ঢাকা, রোববার 15 October 2017, ৩০ আশ্বিন ১৪২8, ২৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দেশের স্বার্থেই নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে  অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে হবে 

 

 

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের স্বার্থেই আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন অপরিহার্য বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলেন, আবার ৫ জানুয়ারি মার্কা নির্বাচন হলে দেশ আরো পিছিয়ে পড়বে। প্রশ্নাতীত নির্বাচনের জন্য বিদেশী পর্যবেক্ষক রাখতে হবে। নির্বাচনকালে সার্বক্ষণিক সেনা মোতায়েন করতে হবে। এতে নির্বাচনে সব দল অংশ নেয়ার সুযোগ পাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য হবে। গণতন্ত্র ও অর্থনীতির স্বার্থে এটা অতি জরুরি মন্তব্য করে এজন্য সরকারের সদিচ্ছা, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাটাই বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। 

গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশের নির্বাচন ও গণতন্ত্র বিষয়ক এক গোলটেবিল বৈঠকে তারা এ অভিমত দেন। ‘দ্য ঢাকা ফোরাম’ নামের একটি সংগঠনের আয়োজনে গোলটেবিল আলোচনায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা নির্বাচন এবং এর কর্মকৌশল কী হতে পারে সেসব নিয়ে আলোচনা করেন ও তাদের মতামত তুলে ধরেন। আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা, সাবেক তথ্যমন্ত্রী মিজানুর রহমান শেলী, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব ড. আলী ইমাম মজুমদার, সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক, ঢাকা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদ আখতার, সাবেক রাষ্ট্রদূত এফ এ শামীম আহমেদ, আহমাদ মাহমুদুর রেজা চৌধুরী, ইফতেখারুল করিম, মাসুদ আজীজ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সেরাজুল ইসলাম।

 কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ তার আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থনেতিক উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি সুশাসন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নির্বাচিত সরকার উন্নয়ন ধারাকে এগিয়ে নিতে চায় তাকে অংশগ্রহণমূলক হতে হবে বলেও উল্লেখ করে তিনি বলেন, অংশীদারমূলক সরকার না হলে অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উন্নয়ন ও ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখা কঠিন। একতরফা নির্বাচন করলে তা গ্রহণযোগ্য হবেনা। দেশের সুশাসন বাধাগ্রস্ত হবে, অর্থনীতি আবার পিছনের দিকে চলে যাবে।

নাগরিক সংগঠন সুজন’র বর্তমান সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি হবে না সেটি সরকারের চাওয়ার ওপর নির্ভর করে। সরকার না চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। সরকার যাতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, এ জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার লাগবে। তিনি বলেন, পকেট ইলেকশন যাতে না হয়, সে জন্য সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষক রাখতে হবে। সর্বোপরি সেনা মোতায়েন করতে হবে। একই সঙ্গে যাতে নির্বাচন কমিশন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ভাবে কাজ করতে পারে সে জন্য সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির সমালোচনা করে বলেন, আগে তাদেরকে বিপ্লবী দল হিসেবে জানতাম। কিন্তু তারা এখন ক্ষমতালোভী হয়ে গেছে।   

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনও বলেন, আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে সরকারের সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন সংসদ ভেঙে দেয়ার দাবি জানাবে উল্লেখ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মইনুল হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তারা উদ্যোগ নিলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে। তিনি বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্যে লিপ্ত হয়। এটা পরিহার করতে হবে। তিনি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধান দলগুলোকে অংশগ্রহণের পরিবেশের গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, সরকার চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। 

সাবেক সিইসি ড. এ টি এম শামসুল হুদা সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শামছুল হুদা বলেন, গণতন্ত্রের চরম দুঃসময় চলছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে প্রথমে সবদলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে। নির্বাচন বয়কট পরিহার করতে হবে। গত নির্বাচনে কয়েকটি দল অংশগ্রহণ না করায় ১৫৩টি আসনে বিনা ভোটে জয় পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি এমন একটি দল যে ৭০-৮০টি আসন পেতো। আগামী নির্বাচন কোনো ভাবেই ছেড়ে দেয়া যাবে না। ভারতের বিজেপি দলের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একসময় দলটি ২টি আসন পেয়েছিলো। এখন জনগণের ভোটে ক্ষমতায় রয়েছে। এই জন্য নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

মিজানুর রহমান শেলী বলেন, সরকার যদি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মত আবার একইভাবে নির্বাচন করে তাহলে তাতে সরকারেরই ক্ষতি হবে। দেশে প্রতিহিংসা, প্রতিরোধের সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে তারা কি ধরনের সংকটে আছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সাথে দেশের ভবিষ্যত অনেক কিছু জড়িয়ে রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বোঝা গেছে সরকারের কোন বন্ধু নেই।

সাবেক আওয়ামীলীগ নেতা আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার নিরপেক্ষ না হয়। ততক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না। তিনি বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নির্বাচনের সময় নির্ভয়ে রদবদল করতে পারে। সেনাবাহিনী মাঠে সঠিক ভাবে কাজ করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। সঠিকভাবে কাজ করলে জনগণের বিজয় হবে। 

ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, দেশে নির্বাচনের কোন সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। গত নির্বাচনে এরশাদকে যেভাবে জোর করে অসুস্থ করা হয়েছিল, এখন প্রধান বিচারপতিকে সেভাবে জোর করে অসুস্থ বানানো হয়েছে। ফলে এখনো সে রকম পরিবেশই বিরাজ করছে। তিনি বলেন, বিএনপি যাতে নির্বাচনে না যায়, সংলাপে না যায় সেজন্য বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা দিয়ে উসকানি দিচ্ছে। জামায়াত নেতাদের আটক করে নেগোসিয়েশন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা সরকারের ফাঁদে পা দিচ্ছিনা। ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচন আর সরকার করতে পারবেনা। যে নামেই হোক ভোট পাহারা দেয়ার সরকার গঠন করতে হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। 

ড. আলী ইমাম মজুমদার বলেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ অন্তর্বর্তী সরকারের কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি বর্তমান সংসদে থাকা দলগুলো নিয়ে এ সরকার গঠনের কথা বলেছেন। এটা হলে আগের মত অবস্থাই হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার পরিবেশ থাকবে না। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সরকার থাকতে হবে। কিন্তু সে জাতীয় সরকার গঠন করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। 

ইকতেদার আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে এ পর্যন্ত ১০টি নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি দলীয় সরকারের অধীনে এবং ৪টি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। দলীয় সরকারের অধীনের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরাই বিজয়ী হয়েছে। আর অন্তর্বর্র্তী সরকারের অধীনের নির্বাচনে বিরোধী দল জয় লাভ করেছে। এজন্য দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ফলাফল কী হবে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট। তিনি বলেন, বর্তমান কমিশন রকিব কমিশন থেকেও নিকৃষ্ট, তাদের দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। 

ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে ধ্বংস করা হচ্ছে। সর্বশেষ বিচার বিভাগ দুর্বল করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া এ সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। এজন্য আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে। সরকারের স্বদিচ্ছা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুল ইসলাম তার প্রবন্ধে বলেন, সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। এজন্য সবার আগে দরকার প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ