ঢাকা, শুক্রবার 15 December 2017, ১ পৌষ ১৪২৪, ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়ে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি

এডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান : [তিন]
সৎ মা, সৎ পিতা ও সৎ ভাইদের দ্বারা শিশু নির্যাতন : মানব সমাজের দাম্পত্য জীবনের কোন এক  পর্বে আল্লাহর মেহেরবানীতে মায়ের কোল জুড়ে একটি শিশুর জন্ম হয়। পরম স্নেহ মমতা দিয়ে বাবা- মা, নানা- নানী, দাদা-দাদী, চাচা- ফফু, খালা, মামা, ভাইবোন বাচ্চাটিকে খাদ্য, চিকিৎসা, পোশাক ও আদর স্নেহ দিয়ে লালন পালন করে বড় করতে থাকেন। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় শিশুটির মা ছোটবেলায় মৃত্যুবরণ করে। অনেক সময় বাবাও মৃত্যুবরণ করে। মাতার মৃত্যুজনিত পরিস্থিতিতে বাবা আর একজন স্ত্রী ঘরে আনেন। আবার অনেক সময় শিশুটির মায়ের অন্যত্র বিবাহ হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়া শিশুদের জীবনে কি ধরনের  দুঃখ কষ্ট নেমে আসে তা অনেক সময় চোখের আড়ালেই থেকে  যায়। এধরনের শিশুদের অনেকেই সৎ মায়ের চক্রান্তে প্রাণ দিতে হয়। না হলেও অল্প খেয়ে, পরে  অনেক কষ্ট সহ্য করে বড় হতে হয়। সৎ মায়ের প্রভাবে অনেক সময় শিশুটির পিতা শিশুটিকে মারপিট সহ নানাভাবে কষ্ট দেয়। সৎ ভাই, বোনদের দ্বারাও অনেক শিশু নির্যাতিত হয়। এধরনের শিশুদের পক্ষ হয়ে কথা বলার কোন লোক সমাজে দেখা যায় না। সমাজের সচেতন শ্রেনির মানুষরা পর্যন্ত এক্ষেত্রে বলে থাকে যে যার ছেলে সে মেরেছে তাতে আমাদের কি করার আছে।
শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের দ্বারা শিশু নির্যাতন : বাংলাদেশ সহ সমগ্র উপমহাদেশে বিচিত্র ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। দিন যত এগুচ্ছে এ ধরনের বৈচিত্র্যতা দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে। সমস্ত শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে আছে পুরোনো ধাচের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কওমী মাদ্রাসা, হাফেজী মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন এবতেদায়ী মাদ্রাসা, কিন্ডার গার্টেন স্কুল প্রভৃতি। সম্প্রতি শিক্ষকদের দ্বারা নির্মমভাবে শিশুদের মারপিটের শিকার হওয়ার একাধিক ভিডিও ফুটেজ ইউটিউবে ভাইরাল হয়েছে। যা বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হায়েনা তুল্য, হিংস্র শিক্ষকদের দ্বারা শিশু নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে সামান্য কয়েকটি মাত্র। সম্প্রতি ঢাকার ডেমরা আ: মান্নান সহকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আ: মোত্তালেব কর্তৃক অপরাধ ছাড়াই পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী সাদিয়া আফরীনকে শুধুমাত্র একটি হাসি দেওয়ার অপরাধে বেঞ্চের নীচে মাথা ঢুকায়ে সারা শরীর বেত্রাঘাতে ক্ষত বিক্ষত করে দেয়া হয়। বাচ্চাটির মা একজন স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা। সে পরের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে অতিকষ্টে বাচ্চাটিকে পড়াত। বাচ্চাটির দেহে যেভাবে ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় দেখা গেছে তাতে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দেশের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গরীব বাচ্চারা সময় মত বেতন নিয়ে না আসায় এক শিক্ষক বাচ্চাদের ১০ টি করে বেত্রাঘাত করে। টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় বাচ্চাগুলোর পিঠে ও শরীরের অন্যান্য স্থানে যখমের কারণে দগদগে ঘা সৃষ্টি হয়েছে। ঐ শিক্ষকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে টিভি প্রতিবেদক কথা বললে তিনি অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চান। সম্প্রতি একটি টিভি প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, ঢাকার নাম করা প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেন্টগ্রেগরী হাইস্কুল এ্যান্ড কলেজে ছোট বাচ্চাদেরকে দীর্ঘ সময় কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখার শাস্তি দেয়া হয়েছে। কওমী মাদ্রাসার একটি ছাত্রাবাসের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে বাচ্চারা যাতে পালিয়ে না যায় সেজন্য কয়েকটি বাচ্চার পায়ে পরানো আছে লোহার শিকল। আর শিকলের  মাথায় ভারি পাথর লাগানো আছে। আমার নিজস্ব গ্রামে এধরনের একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় কয়েক বৎসর আগে একটি  ছোট বাচ্চার পায়ের তলায় এক শিক্ষক নামধারী নির্মমভাবে মার ডাং করে। বাচ্চাটি ঐ নির্যাতনের পর দৃষ্টি শক্তি হারায়ে ফেলে। পরে বাচ্চাটি মারা যায়। বাচ্চাটিকে মারপিটের ঘটনায় ব্যথিত হয়ে আমি ঐ মাদ্রাসায় একজন সাংবাদিককে যেতে বলি সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার প্রমাণ পান। পরে আমার এলাকায় আমার নামে ঐ মাদ্রাসার শত্রু হিসাবে প্রচার চালানো হয়। মাদ্রাসা কমিটিতে বাচ্চাটির মামা ঐ মাদ্রাসা কমিটির পরিচালনা কমিটিতে থাকায় বিষয়টি ধামাচাপা দেয়া হয়। আমাদের সমাজের এক শ্রেণির নির্দয় ব্যক্তি যারা তাদের বাচ্চাদেরকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে শিক্ষাদানের হুকুম দিয়ে উৎসাহিত করে থাকেন। ৩/৪ মাস আগে ইউটিউবে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে যে, একটি ৬/৭ বছরের বাচ্চাকে একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়। কোন অপরাধে মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ বা আলিম নামধারী একজন বাচ্চাটিকে পায়ের নিচে চেপে ধরে মারপিট করছে এবং কিছুক্ষণ পর পর ছেচরায়ে মাদ্রাসার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাটি আল্লাহ আল্লাহ বলে চিৎকার করছিল। বাচ্চাটির চিৎকারের পরও পাষন্ড শিক্ষকটির মনে কোনরূপ দয়ার উদ্রেক হয়  নাই।
এতিমখানা কওমী মাদ্রাসা ও আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে বিচিত্র ধরনের শিশু নির্যাতন : নিবন্ধের  এ অংশটি লিখতে গিয়ে আমি দেশের শ্রদ্ধেয় আলেম সমাজ, হাফেজে কোরআন ভাইদের কাছে কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। কারণ এ অংশে এমন একটি বিষয়ে আলোকপাত করবো যা ৪ হাজার বছর আগের দিনের লুৎ সাগরের তীরের বাসিন্দারা করেছিল। তা হচ্ছে সমকাম। তাও আবার ছোট বাচ্চাদের সাথে জবরদস্তি করে প্রাণ ভয়, মারের ভয় দেখায়ে, চকলেট খাওয়ানোর লোভে দেখায়ে, ভালো পোশাক কিনে দেয়ার লোভ দেখায়ে। কয়েকমাস আগে আমার নিজ গ্রামের হাফেজিয়া মাদ্রাসায় একটি ছোট বাচ্চাকে একজন হাফেজ নামধারী পায়ুপথে জবরদস্তি মুলকভাবে বলাৎকার করে। বাচ্চাটি নির্যাতিত হয়ে চিৎকার দিলে ঘটনাটি জানাজানি হয়। পরে ঐ হাফেজ নামধারী পশুটি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেল হাজতে আছে। আমাদের দেশের হাফেজিয়া মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসার ছাত্রাবাস সমূহে অনেক শিক্ষক স্ত্রী সন্তান পরিবার ছাড়া বছরের পর বছর অবস্থান করতে দেখা যায়। এরা ছাত্রাবাসের অনেক শিশু বাচ্চাকে নানা প্রলোভন দিয়ে বা ভয় দেখায়ে তাদের সাথে সমকামে রাজী হতে বাধ্য করে। বাচ্চাটি লজ্জায় শরমে বা ভয়ে ঘটনাটি প্রকাশ করতে পারে না।  মনের মধ্যে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ নিয়ে এরা বড় হয়। এক সময় ধর্ম শিক্ষক, আলেম এমনকি পবিত্র ইসলাম ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠে। ১৯৭৬ সালে আমি বগুড়া মোস্তাফাবিয়া মাদ্রাসায় কামিল শ্রেণীতে হাদিস বিভাগে ভর্তি হই। আমার সাথে বেশ কয়েকজন সিনিয়র ভাই একই বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। তারা আগে বিভিন্ন কওমী মাদ্রাসার ছাত্র ছিল। আমার কাছে বগুড়ার জামিল মাদ্রাসাসহ তারা যেসব কওমী মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেছিল সেখানকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিল সারা দেশের কওমী মাদ্রাসাগুলোতে এধরনের ঘটনা কম বেশি ঘটিয়ে থাকেন।  শ্রেণীর আলিম হাফেজ নামধারী ছোট বাচ্চাদের  সাথে এধরনের ঘটনা ঘটিয়েছেন বলেছেন। ঘটনাগুলো লোক লজ্জার ভয়ে অনেকেই প্রকাশ করে না। আমি ১৯৮০-৮৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়ন করেছি। ঐ সময়ে শোনা একটি ঘটনা বলছি। পিরোজপুর জেলার স্বরুপকাঠি থানায় দেশের বিখ্যাত শর্ষিনা দারুস সুন্নত আলিয়া মাদ্রাসা অবস্থিত। মাদ্রাসাটি অবিভক্ত বাংলার বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও মুজাদ্দিদ মরহুম আবু বকর সিদ্দিকী ফুরফুরাইয়ী রহমতুল্লা আলাইহের খলিফা শাহ  নেছাব উদ্দিন (রঃ) প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসাটি থেকে প্রতি বৎসর শত শত আলিম চুড়ান্ত ডিগ্রি নিয়ে চলেছেন। এহেন একটি মাদ্রাসায় অধ্যয়ন শেষ না করে আসা  একজন ছাত্রভায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সে পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। ছেলেটি আমাকে জানায় যে, সে শর্ষিনার মরহুম পীর সাহেব আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ সাহেবের একজন মুরীদ বা ভক্তের সন্তান। তার বাবা অত্যন্ত শখ করে বড় আলিম বানানোর জন্য তাকে শর্ষিনা মাদ্রাসায় অতি বাল্য বয়সে ভর্তি করায়ে দেয়। ঐ ভাইটি মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে পড়া কালে বিশেষ একটি এলাকায়  হুজুর বলে খ্যাত এক শিক্ষক এর দ্বারা বলাৎকারের শিকার হয়। ঐ ভাইটি ঘটনাটি প্রকাশ করায় সে তার পিতার দ্বারা নিগৃহিত হয়। বিশেষ এলাকার নামে  খ্যাত একজন শিক্ষক এমন  কাজ করতে পারে, তা তার পিতা বিশ্বাস করতে পারে নাই। শর্ষিনার তৎকালীন পীরসাহেব পর্যন্ত ঘটনাটি পৌছালে তিনিও নাকি বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেন নাই। এই ধরনের স্পর্শকাতর একাধিক ঘটনা  আমার জানা আছে। আমার এলাকার একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসার হুজুর গোটা জীবন পরিবার ছাড়াই বসবাস করে আমার এলাকায় বাধ্যকে পৌঁছেছেন। তার পুরাতন অনেক ছাত্র আমার কাছে এ ধরনের একাধিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। দেশের অনেক মসজিদের ইমাম সাহেব স্ত্রী পরিবার ছাড়া বসবাস করেন। তাদের ফুট ফরমায়েস খাটা ছোট মেয়ে বাচ্চারাও অনেক সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছে। রংপুর শহরে এধরনের একটি ঘটনার একটি মামলায় আসামী পক্ষে লড়তে গিয়ে ঘটনাটি আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। ঐ ইমাম কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা ছিলেন। আমি পরে মামলাটি ছেড়ে দেই। আমার ছাত্র জীবনে আমার নিজ জেলা রংপুর এর পীরগঞ্জ থানার মাদারগঞ্জ জামে মসজিদের এ ধরনের একজন ইমাম ও হাফেজ দ্বারা ৭/৮ বছরের কাজের মেয়ে ধর্ষিত হয়েছিল। বাচ্চাটিকে তার পিতা মাতা মসজিদের বারান্দায় শোয়ায়ে রেখেছিল, আর সবার কাছে বিচার প্রার্থনা করেছিল। কিন্তু মসজিদ কমিটির প্রভাবশালী লোকজন রাতের আধারে হাফেজ নামধারীকে বিদায় করে দিয়ে দায়মুক্ত হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার কোন নিরপেক্ষ সংস্থার দ্বারা সারা দেশের হাফেজিয়া মাদ্রাসা, কওমী  মাদ্রাসা, এতিমখানা বা আলিয়া মাদ্রাসা ছাত্রাবাস বা  যেখানে ছোট বাচ্চাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে আর ঐসব স্থানে পরিবার ছাড়া বসবাস করা তথাকথিত কিছু আলিম হাফিজ শিক্ষক যারা বসবাস করে তাদের এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে যদি একটি তদন্ত কাজ পরিচালনা করে তবে অনেক ঘটনা খুজে পাওয়া যাবে আমি নিশ্চিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ