করতে পারছে না। এতে দেশের কৃষক সমাজ দিন দিন হতদরিদ্র হয়ে পড়ছে বলেও নদীর পার্শ্ববর্তী বসবাসরত মানুষ দাবি করেন। এছাড়া নদী ভরাটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশে বেড়ে ওঠা ভূমি দস্যুদের প্রভাব। ভূমি দস্যুদের ক্ষমতার দাপটে নদী ভরাট করে নদীর কিনারে স্থাপন করা হচ্ছে শিল্প কারখানা। এ তুরাগ নদীর উৎস স্থল হতে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত শতশত শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। এভাবে নদী ভরাট করে শিল্প স্থাপনা করা হলে এদেশের সকল ছোট বড় নদী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বলে সাধারণ মানবগোষ্ঠীর বিশ্বাস। অসৎ সরকারি কর্মচারীদের যোগসাজশে এককালের প্রমত্তা তুরাগ নদী এখন অনেকস্থানে খালে পরিণত হয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় তুরাগ নদীকে রক্ষার জন্যে অনেক আন্দোলন হলেও তুরাগ দখল থেমে থাকে নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা ভূমি দস্যুদের বিরুদ্ধে তুরাগ নদীর চিহ্ন বাংলাদেশের মানচিত্র হতে মুছে যাবে।
দূষণ-দখলে বিলুপ্তির পথে সাভারের কর্ণপাড়া খাল : দূষণ আর দখলের কবলে পড়ে ঢাকার সাভারের কর্ণপাড়া খালের অস্তিত্ব এখন বিলুপ্তির পথে। হাজার হাজার লিটার তরল বর্জ্য ও আবর্জনার কারণে খালের পানি কালো আর দুর্গন্ধময়। আর দখলের কারণে আকারও ছোট হয়ে আসছে। কর্ণপাড়া খালটির উৎস সাভারের বংশী নদী থেকে। মিশেছে তুরাগ নদের মিরপুর এলাকায় গিয়ে। এক সময় খালটিতে পর্যাপ্ত পানি ছিল, ছিল প্রচুর মাছ। এখনকার লোকজন গৃহস্থালিসহ গোসলের কাজ সারত এই খালে। কিন্তু এখন এটিকে আর খালের মতো মনে হয় না। পানিতে নামলে শরীরে ঘা হয়ে যায়। কর্ণপাড়া খালের সাভার পৌরসভার বড়াই গ্রাম ও কর্ণপাড়া মৌজার ঢাকা আরিচা মহাসড়কের উভয় পাশে প্রায় ১ কি.মি. এলাকা জুড়ে চলছে ভরাট ও দখলের প্রতিযোগিতা, কোথাও মাটি, কোথাও আবর্জনা ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়। বড়াইগ্রাম জামে মসজিদের পাশে খালের মাঝে বাঁশ পুঁতে দখল করা বেশ কিছু অংশ আবর্জনা ফেলে ভরাট করা হচ্ছে পৌরসভার পক্ষ থেকে। এছাড়া মাটির নীচ দিয়ে স্থাপন করা একাধিক পাইপের মাধ্যমে বর্জ্য মিশ্রিত তরল খালে এসে পড়তে দেখা যায়। এসব পাইপের কোন উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি।
দূষণ আর দখলে বিপর্যস্ত গুলশান লেক : দূষণের পর এবার দখলের কবলে পড়েছে রাজধানীর গুলশান লেক। অব্যাহত এ দখলে হয়তো অচিরেই হারিয়ে যাবে মহাখালী গাউসুল আজম মসিজদ সংলগ্ন লেকের প্রায় পাঁচ বিঘা জমি। অভিযোগ উঠেছে, এটি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠন। লেকের জমি ভরাট করে কেন বহুতল নির্মাণ করা হচ্ছে জানতে চাইলে একজন কর্মচারী বলেন, আমাগো মালিক অনেক শক্তিশালী, রাজউকের লোকেরা অনেকবার আইছে। ভরাট বন্ধ করতে পারে নাই। লেকের দায়িত্ব প্রাপ্ত রাজউকের কর্মকর্তা বললেন, ভরাট করে ফেলেছে, এখন আর কী করার আছে? রাজউকের দায়িত্বহীনতার অভাবে লেকটি দখল হয়ে যাচ্ছে। গুলশান লেক বনানী, অভিজাত এলাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
ধলেশ্বরীর বুকে রাস্তা : প্রায় সারা বছর নৌকা চলাচলের মতো পানির থাকলেও শুকনো মৌসুমে মাস তিনেক মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জাজরা বাজারের কাছে ধলেশ্বরী নদী সরু একটা ধারায় প্রবাহিত হয়। কিন্তু সেই সরু ধারাটি এখন রুদ্ধ মাটি ব্যবসায়ীদের কারণে। তাঁরা ট্রাক চলাচলের জন্যে নদীর এপাড় থেকে ওপাড় পর্যন্ত বানিয়েছে মাটির রাস্তা। সেই রাস্তায় গত ২০ দিন ধরে ঘড়ঘড় শব্দে চলছে ট্রাক। এখানে নদীর বুকে বাঁধ দিয়ে রাস্তা বানানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ- বলেছেন পানি উন্নয়নবোর্ডের কর্মকর্তারা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে সাতফুট উঁচু প্রায় ১৬ ফুট চওড়া করে নদীর বুকে রাস্তা বানানো হয়েছে। নদীর দুই পাড়কে সংযুক্ত করতে রাস্তাটির উত্তর পাড়ে ফসলি জমিতে যন্ত্র বসিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। আর ট্রাকে সেই মাটি পার হচ্ছে নদীর ওপর বানানো রাস্তা দিয়ে।
অস্তিত্ব সংকটে নদী খাল : পদ্মা ও যমুনার মতো বড় দুটো নদীর তীরে গড়ে ওঠা মানিকগঞ্জ জেলার ভেতর দিয়ে এক সময় প্রবাহিত হতো ৯টি শাখা নদী। এছাড়াও সারা জেলায় সাপের মতো ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য খাল আর বড় বড় বিল। এর মাঝে বেশ কয়েকটি নদী অস্তিÍত্ব হারিয়েছে। শুকিয়ে গেছে অর্ধেকের বেশি খাল-বিল। সেগুলো টিকে আছে তাতেও বছরের অর্ধেক সময় পানি থাকে না। আবার বর্ষা মৌসুমে এই মরা নদীগুলোই হয়ে ওঠে ভয়ংকর। নাব্যতা হারিয়ে ফেলায় নদী ও খালবিলেগুলো বর্ষায় পানি ধারণ করতে পারে না। ফলে পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। ভাঙনের শিকার হয় বাড়িঘর, জনপথ আর ফসলি জমি। অস্তিÍত্ব সংকটে পড়া জেলার নদী খাল আর বিল দখল করে নিচ্ছে ভূমি দস্যুরা। অনিয়ন্ত্রিতভাবে তোলা হচ্ছে বালু। কেটে নেয়া হচ্ছে মাটি। চলছে কারখানার বর্জ্য আগ্রসন। দূষণ ঘটছে পানিতে। দূষিত হচ্ছে সার্বিক পরিবেশ প্রকৃতি। বছরের অর্ধেক সময় নদী ও খালবিলে থাকেনা। তাই মাছও নেই। জেলে সম্প্রদায়ের মানুষগুলো বাঁচার তাগিদে বাপ বাদার পেশা ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। মানিকগঞ্জ জেলার অন্যতম নদীগুলো হচ্ছে পদ্মা, যমুনা, ইছামতি, কালীগঙ্গা, কান্তাতী, ঘনলোকহানী, গাজীখালী, ক্ষারাই, মন্দা, ভুবনেশ্বর ও ধলেশ্বরী।
শিবালয় উপজেলার দক্ষিণ ও হরিরামপুর উপজেলার পশ্চিম সীমান্ত ঘেঁষে বইছে পদ্মা নদী। এই নদীর প্রবাহ মানিকগঞ্জকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে ফরিদপুর জেলা থেকে। বিগত ৩০ বছরে পদ্মার ভাঙ্গনে হরিরামপুর উপজেলার পাটগ্রাম, লেছড়াগঞ্জ, সুতাপরী, হারুকান্দী, আজিমনগর ও বয়রা ইউনিয়নের অধিকাংশ আবাদি জমি বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে পদ্মা হরিরামপুরের কাছে তিনটি ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার বুকে মানিকগঞ্জের সীমানায় বেশ কয়েকটি বড় বড় চর জেগে উঠেছে। সেখানে ইতিমধ্যে বসতিও গড়ে উঠেছে। আবার নদীর দিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চরগুলো ভাঙ্গনের কবলে পড়ে নদী ভাঙ্গন এই উপজেলার অর্ধেক মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙ্গনের শিকার বাস্তুচ্যূত পরিবারগুলো ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকায় দৌলতপুর উপজেলার, পশ্চিম সীমান্ত ঘেষে প্রবাহিত হয়েদ শিবালয় উপজেলায় যমুনা নদী, আরিচা ঘাটের অদূরে পদ্মায় মিশেছে। এক সময় যমুনার ভাঙ্গনে বিলিন হওয়া দৌলতপুর উপজেলা চরকারি, বাঁচামারা, রাঘুটিয়া ও রিয়েলপুর ইউনিয়নের অনেক গ্রাম গত ১০ বছরে আবার জেগে উঠেছে। শিবালয় উপজেলার শিলবালয়  ও তেউতা ইউনিয়ণসহ দৌলতপুরের এ ৪টি ইউনিয়নের অধিকাংশ ভূখন্ডই এখন যমুনার চর।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এসব বিশাল বশিাল চরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বঞ্চিত মানুষগুলো মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। পদ্মার শাখা নদী ইছামতী ও হরিরামপুর উপজেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ফের পদ্মায় মিশেছে। ভাঙ্গন ঠেকাতে বছর পনের আগে যাত্রাপুরের কাছে বাঁধ দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি মৃত প্রায়। কেবল বর্ষামৌসুমে একটা ধারা প্রবাহিত হয়। দৌলতপুরের কাছে যমুনা থেকে কালিগঙ্গা নদীর উৎপত্তি। এর নদীটি ঘিওর উপজেলার জাবরা গ্রাম হয়ে তরা ব্রিজের নীচ দিয়ে মানিকগঞ্জ সদরের বেওয়া ঘাট হয়ে সিংগাইর উপজেলার চারিগ্রাম হয়ে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশেছে। বর্তমান এই নদীর অধিকাংশ স্থানে শুকনো মৌসুমে নৌকা চলার মত পানিও থাকেনা। কোথাও কোথাও একেবারেই শুকিয়ে যায়। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার যমুনা নদী থেকে ধলেশ্বরী নদীর উৎপত্তি। সেখান থেকে এই নদী মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীটি সিংগাইর হয়ে বুড়িঙ্গায় মিশেছে। এই নদীটিও মৃত প্রায়। বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময়। নৌকা চলচলের মত পানি থাকে না। ধলেশ্বরী শাখা কান্তাবতী, মনলোহানী, খিরাই, মন্দা ও ভুবনেশ্বর নদীর এখন আর অস্তিত্ব নেই। বয়স্ক মানুষগুলোর মুখেই এ নদীগুলোর নাম শুনা যায়। ধলেশ্বরীর আর একটি শাখা নদী গাজীখালী একসময় স্রোতশীনী থাকলেও আজ মৃত প্রায়। বর্ষা মৌসুমে কয়েক মাস ছাড়া এই নদীর বুক জুড়ে কেবল ধু ধু বালুচর।
বালু নদ : তুরাগের মত অবৈধ দখলের কারণে বিপন্ন হতে চলছে বালু নদ। প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর তীরবর্তী বেশীর ভাগ এলাকা এখন অবৈধ দখলদারের কবলে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের কারণেই দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে নদটি। ভূঁইয়াপাড়া, টেকপাড়া, মেরাদিয়া, ত্রিমোহনী, নাসিরাবাদ, ডুমনি, মান্ডা, দক্ষিণগাঁও, কাজলা, পুলারটেক ও মানিকনগর এলাকাগুলোর বেশিরভাগ তীর ভূমি অবৈধ দখলে চলে গেছে। যেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন, অবৈধ স্থাপনা ও ব্যবসাকেন্দ্র। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১৭ নেতা-কর্মীর অবৈধ দখলে বালু, যেখানে মাসে আদায় হবে ৫০ লাখ টাকা। এই নেতাদের নির্দিষ্ট কোন রাজনৈতিক পরিচয় নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা সে দলের সমর্থক বলে যাবে। তাদের বর্তমান পরিচয় ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক। একইভাবে দখল বাণিজ্যের কারণে টঙ্গী রেলসেতু ও সুলতানা কামাল সেতু এখন ঝুঁকির মুখে। যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার সড়ক যোগাযোগ।
ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর পানি প্রবাহ ও বিষাক্ত পানি : শিল্প বর্জ্যসহ বিষাক্ত তরল দূষক পদার্থ প্রতিনিয়ত নদীর পানির সাথে মিশে ঢাকার চারপাশের নদী সমূহের পানি প্রবাহের পানি দূষিত করে ফেলেছে। বিদ্যমান ঢাকার চারপাশের সবগুলো নদীই এখন বিষের প্রবাহে পরিণত হয়েছে বলে পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন। সরেজমিন অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, রাজধানী ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু নদী ছাড়াও মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী, খুলনার রূপসা, চট্টগ্রামের কর্ণফূলীসহ দেশের উল্লেখ্যযোগ্য নদীসমূহের পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, শিল্প কারখানার কঠিন ও তরল বর্জ্য, রাসায়নিক বর্জ্যই নদীর পানি দূষিত হবার প্রধান কারণ। তবে কৃষি জমিতে কয়েক দশক ধরে এক নাগাড়ে রাসায়নিক সারের ব্যাপক ব্যবহার এবং ফসল গাছ-গাছালিতে ঢালাওভাবে বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আমাদের নদীপ্রবাহ বিষের প্রহরে পরিণত হয়েছে। নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং সরকারের পরিবেশ বান্ধব নীতি না থাকায় এ বিপর্যয় হয়েছে। তবে এটা এমন এক বিশাল বিপর্যয় যা কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না। প্রকৃতি অকৃপণভাবে মানুষকে যা দিয়েছে তার সদব্যবহার না করা এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের তার সদব্যবহার না করা এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর অন্ধ বলৎকারে প্রাকৃতির ভারসাম্য ক্রমশ মানব বসতির বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। দেশের ২৭৭টি চামড়া শিল্প থেকে প্রতিদিন ৮.৪৭ মিলিয়ন লিটার তরল বর্জ্য নির্গত হয়। এর শতকরা ৯০ ভাগই ঢাকার হাজারীবাগে অবস্থিত। এসব বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানিতে মিশছে। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হয়েছেন ক্রোমিয়াম মিশ্রিত তরল বর্জ্য মাছের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে। ডায়িং কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য প্রাণীকূলের নানা রকম রোগ বৃদ্ধিসহ খাদ্যচক্রের বিষক্রিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি করছে। নদী দূষণের অন্যান্য কারণের মাঝে রয়েছে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার, নৌযানের ময়লাবর্জ্য ও তেল, শহরের বর্জ্য, পলিথিন ব্যাগ, প্লাষ্টিক দ্রব্যাদি, হাসপাতাল বর্জ্য। মানুষ্য ও পশু পাখির বিষ্ঠা, মৃতদেহ, গাছ-গাছালির পচাঁ পাতা ইত্যাদি নদীর পানিকে নিয়মিত দূষিত করছে। পরিবেশবিদ ও বিশেষষ্ণরা বলেছেন। দূষণ কবলিত নদীসমূহের পার্শ্ববর্তী মাটি, বাতাস, পানি, তাপমাত্রা, গাছপালা, তৃণগুল্ম মাছ, জলেজ সম্পদ, পশুপাখি, মানুষ, তথা সামাজিক পরিবেশ সংকটপন্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকার চারপাশের নান্দনিক সৌন্দর্য, জনমানুষের জীবন জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই আমাদের নদীসমূহকে রক্ষা করতে হবে। নদী বাঁচলে মানুষ ও পরিবেশ বাঁচবে। নদী দূষণ বন্ধ হলে মানুষের রোগব্যাধি কমে যাবে। স্বাস্থ্যখাতের খরচও কমে যাবে। আমাদের এসকল নদীসমূহের পানি ব্যবহারের অযোগ্য অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদী দূষণ প্রতিরোধে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার এ কাজটিকে দায়সারাভাবে করলে চলবে না। এ কাজে সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে একটি নীতিমালা তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা : ঢাকার চারপাশের নদীগুলো অবস্থা আজ কত করুণ ও ভয়াবহ তা আমরা আলোচ্য প্রবন্ধে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে আমাদের অনতিবিলম্বে কিছু কায্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন-
(১) চারপাশের নদীগুলোতে যাতে সারা বৎসর সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পানি প্রবাহে স্বাভাবিক থাকে সেজন্যে নদীসমূহের দ্রুত নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
(২) নদীদখল ও নদী ভরাটের হাত থেকে নদীগুলোকে রক্ষা করার জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত নিতে হবে। এক্ষেত্রে  নদীগুলোর সীমানা পিলার স্থাপন করা উচিত।
(৩) নদীগুলোকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। এক্ষেত্রে নদীপাড়ে অবস্থিত বিভিন্ন শিল্প কারখানায় বর্জ্য যাতে নদীর পানির সাথে না মিশে সে ব্যবস্থা দ্রুত করা প্রয়োজন।
(৪) বাস্তবতার নিরিখে সুষ্ঠু ও সুনিশ্চিত দূরদর্শী অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
(৫) বছরে অন্তত একবার নদীগুলোতে ড্রেজিং করা প্রয়োজন।
(৬) কার্যকর ড্রেজিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি বর্ষার পানি ধরে রাখার জন্যে জলাধার নির্মাণের পদক্ষেপ নিতে হবে।
(৭) অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে নদীরক্ষায় কোর্টের আদেশসমূহকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
(৮) বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, বালু প্রভৃতি নদীসমূহের বিষাক্ত বর্জ্য যা মানুষ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্যে অত্যন্ত ক্ষতিকর তা বিকল্প কোন পাথে ধ্বংস করে দিতে হবে।
(৯) প্রয়োজন হলে নদীর তীর হতে সকল ধরণের শিল্প কারখানা সরিয়ে নেয়া যায় কিনা তা ভেবে দেখতে হবে।
(১০) নদীর পানিতে দ্রুত দ্রবীভূত হয় এমন সব বর্জ্য এবং বিষাক্ত রাসায়নিক বিকল্প কোন উপায়ে নিশ্চিহ্নে করা যায় কিনা সে উপায় বের করা প্রয়োজন।
(১১) ঢাকার চারপাশ দিয়ে যে শহর রক্ষা বাঁধ দেয়া হয়েছে সেখানে প্রয়োজনীয় বৃক্ষ লাগিয়ে সেখানে কোন রাস্তা তৈরি না করে শুধুই বাঁধ এলাকা যাতে শুধু মানুষ চলাচল করবে কিন্তু কোন  বর্জ্য/ ময়লা নদীতে  ফেলা না হয় এমন ব্যবস্থা করার কথা চিন্তা করা যেতে পারে।
(১২) ঢাকার চারপাশের নদীসমূহের রক্ষায় একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে নদীগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং এর যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
উপসংহার : মহানগরী ঢাকাকে ঘিরে রেখেছে চারটি নদী। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীকে বলা হয় নগরীর প্রাণ। বিগত কয়েক বছর ধরে এই চারটি নদীই মারাত্মকভাবে দূষিত। রাজধানীর বর্জ্য ও আবর্জনার বেশিরভাগই এ নদীতে ফেলা হয়। সেই সঙ্গে অব্যাহতভাবে নদী দখলের প্রচেষ্টা এই চারটি নদীকেই যেন গলাটিপে মেরেছে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বেশ কয়েকটি প্রস্তাব রেখেছেন। ধারণা করা যায়। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে চারটি নদীই আবার প্রাণ ফিরে পাবে। তবে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে বহু বাঁধা রয়েছে। অন্যদিকে মানুষের অসতর্কতার কারণে ঢাকার চারটি নদীর পানিই এখন ব্যবহার অনুপযোগী। এসব নদীর পানি বিষাক্ত, কালো রং। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা নদীর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। যন্ত্রচালিত নৌযান থেকে নি:কৃত তেল, কারখানার বর্জ্য পানিতে ফেলার কারণে তা নদী তীরবর্তী জনজীবনের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিলে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে বাঁচানো সম্ভব।
অতীতে ইংল্যান্ডের টেমস নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছিল। বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ নদীর পানিকে পরিপূর্ণভাবে দূষণ মুক্ত করা সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞদের অভিমত টেমস নদীর এই শোধন ক্রিয়ার উদাহরণ নি:সন্দেহে ঢাকার বুড়িগঙ্গারসহ চারটি নদীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। প্রথমেই দূষণ প্রক্রিয়া বন্ধের লক্ষ্যে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থাই নিতে হবে। নদীকে দূষণমুক্ত করতে হলে ধাপে ধাপে সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সুয়্যারেজ লাইনের মাধ্যমে নগরীর যে বর্জ্য প্রতিদিন নদীতে ফেলা হচ্ছে তা বন্ধে কার্য্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সবাই চাই ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষার্থে এ ধরনের প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধ বাস্তবায়ন করা হোক। সেই সঙ্গে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে সার্বক্ষণিকভাবে দখলম্কুত রাখতে হলে নদীরক্ষা বাহিনী বা রিভার গার্ডের কোন বিকল্প নেই। উচ্ছেদের পর যাতে নদী আবার দখল না হয় সেই লক্ষ্যে সার্বক্ষণিক নজরদারির প্রয়োজন। (সমাপ্ত)
* লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, সাভার কলেজ, সাভার, ঢাকা।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি :
আলী, ড. শেখ মাকমুদ; ২০০৫ বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার, বৃহত্তর ঢাকা, ঢাকা।
আব্বাস, বি এম, এ টি; ১৯৮৪, ফারাক্কা বেরেজ ও বাংলাদেশ, ঢাকা।
মামুন, মুনতাসীর; ২০০৮, ঢাকা: স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী, অন্য প্রকাশন, ঢাকা।
বাংলাপিডিয়া, প্রথম-নবম খন্ড; ২০১০, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা।
হোসেন, মোকারম; ২০০৫, বাংলাদেশের নদী, ঢাকা।
Khan, Dr. F.H; 1975, Geology of Bangladesh, Dhaka.
Wadia, D. N. 1974, Gelogy of India.
দৈনিক ইত্তেফাক, ৩০/৬/২০০১ ইং, ঢাকা।
দৈনিক যুগান্তর ১০/১০/২০০৩ইং, ঢাকা।
দৈনিক প্রথম আলো ২১/১১/২০০৩ ইং, ঢাকা।
দৈনিক সংবাদ, ২৮/৫/২০০৫ ইং, ঢাকা।
দৈনিক সংগ্রাম, ০১/০১/২০০৬ ইং, ঢাকা।
দৈনিক জনতা, ০৫/২/২০০৬ ইং, ঢাকা।
দৈনিক ইত্তেফাক, ১২/১১/২০১২ ইং, ঢাকা।
বাংলাদেশ প্রতিদিন, ০৮/০৫/২০১৩ ইং, ঢাকা।
রহমান, মোহাম্মদ খলিলুর; ২০০৫, নদী বাঁচাও-দেশ বাঁচাও, ধানসিঁড়ি প্রকাশন, ঢাকা।
ওয়াজেদ, আব্দুর, ২০১১, বাংলাদেশের নদী-মালা, পালব পাবলিশার্স, ঢাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ