ঢাকা, সোমবার 28 August 2017, ১৩ ভাদ্র ১৪২8, ০৫ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বকেয়া না পাওয়ায় চামড়া পাচারের আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের

এইচ এম আকতার : ঈদকে কেন্দ্র করে আবার স্বক্রিয় হয়ে উঠেছে লবণের সিন্ডিকেট চক্র। লবণের দাম বৃদ্ধি আর ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায় না হওয়াতে সংকটে চামড়া ব্যবসায়ীরা। পুঁজি সংকট কাটাতে তাই সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন জেলা প্রর্যায়ের চামড়ার ব্যবসায়ীরা। ঈদের আগে সাভারের ট্যানারি পল্লি প্রস্তুত না হলে বড় ধরনের সংকটে পড়বে এ শিল্প। রফতানিতে নেমে আসবে ধস। এ নিয়ে শঙ্কিত ব্যবসায়ীদের ঘুম হারাম।

জানা গেছে সারা দেশের কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের কাছে এখনও পাওনা রয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। এ টাকা না পেলে তারা নতুন করে কাচা চামড়া কিনতে পারবে না। তবে, ট্যানারি মালিকরা বলছে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ওপর নির্ভর করবে তারা কি পরিমান টাকা পরিশোধ করতে পারবে।

আসছে কুরবানি ঈদ। বছরের চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মওসুম। ঈদের দিন থেকেই ব্যস্ত হয়ে উঠবে ঢাকার পোস্তা, নাটোরের চকবৈদ্যনাথ এবং চট্টগ্রামের ট্যানারি পাড়া। প্রতি বছরের ন্যায় এবার চামড়া কিনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এসব ট্যানারি মালিকরা। কিন্তু তাদের অভিযোগ তারা ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে তাদের বিগত দুই বছরের বকেয়া এখনও পায়নি। তাই এখনও তারা কি পরিমান চামড়া কিনতে পারবেন তার কোন পরিকল্পনা করতে পারেনি। তারা বলছেন ট্যানারি স্তনান্তর নিয়ে সরকার এবং ট্যানারি মালিকদের মধ্যে যে রশি টানাটানি চলছে তার শেষ কোথায় জানিনা। 

নাটোরের চামড়ার ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, আমরা ঈদের মওসুমে চামড়া কিনে তা সংরক্ষন করি। লবন দিয়ে তা সংরক্ষণ করে পরে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করে থাকি। কিন্তু এখনও আমরা বকেয়া টাকা পাইনি। এতে আমাদের শঙ্কা হয়ে এই মওসুমে চামড়া কিনতে পারবো কি না। যদি আমরা চামড়া কিনতে না পারি তাহলে তা ভারতে পাচার হয়ে যাবে।

তিনি, আরও বলেন, ট্যানারি মালিকরা যদি এ বছর বেশি ঋণ পেয়ে থাকেন তাহলেই আমরা চামড়া াকনতে পারবো। ঋণ না পেলে আমরা আমাদের বকেয়া টাকা পাবনা। আর বকেয়া না পেলে কোনভাবেই চামড়া কিনতে পারবো না।

নাটোরের আরেক চামড়ার ব্যবসায়ী ওলি আহমেদ বলেন, প্রদি বছর কুরবানির ঈদ এলেই একটি চিহ্নিত চক্র লবণের দাম বাড়িয়ে দেন। এতে আমাদের চামড়া শিল্পের অনেক ক্ষতি হয়। কিন্তু লবন আমদানির অনুমতি দিলেও তাতে কোন লাভ আমাদের হয় না।

তিনি আরও বলেন, প্রতি বস্তা লবণের দাম ছিল ৬৫০ টাকা। তা বাড়িয়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়। সরকার এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার কারনেই প্রতি বছরই তা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এদিকে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা বলছেন, যদি আমরা বেশি ঋণ পেয়ে থাকি তাহলেই বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হবে। তা না হলে পরিশোধ করা কঠিন হবে। কারন হিসেবে তারা বলেন, এখনও সাভারের ১২০ টি কারখানা নির্মাণের কাজ চলছে। এখনও ট্যানারি মালিকদের হাতে কোন টাকা নেই। ব্যাংকের ঋণই আমাদের ভরসা।পাওনা টাকা নিতে এরইমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা ঢাকায় এবং নাটোরে ভিড় করছেন। টাকা না পেলে এবার পথে বসতে হবে বলেও অনেকের আশঙ্কা। চামড়া শিল্প রক্ষায় লবণের দাম কমানো এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের দাবি জানালেন ব্যবসায়ী নেতারা। নাটোরের কাঁচা চামড়ার আড়তগুলো এবার কোরবানিতে কয়েকশো কোটি টাকা লেনদেনের আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে সাভারের আধুনিক চামড়া শিল্প নগরীর বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা না হলে আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানীকারকরা। তারা আরো জানায়, হাজারিবাগ থেকে তাদেরকে জোর করে, বের করে দেয়া হলেও সাভারকে পুরোপুরি প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এ অবস্থায় এবারের কোরবানির ঈদে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা নিয়ে সংকটে পরবেন তারা। আশঙ্কা করছেন এই শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতির।

সারা দেশে বছর জুড়ে যে পরিমাণ পশুর চামড়া সংগ্রহ হয়, তার প্রায় ৬০ ভাগই আসে কোরবানির ঈদে। তবে হাজারিবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্পের স্থানান্তর নিয়ে জটিলতায় এবার বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।

এবারের ঈদে চামড়া সংগ্রহ করা নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানান ব্যবসায়ীরা। তাই অগ্রাধিকার দিয়ে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে। বলা হয়, প্রতিবছর সিন্ডিকেটের কারণে লবণের দাম বৃদ্ধিতে এই শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেয়া হলেও তার কোন সুরাহা হচ্ছে না। অব্যস্থাপনাগুলো সমাধান করা না গেলে চামড়া পাশের দেশে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে ব্যবসায়ীরা।

এদিকে চামড়া কেনার জন্য ব্যবসায়ীদের ঋণ বিতরণ করা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা ঋণখেলাপি হয়ে যায়। এর পরেও বিতরণ করা হয় ঋণ। গতবারের মতো এবারো চামড়া কেনার জন্য চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ব্যবসায়ীদের ঋণ দেবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করবে জনতা ব্যাংক ৩০০ কোটি টাকা। এর পরেই রূপালী ব্যাংক আড়াই শ’ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংক দেড় শ’ কোটি টাকা ও অগ্রণী ব্যাংক দেবে ১০০ কোটি টাকা।

ব্যাংকগুলো থেকে জানা গেছে, যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছেন এবার তাদেরকেই কেবল ঋণ দেয়া হবে। কারণ ইতোমধ্যে যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন তাদের বেশির ভাগই ঋণ ফেরত দিচ্ছেন না। প্রতি বছরই ঈদের আগে চামড়া কেনার জন্য তারা ঋণ নেন। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও ঋণ পরিশোধের ধারেকাছেও আসেন না। আবার ঠিকই ঈদের আগে নতুন করে ঋণ নেয়ার জন্য ব্যাংকের কাছে আসেন তারা। এ ক্ষেত্রে ঋণ নবায়ন, তা-ও আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে ডাউন পেমেন্ট না দিয়ে ঋণ নবায়নের তোড়জোড় শুরু করা হয়।

সোনালী ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ব্যাংকটি গত বছরে যে পরিমাণ চামড়া খাতে ঋণ বিতরণ করেছিল তার বেশির ভাগই খেলাপি হয়ে গেছে। যেমন, পাঁচ বছরে চামড়া শিল্পে ঋণ বিতরণ করেছে প্রায় ৬৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ও নন ফান্ডেড মিলে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ঋণ গেছে নিয়মিত চামড়া শিল্পে। বাকি ৫৮৩ কোটি টাকা গেছে কোরবানির চামড়া ক্রয়ে। এসব ঋণ মোট ১০ প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে প্রায় ৫৫৮ কোটি টাকা। চারটি প্রতিষ্ঠান ঋণ বিতরণ করলেও ছয়টি প্রতিষ্ঠান কোনো ঋণই পরিশোধ করছে না। এর মধ্যে মেসার্স ভারসেজ সুজের কাছে সোনালী ব্যাংকের বকেয়া রয়েছে সাত কোটি ২০ লাখ টাকা, একইভাবে গ্রেট ইস্টার্ন ট্যানারি এক কোটি টাকা, এক্সিলেন্ট ফুটওয়্যার প্রায় ১০ কোটি টাকা, দেশমা সু ইন্ডাস্ট্রিজ প্রায় সাড়ে ২৩ কোটি টাকা, এসএনজেড ফুটওয়্যার প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা এবং আনান ফুটওয়্যারের কাছে ব্যাংকের বকেয়া প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা। এসব ঋণ বর্তমানে খেলাপি হয়ে গেছে।

এবার সোনালী ব্যাংক চারটি প্রতিষ্ঠানকে দেড় শ’ কোটি টাকার ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই সূত্র জানিয়েছে, কোরবানির চামড়া কিনতে গত বছর তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল সোনালী ব্যাংকের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ করপোরেট শাখা। এর মধ্যে ভুলুয়া ট্যানারি বেশির ভাগ ঋণ পরিশোধ করেছে। এবার প্রতিষ্ঠানটি ৪০ কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে। ঋণ ফেরত দেয়ার অভ্যাস থাকায় এবারো ভুলুয়াকে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার চিন্তা করছে ব্যাংক কর্তৃপ। গত বছরের নেয়া আমিন ট্যানারি ২৫ কোটি ও কালাম ব্রাদার্স ট্যানারি ২০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠান দু’টি আরো এক বছর সময় চায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রূপালী ব্যাংক ২০১৬ সাল পর্যন্ত চামড়া শিল্পে ঋণ বিতরণ করেছে ৬৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত বছরই চার প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে ১৬৭ কোটি টাকা। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের মেয়াদ থাকায় এখনো খেলাপি হয়নি। তবে বকেয়া রয়েছে পুরোটাই। এ ছাড়া পুরনো খেলাপি আছে ১৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে হোসেন ব্রাদার্স ২৭ কোটি ২০ লাখ, মাইজদী ট্যানারি ২৪ কোটি, এফ কে লেদার ৫১ কোটি ও মিজান ট্রেডার্সের খেলাপি ৩২ কোটি টাকা। এসব ঋণ ১৯৮৫ সাল থেকে খেলাপি হয়ে আসছে।

গত বছরের মতো এবারো রূপালী ব্যাংক চামড়া খাতে ঋণ দেবে। এ জন্য ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এবার যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন কেবল তাদেরকেই এ ঋণ বিতরণ করা হবে।

জনতা ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, গত বছর ২০ জন চামড়া ব্যবসায়ীর মধ্যে আড়াই শ’ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। এবার এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। যারাই নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছেন তাদেরকেই এ বরাদ্দ থেকে ঋণ দেয়া হবে। ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেছেন তাদেরকে এবার চামড়া কিনতে ঋণ দেয়া হবে। গত বছর এ খাতে ৬০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। এবার এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা।

তবে এবার বেসিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) এ খাতে কোনো ঋণ বিতরণ করছে না। 

ট্যানারি এসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, সাভারে উন্নয়ন কাজ চলছে। এতে করে ট্যানারি মালিকদের হাতে তেমন টাকা নেই। কিন্তু চামড়া ব্যবসায়ীদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে হবে। তা না হলে তারা কাঁচা চামড়া কিনতে পারবে না। তারা যদি চামড়া কিনতে না পারে কিংবা সংরক্ষন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে পাচারের আশঙ্কা থেকেই যায়। যা রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতির কারন হবে। ব্যাংকগুলোর কাছে আমরা ঋণের আবেদন করেছি জানিনা কি পরিমান ঋণ পাবো। তবে এখন পর্যন্ত ৮’শ কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ