ঢাকা, সোমবার 17 July 2017, ২ শ্রাবণ ১৪২8, ২২ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল “ওপেন সিক্রেট”

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : আধুনিক বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও যেমন দ্রুতহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি দিন দিন বেড়েই চলেছে নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ। বর্তমানে অন্যান্য সামাজিক অপরাধের মধ্যে পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল মেশানো একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত। বাংলাদেশের বাজারগুলো এখন ভেজাল পণ্যে সয়লাব। শিশু খাদ্য থেকে শুরু করে পানীয়, শাক-সব্জি, ফল-মূল, মিষ্টি, নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রসহ এমনকি ঔষধেও ভেজাল মেশানো হচ্ছে। এর ফলে আমাদের জাতীয় জীবনে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ অধিকাংশ জনসাধারণ এ বিষয়ে ভালোভাবে অবহিত নয়। জনসাধারণ জানেন না যে, তারা প্রতিনিয়ত খাদ্য বা পণ্যসামগ্রীতে কী ধরনের ভেজাল বা বিষক্রিয়ার সম্মুখীন হচ্ছেন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার লোভে পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল দিয়ে ভোক্তা ও ক্রেতাসাধারণকে প্রতারিত করছে। ফলশ্রুতিতে স্বাস্থ্যহানিকর প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরণের জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে দেশের জনসাধারণ। জনস্বাস্থ্য দিন দিন মারাত্মক হুমকির দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রতিবন্ধী, বিকলাঙ্গ, অটিস্টিক ও মানসিক রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। অথচ বিশুদ্ধ, ভেজালমুক্ত পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী প্রাপ্তি ভোক্তা সাধারণের আইনগত অধিকার। এমতাবস্থায় ভেজালমুক্ত, বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পণ্যসামগ্রী প্রাপ্তি বাংলাদেশের গণমানুষের অন্যতম প্রত্যাশা।
বাংলা একাডেমীর ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এ পণ্য শব্দের অর্থ করা হয়েছে- বিক্রেতয় দ্রব্য; বেসাত; মূল্য; মাসুল; ভাড়া। সংকীর্ণ অর্থে পণ্য হলো কতগুলো আপাতক দৃশ্য (tangible) গুণের সনাক্তকরণযোগ্য (identifiable) সমাবেশ। এ অর্থে প্রতিটি পণের সর্বজনবোধ্য একটি বর্ণত্মাক নাম আছে; যেমন, আপেল, স্টিল বা ক্রিকেট ব্যাট ইত্যাদি। কিন্তু ব্যাপক অর্থে প্রতিটি পণ্যেও ভিন্ন ভিন্ন বাণিজ্যিক মার্কা (brand) হলো ভিন্ন ভিন্ন একটি পণ্য। অুনরূপভাবে ট্যাবলেটের উপরে মার্কায় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও স্কুইব-এর এ্যাসপিরিন ও বায়ার-এর এ্যাসপিরিন হলো দুটো পৃথক পণ্য। কোম্পানি মার্কার এই ভিন্নতা ভোক্তার কাছেও পণ্যে পণ্যে পার্থক্য সূচিত করে এবং এতে পণ্য-সংজ্ঞাতেও ভোক্তার কাঙ্খিত তুষ্টি সাধিত হয়।
‘ভেজাল’ শব্দের অর্থ মিশ্রিত; মেকি; খাঁটি নয় এমন; উৎকৃষ্ট দ্রব্যের সঙ্গে নিকৃষ্ট দ্রব্যেও মিশ্রণ; যে খারপ জিনিষ অন্য ভালো জিনিষের সঙ্গে মিশানো হয়; খারাপ জিনিষ মিশ্রণ; বিশুদ্ধ নয় এমন। ইংরেজীতে ভেজালের প্রতিশব্দ উল্লেখ করা হয়েছে- To cheat, swindle; to double cross; to deceive, fool; delude; bluff, beguile; to trick, dupe; Gull.
প্রকৃতিগত পরিবর্তনের ফলে বস্তুর পরিচিতি যাই হোক না কেন, তাকে ভেজাল অথবা নকল যা-ই আখ্যা দেয়া হোক না কেন, বিষয়টি ধর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে না। কিন্তু মানুষ কর্তৃক দ্রব্যটি আংশিক বা পরিপূর্ণ যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন মানবসমাজে তখন বস্তুটি ভেজাল বা নকল নামে অভিহিত হয়। অতি মুনাফার লোভে মানুষ যখন রাতারাতি আঙ্গুল ফুুলে কলাগাছ হতে চায়, তখন তাকে যে অনৈতিকতা, অসততার শরণাপন্ন হতে হয়, তাকে ‘ভেজাল’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। ইসলামী পরিভাষায়- ভেজাল এমন কাজ বা বস্তু, যা তার মূল্যের বিপরীত। অর্থাৎ কোন বস্তুর দোষ,ত্রুটি গোপন করা, কাজে প্রবঞ্চনা করা, আসল কথা বা কাজের বিপরীত করাই হলো ভেজাল। বাংলাদেশে পণ্যে ভেজাল মিশ্রণের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, অতি মুনাফা অর্জন করার মানসিকতা। এদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষই তার অবস্থাগত দিক থেকে মনে করে, যেভাবেই হোক না কেন যত দ্রুত অর্থ উপার্জন করা যাবে, ততই ধনী হওয়া যাবে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। এ দেশের রাজনীতিতে পরিচ্ছন্নতা ও জবাবদিহিতা লক্ষণীয় ভাবে কম। এর বিরূপ প্রভাব জনজীবনের সর্বস্তরেই পড়েছে। ফলে খাদ্য ও পণ্যদ্রব্যে যে বিষ ঢালাওভাবে মেশানো হচ্ছে এবং তা বন্ধ করার কার্যকর পদক্ষেপ খুবই ক্ষীণ। পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি উচ্চ আসনে পৌঁছতে না পারার কারণে এর প্রভাব কেমিক্যাল আমদানিকারক সকল পণ্যের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী এবং ভোক্তার মানসিকতার ওপর গিয়ে পড়েছে। সর্বগ্রাসী ভেজাল ও বিষক্রিয়ার এটি হলো প্রধানতম কারণ। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ শিক্ষিত ও স্বাস্থ্যসচেতন নয়। এ কারণে পণ্যে বা খাদ্যে ভেজাল সম্পর্কে তাদেরও সচেতনতা খুবই কম। এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যে ভেজাল দিয়ে সরলবিশ্বাসী ক্রেতাসাধারণকে প্রতারিত করছে। বাংলাদেশের হাট-বাজার ও বিপণী-বিতানগুলোতে প্রতিনিয়ত ভেজাল পণ্য কেনা-বেচা হলেও যারা পণ্যে ভেজাল দেয় তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয় না। ফলে পণ্যে ভেজালের মাত্রা দিনদিন বেড়েই চলেছে। তাই যথাযত শাস্তি না হওয়াও বাংলাদেশে পণ্যে ভেজালের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। পণ্যে বা খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ একটি মারাত্মক সামাজিক অপরাধ। এ বিষয়ে বাংলাদেশে কঠোর আইন থাকলেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় না। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া পণ্যে ভেজালের অন্যতম কারণ। পণ্য এবং খাদ্যসামগ্রীতে যেসব কেমিক্যাল ও ভেজাল দ্রব্য ব্যবহার করা হয়, তা বাংলাদেশে অত্যন্ত সস্তা এবং সহজলভ্য। ফলে ভেজাল মিশ্রণকারীরা খুব সহজেই পণ্য এবং খাদ্যসামগ্রীতে ভেজাল মিশ্রণ করে থাকে। বাংলাদেশের হাট-বাজার ও বিপনী-বিতানগুলোতে বিজ্ঞাপন নির্ভর চাকচিক্যময় প্রচুর পণ্যসামগ্রী পাওয়া যায়। এমতাবস্থায় সাধারণ ভোক্তাদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পছন্দ করতে হিমশিম খেতে হয়। স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পণ্যসামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে চটকদার বিজ্ঞাপন দারুণভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা কথার ফুলঝুরি আর স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ বিজ্ঞাপন প্রচার করে প্রতিনিয়ত সাধারণ ভোক্তাগণকে প্রতারিত করছে। বাংলাদেশে একসময় পণ্যে ভেজাল দেওয়া ছিল গুটিকয়েক ব্যবসায়ীদেও মধ্যে সীমিত, আজ তা ঢুকে পড়েছে সমাজের সর্বত্র। ভেজাল পণ্য বাজারের সর্বত্র বিরাজমান। মুনাফালোভী মানুষ রাতারাতি অর্থ-বিত্তশালী হওয়ার লক্ষ্যে ভেজালের কারবার করে যাচ্ছে। প্রতারিত হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। এখানে সাধারণ-অসাধারণে কোন কথা নেই, পার্থক্য নেই। এক কথায় পণ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়ার শিকার সবাই।
বাংলাদেশে ভেজাল পণ্য, খাদ্যদ্রব্য, পানীয় ও ঔষধের কারণে দেশের প্রতিটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। উদাহরণস্বরূপ যে মিষ্টি বিক্রেতা মিষ্টির মধ্যে সোডিয়াম সাইক্লামেট, স্যাগারিন, কাপড়ের ও চামড়ার ক্ষতিকর রং ব্যবহার করে বিক্রি করছেন, সেই মিষ্টি বিক্রেতা বাজার হতে ফরমালিন দেয়া মাছ অথবা দুধ খাচ্ছেন অথবা ফরমালিন দেয়া মাছ বিক্রেতা বাজার হতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশ্রিত বিস্কুট খাচ্ছেন অথবা তার বাচ্চাকে ক্ষতিকর রঙিন চকলেট খাওয়াচ্ছেন। এভাবে বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ ভেজাল পণ্য এবং খাদ্যদ্রব্যের কারণে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য তথা হাট-বাজার ও বিপণী বিতাগুলোর পণ্যসামগ্রীতে ভেজালের মাত্রা বা স্বরূপ কেমন তা তুলে ধরতে Transparency International Bangladesh (TIB)-পুরস্কারপ্রাপ্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সরকারিভাবে সরেজমিনে পরিচালিত ভেজালবিরোধী কিছু তথ্য নিম্নে তুলে ধরা হলো।
টিভিচিত্র, সংবাদপত্রে এবং পণ্যের লেবেলে মনোলোভা বিজ্ঞাপন দিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান দেশব্যাপী ‘ন্যাচারাল মিনারেল’ ও ‘পিউরিফাইড ড্রিংকিং ওয়াটার’ নামে বোতলজাত পানি বাজারজাত করলেও এসব পানির শতকরা ৯৮ ভাগই বিশুদ্ধ, জীবাণুমুক্ত বা ন্যাচারাল মিনারেল সমৃদ্ধ নয়। অনুসন্ধনে জানা গেছে Bangladesh Standards and Testing Institutions (BSTI)-এর বিধানমালা অনুযায়ী মিনারেল ওয়াটার ও পিউরিফাইড ড্রিংকিং ওয়াটার প্রস্তুত করার জন্য বোতলজাত পানিতে স্বাস্থ্যসম্মত যেসব উপাদান থাকা বাধ্যতামূলক, অধিকাংশ পানিতেই সেসব উপাদানের উপস্থিতি নামমাত্র, আবার শরীরের জন্য ক্ষতিকারক যেসব জীবাণু বা পদার্থ শোধন করা অপরিহার্য, সেসব জীবাণুর প্রকট উপস্থিত রয়েছে এসব বোতলজাত পানিতে। ফলে মিনারেল ও বিশুদ্ধ পানির নামে বোতলজাত পানি কিনে ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন এবং মোটা অংকের অর্থের অপচয় করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ পরিচালিত এক গবেষণায় দেশের পানি উৎপাদনকারী শিল্পের উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। দেশের প্রথম সারির পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জনপ্রিয় ব্রান্ডের পানিও এ তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়। জানা যায়, পানির মান যাই হোক বাজারে পাওয়া নিম্নমানের প্রায় সবকটি পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানই দেশের একমাত্র পণ্যদ্রব্যেও মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বি.এস.টি.আই-এর ছাড়পত্র পেয়েছে। বোতলজাত পানি উৎপাদনের প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়াসার পানি ব্যবহার করে। তাদের নিজস্ব ল্যাবরেটরি, ডিপটিউবওয়েল নেই।
গবেষকগণ বলেছেন, বোতলজাত পানির চেয়ে জারের পানির অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। হালে বোতলের পাশাপাশি এখন বাসা বাড়ীতেও ‘জার কালচার’ শুরু হয়েছে। শতকরা ৯০ ভাগ অফিস আদালতে এখন জারের পানি পান করা হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, শুধু ঢাকা মহানগরীতেই প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ হাজার বড় জারের পানি বিক্রি হচ্ছে। পানি উৎপাদনকারীদের ক্রমশ জারের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে কয়েকটি চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। কোম্পানীগুলো জানায়, বোতলের পানি বাজারজাতে উৎপাদন খরচ বেশী। একটি জার না ভাঙ্গা পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। কিন্তু বোতল দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা যায় না। ফলে বোতলজাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। জারের পানি সরাসরি ভোক্তার হাতে অর্থাৎ অফিস আদালতে চলে যাওয়ায় অভিযান চালিয়েও ধরা সম্ভব হয়না। আবার মান পরীক্ষার জন্য এসব পানি বাজারেও পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা এ কারণেই কোম্পানীগুলো জারের পানির দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
ভেজাল ভোজ্য তেলে দেশের বাজার এখন সয়লাব। বাজার বিভিন্ন জাতের ও ব্রান্ডের অতিস্নেহের পদার্থ এ ভোজ্য তেলের তেলেসমাতিতে আসল-নকলের ফারাক প্রায় উঠে গিয়েছে। বাজারে বিক্রীত সরিষার তেল, সয়াবিন, বাটার অয়েল, ঘি অধিকাংশই ভেজাল। অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের সাথে মাস্টার এসেন্স হিসেবে সুপরিচিত এ্যালিলি সোথায়োসায়ানাইডসহ বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে তৈরী করা হয় ‘খাঁটি সরিষার তেল’। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম ঝাঁঝ ও রঙ মিশিয়ে সয়াবিন তেলকে সরিষার তেলে রূপান্তরিত করা হয়। এই তেল ডেকচি বা কড়াইতে ঢালার পর গরমে অধিক হারে ফেনা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তেল লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারসহ সকল পেটের পীড়া ও চর্মরোগের অন্যতম কারণ। ‘সম্পূর্ণ কোলেস্টেরলমুক্ত’ এ লেভেল বড় ধরনের এক রসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। গরুর চর্বি, তেল ও আলু মিশিয়ে তৈরী করা হয় ভেজাল বাটার অয়েল। দেশের বিভিন্ন এলাকার মিলের পঁচা পাম অয়েল ও পঁচা সরিষার তেল এবং বিষাক্ত পাম স্টিয়রিন মিশিয়ে তৈরী হয় সয়াবিন। চটকদার লেবেল লাগিয়ে ‘১০০ ভাগ খাঁটি তেল’ হিসেবে বাজারে বিক্রয় হচ্ছে। এ তেলের বোতল-কৌটায় লাগানো হয়ে থাকে বি.এস.টি.আই-এর নির্ভেজাল সার্টিফিকেট। বেশীরভাগ হোটেল-রেস্তোরাঁয় ভেজাল খাদ্যেও ছড়াছড়ি। গরুর নামে মহিষের মাংস, খাসির নামে বকরী-ভেড়ার মাংস আর পঁচা-বাসি ময়লাযুক্ত খাবার হোটেল-রেস্তোরাঁয় প্রচুর বিক্রয় হচ্ছে। এমনকি মরা মুরগীর মাংস দুষ্প্রাপ্য নয়। অধিকাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁর পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। নোংরা-স্যাঁতসেঁতে গন্ধময় পরিবেশে রান্না-বান্না হয়। হোটেলে ব্যবহৃত ডেগ-ডেকচি, হাঁড়ি-পাতিল, কড়াই, থালা-বাসন, গ্লাস, কাপ-পিরিচ, চামচ ভালভাবে পরিষ্কার করা হয় না। হোটেল-রেস্তোরাঁয় এই সমস্ত খাবার খেয়ে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত আমাশয়, ডায়রিয়া, ফিতা ক্রিমি এবং হেপাটাইটিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আর চিকিৎসা করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে।
সারাদেশে ভেজাল-নকল, নিম্নমানের মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ নির্বিঘ্নে বিক্রয় হচ্ছে। নিরাময় ও জীবনরক্ষাকারী ভেজাল ঔষধ যেন জীবনবিনাশী ‘পয়জন’-এ পরিণত হয়েছে। ঔষধ বাজারে কোনটি আসল আর কোনটি নকল তা অনেক সময় দোকানীরাও চিনতে পারেনা। কেবল ঢাকা শহরে নয়; সমগ্র দেশে বেশুমার ‘নকল’ ঔষধ তৈরীর কারখানা রয়েছে। সরকার সম্প্রতি নকল ভেজাল ও নিম্নমানের ঔষধ বাজারজাত করার অভিযোগে দেশের ১৭টি কোম্পানীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এর অধিকাংশই রাজধানীর বাইরে অবস্থিত।
বিভিন্ন ব্রান্ডের ক্যাপসুল, ট্যাবলেট, সিরাপ, স্যালাইন এবং ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সই বেশী নকল ও ভেজাল হচ্ছে। এরারুটের সাথে এক ধরনের কৃত্রিম আঠালো পদার্থ মিশ্রণ করে তৈরী হয় ট্যাবলেট আর আবরণের মধ্যে ডালের বেসন মিশিয়ে ক্যাপসুল তৈরী করা হয়। স্যালাইনের প্যাকেটে ভরা হয় পরিষ্কার পানি। হিমি করে বাটা চিনির সাথে ময়দা মিশিয়ে তৈরী করা হয় ডেক্সট্রোজ (গ্লোকোজ)। এই সকল নকল-ভেজাল ঔষধ দেশের মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভরা বাজারজাত করছে। বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন খ্যাতনামা ঔষধ কোম্পানীর ঔষধের লেবেল ছাপিয়ে তা শিশির গায়ে সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। ফলে কারও বুঝারও উপায় থাকেনা যে, এটা ‘নকল’ ঔষধ। এ ভেজাল ঔষধ সাম্রাজ্যে একশ্রেণীর হেকিমি ব্যবসায়ও দেশে জমজমাট। বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকায় সর্বরোগের মহৌষধের চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে তার মানুষকে প্রকাশ্যে প্রতারণা করছে। তাদের অশ্লীল বিজ্ঞাপনের উপর সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলেও ভাষার মারফোলজিতে তারা আরও অশ্লীল বিজ্ঞাপন দিচ্ছে।
রসনাতৃপ্ত রসগোল্লা, কালোজাম, জিলিপি, পানতোয়া, চমচম, সন্দেশ, মিহিদানা, প্যাড়া প্রভৃতি তৈরীতে এখন খাঁটি দুধের বদলে নিম্নমানের গুঁড়াদুধ, চিনির বদলে স্যাকারিন আর ফুডকালারের পরিবর্তে কৃত্রিম ক্ষতিকর রং ব্যবহার করা হচ্ছে। খাঁটি ছানার তৈরী- রস-টসটসে রসগোল্লা মিলছে না। আর ভেজালে আবর্তে দেশের মিষ্টান্ন ভান্ডারগুলো ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। ঢাকার কয়েকটি প্রসিদ্ধ মিষ্টি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানেও লেগেছে ভেজালের ছোঁয়া। মাহাখালী জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের খাদ্য পরীক্ষাগারে গত ১০ বছরে পরীক্ষিত একটি মিষ্টির নমুনাতেও খাঁটি পাওয়া যায়নি।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, আমদানীকৃত গুঁড়া দুধ দ্বারাই বেশীরভাগ মিষ্টান্ন তৈরী করা হচ্ছে। মেয়াদ উত্তীর্ণ নষ্ট গুঁড়া দুধও ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ৬টি নামকরা মিষ্টি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। ভেজাল মিষ্টির পাশাপাশি ঢাকাতে ‘নকল’ মিষ্টি ব্যবসায়ও জমজমাট। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীর চমচম, বগুড়া ও গৌরনদীর দই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিষ্টি, কুমিল্লার রসমালাই, খাঁটি ও ভেজাল দুই ভাবেই বিক্রয় হচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মিষ্টিতে ব্যবহৃত ক্ষতিকর কাপড়ের রং ফুড পয়জনিং-এর সৃষ্টি করে। এই রং খাবার ফলে ছোট রোগ হতে ক্যান্সার ও কিডনি পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাজার ভর্তি অবিকল আসল ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর আদলে তৈরী নকল টেলিভিশন, টেপ রেকর্ডার, ক্যাসেট প্লেয়ার, রেডিও, ভিসিপি, ভিসিআর, টেবিল ফ্যান কিনে ক্রেতারা রোজ ঠকছেন। জিঞ্জিরা, নবাবপুর ধোলাইখাল, বায়তুল মুকাররম মার্কেট, স্টেডিয়াম পাড়া, ইসলামবাগ, হাজারীবাগ, মীরহাজিরবাগ ও বাড্ডা এলাকায় গড়ে ওঠা অসংখ্য দুই নম্বর ‘মেইড ইন জাপান’, ‘মেইড ইন চায়না’ ও মেইড ইন কোরিয়া’ কারখানার সকল ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর ভিড়ে আসল-নকল চেনা দায়। এ সকল কারখানায় যে সমস্ত সামগ্রী তৈরী হয় সেগুলোর বেশীরভাগ খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানী করা হয় ভারত, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের অখ্যাত কোম্পানী হতে। ভারত হতে চোরাইপথে সর্বাধিক পরিমাণ ‘নকল’ যন্ত্রাংশ আসে। এ সকল বিদেশী যন্ত্রাংশের সাথে দেশে তৈরী অত্যন্ত নিম্নমানের যন্ত্রাংশ, বাহিরাবরণ প্রভৃতি দিয়ে তৈরী করা হয় অবিকল আসল ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর মত সামগ্রী। এ সামগ্রীর লেবেল ও কার্টন আসলটির মত থাকে। এই ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর গায়ে আসলের মত টাইপ দিয়েই স্ক্রীনপ্রিন্ট করে “MADE IN JAPAN,” `MADE IN CHINA’ লিখে দেওয়া হয়।
এ প্রতারণা এখন প্রায় ‘ওপেন সিক্রেট’। কিন্তু অনভিজ্ঞ ক্রেতাদের বুঝাবার উপায় নেই। নকল জিনিসের দাম আসলের চেয়ে কম হওয়ায় অনেক ক্রেতা ভেজাল এবং নকল সামগ্রী ক্রয়ের ফাঁদে পা দেন। জাপান ভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত একটি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর এদেশীয় স্বত্বাধিকারী জানান, জাপানে শ্রমিক মজুরী এবং প্রাতিষ্ঠানিক খরচ আকাশ ছোঁয়া। একারণে জাপানের কারখানায় উৎপাদিত সামগ্রীর দাম পড়ে যায় বেশী। জাপান তাদের পণ্যের কোয়ালিটি অক্ষুণœ রেখে উৎপাদন খরচ কমাবার জন্য টেলিভিশন, টেপ রেকর্ডার, ভিসিআর, সিডিসেট, ডেকসেট, রেডিওসহ এই জাতীয় কারখানা অন্যদেশে সরিয়ে নিয়েছে। তিনি জানান, প্রতিদিন বিখ্যাত ইলেকট্রনিক্স কোম্পানীর সার্ভিস সেন্টারে যে টিভিগুলো মেরামত করার জন্য আনা হয় তার ৫০ ভাগই ‘দুই নম্বর’ পণ্য। বাংলাদেশে পণ্যে ভেজালের স্বরূপ বোঝাতে ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ রোকন-উদ-দৌলা কর্তৃক সরেজমিনে পরিচালিত কয়েকটি অভিযানের চিত্র নিম্নে তুলে ধরা হলো।
আমের ঝুড়িতে আমের মাঝখানে এক টুকরো কার্বাইড অথবা কার্বাইড গুঁড়ো করে ছিটিয়ে দেয়া হয়। কার্বাইডের তেজস্ক্রিয়তায় আম আগুনের মতো গরম হয়ে যায় এবং ২৪ ঘন্টার মধ্যে হলুদ বর্ণ ধারণ করে ও পেকে যায়। ড্রামভর্তি কেমিক্যাল মিশ্রিত পানির মধ্যে কলার ছড়াকে চুবিয়ে তোলা পর ২৪ ঘন্টার মধ্যে কলা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। ফলে কলার কোন ঘ্রাণ ও স্বাদ পাওয়া যায় না। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুড, ডাইনিং, ক্যান্টিন, চাইনিজ সর্বত্রই পঁচা, বাসি খাবারের পাশাপাশি পোড়া তেল, রং ব্যবহার, কেমিক্যাল, গোলাপজল খাবাওে ব্যবহার, চিকেন আবর্জনার স্তুপ, একই ফ্রিজে রান্না খাবার, কাঁচা মাছ-মাংস, বাটা কাঁচা মশলা, বাসি খাবার রাখা হয়। বিস্কুট ফ্যাক্টরি ও বিভিন্ন বেকারিতে অভিযান পরিচালনা করে দেখা যায়,সেখানে তৈরী পণ্যদ্রব্য ও খাদ্যসামগ্রীতে ক্ষতিকর রং, নামবিহীন, লেবেলবিহীন, বিভিন্ন ধরণের কেমিক্যাল, ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া, বাইকার্বোনেট, সোডিয়াম বাই কার্বোনেট, সোডিয়াম সাইক্লামেট, পঁচা ডিম, ভেজাল ঘি, তেল, ফ্লেভার, সুগন্ধি কেমিক্যাল ইত্যাদি ভেজাল মিশ্রণ দেয়া হয়েছে। ঢাকা শহরের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে একটি প্রসিদ্ধ মিষ্টি কারখানায় অভিযান পরিচালনা করে পঁচা টেক্সটাইল মিলের রং পাওয়া যায়। রঙের কৌটায় লেখা ছিল Use for only textile.
ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোড ও নবাবের দেউড়িতে অভিযান চালিয়ে দেখা যায়, কয়েক প্রকারের ডাইং রং ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল দিয়ে চকলেট ও আইসক্রিম তৈরী করা হচ্ছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে দেখা গেছে, ওয়াসার পানিকে মিনারেল ওয়াটার বিশুদ্ধ পানি হিসেবে বোতলজাত ও পরিপাক করা হচ্ছে কোনো রকমের শোধন ছাড়াই। ঢাকা শহরের কারওয়ান বাজারে ৪৭টি শুটকির আড়ৎ ও দোকানে অভিযান পরিচালনা করে ক্ষতিকর ডিডিটি পাউডারযুক্ত শুঁটকি পাওয়া যায়। ঢাকা শহরের মহাখালীতে অভিযান করে দুধে চালের গুঁড়ো, ইটের গুঁড়ো এবং তরল দুধে ফরমালিন পাওয়া যায়। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় ধান তাড়াতাড়ি সিদ্ধ করতে, চাল ও মুড়ি ধবধবে সাদা করতে ইউরিয়া সারের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান পরিচালনা করে ঔষধ প্রশাসনের অনুমোদনবিহীন ভেজাল ঔষধ ও স্যালাইন পাওয়া যায়। ঢাকা শহরে প্রতিদিন শতশত মহিষ জবাই করা হলেও কোথাও মহিষের মাংস পাওয়া যায় না। মহিষের মাংসকে গরুর মাংস বলে এবং ভেড়ার মাংসকে খাসির মাংস বলে বেশী দামে বিক্রি করার প্রতারণা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাজরে সরিষার তেল, নারিকেল তেল, অনুমোদনবিহীন মধু, ঘি, বিদেশী কসমেটিক্স, দুধ, গুঁড়ো দুধ, চিনি, পামওয়েল, ভেজিটেবল ওয়েল ইত্যাদি পাওয়া যায়। অথচ উক্ত পণ্যগুলো বি.এস.টি.আই-এর গুণগত মান পরীক্ষিত নয় এবং লাইসেন্সবিহীন।
পণ্যসামগ্রী ও খাদ্যসামগ্রীতে ভেজাল মেশানো কেবল বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত নয়, এটি এখন একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য ক্ষতিকর। এটা পৃথিবীব্যাপী একটি মারাত্মক ব্যাধি। বাংলাদেশে পণ্যে ভেজালের ক্ষতিকর দিকগুলোর উল্লেখযোগ্য কিছু নিম্নে তুলে ধরা হলো : পণ্য ও খাদ্যসামগ্রীতে ভেজালের কারণে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে। ভেজাল পণ্য ব্যবহারের ফলে মানুষ ক্যানসার, হৃদরোগ, স্নায়ু রোগ, ডায়বেটিস, নিদ্রাহীনতা, পক্ষাঘাত, পেটের পীড়া, মাথাব্যথা প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে কঠোর আইন থাকলেও এর বাস্তবায়ন নেই। ফলে পণ্যে ও খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণকারীরা গোটা জাতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এতে দেশের জনসাধারণের শারীরিক ও মানসিক উভয়বিধ স্বাস্থ্যই আশঙ্কাজনকভাবে হুমকির মুখে। তাই ভেজাল প্রতিরোধে যে খাদ্য আইন হয়েছে অতিসত্বর তার সঠিক ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরী।
বাংলাদেশে পণ্যসামগ্রী, খাদ্যসামগ্রী এবং শাক-সবজিতে যে ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য তথা ভেজাল ব্যবহার করা হয় তা স্বাস্থ্যেও জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব ভেজালযুক্ত খাদ্য ও পণ্য ব্যবহারের ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, জন্ডিস, মেদবহুলতা প্রভৃতি জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। হৃদরোগ, ক্যানসার ও স্ট্রোক বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে মানুষের মৃত্যুও অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে এসব রোগের মূল কারণ ভেজালমিশ্রিত ভোজ্যতেল এবং পণ্য ও খাদ্যদ্রসামগ্রী। পণ্য ও খাদ্যদ্রব্যের ভেজাল শিশুস্বাস্থ্যেও জন্য মারাতœক ক্ষতিকর। শিশুরা সুস্থ-সুন্দরভাবে গড়ে উঠুক তা সবাই কামনা করে। কিন্তু পণ্য ও খাদ্যেও ভেজাল কারবারিরা শিশুস্বাস্থ্যকে তাদের ভেজালের ব্যবসার বলি করে তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের ভবিষ্যতকেই অন্ধকার করে দিচ্ছে। শিশুদের এই স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর দিকটি দেশ-জাতির ভবিষ্যতকে সমানভাবে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে চিচ্ছে। ভেজাল খাদ্য ও পানীয় ব্যবহারের ফলে তরুণ সমাজের অস্থিরতা ও ক্ষুধামন্দা বৃদ্ধি পায় তাদেও মধ্যে দেখা দেয় নেশা ও অপরাধ প্রবণতা। তরুণ সমাজের এহেন অস্থিরতা ও অপরাধ প্রবণতা জাতির জন্য চরম ক্ষতির কারণ বলে গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীগণের অভিমত।
বাংলাদেশে পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল প্রতিরোধে প্রচুর আইন (Laws), অ্যাক্টস (Acts), অধ্যাদেশ (Ordinances), মাহামান্যরাষ্ট্রপতির আদেশ (President Order), বিধি-বিধান (Rules) বিদ্যমান আছে। প্রয়োজন শুধু এসব বিদ্যমান আইন-কানুনসমূহের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। প্রচলিত আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতিসমূহ সততা, আন্তরিকতা, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হলে বাংলাদেশে পণ্যে ভেজালের সার্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে বাধ্য। আমাদের অনেক আইন আছে, যেগুলোর প্রয়োগ নেই। আবার অনেক আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। তাই বলা যায়, পণ্যে ভেজাল ও নকল প্রতিরোধে আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে আইন-কানুন বিদ্যমান। প্রয়োজন শুধু এসব সুষ্ঠুভাবে কার্যকরী করা।
বাংলাদেশে পণ্যসামগ্রী, খাদ্যদ্রব্য ও ঔষধে ভেজাল প্রতিরোধে সবচেয়ে পুরাতন আইন ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি। দণ্ডবিধি ২৭২, ২৭৩, ২৭৪, ২৭৫, ২৭৬ ধারায় এ বিষয়ে শাস্তির বিধান যথাক্রমে ছয়মাস কারাদণ্ড বা একহাজার টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান আছে। তবে এসব আইনে যেমন মামলা হয়না; তেমনি আইন প্রয়োগও হয় না। বাংলাদেশে ২০০৫ সাল থেকে উপরিউক্ত দণ্ডবিধিগুলোর ব্যাপক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন শুরু হয়। উক্ত ধারাগুলোতে শাস্তি কম হলেও কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড উভয় ধারা মিলে ১ (এক) বছর কারাদণ্ড দেয়া হলে ভেজালকারীদেও মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও ভীতির সঞ্চার হয়। পণ্যসামগ্রী ও খাদ্যসামগ্রীতে ভেজাল প্রতিরোধে আমাদের দ্বিতীয় আইন ১৮৫৯ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ যা ২০০৫ সালে সংশোধন করা হয়। এই অধ্যাদেশ ভেজালকারীদের শাস্তি তিন লক্ষ টাকা, ১ (এক) বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং দোকান বা কারখানার যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশে পণ্যসামগ্রী, খাদ্যসামগ্রী, ঔষধ এবং প্রসাধনসামগ্রীতে ভেজার প্রতিরোধে সবচেয়ে শক্তিশালী আইন হচ্ছে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন। এই আইনে ভেজাল কারবারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যৃদ-, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১৪ (চৌদ্দ) বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ১৯৮৫ সালে বি.এস.টি.আই অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যা ২০০৩ সালে সংশোধন করা হয়। এতে ভেজাল কারবারীদের সর্বোচ্চ একলক্ষ টাকা জরিমানা এবং মামলার বাজেয়াপ্ত ও কারখানা বন্ধ করে দেয়ার বিধান করা হয়। উপরোক্ত আইনগুলো ছাড়াও বাংলাদেশে পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল প্রতিরোধ ২০০৫ সাল থেকে ভেজালবিরোধী মোবাইল কোর্ট চালু করা হয়। অপরাধের ধরণভেদে এ কোর্ট তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তি দিয়ে থাকে। বর্তমান বিশ্বেও অনুন্নত দেশগুলোতে ভেজাল একটি বড় রকমের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যার কবল থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও মুক্ত নয়। এ দেশে ভেজাল মেশানোর প্রবনতা অসাধু ব্যবসায়ীদেও স্বভাবে পরিণত হয়েছে। অসৎ ব্যবসায়ী সর্বদাই স্বল্প পূঁজিতে এবং স্বল্প সময়ে অত্যধিক মুনাফা অর্জন করতে চায়। এ কারণে তার নীতি-নৈতিকতা মেনে ব্যবসা-বাণিজ্য করে না।
পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে পরিমাপে ও ওজনে কম দিয়ে, প্রতারণা করে, মজুদদারী করে, নিষিদ্ধ ও হারাম মিশিয়ে বিক্রি করে, অসাধু উপায়ে মানুষকে ঠকিয়ে মুনাফা অর্জন করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। মানুষের অধিকার, জনস্বার্থ, জনস্বাস্থ্য সর্বোপরি মানুষের জীবন তাদের কাছে একেবারেই তুচ্ছ বিষয়। অতচ আমাদের দেশের শতকরা নব্বই জন ব্যবসায়ী মুসলিম। তারা সালাত আদায় করেন, রোযা রাখেন, হজ্জ করেন। অনেকে যাকাতও দেন। যাদের মধ্যে এমন ধর্মীয় চেতনা ও মূল্যবোধ বিরাজমান, তার কিভাবে ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বিভিন্ন কৌশলে পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল মেশান? নিম্নমানের পণ্যকে ‘এক নম্বর’ বলে চালিয়ে দিয়ে প্রতারণা করেন? খাদ্য-পণ্য ক্ষতিকর কেমিক্যাল, বিস্ফোরক দ্রব্য, রং ও অরুচিকর উপাদান মেশান? বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক। বাংলাদেশের হাট-বাজার, মার্কেট ও বিপণি বিতানগুলো ভেজাল পণ্যে সয়লাব হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা পরকালের মুক্তি ও সাফল্য লাভের চাইতে দুনিয়ার জীবনের সাফল্য ও ভোগ-বিলাসকে অত্যধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে তাদের ঈমানের ভিত্তি ও শক্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরী। আর এ জন্য প্রয়োজন ব্যাপক ইসলামী জ্ঞান চর্চা, গণসচেতনতা ও ইসলামের বিধি বিধানগুলোর প্রচারণা। সরকারি-বেসরকারি ও সমম্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এহেন প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি।
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্য শুধু অর্থোপার্জনের একটি মাধ্যম নয়, এটি মানবসেবার অন্যতম একটি মাধ্যম। এ কারণে ব্যবাসা- বাণিজ্য সম্পর্কিত বহুবিধ তথ্য পবিত্র কুরআন ও হাদীসে উপস্থাপিত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কিত পদ্ধতিগুলোর শরীয়াসম্মত নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, ইসলাম কীভাবে ক্রেতা বিক্রেতা এবং ব্যবসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সর্বাধিক কল্যাণ নিশ্চিত করেছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য পণ্যসামগ্রীতে যেভাবে ভেজাল মিশিয়ে কেনা-বেচা করা হচ্ছে তা জনসাধারণের সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরণের ব্যবসায় ইসলামে সর্বাবস্থায় হারাম। একজন মুমিন-মুসলিম ব্যবসায়ী এহেন হারাম ব্যবসা পরিত্যাগ করে হালাল ব্যবসা পরিচালনা করবেন, এটাই আমরা আশা করি। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যদি সৎভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন, ক্রেতাসাধারণ যদি সঠিক পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে সচেতনতা অবলম্বন করেন, সর্বোপরি সরকারি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি তাদেও দায়িত্ব-কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেন, তাহলে বাংলাদেশে পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ