ঢাকা, শুক্রবার 25 May 2018, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৮ রমযান ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্মৃতির রেখাচিত্রে নজরুল

 

হোসেন মাহমুদ: কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্য দিয়ে সে বিস্ময়ের অবাধ ‘বিস্ফোরণ ঘটেছিল। কবিতায় আগুন ঝরিয়ে ইংরেজ শাসনের ভিতটাকে জোরেশোরে নাড়া দিয়েছিলেন তিনি। পুরস্কার হিসেবে জুটেছিল কারাদন্ড আর বই বাজেয়াপ্ত। কিন্তু রক্তে যার বিদ্রোহের স্রোত, প্রাণে যার অপরিসীম জীবন জোয়ার, তার কাছে জেল-জুলুম কোনো বিষয়ই হতে পারেনি।  ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’- এই হৃদয়প্লাবী হাঁক দিয়ে তিনি এসব তুচ্ছ কালিমাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ফের বিপ্লবের জয়গান গেয়েছেন। 

তবে নজরুল সারাজীবন বিদ্রোহের পতাকা অবনমিত না করলেও তার প্রাখর্য স্তিমিত হয়ে আসে প্রাক-মধ্যজীবনে। ১৯৩০-এর দিকে তিনি কবিতা ছেড়ে গানের ভুবনে প্রবেশ করেন। কবিতা, গল্প- প্রবন্ধ ছেড়ে পুরোপুরি গীতিকার-সুরকার হয়ে ওঠেন তিনি। তবে সেও বেশীদিনের জন্য নয়। ১৯৪২-এর জুলাই থেকে মৌনতার জগতে সমর্পিত হন। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিনদশক পর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার একদা বর্ণাঢ্য জীবনের যবনিকাপাত ঘটে।

এ জীবনকালে নজরুল যেমন তাঁর গুণমুগ্ধ বহু মানুষের সংস্পর্শে আসেন তেমনি অনেক গুণী মানুষ ও এ অসাধারণ মানুষটির সংস্পর্শে আসেন। নজরলকে তারা নানাভাবে দেখেছেন। তাঁর সাথে অনেকের অনেক স্মৃতিও রয়েছে। নজরুলের মৃত্যুর পর তাঁদের কেউ কেউ নজরুলকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত বা নাতিদীর্ঘ স্মৃতিকথা লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে অনেকের স্মৃতিকথাই মূল্যবান। 

নজরুল সম্পর্কে বহুজনের  স্মৃতিচারণ নিয়ে ১৯৬০ সালে বিশ^নাথ দে’র সম্পাদনায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ‘নজরুল স্মৃতি’। এ গ্রন্থের ভূমিকায় সম্পাদক জানিয়েছেন, ‘ নজরুলের নিকট সান্নিধ্যে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা কোনোদিনই ভুলবেন না তাঁর জ্যোতির্ময় মূর্তি, ভাস্বর ভানুত্ব। কবির সেই হিমালয় নির্ঝর গুরুগুরু কন্ঠস্বর আজো তাঁদের কানে বাজে। মনে পড়ে ঘরোয়া মানুষ দরদী কবি নিত্যদিনের কতো ঘটনার স্মৃতি চিত্র।’ সম্পাদক বলেছেন, ‘ .... কবি নজরুল সম্পর্কে পশ্চিম ও পূর্ব-বাংলার একশত একজন কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সমাজ সংস্কারক-বিপ্লবী নেতার লেখা নিয়ে ‘নজরুল স্মৃতি’ প্রকাশিত হলো।’  

এ সব লেখার মধ্য থেকে এগারো জনের স্মৃতিকথার চয়িত অংশ দিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের বৈচিত্র্যময়  জীবনের এ রেখাচিত্রটি গ্রন্থিত হল।

ইন্দ্রজিৎ রায় তাঁর স্মৃতিকথা ‘কিশোর-আচার্য নজরুল’-এ তাঁর জীবনের একটি স্বল্পজ্ঞাত তথ্য দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন, নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন ধর্মভীরু, দানশীল, সরলচিত্ত আর আপনভোলা মানুষ। তিনি স্থানীয় মসজিদে ইমামতি আর পীর হাজী পাহলোয়ানের দরগাহে খাদেমগিরি করে প্রাপ্ত যৎসামান্য অর্থে সংসার চালাতেন। বাংলা ও উর্দু ভাষায় তাঁর রীতিমতো দখল ছিল। হাতের লেখা ছিল মুক্তোর মত সুন্দর, ঝরঝরে। নজরুল উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার এই গুণগুলি নিজের মধ্যে কমবেশী পেয়েছিলেন। ইন্দ্রজিৎ রায় লিখেছেন,‘ নজরুলের লেখাপড়ার প্রথম ধাপ শুরু হয় তাঁর বাবার কাছে। বাবাই ছিলেন তাঁর সর্বপ্রথম শিক্ষাগুরু। তারপর অক্ষর পরিচয় শেষ হলে তাকে ভর্তি করে দেওয়া হলো পাঠশালায়। .... খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন নজরুল ইসলাম। মক্তবের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার আগেই তিনি বেশ সাবলীলভাবে আর নির্ভুল উচ্চারণে ‘কোরান শরীফ’ পাঠ করতে পারতেন। তাঁর আরবী, উর্দুÑ বিশেষ করে আরবী উচ্চারণ আর সঠিক কোরান পাঠ শুনে একবার এক জবরদস্ত মৌলানা বালক নজরুলের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।’  

ব্রিটিশ আমলে পুলিশে চাকুরি পেয়েছিলেন পঞ্চানন ঘোষাল।  তাঁর স্মৃতিচারণ ‘নজরুল-স্মৃতি’-তে নজরুল জীবনের বেদনাঘন একটি দিক উঠে এসেছে। তিনি পুলিশে নিয়োগ পেয়ে জোড়াসাঁকো থানায় ছিলেন। সে সময় নজরুল ঐ থানা এলাকায় বাস করতেন।  একদিন উপরের নির্দেশে গোয়েন্দা পুলিশের সাথে ভোর ৪ টায় তাকে নজরুলের বাড়িতে যেতে হয় খানা-তল্লাশির জন্য। নজরুল তাদের কোনো বাধা না দিয়ে তাদের সহযোগিতা করছিলেন। সব তল্লাশির পর একটি বাক্স খুলতে যেতেই নজরুল ছুটে এসে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ে তাদের বললেন, না, না, ওটাতে হাত দেবেন না। এরপর পঞ্চানন ঘোষালের ভাষায়, ‘‘ তাঁকে এইভাবে হঠাৎ বিচলিত হতে দেখে পুলিশের সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। ঐ বাক্স খুলে উপুড় করা মাত্র কাজী সাহেবের চোখ হতে ঝরঝর করে জল ঝরে পড়ল। আমরা এ যাবৎ কাল তাঁর চোখ হতে শুধু আগুন ঝরতে দেখেছি। ও রকম শক্ত একজন মানুষের চোখে জল দেখে সকলেই অবাক হলাম। ঐ বাক্সে কিছু শিশুর খেলনা ও শিশুর ব্যবহার্য দ্রব্যাদি ছিল। এগুলি কাজী নজরুল ইসলামের  প্রথম পুত্র স্বর্গত বুলবুলের ব্যবহার্য সামগ্রী।”

লেখক-গবেষক আজহারউদ্দিন খান ১৯৪৯ সালে ৮ সেপ্টেম্বর নজরুলকে দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি ‘জীবন-সায়াহ্নে কবি নজরল’ শীর্ষক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘ ... হঠাৎ দেওয়ালে টাঙানো কবির ছবি দেখলুম। কি অপরূপ সুন্দর ছবিখানা। ছবিটা দেখে মনটা একটু গুমরিয়ে উঠলোÑ সেই উজ্জ্বল প্রোজ্জ্বল মহান মুখশ্রী, সেই তীক্ষè আরক্ত অপাঙ্গ চোখ, সেই উদার গম্ভীর স্বচ্ছ ললাট! আর কি দেখবো? .... কবি নজরুল বেরিয়ে এলেন। চমকে উঠলুম, এ নজরুলকে দেখে চোখ কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না যে ইনিই বিদ্রোহী কবি নজরুল! পরনে একটি লুঙ্গি ও ধূসর বর্ণের হাফশার্ট। মুখে একটা উত্তেজনার ভাব ফুটে বেরুচ্ছে, তাঁর সেই বিদ্রোহী প্রাণশক্তির ছাপ অস্তরাগের বিলীয়মান আভার মত মুখে খেলা করছে। .... আবার কবির টাঙানো ছবির প্রতি দৃষ্টি পড়ে গেলো, শিউরিয়ে উঠলাম, যেন চিনতে পারছিনে।  এ কবি আর ছবির কবি যেন এক নয়- ভিন্ন। যে কবি বলেছিলেন, ‘ আমি বিশ^ ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির’ তাঁর উন্নত শিরের ও ইন্দ্রিয়ের দরজাগুলো একে একে রুদ্ধ হয়ে আসছে। মুখ তাঁর শীর্ণ, আগুনের মত গায়ের রং ফিকে হয়ে গেছে, কেশরের মত যে কেশগুচ্ছ তাঁর ঘাড় বেয়ে নামতো তা উঠে গেছে, সে সৌম্য মূর্তি আর নেই। তাঁর কবিতার বই রইলো, রইলো তাঁর বিচিত্র বহু কর্মান্বিত জীবনের উজ্জ্বল অবিনশ্বর ইতিহাস- কিন্তু সমস্ত কীর্তির অন্তরালে ছিলেন যে কবি নজরুল, তিনি আর নেইÑ তাঁর স্থানে আছে রোগে জীর্ণ নজরুল।’

প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায় ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘ মনে পড়ে তার দিলদরিয়া প্রাণের কথা। এমন প্রাণ নিয়ে খুব কম মানুষই জন্মায়। মজলিসি সভাসদ, হাসিগল্পের নায়ক, ভাবালু গায়ক, বলিষ্ঠ আবৃত্তিকার, বিশিষ্ট সুরকার, গুণীর গুণগ্রাহী, উদার সরল মানুষÑ যে রেখে ঢেকে কথা কইতে জানত নাÑ যখনই আমাদের সভায় আসরে আসত ছুটে, হেঁটে নয়Ñ অট্টহাস্যে ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে, এসেই জড়িয়ে ধরত দিলীপ দা বলে- এমন মানুষ কটাই বা জীবনে দেখেছি? .... কাজী বিদ্রোহী কবি বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে নির্ভেজাল কবি। তাই বুঝি তার বিদ্রোহে মানুষের মনে ছোঁয়াচ লাগত এত ব্যাপক ভাবে। কত সভায় এবং চ্যারিটি কনসার্টেই না সে আমাদের গানের পরে এই ভাবের নানা গান গাইত ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে ভাঙা গলায়। কিন্তু এমন গাইত যে, ভাঙা গলাকেও ভাঙা মনে হত না- আগুন ছুটিয়ে দিত সে। এমন প্রাণোন্মাদী গায়ক কি আর দেখব এই মন মরা যুগে? সত্যিই আমাদের অবাক লাগত ভাবতে ভাঙা গলায়ও কাজী কোন্ জাদুতে এমন অসম্ভবকে সম্ভব করত দিনের পর দিনÑ ভাবের ঢলে পাথরের বুকে আলোর ঝর্ণা বইয়ে!’ 

সেকালের নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ইন্দুবালা দেবী সুরকার -সঙ্গীত রচয়িতা কাজী নজরুল ইসলামের একটি ছবি এঁকেছেন।   তাঁর স্মৃতিচারণ  ‘সুরের রাজা’।  এতে তিনি বলেছেন, ‘ কাজীদা ছিলেন আমাদের বাংলা গানের ট্রেনার। .... কাজীদার একটি জিনিস দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যেতাম। শুধু আমি কেন, আমার মত অনেকেই হতো। রিহার্সাল ঘরে খুব হৈ-হুল্লোড় চলছে, নানাজনে করছে নানা রকম আলোচনা। কাজীদাও সকলের সঙ্গে হৈু-হল্লোড় করছেন, হঠাৎ চুপ করে গেলেন। একধারে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন খানিক। অনেকে তাঁর এই ভাবান্তর লক্ষ্যই করল না হয়তো। কাজীদার সেদিকে লক্ষ্যই নেই। এতো গোলমালের মধ্যেও তিনি একটুখানি ভেবে নিয়েই কাগজ-কলম টেনে নিলেন। তারপর খসখস করে লিখে চললেন। মাত্র আধ ঘন্টা। কি তারও কম সময়ের মধ্যে পাঁচ-ছ’ খানি গান লিখে পাঁচ-ছ’ জনের হাতে হাতে বিলি করে দিলেন।  যেন মাথার মধ্যে তাঁর গানগুলো সাজানোই ছিল, কাগজ-কলম নিয়ে সেগুলো লিখে ফেলতেই যা দেরী। কাজীদা এই রকম ভীড়ের মধ্যে , আর অল্প সময়ের মধ্যে, এমন সুন্দর গান লিখতে পারতেন। আর শুধু কি এই! .....গান লেখার সাথে সাথে সুরও তৈরী করে ফেলতেন কাজীদা। অপূর্ব সব সুরÑ যার তুল না হয় না। কাজীদা ছিলেন সুরের রাজা। ’

প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহ্ম্মদ কাজী নজরুল চরিত্রের এক অতুলনীয় বিশালতার দিক তুলে ধরেছেন তাঁর ‘কাজীদা-র কথা’য়। তিনি  বলেছেন , ‘  বাংলা গানে গজল সুরের প্রথম আমদানী করেন নজরুল ইসলাম, যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে। ....  গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল রুমে তাঁর গানের বড়ো বড়ো খাতাগুলো পড়ে থাকতো। সেই খাতা থেকে কোনো কোনো নতুন কবি গান  লিখে নিয়ে কাজীদার লাইন শুদ্ধ প্রায় হুবহু নকল করে নিজের লেখা বলে গ্রামোফোনে চালাবার চেষ্টা করতে লাগলো। কাজীদাকে বললাম সে-কথা। তিনি হেসে বললেন, ‘দূর পাগল, মহাসমুদ্র থেকে ক’ঘটি পানি নিলে কি সাগর শুকিয়ে যাবে? আর নবাগতের দল এক-আধটু না নিলে হালে পানিই বা পাবে কী করে?’  নজরুল সম্পর্কে আরেকটি কথা বলেছেন আব্বাসউদ্দীনÑ ‘বিশ বৎসর প্রায় কাজীদার সাহচর্যে ছিলাম; এর মধ্যে একদিনও তাঁর মুখে পরনিন্দা শুনিনি।’    

প্রথিতযশা গায়ক-সুরকার শচীন দেব বর্মণ (এস ডি বর্মণ) তাঁর ছোট্ট লেখা ‘কাজীদা’-তে বলেছেন, ‘ কাজীদা, শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত কাজী নজরুল ইসলাম যে কতোবড়ো গুণী, জ্ঞানী, কতোবড়ো  ¯্রষ্টা, কবি ও শিল্পী, তাঁর ব্যক্তিত্ব যে কতো মহান, তাঁর বৈশিষ্ট্য যে কতোখানি এবং তাঁর স্থান যে কত উঁচুতে তা দেশে-বিদেশে কারো অজানা নেই। .... তাঁর গান গেয়ে যে আনন্দ ও তৃপ্তি পেয়েছি তা আমার মনে সর্বদাই গেঁথে আছে ও থাকবে। তাঁর গান গেয়ে আমি ধন্য হয়েছি।’

গৌরীশংকর ভট্টাচার্য ‘ সাধক নজরুল’ নামের লেখাতে জানিয়েছেন যে নজরুল  ১৯২১ সালে তাঁর ‘ব্যথার দান’ গ্রন্থের স্বত্ব দু’শ টাকায়, ঐ বছরই ‘রিক্তের বেদন’ ও আরো দু’টি বইয়ের স্বত্ব চারশ’ টাকায় বিক্রি করেন। ‘অগ্নিবীণা’র কপিরাইট বিক্রি করেন ডিএম লাইব্রেরির কাছে। তিনি স্ত্রীর অসুখের সময় এইচএমভি-র সকল গানের রয়্যালটি চার হাজার টাকায়  বন্ধক রাখেন। 

আয়নুল হক খাঁ তার ‘নজরুল চরিত্রের দু’একটি দিক’ লেখায় বলেন, ‘ কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমার সমসাময়িক এবং প্রায় সমবয়সী।.... কবির ছিল গতির প্রতি সীমাহীন আসক্তি। তিনি পারতপক্ষ ট্রামে করে যাতায়াত করতে চাইতেন না , বলতেন ‘ট্রাম টিকির টিকির করে  থেমে থেমে চলে এটা আমার অসহ্য লাগে।  ট্যাক্সি যখন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলে তখন আমার মনও যেন এক অজানা দেশে পাড়ি দেয়, আমি তখন সংসারের অভাব-অনটনের কথা একদম ভুলে যাই। .... কবি চরিত্রের আর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল তঁর চক্ষুলজ্জা, অন্য কথায় তাঁর মনের উদারতা। কবির বাড়িতে আত্মীয়-অনাত্মীয়, ভক্ত ও তিন-চারজন বেকার বৎসরের পর বৎসর নিয়মিত থাকতো। তাদের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা কবিকেই করতে হত।  কবি কখনো তাদেরকে অন্যত্র চলে যেতে বলতেন না। এ ছাড়াও কবির বন্ধু-বান্ধব তাঁর বাড়ীতে গিয়ে মাঝে মাঝে আড্ডা জমাতেন।  আহারের সময় হলেই কবি তাদের সবাইকে নিয়ে খেতে বসতেন।  কোথা থেকে এদের খাবারের ব্যবস্থা হবে সে হিসাব কবির নেই। ’

যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ব্যক্তি জীবনে ছিলেন বেহিসেবী ও বিষয় বুদ্ধিহীন, সেই নজরুল ইসলাম ব্যবসা করতে গিয়েছিলেন। এ কথা জানিয়েছেন  ‘ আজও মনে আছে ’ নামের লেখায় দেবনারায়ণ গুপ্ত। তিনি বলেছেন, ‘ .... বন্ধুটির কাছে শুনতাম, কবি নাকি বাড়ী থেকে বেরিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানিতে যান। ‘কলগীতি’ নামের একটি রেকর্ডের দোকানও তিনি করেছেন বিবেকানন্দ রোডে।  সে সময় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ছায়া’র পৃষ্ঠায় কবির ঐ দোকানের একটি ভারী মজার বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিলঃ কলগীতি Ñ ১৬ বিবেকানন্দ রোড। আমাদর দোকানের  বিশেষত্ব কলগীতির  যারা নিয়মিত খরিদ্দার হবেন তাঁদের বাড়ীতে পাঁচটি কোম্পানির প্রতি মাসের সমস্ত রেকর্ড শুনে পছন্দ করার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তাঁদের অর্ডারি রেকর্ড ইত্যাদি আমাদের লোক গিয়ে বাড়িতে দিয়ে আসবে। Ñ কাজী নজরুল ইসলাম, স্বত্বাধিকারী। তা এত করেও কবি সেদিন দোকান বেশিদিন টেকাতে পারেননি। আসলে তিনি তো আর ব্যবসায়ী ছিলেন না।’

কবি- লেখক-সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু ‘স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক লেখায় নজরুল  সম্পর্কে বলেছেন, ‘ বিদ্রোহী’ পড়লুম ছাপার অক্ষরে মাসিক পত্রে, মনে হলো এমন কখনো পড়িনি।  অসহযোগের অগ্নিদীক্ষার পরে সমস্ত মনপ্রাণ যা কামনা করছিলো, এ যেন তাই; দেশব্যাপী উদ্দীপনার এই যেন বাণী। .... নতুনের কেতন সত্যিই উড়লো। নজরুল ইসলাম বিখ্যাত হলেন। আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে এত অল্প সময়ের মধ্যে এতখানি বিখ্যাত অন্য কোনো কবি হননি।’ নজরুল একবার ঢাকায় আসেন। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘ বিশ^দ্যিালয়ের সিংহদ্বারে এক মুসলমান অধ্যাপকের (খুব সম্ভবত ড. কাজী মোতাহার হোসেন, আশ্চর্য যে বুদ্ধদেব বসু তার নাম উল্লেখ করেননি) বাসা, সেখান থেকে নজরুলকে ছিনিয়ে আমরা কয়েকটি উৎসাহী যুবক চলেছি আমাদের ‘প্রগতি’র আড্ডায়। .... হেঁটেই চলেছি আমরা, .... জনবিরল সুন্দর পথ আমাদের কলরবে কলরবে মুখর, নজরুল (একাই) একশো। চওড়া মজবুত জোরালো তাঁর শরীর, লাল-ছিটে-লাগা বড়ো মদির তাঁর চোখ, মনোহর মুখশ্রী, লম্বা ঝাঁকড়া চুল তাঁর প্রাণের ফূর্তির মতোই অবাধ্য। .... প্রাণশক্তির এমন এমন অসংবৃত উচ্ছ্বাস, এমন উচ্ছৃঙ্খল, অপচয় অন্য কোনো বয়স্ক মানুষের মধ্যে আমি দেখিনি। দেহের পাত্র ছাপিয়ে সব সময় উথলে পড়ছে তাঁর প্রাণ, কাছাকাছি সকলকেউ উজ্জীবিত করে, মনের সকল খেদ ও ক্লেদ ভাসিয়ে দিয়ে।’   

নজরুলের ঘনিষ্ঠবন্ধু ও সহপাঠি প্রখ্যাত সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘ভোলে না কেউ ভোলে’ গ্রন্থের প্রায় পুরোটা জুড়েই নজরুলের স্মৃতিচারণ করেছেন। তারপরও  বন্ধু নজরুল সম্পর্কে তাঁর অনেক কথাই না বলা রয়ে গেছে। ‘বন্ধু নজরুল’ শীর্ষক পৃথক স্মৃতি কথায় তিনি মহান, উদার কবি নজরুলের রেখাচিত্র এঁকেছেন।  শৈলজানন্দ লিখেছেন, ‘ চওড়া বুকের ছাতি, বড়ো বড়ো চোখ, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল সুন্দর দেহ। মাথার চুলগুলো কিছুতেই বাগ মানছেনা- এই নজরুল! ... আমরা তখন পনেরো ষোল বছরের কিশোর বালক। রাণীগঞ্জে থাকি। দু’জন দুটো স্কুলে পড়ি, কিন্তু থাকি খুব কাছাকাছি। এক পুকুরে স্নান করি, সাঁতার কাটি, আম, জাম, কামরাঙা গাছ থেকে পেড়ে নুন দিয়ে খাই, একসঙ্গে বেড়াতে যাই, সুখ-দুঃখের গল্প করি।’ পল্টন থেকে আসার পর নজরুলের অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন- সবাই তাকে নিয়ে হৈচৈ করছে, টানাটানি করছে, বলছে গান গাও, কবিতা শোনাও। বাহবা দিচ্ছে, প্রশংসা করছে। কিন্তু তিনি যে কি খেয়ে ও কেমন করে বেঁচে আছেন সে দিকটি দেখছে না। একটি পয়সাও নজরুলের আসছে না কোথা থেকেও।  শৈলজানন্দ বলেছেন,  সে সময় নজরুল তার গল্পগুলোর কপিরাইট বিক্রির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তিনি  চাননি যে তাঁর এ অবস্থার কথা অন্য কেউ জানুক। শৈলজানন্দ  শেষদিকে  লিখেছেন, ‘ কবি এবং গীতিকার নজরুল সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তাই দেশবাসীর কাছ থেকে পেয়েছে সে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা আর প্রণতি। একদিন জীবন দেবতার কাছ থেকে পেয়েছে সে নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ আর অপরিমান যন্ত্রণা। কবি নজরুলের চেয়ে মানুষ নজরুল অনেক-অনেক বড়। শিশুর মত সরল, নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক, নিরহঙ্কার, এমন অজাতশত্রু হৃদয়বান এবং আনন্দময় পুরুষ এ যুগে সচরাচর দেখা যায় না।’

সত্যিই তাই।

সূত্র :

নজরুল স্মৃতি : বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত

প্রকাশক : সাহিত্যম, কলকাতা, ১৩৬৭ বাংলা সন  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ