ঢাকা, বুধবার 02 August 2017, ১৮ শ্রাবণ ১৪২8, ৮ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আ’লীগ হিটলারকে পুরো দেবতা মেনেই যাবতীয় কাজ করে -মির্জা ফখরুল

গতকাল মঙ্গলবার শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে বরকত উল্লাহ বুলু মুক্তিপরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে ইউনেস্কোর অবস্থান নিয়ে জ্বালানি উপদেষ্টা মিথ্যাচার করেছেন বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এক আলোচনা সভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাবে না। সংস্থার প্রতিবেদনে এটা প্রমাণিত হলো। আওয়ামী লীগের নেতারা বিশেষ করে যিনি দায়িত্ব উপদেষ্টা আছেন তিনি তারপরও মিথ্যা কথা বলছেন। কীভাবে মিথ্যা কথা বললেন, আমি গতকাল (সোমবার) সংবাদ সম্মেলনটা শুনেছি। এদের চেহারা উন্মোচন হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমি ক্ষমা চেয়ে নিতে চাই, মাননীয় উপদেষ্টা আমার শিক্ষক। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নাম ছিলো, অত্যন্ত মেধাবী বুরোক্রেট ছিলেন, আমলা ছিলেন এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা নিসন্দেহে। আজকে কী ঘটলো যে, আপনি আপনার সমস্ত স্বকীয়তা ত্যাগ করে, নিজের বিবেককে বাদ দিয়ে আপনি এদেশকে ধ্বংস করবার একটা কাজে লিপ্ত হয়েছেন।

রাজধানীর তোপখানা রোডে জাতীয় শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে দলের কারাবন্দী ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর মুক্তির দাবিতে ‘বরকত উল্লাহ বুলু পরিষদের উদ্যোগে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সভাপতি মো. মাসুস রানা‘র সমাবেশে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম আজাদ, হারুনুর রশীদ হারুন, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, কাদের গনি চৌধুরী, যুব দলের মামুন হাসান প্রমূখ বক্তব্য রাখেন।

উল্লেখ্য, পোল্যান্ডের ক্রাকাও শহরে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪১তম সভায় সুন্দরবন বিষয়ে শুনানিতে এই প্রস্তাব গৃহীত হয় বলে রোববার জাতিসংঘ সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়ার পর থেকে ইউনেস্কো তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছিল। ওই সভার পর সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছিল, ইউনেস্কো সুন্দরবনের কাছে রামপালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে ‘আপত্তির জায়গা থেকে সরে এসেছে’। বিদ্যুৎ কেন্দ্রবিরোধী পরিবেশ ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সরকারের ওই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তটি প্রকাশের পর দেখা যায়, তার সঙ্গে সরকারের বক্তব্য পুরোপুরি মিলছে না।

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধি দলের প্রধান প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই ইলাহী চৌধুরী সোমবারই এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, “রামপাল প্রকল্প চলমান থাকবে। সেই সঙ্গে ইউনেসকোর পরামর্শ অনুযায়ী স্ট্রাটেজিক্যাল এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্টও চলবে। কোনো মিটিগেটিং মেজার (পদক্ষেপ) নেয়ার প্রয়োজন হলে আমরা সেটা নেব। তারা যেমন পরিবেশ বিষয়ে সচেতন, তেমনি আমরাও সুন্দরবনের যাতে ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক।” তিনি দাবি করেন, ক্রাকাও বৈঠকে ইউনেসকো আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করতে বলেনি ইউনেস্কো। সুন্দরবনকে এখন ঝুঁকিপূর্ণও বলছে না সংস্থাটি।

সুন্দরবনকে দেশের ‘লাইভ ল্যান্ড’ অভিহিত করে সরকারের উদ্দেশ্যে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের সুন্দরবন আমাদের লাইফ ল্যান্ড, সুন্দরবন আমাদের রক্ষাকবজ। আমাদের পরিবেশকে রক্ষার জন্যে, আমাদের মাটিকে রক্ষা করবার জন্যে সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। সেটাকে ধ্বংস করবার জন্য আপনারা (সরকার) সেখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দিচ্ছেন এবং দেয়ার উদ্দেশ্য কার? কার জন্য দিচ্ছেন? সেটা কী জনগনের জন্য দিচ্ছেন নাকী অন্য কারো যে স্বার্থ সেটাকে চরিতার্থ করবার জন্য দিচ্ছেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদেরকে বুঝতে হবে কারা-কেনো এগুলো করছে, সরকার কাদের স্বার্থে এগুলো করছে? এরা ইতিমধ্যে জনগনের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, ভবিষ্যতে আরো হবে। যারা দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করবে তাদেরকে দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। সুন্দরবন এলাকার কৌশলগত পরিবেশ মূল্যায়নের (এসইএ) আগে সেখানে যাতে বড় কোনো শিল্প বা অবকাঠামো নির্মাণ করা না হয়, তা বাংলাদেশ সরকারকে নিশ্চিত করতে বলেছে ইউনেস্কো।

সরকার দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) হার নিয়ে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজকে যে জাতীয় প্রবৃদ্ধির কথা বলছেন সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের হার্বাডের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সার্ভে রিপোর্টে দেখা গেছে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি চার এর উপরে বেশি নয়। বিশ্বব্যাংক বলছে, এটা ৬ এর উপরে কোনো মতে যেতে পারে না। আমাদের বিজেএমইএ প্রেসিডেন্ট বলেছেন, দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে। প্রতিটি ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ করে দেখবেন তারা ব্যবসা-বানিজ্য করতে পারছেন না, শিল্প উৎপাদন নেই। সরকারের উদ্দেশ্যে ফখরুল বলেন, দেয়ালের লিখন পড়ুন, মানুষের চোখের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করুন আর সত্যটাকে জানার চেষ্টা করুন। জনগনকে বেশিক্ষন বোকা বানিয়ে রাখা যায় না, কিছুক্ষণের বোকা বানিয়ে রাখা যায়।

বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, গত কয়েকদিন ধরে আমাদের প্রধান বিচারপতি এই সরকারের স্বরূপ উন্মোচন করে দিয়েছেন। পরিস্কার করে বলেছেন, তারা কী অবস্থায় আছেন, এই সরকার কী চেষ্টা করছেন। গণতন্ত্র ও সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে নিয়ে তারা তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।

সুশীল সমাজের সাথে নির্বাচন কমিশনের অনুষ্ঠিত সংলাপের বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা পত্র-পত্রিকায় যা দেখেছি, সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা গতকাল (সোমবার) বলেছেন যে, সহায়ক সরকার ছাড়া অর্থাৎ একটা নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। তারা বলে এসেছেন, সেনা বাহিনী মোতায়েন ছাড়া, তাদেরকে ম্যাজেস্ট্রেসি ক্ষমতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। তারা পরিস্কার করে বলেছেন, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে আনতে হবে এবং তাদের জন্য লেভেল প্ল্যায়িং ফিল্ড করতে হবে। আমরা শুধু পুনরায় বলতে চাই, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন করেছেন, সেই নির্বাচন আপনাদেরকে এদেশের মানুষ আর করতে দেবে না। সেই নির্বাচনই হবে যেখানে বিএনপিসহ সকল দল অংশগ্রহন করতে পারবে এবং নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা হবে।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের চামড়া খুব মোটা। যা বলেন, ওদের কিছু যায় আসে না। তারা হিটলারকে বেশি অনুসরণ করে, তারা হিটলারকে পুরো দেবতা মনে করে, তার যাবতীয় কাজ করে। তার যে তথ্যমন্ত্রী ছিলো- গোয়েবলস, উনি বলতেন যে একটি মিথ্যাকে বার বার বলতে থাকো, তা সত্যে প্রমাণিত হয়ে যাবে, জনগন বিশ্বাস করতে শুরু করবে। এজন্য আওয়ামী লীগ মিথ্যা বলতেই থাকে। নির্বাচন হবেই হবে, আর শেখ হাসিনা একমাত্র নেত্রী তার অধীনে নির্বাচন হবে। আমরা স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, ওইরকম নির্বাচনে জনগন অংশগ্রহণ করবে না।

সরকার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ‘বিরাজনীতিকরণ’ প্রক্রিয়া শুরু করেছে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব এর বিরুদ্ধে জনগনকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবানও জানান। তিনি বলেন, তাদের দলের কোনো শক্তি নেই। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, পুলিশ-র‌্যাব-বিজেবিকে ব্যবহার করে আজকে তারা তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে জোর করে টিকে রেখেছে। এসময় বিচারবর্হিভুত হত্যাকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন মির্জা ফখরুল।

আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো ছাড়া বিকল্প পথ নেই উল্লেখ করে দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে করে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া সদস্য সংগ্রহ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের পাশে মিশে যেতে বলেছেন। জনগণকে রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করতে বলেছেন। আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের মাধ্যমে এই অপশক্তিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে। কারণ আওয়ামী লীগ মিথ্যা মামলাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধীদলকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাচ্ছে। সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এরা (আওয়ামী লীগ) রাষ্ট্রযন্ত্র পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে আছে। গোটা দেশকে কারাগার বানিয়েছে। অনেকেই আবার কারাগারে না গিয়ে বন্দী অবস্থায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের হাতে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা পর্যন্ত কেউ নিরাপদ নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ