ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 December 2018, ১৩ পৌষ ১৪২৫, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এ বছরের মতো অব্যবস্থাপনায় ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত ইতোপূর্বে কখনো হয়নি

* সেনাবাহিনীর দায়িত্ব সম্পর্কে ইসির বিবরণ দেয়া উচিত --- এম সাখাওয়াত হোসেন
* অপেক্ষায় থাকেন পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে ---- ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী
* আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা করা হচ্ছে ---- ব্যারিস্টার সারা হুসাইন
* ইসি নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি --- ড. রওনক জাহান
স্টাফ রিপোর্টার : নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেশের বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের আয়োজনে এ বছরের মতো অব্যবস্থাপনায় ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত ইতোপূর্বে কখনো হয়নি। ইসি যদি সোজা হয়ে থাকতো তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হতো। বিরোধী দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে প্রার্থীরা রক্তাক্ত হচ্ছে। অথচ ইসি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা করা হচ্ছে। সরকারি দল ও নির্বাচন কমিশন এক হয়ে গেছে। ইসি নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে না- এটা হতে পারে না। জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা করতে হবে। এমতাবস্থায় দেশের পরিবর্তন করতে হলে তার দায়িত্ব তরুণদেরকেই নিতে হবে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্যাটেজিক স্টাডিজ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভার্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত “জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮: তরুণ, নারী ও সংখ্যালঘুদের কেন ভোট দেওয়া উচিত” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্টজনেরা এ সব কথা বলেন। সিজিএসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে ও সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের পরিচালনায় বৈঠকে সম্মানিত অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. রওনক জাহান, অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলির সদস্য এ্যাডভোকেট ইউসুফ হুসাইন হুমায়ুন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.), গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্টোর আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হুসাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, অধ্যাপক সাদেকা হালিম, আমেরিকার ব্লাক হিল স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহরার আহমেদ, সাম্যবাদি দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়–য়া, বাংলাদেশ ইনডিজিনাস পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং প্রমুখ। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশীপ সেন্টারের সভাপতি ইজাজ আহমেদ। 
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সামরিক বাহিনীর ওপর মানুষের অনেক আস্থা থাকে। তারা কোন দলের দিকে তাকিয়ে বা কারো মুখ দেখে কাজ করবে না। তাদের নিয়মে যা রয়েছে সেভাবেই কাজ করবে। এ জন্যে তাদের ওপর মানুষের আস্থাটা অনেক বেশি থাকে। নির্বাচনের প্রাক্কালে সেনাবাহিনী নামায় মানুষের মনে আশা-প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি চায় তাহলে নির্বাচনে সেনাবাহিনীর সম্পর্কে বিবরণ দিতে পারে। সেখানে সেনাবাহিনীর কাজ সম্পর্কে বলা থাকবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে সেটি দেওয়ার সময় আছে কী না আমার জানি না। তবে সেনাবাহিনীকে কী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, কী করার কথা বলা হয়েছে, এবং সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেগুলো দেখার বিষয়।
তিনি বলেন, মানুষ এখন ভাবছে যে আর মারামারি হবে না। কিন্তু, সেনাবাহিনী রয়েছে এক জায়গায় আর মারামারি হলো আরেক জায়গায়। সামরিক বাহিনীর নিজস্ব একটা কমান্ডিং চ্যানেল রয়েছে। তারা সেই চ্যানেলের মাধ্যমে কাজ করে। কিন্তু, সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়েছে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্যে। যারা তাদেরকে ডেকেছে তারা কী চাচ্ছে তার ওপর সশস্ত্র বাহিনীকে নির্ভর করতে হবে। সেনাবাহিনী আক্রান্ত হওয়ার অবস্থা পড়েছে ঠিক তখন ম্যাজিস্ট্রেট না থাকলে তারা একজন কমিশনড অফিসারের নেতৃত্বে অ্যাকশনে যেতে পারে। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব  ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিতে হবে।
তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী  ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন যে তার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ঠিক তখনি তিনি সেনাবাহিনী ডাকতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ ছাড়া কোনো অ্যাকশনে তারা যেতে পারে না। অর্থাৎ, আটক বা সাময়িকভাবে গ্রেপ্তার করা বা হাজতে নেওয়া। এর কিছু করতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত একজন ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে নির্দেশ না দেন।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের আয়োজনে এ বছরের মতো অব্যবস্থাপনায় ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত ইতোপূর্বে কখনো হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ইসি প্রার্থিতা নিশ্চিত করার পর অন্য কেউ বাতিল তো দুরের কথা স্থগিতও করতে পারে না।
সাখাওয়াত বলেন, এখন মহিলারাও নিরাপদ নয়। নির্বাচনী প্রচারে নেমে এ পর্যন্ত ৪ শতাংশ নারী প্রার্থী হামলার শিকার হয়েছে। তাহলে তারা কিভাবে নির্বাচনের মাঠে নামবে। কেন নির্বাচনে আসবে।  
ড. রওনক জাহান বলেন, অনেক দিন ধরেই নির্বাচনী সহিংসতার প্রতিবাদ করে আসছিলো ঐক্যফ্রন্ট কিন্তু কমিশন কোনো প্রতিকার করেন নাই। ঐক্যফ্রন্ট চাচ্ছিলেন নির্বাচনী  সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টিতে শক্ত ভূমিকা রাখবেন কমিশন কিন্তু তাও রাখতে পারেন নাই। নির্বাচনকে ঘিরে এমন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে মানুষ ভোট দিতে পারবেন কিনা।
তিনি বলেন, প্রতিদিনই নির্বাচনী সহিংসতা হচ্ছে, গ্রেফতার হচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মী। সবমিলিয় মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। মানুষের মনে সংশয় আছে ভোট দিতে পারবেন কী না?
তিনি বলেন, অনেক পরিবর্তনের আন্দোলন তরুণরাই করেছে। আর সেই আন্দোলনের সমাধান দিয়েছে রাজনীতিবিদরা। কিন্তু বর্তমানে তরুণরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ঢুকে তাদের আজ্ঞাবহ হয়ে গেছে। যা তাদের উচিত নয়। তরুণদের শুধু দল কিংবা ব্যক্তি চিন্তায় কাজ করলে হবে না। গোটা দেশের কল্যাণে কাজ করতে হবে। কেউ জায়গা করে দেবে না। নিজেদের ভয়েজ রেইজ করে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। জাতির এ ক্রান্তিকালে তরুণদের দেশের মানুষের কল্যাণে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সরকারি দল ও নির্বাচন কমিশন এক হয়ে গেছে। বিরোধী দলের নেতা কর্মী থেকে শুরু করে প্রার্থীরা সরকারি দলের হামলায় রক্তাক্ত হলেও ইসি বলছে পরিবেশ সুষ্ঠু আছে। ইসি একপেশে আচরণ করছে। সরকারও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে গাড়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন কিছু ঘুষ হিসাবে দিচ্ছে। অনেক সময় ঘুষ দিয়ে লাভ হয় না। বরং ব্যাক ফায়ার হয়। অপেক্ষায় থাকেন। পরিবর্তন হয়েও যেতে পারে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এর আগে তরুণদের কাছে যুদ্ধাপরাধীর তকমা বিক্রি করেছে। তরুণরা তখন সেটা গ্রহণ করেছিল। এখন আর কি বিক্রি করবে। তরুণরা এখন রাষ্ট্রের মেরামত চাচ্ছে। কেননা যুদ্ধে যত মানুষ মারা গেছে তারচেয়েও ৫০গুণ মানুষ যানবাহনে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। দেশবাসী পরিবর্তন চাচ্ছে। আর নির্বাচন কমিশন কার্ফিউ জারি করে জনগণকে বুঝাতে চাচ্ছে তোমরা ভোটকেন্দ্র ভোট দিতে যেও না। সেটা তরুণরা হতে দেবে না।
অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। মনোনয়নপত্র বৈধ্য করলেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয় না। সরকারি দলের নেতাকর্মীরা দেদারসে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। আর বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা এলাকায় যেতে পারছে না। এর নাম অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নয়। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হলে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও সরকার দলীয়রা সবাই এক হয়ে কাজ করছে। এ অবস্থায় কোনোভাবেই অবাধ সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে পারে না।   
দিলীপ বড়ুয়া বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বিত্তায়নের রাশ টেনে ধরতে না পারলে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। বর্তমানে পরিবেশ এমন পর্যায়ে গেছে যে, কোনো জায়গায় নিরাপত্তা নেই।
ব্যারিস্টার সারা হুসাইন বলেন, আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা করা হচ্ছে। নির্বাচনে প্রার্থীদের উপর হামলা হচ্ছে। নেতাকর্মীদের উপর হামলা হচ্ছে। নির্বাচনে কোনোভাবেই সমতল মাঠ তৈরি হয়নি। এতো হামলা হচ্ছে অথচ ইসি বলছে তারা কিছু দেখছে না। এতে দেশের তরুণ সমাজসহ সকলে হতাশ হচ্ছে ও ভীতি কাজ করছে। এ অবস্থার উন্নয়নে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। সবাইকে ঘর থেকে বের হতে হবে। নিজেদের ভোট দেয়া নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকলে কি করতে হবে সে সিদ্ধান্ত তরুণদেরই নিতে হবে।
তিনি বলেন, ইসির উচিত তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। হামলা ও গ্রেফতার যেন না হয় সে ব্যবস্থা নিয়ে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা। সবাই যেন ভোট দিতে যায় এবং নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে সে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। 
ইজাজ আহমেদ বলেন, পরিবর্তন করতে হলে তরুণদেরই করতে হবে। বাইরের কেউ এসে আমাদের পরিবর্তন করিয়ে দেবে না। পরিবর্তন আমাদের নিজেদের করতে হবে। যদিও তা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবুও আমাদের পরিবর্তনের জন্য ভোট কেন্দ্রে যেতে হবে। ভোট দিতে পারবো কি-না সেটা পরের কথা। রিস্ক আছে জেনেও দেশের মানুষের কল্যাণে ভোট কেন্দ্রে যেয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ