ঢাকা, শুক্রবার 15 December 2017, ১ পৌষ ১৪২৪, ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জেরুসালেম প্রশ্নে ওআইসি’র ঘোষণা

ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ওআইসি পূর্ব জেরুসালেমকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ওআইসি’র বর্তমান চেয়ারম্যান এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের আহ্বানে দেশটির বৃহত্তম নগরী ইস্তাম্বুলে গত বুধবার অনুষ্ঠিত ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানদের বিশেষ সম্মেলনে গৃহীত এই ঘোষণায় ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং পূর্ব জেরুসালেমকে এর রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য বিশ্বের সকল দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, দিন কয়েক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশু কোনো কারণ বা উপলক্ষ ছাড়াই আকস্মিক এক বিবৃতিতে জেরুসালেমকে অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইলের রাজধানী বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্টের সে ঘোষণার প্রতিবাদ জানানোর এবং মুসলিম বিশ্বের করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যেই প্রেসিডেন্ট এরদোগান ওআইসির এই বিশেষ শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবদুল হামিদ এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানীসহ ওআইসির সকল সদস্য রাষ্ট্রের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধান এবং প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।
সম্মেলনের ঘোষণায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে আইনগতভাবে অবৈধ বলে মন্তব্য করে বলা হয়েছে, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এবং নতুন করে ছড়িয়ে পড়বে প্রাণঘাতী সংঘাত। আর এ ধরনের সকল প্রতিক্রিয়ার জন্যই দায়ী থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পথ ধরে কোনো দেশ যদি জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তাহলে মুসলিম দেশগুলো সম্পর্ক ছিন্ন করাসহ তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে বলেও ঘোষণায় সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। ওআইসি একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি ভূখন্ডের ওপর থেকে ইসরাইলের দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে তৎপর হওয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ওআইসির ইস্তাম্বুল শীর্ষ সম্মেলনে দেয়া ভাষণে ইসরাইলকে একটি অবৈধ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, দেশটির ইহুদী সরকার ক্রমাগতভাবে ফিলিস্তিনের ভূখন্ড দখল করে চলেছে। ইসরাইলের এই সম্প্রসারণবাদী তৎপরতাকে কোনোক্রমেই গ্রহণ করা হবে না বরং প্রতিহত করতে হবে। জেরুসালেম তথা বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব মানবতাকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। এই ভুল, বেআইনি ও উসকানিমূলক সিদ্ধান্তের পেছনে খ্রিস্টান ও ইহুদিবাদী মন-মানসিকতা কাজ করেছে বলে কটাক্ষ করে প্রেসিডেন্ট এরদোগান সিদ্ধান্তটি বাতিল করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের সংঘাতে মধ্যস্থতা করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান আরো বলেছেন, যেসব দেশ আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারকে মূল্যায়ন ও সম্মান করে সেসব দেশের উচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করা এবং জেরুসালেমকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া।
বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানী বলেছেন, ওআইসির পক্ষ থেকে পূর্ব জেরুসালেম তথা আল-কুদ্সকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার যে আহবান জানানো হয়েছে তার বাস্তবায়নে মুসলিম দেশগুলোকে কঠোর অবস্থান নিয়ে ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রেসিডেন্ট রুহানী বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন, মুসলিম দেশগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলে মার্কিন সরকার তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারবে না। গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বিশ্বের সব দেশের মুসলিমরাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মুসলিম ও ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বুঝতে পেরেছে এবং এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। ইস্তাম্বুল ঘোষণাও তার প্রমাণ।
ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ওআইসির বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ ছাড়াও ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থে বক্তব্য যেমন রাখা হয়েছে তেমনি নেয়া হয়েছে কিছু সিদ্ধান্তও। আমরা পূর্ব জেরুসালেমকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করে ওআইসির দেয়া ঘোষণার প্রতি সর্বান্তকরণে সমর্থন জানাই এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেয়া সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করি। বলা দরকার, ওআইসির সিদ্ধান্ত ও ঘোষণার পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। কারণ, ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল অবৈধ পন্থায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত ফিলিস্তিনের ভ’খন্ড দখল করে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠাকালেই ইহুদী সমরবাদীরা জেরুসালেমের পশ্চিম অংশ দখল করে নিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ পাশ্চাত্যের মুসলিম বিরোধী দেশগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতায় শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইসরাইল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পূর্ব জেরুসালেমও দখল করে নেয়। ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী নেতারা একই সঙ্গে ঘোষণা করেন, মুসলিমদের পবিত্র স্থান বায়তুল মুকাদ্দাস তথা পূর্ব জেরুসালেমই হবে ইসরাইলের রাজধানী।
কিন্তু ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র প্রতিরোধের পাশাপাশি সকল আরব রাষ্ট্র এবং বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের তীব্র বিরোধিতার কারণে এতদিন ইসরাইল তার সে ঘোষণার বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অন্যদিকে জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু ইসরাইলের সমর্থনেই অবস্থান নেননি, পরিষ্কার উসকানিও দিয়েছেন। এর ফলে ইসরাইল যেমন উৎসাহিত হবে, তেমনি প্রতিরোধ গড়ে তুলবে ফিলিস্তিনিরা। তারা যে সঙ্গিহীন বা দুর্বল নয় বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বই যে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াবেÑ সে ঘোষণাই এসেছে ওআইসির ইস্তাম্বুল শীর্ষ সম্মেলন থেকে। আমরা মনে করি, মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকা অন্য সকল দেশেরও উচিত ইসরাইলের অন্যায় যুদ্ধ ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং ওআইসির ঘোষণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করা। আমরা আশা করতে চাই, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ওআইসির আহবানে সাড়া দিয়ে তার সিদ্ধান্ত বাতিল করবেন, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশংকা না দেখা দিতে পারে। ইসরাইলের দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে তৎপর হওয়ার জন্য আমরা জাতিসংঘের প্রতিও আহবান জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ