ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 March 2018, ২৪ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৯ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জীবননগরে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে ইটভাটা ॥ জনজীবন অতিষ্ঠ

চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা: চুয়াডাঙ্গার সীমান্তবর্তী জীবননগর উপজেলাসহ জেলার প্রতিটি উপজেলার সড়ক-মহাসড়কের পার্শে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে ইটের ভাটা। এসব ইটভাটার মাটি রাস্তার উপর পড়ে বর্ষকালে কাদা আর শুষ্ক মওসুমে ধুলাবালিতে নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে পথচারীদের। পরিবেশ দূষণ আর শব্দ দূষণের ফলে এলাকাবাসী নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে এবং নির্মাণ কাজে ইট একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলে সবার আগে নিজে সুস্থ থাকা এবং অপরকে সুস্থ থাকার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মওসুমে জীবননগর উপজেলায় ২৩টি ইটভাটাসহ জেলার ৮৭টি ইটভাটায় ইট পোড়ানো হচ্ছে। এসব ইটভাটার মধ্যে মাত্র ২৬টির লাইসেন্স রয়েছে। আর বাকী ৭১টি ইটভাটা চলছে লাইসেন্সবিহীন প্রশাসনকে ম্যানেজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আইন অনুযায়ী ফসলি জমি ও জনবসতি এলাকায় ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ থাকলেও জেলার অধিকাংশ ইটভাটাই স্থাপন করা হয়েছে জনবসতি ও আবাদি জমিতে।
আবার এর মধ্যে অনেক ইটভাটা এলাকার কাঁচা-পাকা রাস্তার কোলঘেঁষে করা হয়েছে।এসব ইটভাটাগুলোতে ইট তৈরীর প্রধান উপকরণ মাটি। আর সেই মাটিরও জোগান হচ্ছে ফসলি জমির উপরি ভাগের মাটি থেকে। এসব মাটি ইটভাটার নিজস্ব লক্কড়-ঝক্কড় পরিবহণযোগে প্রতিদিন আনা নেয়ার ফলে রাস্তার উপর মাটি পড়ে কাদা-মাটিতে এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে। অবিরত মাটি বহনের ফলে রাস্তায় এতবেশি মাটি পড়ে যে অনেক সময় পথচারিদের চলাচল দুস্কর হয়ে পড়ে। সামান্য বৃষ্টিপাতে রাস্তায় পড়ে থাকা ধুলা-মাটি কাদায় পরিণত হয়ে জনভোগান্তির সৃষ্টি করে। এমন পরিস্থিতির কারণে জীবননগর-কালীগঞ্জ মহাসড়কের পার্শ্বে ইটভাটার সৃষ্ট কাদা মাটিতে গত ২০১৩ সালে মোটরসাইকেল থেকে পিতা পুত্র ছিঁটকে পড়ে তাদের করুণ মৃত্যু হয়। অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে জীবননগর-চুয়াডাঙ্গা মহাসড়কে ইটভাটার মাটি বহনকারী ট্রাক্টরের ধাক্কায় দুজন এনজিও কর্মকর্তা মারাত্মক আহত হয়। আহতদের মধ্যে ডাবলু (৪০)  শনিবার গভীর রাতে ঢাকা পক্সগু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। বৈধ-অবৈধ এসব ইটভাটার ট্রাক্টর ও পাওয়ার ট্রিলারের মাধ্যমে জনবসতি এলাকা দিয়ে মাটি বহনের সময় প্রচ- আওয়াজে শব্দ দূষণেও এলাকাবাসী অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
এসব লক্কড়-ঝক্কর গাড়ী অভ্যন্তরীণ ও মহাসড়কে অহরহ চলাচল করলেও রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণে চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ী চালিয়ে থাকেন। এতে প্রায়ই ছোট খাটো দুর্ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে স্কুলগামী ছোট শিশুদের নিয়ে অভিভাবক মহলে শঙ্কার শেষ নেই। জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার রিপন হোসেন বলেন, ইটভাটার মালিকরা তাদের নিজস্ব পরিবহন দিয়ে মাটি টানার ফলে পরিবেশ যেমন দুষিত হচ্ছে, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যও চরম হুমকির মুখে পড়ছে। এসব গাড়ীর মাটি রাস্তায় পড়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তায় পড়া ধুলাবালি থেকে হাঁপ, কাশি ইত্যাদিতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। যত্রতত্র ইটভাটা স্থাপনের ফলে শহরের চেয়ে গ্রামীণ পরিবেশ আরো বেশি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইটভাটার মাটি টানা গাড়ীর কারণে রাস্তা-ঘাটে চলাচল করা তো দায় হয়ে পড়েছে। এসব বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের করণীয় ভূমিকা পালন করতে হবে। জীবননগর পৌর এলাকার রাজনগরের শহিদুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন ইটভাটা মালিকরা তাদের লক্কড়-ঝক্কড় ট্রাক্কর ও পাওয়ার ট্রিলার দিয়ে সারাদিন ধরে মাটি টানার কারণে ধুলাবালিতে আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে। পিঁপড়ার সারির মত এসব ট্রাক্টর-পাওয়ারট্রিলার থানার সামনে দিয়ে ভোর থেকে সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত আসা যাওয়া করলেও কই পুলিশ তো তাদের কিছু বলছে না? আসলে আমাদের মত আমজনতার সুবিধা-অসুবিধা দেখার জন্য দেশে কোনো প্রশাসন নেই।
জীবননগর উপজেলা শহরের বিশেষজ্ঞ ডা.আবু হেনা মোহাম্মদ জামাল শুভ বলেন, ধুলাবালির দুষণে শুস্ক মওসুমে শিশু ও বয়স্কদের শ^াসকষ্টজনিত রোগ বৃদ্ধি পায়। সেসময় হাসপাতালে এসব রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। ইটভাটার গাড়ী থেকে পড়া মাটি ধুলাবালির সৃষ্টি করে তা বাতাসে মিশে গিয়ে শরীরে পড়ে মানব দেহে চর্মরোগের সৃষ্টি করে।
খুঁশকি রোগের অন্যতম কারণ হচ্ছে ধুলাবালি। তাছাড়া বিভিন্ন চর্মরোগ ও মুখের ত্বক নষ্ট করতেও ধুলাবালি ভূমিকা রাখে। ধুলাবালি শরীরে পড়ার কারণে শরীরের লোমকুপের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, এলার্জি, সর্দি-কাশির মত রোগের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে নিঃশ্বাসের সাথে ধুলাবালি ভিতরে গিয়ে ফুসফুসের রোগ সৃষ্টি করে। জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ইট আমাদের জন্য একটি
গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। তবে সবার আগে জীবনের কথা চিন্তা করে ইটভাটা মালিকদের জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারটি মাথায় রেখে সমস্যা সমাধানে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
জীবননগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম রেজা বলেন, জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে ইটভাটার মাটি টানা গাড়ীগুলো রাতে চালানোর ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা যায় কি না ভেবে দেখা হচ্ছে। তাছাড়া সড়ক-মহাসড়কের পার্শে^ অবস্থিত ইটভাটা মালিকদের ইতোমধ্যেই রাস্তার পাশ থেকে মাটি অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যারা নির্দেশ অমান্য করবেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অবৈধ ইটভাটার ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, গত ২২ জুলাই জেলার ইটভাটা মালিকদের ডেকে ইটভাটা তৈরী ও ইট পোড়ানোর ব্যাপারে আইন মেনে চলার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আইন মেনে ইটভাটা স্থাপন করলে তাদেরকে সহযোগিতা করা হবে। সড়ক-মহাসড়কের পার্শ^বর্তী স্থানে ইটভাটা স্থাপন, রাস্তার কোলঘেঁষে মাটির স্তুপ গড়ে তুলে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলে আইনে করণীয় ব্যাপারে সজাগ করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ