ঢাকা, বৃহস্পতিবার 31 August 2017, ১৬ ভাদ্র ১৪২8, ০৮ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কিংবদন্তি সঙ্গীত শিল্পী আব্দুল জব্বার আর নেই

* শেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে

সাদেকুর রহমান : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কন্ঠসৈনিক, কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার আর নেই। ‘সালাম সালাম’, ‘ওরে ও নীল দরিয়া’সহ বহু কালজয়ী গানের এ শিল্পী রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বুধবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে ইন্তিকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। মৃত্যুকালে খ্যাতিমান এ শিল্পী দুই স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে এবং আত্মীয়স্বজনসহ অসংখ্য ভক্ত ও শুভাকাঙ্খী রেখে গেছেন। আবদুল জব্বারের মৃত্যুতে দেশীয় সঙ্গীতাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
বিএসএমএমইউ’র পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুন এই গুণী শিল্পীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেন, শিল্পী দীর্ঘদিন যাবত ক্রনিক কিডনি ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। সকাল থেকে তার লিভার, কিডনি ও মাল্টিপোল অর্গান কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আর এতেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
এদিকে তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও মরহুমের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। গভীর শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আরো শোক প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। এছাড়াও শিল্পকলা একাডেমি, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদ সহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদা শোক বাণী দিয়েছে।
দরাজ ও দরদীকণ্ঠের অধিকারী এ শিল্পী আধুনিক বাংলা গানের বিভিন্ন পর্যায়ে সাড়ে পাঁচ দশক মানবপ্রেম, ভালবাসা, লোকজ, দেশাত্ববোধক, মরমী, দ্রোহ, বিষাদ, প্রতিবাদী, উদ্দীপনা, চলচ্চিত্র, ভক্তিমূলকসহ নানা ধরনের গান গেয়ে সংগীত জগতের এক কিংবদন্তি শিল্পীতে পরিণত হন।
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি, হৃৎপিন্ড, প্রস্টেটসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগেছেন আবদুল জব্বার। এ কারণে গত ৩১ মে থেকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। গঠন করা হয়েছিল চিকিৎসা সহায়তা কমিটি। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে সবার চেষ্টা।
বিএসএমএমইউর কেবিন ব্লকের ৬২০ নম্বর কক্ষে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ডা. দেবব্রত বণিকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন আবদুল জব্বার। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সংকটাপন্ন অবস্থা ছিল তার। রক্তচাপ দ্রুত নেমে যাওয়ায় মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো যোদ্ধা মানসিকতার এই মানুষটিকে।
হাসপাতালে শিল্পীর পুত্র মিথুন জব্বার জানান, অসুস্থ হয়ে পড়লে শিল্পীকে প্রায় এক মাস আগে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতে থাকলে গত রোববার থেকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে হাসপাতালে শিল্পীর সকল প্রকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
বাংলা গানের এই মহান শিল্পীর মৃত্যুর সংবাদ দ্রুত রাজধানীসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক আইন মন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, শিল্পী তিমির নন্দী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছসহ সংস্কৃতি অঙ্গণের অনেকেই হাসপাতালে ছুটে যান।
হাসপাতাল থেকে শিল্পীর লাশ প্রায় ১২টার দিকে মোহাম্মদপুরের মারকাজুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শিল্পীর গোসলের কাজ শেষে তার লাশ কলাবাগানের ভুতের গলি ৫৭/সি, নর্থ সাউথি রোডের ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মহল্লাবাসীর শোক প্রকাশের পর তার লাশ বারডেম হাসপাতালের হিম ঘরে রাখার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য শিল্পীর লাশ আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টা থেকে ১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর নামাযে জানাজা শেষে শিল্পীকে দাফন করার কথা রয়েছে। তবে দাফন কখন ও কোথায় হবে সে বিষয়টি গত রাত পৌণে ৯টা পর্যন্ত পারিবারিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়নি বলে জানা গেছে।
শিল্পী আবদুল জব্বার ১৯৩৮ সালে ৭ নবেম্বর কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন। ওস্তাদ ওসমান গণি ও ওস্তাদ লুৎফুল হকের কাছে তিনি সঙ্গীতে শিক্ষাগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে প্রথম রেডিওতে এবং ১৯৬৪ সালে টিভিতে প্রথম কন্ঠশিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন ও স্থায়ী শিল্পী হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন। শিল্পীর সংগীত জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অবদান হচ্ছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগদান।
স্বজনরা জানা, ব্যক্তিজীবনে তিনবার বিয়ে করেন আবদুল জব্বার। তার প্রথম স্ত্রী হালিমা জব্বার একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাদের দুই ছেলে মিথুন জব্বার ও বাবু জব্বার এবং মেয়ে মুনমুন জব্বার। দ্বিতীয় স্ত্রী শাহীন জব্বার ছিলেন গীতিকার। তার তৃতীয় স্ত্রী ডলি জব্বার বাংলাদেশ বেতারের একজন কর্মকর্তা।
অসংখ্য কালজয়ী গানে কণ্ঠ দেয়া এ শিল্পী মুক্তিযুদ্ধের সময় কাঁধে হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে গেরিলাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে উদ্দীপনামূলক গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং জনগণকে উজ্জীবিত করেন। ওই দুঃসময়ে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অসংখ্য গান গেয়েছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এ শিল্পীর গাওয়া বিভিন্ন গান মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি দেশবাসীরও প্রেরণা ও মনোবল বাড়িয়েছে। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে গণসঙ্গীত গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ টাকা তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেছেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুম্বাইয়ে ভারতের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনমত তৈরিতেও নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
দেশের মানুষের ভালবাসার এ শিল্পী সঙ্গীতের নানা ঘরানার কয়েক হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। এর মধ্যে দুই শতাধিক চলচ্চিত্রের গানও রয়েছে। তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে- ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়’, ‘এ ভুবনে কে আপন’, ‘এ মালিকে জাহান’, ‘আমার সে প্রেম’, ‘আমি বসন্ত হয়ে এসেছি’, ‘আমি এক নীড় হারা পাখি’, ‘আমি নিরবে জ্বলতে চাই’, ‘আমি প্রদীপের মতো আলো দিয়ে যাব’, ‘আমি তো বন্ধু মাতাল নই’, ‘ভালবাসা যদি’, ‘বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা’, ‘দু’জাহানের মালিক তুমি’, ‘এ আঁধার কখনও যাবে না মুছে’, ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে, জানি কবিতার চেয়ে তুমি’, ‘কে যেন আজ ডেকে নিয়ে যায়’, ‘খেলাঘর বারে বারে’, ‘কি গান শোনাব ওগো বন্ধু’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘মুখ দেখে ভুল করো না’, ‘মুজিব বাইয়া যাও রে’, ‘হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে’ প্রভৃতি গান।
আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়..’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহীদ স্মরণে..’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়.., এ গান তিনটি ২০০৬ সালে মার্চ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের বিচারে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
যে সকল চলচ্চিত্রের গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন, সে চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে- মেঘের পর মেঘ, অধিকার, মাস্তান, জীবন তৃষ্ণা, আলোর মিছিল, জয় পরাজয়, মা, বেঈমান, ঝড়ের পাখি, আপন পর, দাতা হাতেম তাই, বিনিময়, এতোটুকু আশা, কত যে মিনতি, মানুষের মন, অবুঝ মন, ঢেউয়ের পর ঢেউ, অনুরাগ, দ্বীপ নেভে নাই, পীচ ঢালা পথ, ঘর জামাই, সারেং বউ, ঈমান, যে আগুনে পুড়ি, সাধু শয়তান, আগুনের আলো, স্লোগান ইত্যাদি।
সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বঙ্গবন্ধু পদক (১৯৭৩)’, ‘একুশে পদক (১৯৮০)’, ‘স্বাধীনতা পদক (১৯৯৬)’, ‘জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার’, ‘বাচসাস আজীবন সন্মাননা’, ‘সিটিসেল-চ্যানেল আই সংগীত পুরস্কার’সহ জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন্ পদক ও সম্মাননা অর্জন করেছেন।
আবদুল জব্বারের জনপ্রিয় তিন গানের গল্প : আব্দুল জব্বারের কন্ঠস্বর চিরকালের জন্য স্তব্ধ হলেও রয়ে যাবে তার কালজয়ী গানগুলো। যে গান গেয়ে জয় করেছিলেন চার দশকের সংগীতপিপাসুদের হৃদয়। আজ তেমন তিনটি গানের গল্প শোনা যাক।
কালজয়ী গান হিসেবে প্রথমেই বলা যায় আবদুল জব্বারের গাওয়া ‘ওরে নীল দরিয়া, আমায় দে রে দে ছাড়িয়া’ ‘সারেং বউ’ ছবির এই গানটির কথা। গানটির সুর করেছেন বরেণ্য সুরকার আলম খান। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে একটি জাতীয় দৈনিককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আলম খান জানান, গানটির অস্থায়ী সুরটা ১৯৬৯ সালে করা। আলম খান বলেছিলেন, ১৯৬৯ সালে একটু অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। একদিন বিকেলে একটু সুস্থ বোধ করছি, গুনগুন করে সুরটা মাথায় আসে। কিন্তু তখন সুরের ওপর কথা লেখা হয়নি। আমি মনের মতো কোনো দৃশ্য পাইনি বলে কোনো ছবিতে সুরটি ব্যবহার করতে পারিনি। তবে কোনো জায়গায় ব্যবহার করার সুযোগ পাইনি, ‘সারেং বৌ’তে পেলাম।
১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে আবদুল্লাহ আল-মামুন এলেন তাঁর ‘সারেং বউ’ ছবিটি নিয়ে। সারেং বাড়ি ফিরছে-এ রকম একটি সিকোয়েন্স তিনি আমাকে শোনান। ওখানে দেখা যাবে, সারেং গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরছেন। আর তাঁর স্ত্রী সেটি স্বপ্নে দেখছে। তখন আমি গানটির জন্য দীর্ঘদিন ধরে রাখা ওই সুরটি গীতিকার মুকুল চৌধুরীকে শোনাই। তিনি তখন সুরের ওপর ‘ওরে নীল দরিয়া’ পুরো মুখটি লিখে দেন। তিনি দুই দিন পর গল্প অনুযায়ী অন্তরাসহ লিখে নিয়ে এলেন। আমি তাঁর কথার ওপরই সুর করি।
আমি মামুন ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম, সারেং কীভাবে বাড়ি ফিরছে। তখন তিনি বললেন, প্রথম অন্তরায় ট্রেনে, দ্বিতীয় অন্তরায় সাম্পানে, এরপর মেঠোপথ ধরে ফিরবে। দৃশ্য অনুযায়ী ট্রেনের ইফেক্ট, সাম্পান, বইঠা, পানির ছপ ছপ শব্দ এবং শেষে একতারার ইফেক্ট তৈরি করলাম। গানটি কাকে দিয়ে গাওয়ানো যায়, যখন ভাবছিলাম, তখন আবদুল্লাহ আল-মামুনই আবদুল জব্বারের কথা বলেন। গানটি কাকরাইলের ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে রেকর্ডিং হয়েছিল। এই গানে ১২ জন রিদম প্লেয়ারসহ ১০ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী বাজিয়েছিলেন।
আবদুল জব্বারের গাওয়া ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটির সুরকার তিনি নিজেই। লিখেছেন ফজল-এ-খোদা। একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, এ গানের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে শিল্পী আবদুল জব্বার লিখেছেন, ১৯৬৯ সাল। গণ-অভ্যুত্থানের হাওয়ায় উত্তাল দেশ। এমনই প্রেক্ষাপটে কবিতা লেখার মানসে কবি ফজল-এ-খোদা হাতে কলম তুলে নিয়েছিলেন। একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা। হাতে তুলে দিলেন অনবদ্য গীতি কথার টুকরো কাগজটি। টুকরো কাগজে লেখা কথাগুলো পড়েই শিহরিত হয়ে উঠলাম। মনে হলো, এটা তো আমারই কথা! মনের গহিনে সারাক্ষণ এ কথাগুলোই বেজে চলে! অথচ কখনো বলা হয়নি। এবার যখন বলার সুযোগ এল, সে সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলাম না। দিনরাত ভাবতে থাকলাম কেমন হবে গানের সুর? একসময় সুর করেও ফেললাম। গানের সঙ্গে মানানসই বলে মনে হয়েছিল আমার। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই, গানটি সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার মতো পরিবেশ পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় দুই বছর পর এল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। সেটি ছিল ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমাদের উজ্জীবিত করে। ভাষণের পর চলল ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি গাইতে গাইতে ট্রাকে করে ঘুরে বেড়ানো। এই গানের কথা একদিন বঙ্গবন্ধুর কানেও পৌঁছেছিল। তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, তোর মতো এত পাতলাপুতলা একটা পোলা আইয়ুবের বিরুদ্ধে কথা কয়, ভয় করে না? তখন আমি তাকে বলেছিলাম, বাবা আপনে যদি ভয় না পান, তাহলে আমি পাব কেন? আমার মুখে এমন কথা শুনে সেদিন থেকে বঙ্গবন্ধু আমাকে ছেলে সম্বোধন করা শুরু করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ এটি প্রথম বেতারে প্রচার হয়।
‘তুমি কী দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’- এটি আবদুল জব্বারের গাওয়া আরেকটি কালজয়ী গান। এটি লিখেছেন অনেক কালজয়ী গানের গীতিকার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। সুর করেছেন সত্য সাহা। গানটি ব্যবহার করা হয়েছিল নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে।
নিজের গাওয়া গানের মধ্যে এ গানটি আবদুল জব্বারের খুব পছন্দ ছিল। এ বিষয়ে আবদুল জব্বার ইতিপূর্বে বলেছেন, ‘গানটি এফডিসিতে রেকর্ডিং হয়েছিল। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর শুনি, গানটি নিয়ে নাকি তোলপাড় হয়ে গেছে। গানটি পর্দায় আলতাফ যখন গেয়ে ওঠেন, তখন পর্দার সামনে অনেক লোকের চোখে পানি দেখেছিলাম। জীবনে যতবার মঞ্চে গান করেছি, এ গানটি গাইতেই হয়েছে।
স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আবদুল জব্বার আরও বলেছিলেন, অনেক মানুষের মুখে শুনেছি গানটি তাদের প্রিয় গানের তালিকায় আছে। তবে এর মধ্যে একজনের কথা না বললেই নয়। বিখ্যাত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের খুব প্রিয় গান ছিল এটি। তিনি গানটি শুনে বলেছিলেন, ‘তুমি বাংলাদেশের জব্বার, তোমার এই গান আমাকে মোহিত করেছে। এত সুন্দর কণ্ঠ, এত সুন্দর গান বিরল।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ