ঢাকা, সোমবার 17 July 2017, ২ শ্রাবণ ১৪২8, ২২ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আবহাওয়ার সঙ্কেত সঠিক তথ্যভিত্তিক করতে নতুন ৬টি কমন সঙ্কেত চালু করা অপরিহার্য

মোঃ এমদাদুল হক (বাদশা) : বাংলাদেশের আবহাওয়া অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং প্রায়ই ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, কালবৈশাখী ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অকালে বহু লোকের জীবন হানি ও সম্পদ খোয়া যায়। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরে এ ব্যাপারে সরকার কর্ম তৎপর হয় এবং নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস রেডিও টেলিভিশনে প্রচার করতে থাকে। বহুবার আবহাওয়ার সঙ্কেতের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণভাবে এদেশে ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হয়ে বহু প্রাণহানি ও সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। চলতি বছরেই পর পর তিন/চার বার সমুদ্র বন্দরের জন্য ৩ নং সতর্ক সঙ্কেত দেয়া হয় যার অর্থ হচ্ছে বন্দরে বাত্যার (ঝড়ো হাওয়া) সমুহ আশংকা রয়েছে।
এতে সাধারণ মাছ ধরার ট্রলার ও উপকূলীয় অঞ্চলে চলাচলকারী নৌ-যানগুলো সাবধানতা অবলম্বন করে না। কারণ জেলেরা সাধারণতঃ বিপদ সঙ্কেত (৫, ৬ ও ৭ নং) এবং মহাবিপদ সঙ্কেত (৮, ৯ ও ১০ নং) উঠলেই কেবল সতর্ক হয় এবং সমুদ্রে মাছ ধরতে যায় না। ফলে বার বার এরূপ ৩নং সতর্ক সঙ্কেত দেখানো হলেও প্রকৃত পক্ষে জেলেরা তা ভ্রুক্ষেপ করে না বিধায় ৩নং সংকেতে বহু মূল্যবান প্রাণ এবং লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পদ বিনষ্টসহ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় করে তুলেছে। অথচ অতীতে ৫-৭ নং বিপদ সংকেতেও এধরনের ক্ষতি হয়নি। কারণ তাতে উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণ সময়মত আশ্রয় নিত। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ৩নং সতর্ক সঙ্কেত না হয়ে ৫-৭নং বিপদ সঙ্কেত হওয়া উচিৎ। তবেই উপকূলীয় অঞ্চলে চলাচলকারী নৌ-যান এবং মাছ ধরার ট্রলারসমুহ নিরাপদ অবস্থানে থাকত ফলে জান মাল বিপন্ন হওয়ার আশংকা থাকত না।
বর্তমানে প্রচলিত শুধুমাত্র ঘূর্ণিঝড়ের জন্য আগাম পূর্বাভাস দেয়ার ব্যবস্থা আছে -যা প্রায়ই বাস্তবভিত্তিক হয় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্ক সঙ্কেত জনগণের কাজে লাগে বৈকি। কিন্তু টর্নেডো ও কাল বৈশাখীর জন্য তেমন কোন কার্যকরী পূর্বাভাস প্রদানের ব্যবস্থা নেই। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, বিগত ১৯৯১ সনের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পরে সরকার সমুদ্র বন্দর ও নদী বন্দরের জন্য একই ধরনের ৬টি সঙ্কেত এবং ঝড়ের গতিবেগ ও করণীয় প্রসঙ্গে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করেছিলেন যার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে প্রায় ১৮ বছর সময় লেগেছে। কারণ আমাদের দেশ ছোট হলেও অনেক বেশী মন্ত্রণালয় ও শাখা-প্রশাখা-বিভাগ-দফতর-অধিদফতর-পরিদফতর রয়েছে যার কারণে জাতীয় অতীব জনগুরুত্বপুর্ণ বিষয়টির উপর অনেকগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নিতে নিতে প্রায় ১৫-১৬ বছর লেগেছে। এ যেন নবাব সিরাজ উদ্দৌলার আমলে কেন্দ্র হতে ১ট চিঠি কুমিল্লার বাঞ্ছারামপুর থানায় আসতে ২৩-২৫ বছর সময় লাগার মত ঘটনা ঘটেছে।  চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আজ প্রায় ২৩ বছর পরও বাস্তবায়িত হয়নি- সত্যিই সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ (!!!) সমুদ্র বন্দরের জন্য বর্তমানে প্রচলিত ৫, ৬ ও ৭ নং বিপদ সঙ্কেতের গুরুত্ব একই-শুধুমাত্র ঘূর্ণিঝড়টি বন্দরের উত্তর-দক্ষিণ অথবা বন্দরের ওপর দিয়ে প্রবাহের জন্য ৫,৬ ও ৭ নং বিপদ সঙ্কেত করা হয়েছে। অর্থাৎ ৫ নম্বর সংকেত উঠলে বাতাসের গতিবেগ ৬২-৮৮, ৬ এবং ৭ নম্বরেও বাতাসের গতিবেগ ৬২-৮৮ কিমি। 
ঠিক একইভাবে ৮,৯ ও ১০ নং মহাবিপদ সঙ্কেতের গুরুত্ব একই রকম- কারণ ৮নং মহাবিপদ সংকেতের সময় বাতাসের গতিবেগ ৮৯ কিমি হতে উর্ধ্বে আবার ৯ ও ১০ নম্বর সময়ও বাতাসের গতিবেগ ৮৯ কিমি এর উর্ধ্বে। শুধুমাত্র দিক নির্দেশের জন্য ৩টি নম্বর ব্যবহার করা হয় যা বাস্তব সম্মত নয় বিধায় বিগত প্রায় ১৯ বছর যাবত পর্যালোচনা করে সারা দেশের জন্য মোট ৬টি সঙ্কেত (সমুদ্র বন্দর ও নদী বন্দরের জন্য একই) পরিবর্তনের জন্য কমিটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে কিন্তু সেটি যদি কার্যকর হতো তাহলেও কিছুটা জন সচেতনাতা-বৃদ্ধি পেত বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।কিন্তু সত্যিই এদেশ খুব দুভার্গ্য নিয়ে এগুচ্ছে-(!!!)। ১৯৬২ সালে প্রণীত অভ্যন্তরীণ নদী বন্দরের জন্য মোট ৪টি ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্কেতের মধ্যে ২নং হুঁশিয়ারী সঙ্কেতের অর্থ হচ্ছে ৬৫ ফুট বা তার ছোট নৌ-যানকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। ফলে ২০০৩ এবং ২০০৪ সনে ২নং সঙ্কেতের সময়ই এমভি নাসরিন-১ এম.ভি দিগন্ত এক্সপ্রেস, মিতালী-৩, লাইটিং সানসহ অনেক লঞ্চও অন্যান্য নৌ-যান ডুবে যায়। ২নং সঙ্কেতে যেহেতু ৬৫ ফুট এর উপরের দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট নৌ-যান চলাচল করা নিষেধ নয় তাই এসব নৌ-যানগুলোর মাষ্টারগণ নিয়ম মোতাবেক বিভিন্ন ঘাট হতে যাত্রা করে এসে মেঘনা নদী বা অন্যান্য বড় নদীতে এসে দেখে যে প্রকৃত অবস্থা ভয়াবহ কিন্তু ঝড়ের সঙ্কেত ২নং-ই ছিল ফলে যাত্রীদের চাপ ও আবহাওয়ার সঙ্কেত অনুসরণ করতঃ বড় নদী পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে যায়।
যার জন্য ঝড়ের সঙ্কেতই অনেকাংশে দায়ী বলে সচেতন মহল মনে করেন। দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে যখন দেখি প্রতি বছরই বর্ষা মওসুমে বঙ্গোপসাগর ও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আবহাওয়ার ৩ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত থাকে তখন অভাবী জেলেরা ৩ নম্বর ঝড়ের সতর্ক সংকেতকে তেমন কোন গুরুত্ব না দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যায়। আর ৩ নম্বর সঙ্কেতে বাতাসের গতিবেগ ঘন্টায় ৪০-৫০ কিমি যা দেশীয় ছোট ছোট ফিশিং ট্রলারগুলো সহ্য করতে পারেনা বিধায় প্রায়ই সাগরে ডুবে যায়। এভাবে এ দূর্ভাগা দেশের নিরীহ জনগণ অকালে প্রাণ হারিয়েছেন-যা বিবেকবান মানুষ সহ্য করতে কষ্ট পাচ্ছেন। দেশের রাস্তা ঘাট উন্নয়নের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে একদিকে যেমন নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদ নদীর স্বাভাবিক গতি প্রবাহকে কন্ঠরোধ করা হচ্ছে, অপরদিকে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। অথচ এর চেয়ে অনেক কম ব্যয় করে আবহাওয়ার উন্নত যন্ত্রপাতি ও নিষ্ঠাবান কর্মচারী সংগ্রহ করে দেশের জনগণের খেদমত করা যায়।
২০০৩ সনে চাঁদপুরের নিকট নাসরীন-১ এবং পাগলার কাছে মিতালী-৩ লঞ্চ ডুবির পরে অতি জরুরী ভিত্তিতে স্থানীয়ভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানের জন্য ১৪টি রাডার ষ্টেশন স্থাপনের কাজ চলছে এবং বর্তমানে কঠোর পদক্ষেপের ফলে যাত্রীবাহী লঞ্চের দুর্ঘটনা অনেক হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া সড়ক পথের চেয়ে নৌ-পথ অনেক নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়েছে কিন্তু বর্তমানে আবহাওয়া বিভাগের দৈন্যদশাতে দেশ ও জাতি চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। নিরীহ জেলেদের বাঁচাতে অবিলম্বে আবহাওয়ার নতুন ৬টি সংকেত ব্যাপক প্রচারের পর জনস্বার্থে চালু করা উচিৎ কারণ আর কোন গরীব অভাবী নিরীহ আনাড়ী জেলেদের অকালে প্রাণহানি জাতি দেখতে চায় না।
লেখক - নদী গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাবেক পরিচালক বিআইডব্লিউটিএ,
e-mail : emdadulbadsha@yahoo.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ