ঢাকা, বুধবার 23 August 2017, ০৮ ভাদ্র ১৪২8, ২৯ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রের মহানায়ককে ফুল আর অশ্রুতে শেষ শ্রদ্ধা ॥ দাফন আজ

সাদেকুর রহমান : ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রের মহানায়ক রাজ্জাককে ফুল আর অশ্রুতে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানালেন তার তিন প্রজন্মের সহকর্মী ছাড়াও অগণিত ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীরা। তারা স্মৃতিকাতর হয়ে স্মরণ করেন ঢালিউডের অভিভাবকতুল্য এই মানুষটিকে। পরিবারের সদস্যবর্গসহ আত্মীয়-স্বজন ও সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে একাধিক নামাযে জানাযাও অনুষ্ঠিত হয় নায়করাজখ্যাত এই অভিনেতার। এদিকে, শ্রদ্ধা ও নামাযে জানাযা শেষে গতকাল মঙ্গলবার বনানী কবরস্থানে তাকে চিরশয্যায় শায়িত করার কথা থাকলেও মরহুমের কানাডা প্রবাসী মেজো ছেলে বাপ্পী ঢাকার পথে রওয়ানা দেয়ায় আজ বুধবার দাফনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবার।

দাফনের সময় পরিবর্তনের বিষয়ে পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়ে রাজ্জাকের ছোট ছেলে সম্রাট গণমাধ্যমকে বলেন, গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নায়করাজের দাফনের কথা ছিল। কিন্তু মেজো ভাই বাপ্পি কানাডা থেকে আসছেন দেশে। তিনি (আজ) বুধবার ভোরে ঢাকায় আসবেন। তারপর এদিনই সকাল ১০টায় বনানী কবরস্থানে রাজ্জাককে দাফন করা হবে।

টার্কিশ এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে সপরিবারে দেশে ফিরছেন বাপ্পি। রাজ্জাকের সহকর্মী অভিনেতা আলমগীর জানিয়েছেন, অল্পকিছু সময়ের জন্য ছেলেটি বাবাকে দেখতে পারবে না এটা আসলে মানতে পারছি না। পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। বাপ্পারাজের মাও অনুরোধ করেছেন দাফন পেছানো হোক। সেকারণেই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বেশ কিছুদিন ধরে নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন ৭৫ বছর বয়সী রাজ্জাক। গত সোমবার বিকেলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে তাকে নেয়া হয় রাজধানীর বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে। অনেক চেষ্টা করেও ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রের এই শক্তিমান অভিনেতাকে বাঁচাতে পারেননি চিকিৎসকরা। ওইদিন সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কিংবদন্তির এই চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে ঢালিউড ও পশ্চিমবঙ্গের টালিউডে শোকের ছায়া নেমে আসে। গভীর শোক জানিয়ে আলাদা আলাদা বিবৃতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ বিশিষ্ট জনেরা ও বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ২৫ বছর প্রায় একাই টেনে নিয়ে গেছেন এই চিত্রনায়ক। শেষদিকে অন্য চরিত্রে অভিনয় করলেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন তাকে চিরসবুজ নায়ক হিসেবেই দেখে। পাঁচশ’র বেশি চলচ্চিত্রের অভিনেতা আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশের মানুষের কাছে খ্যাত ছিলেন নায়করাজ নামেই। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সাদা-কালো যুগ থেকে শুরু করে রঙিন যুগ পর্যন্ত দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে গেছেন তিনি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন পাঁচ দশকের বেশি সময় তিনি শাসন করে গেছেন রাজার মতো।

সোমবার রাতে রাজ্জাকের লাশ রাখা হয় ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘরে। সেখান থেকে গতকাল বেলা ১১টার দিকে নেয়া হয় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল, জীবনের অন্যতম স্মৃতিবহুল জায়গা এফডিসিতে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পৌনে ১২টায় তার প্রথম জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকে মুষলধারায় বৃষ্টি, এরপর প্রখর রোদ কোনো কিছুই দমাতে পারেনি রাজ্জাকভক্তদের; লোকে-লোকারণ্য ছিল বিএফডিসির প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ভেতরের চত্বর পর্যন্ত। মরহুমের কফিনবাহী গাড়ির সঙ্গে আসেন তার ছেলে চিত্রনায়ক বাপ্পারাজ ও স¤্রাট। 

এফডিসিতে নায়করাজের কফিনে শ্রদ্ধা জানায় তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবার, সিনেম্যাক্স মুভি পরিবার, বাংলাদেশ আওয়ামী সাংস্কৃতিক লীগ, বাংলাদেশ ফিল্ম ক্লাব, চলচ্চিত্র গ্রাহক সংস্থা, চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি, সিনে স্থিরচিত্র গ্রাহক সমিতি, জাসাসসহ বিভিন্ন সংগঠন। 

রাজ্জাককে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমাম, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক ও গীতিকার মাজহারুল আনোয়ার, অভিনেতা আলমগীর, চিত্রনায়িকা ববিতা, শাবনূর, নায়ক শাকিব খান, অভিনেতা সুব্রত, আলীরাজ, রুবেল, ফেরদৌস, আহম্মদ শরিফ, ওমর সানি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি অভিনেতা মিশা সওদাগর ও সাধারণ সম্পাদক নায়ক জায়েদ খানসহ আরও অনেকে।

প্রিয় অভিনেতাকে শ্রদ্ধা জানানোর পর সেখানে তার প্রথম নামাযে জানাযা হয়। সেখানে রাজ্জাকের বড় ছেলে বাপ্পারাজ বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চান।

অভিনেত্রী ববিতা বলেন, আমার জীবনের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি রাজ্জাকের সঙ্গে। রাজ্জাকের পর্দা উপস্থিতি, অভিব্যক্তি এখনকার নায়করা অনুসরণ করেন।

রাজ্জাকের এক সময়ের আরেক পর্দাসঙ্গী অভিনেত্রী সুচন্দা বলেন, রাজ্জাক নায়কের মতো রূপালী পর্দায় এসেছিলেন। তার চলে যাওয়া নায়কের মতোই হলো। তিনি কখনো কারো কাছে কিছু চেয়ে ছোট হননি। রিয়েল লাইফে তিনি মহানায়ক ছিলেন।

নায়ক আলমগীর বলেন, আমার বলার কিছুই নাই। পিতা হারালে সন্তানের যেমন লাগে আমারও তেমন লাগছে।

শাকিব খান বলেন, এখনকার প্রজন্ম এবং আগামী যতো প্রজন্ম আসবে তাদের কাছে নায়করাজ রাজ্জাক প্রেরণা হয়ে থাকবেন। আমরা একজন আইডল হারালাম।

শাবনূর বলেন, বিশ্বাস হচ্ছে না রাজ্জাক আঙ্কেল আর নেই। পর্দা থেকে পেছনের নায়ক রাজ্জাক আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

এফডিসিতে জানাযা শেষে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাজ্জাকের কফিন নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখান থেকে তার কফিন নেয়া হয় গুলশানের আজাদ মসজিদে। দ্বিতীয় দফা জানাযা শেষে তার লাশ রাখা হয় ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমাগারে।

বৈরী আবহাওয়া আর যানজট উপেক্ষা করে গতকাল দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসেছিলেন সরকারের মন্ত্রী, আমলা, রাজনীতিবিদরা। এসেছিলেন চলচ্চিত্র অঙ্গনের সেকাল-একালের সহশিল্পীরা, শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধি আর ভক্তরা। সবার হাতে ছিল শ্রদ্ধার ফুল। এফডিসি থেকে বেলা সোয়া ১২টার দিকে রাজ্জাকের কফিন নেয়া হয় শহীদ মিনারে। 

শহীদ মিনারে প্রথমে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ নায়করাজের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ফুল দেন মন্ত্রী আসাদুজ্জাসান নূর। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ফুল দেন তার দল জাসদের পক্ষ থেকে।

রাজ্জাকের কফিনে শ্রদ্ধা জানানোর পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বাংলা চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন তিনি। তার চলে যাওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। এ শূন্যস্থান কখনও পূরণ হওয়ার নয়। তিনি ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রের উত্তম কুমার।

বিএনপির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গাজী মাজহারুল আনোয়ার, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। পরে নজরুল ইসলাম খান এই নায়ক সম্পর্কে বলেন, ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজ্জাক ছিল আমার প্রিয় বন্ধু। চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার মতো সংস্কৃতিমনা মানুষ কমই দেখেছি। তার সঙ্গে যে কত স্মৃতির অধ্যায়। তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী মানুষ।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, অভিনেত্রী রোজিনা, চিত্রনায়ক শাকিব খান, চিত্রনায়ক জাভেদ, অভিনেত্রী জয়া আহসান। শ্রদ্ধা নিবেদন করে তারা অনেকেই জানালেন তাদের প্রতিক্রিয়া।

অভিনেত্রী রোজিনা বলেন, আমার জীবনের প্রথম ছবি ‘আয়না’তে নায়ক হিসেবে পেয়েছিলাম রাজ্জাক ভাইকে। তার সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে তখন আমার হাত-পা কাঁপছিল। সেটা বুঝে তিনি আমাকে সাহস দিয়ে বললেন, ‘তোমার অভিনয় ভালো হচ্ছে।’ অভিনয়ের অনেক কিছু শিখেছি তার কাছ থেকে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তিনি নিজেই ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও রাজ্জাকের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। শ্রদ্ধা জানায় বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, অভিনয় শিল্পী সংঘ, স্মৃতি ৭১, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, এনটিভি, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, ঋষিজ, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ওয়ার্কার্স পার্টি, দৃষ্টিপাত নাট্য সংসদ, মুক্তধারা সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বাংলাদেশ বাউল একাডেমি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ যুব সমিতি, সুবচন নাট্য সংসদ, দনিয়া সাংস্কৃতিক জোট, ডিরেক্টরস গিল্ড, দেশ টিভি, প্রজন্ম ’৭১, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিসহ আরও অনেক সংগঠন।

তিনদিনের কর্মবিরতি : বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান জানালেন, নায়করাজের মৃত্যুতে তিনদিনের কর্মবিরতি দিয়েছেন তাঁরা। এই তিনদিন কালো ব্যাচ ধারণ করবেন সবাই, এফডিসি ওড়াবে কালো পতাকা। শোকসভা হবে, আলোচনা হবে নায়করাজের জীবন নিয়ে। তিনি বলেন, শোক শুধু মুখেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করতে হবে। আমরা আমাদের পিতাকে, অভিভাবককে হারিয়েছি। তার অভাব অপূরণীয়। এছাড়া গতকাল রাজধানীর মধুমিতাসহ কয়েকটি সিনেমা হল শোক কর্মসূচি হিসেবে সিনেমা প্রদর্শন করেনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ