ঢাকা, সোমবার 31 December 2018, ১৭ পৌষ ১৪২৫, ২৩ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বে-টার্মিনাল : আধুনিক বন্দরের যাত্রা

বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর গত বছরগুলোতে ক্রমাগতভাবে ১২-১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। চট্টগ্রাম বন্দরের এই অব্যাহত প্রবৃদ্ধি দেশের সার্বিক উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণ করা গেলে বর্তমান অবকাঠামোগত সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার হলে এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য পতেঙ্গার উত্তরে বে-টার্মিনাল নির্মাণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে ৩০ বছর মেয়াদী একটি স্ট্র্যাটেজিক মাস্টারপ্লান প্রণয়ন করা হয়েছে। সেই ‘মাস্টারপ্লান’ অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরের পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। স্ট্র্যাটেজিক মাস্টারপ্লানে পতেঙ্গার উত্তরে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বে-টার্মিনাল (কন্টেইনার) নির্মাণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধির জন্য পশ্চাৎভূমির সাথে বিদ্যমান মাল্টিমোডাল সংযোগ সুবিধার জন্য বে-টার্মিনাল দেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে বে-টার্মিনাল উদ্বোধন করেছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর সমুদ্র মোহনা হতে ১১ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত। কর্ণফুলী নদীর দুটি বাঁক এবং নাব্যতা চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশের জন্য পণ্যবাহী জাহাজের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে। এ বন্দরে নিরাপদে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করতে মোহনায় এবং নদীতে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। ২০১৪ সালে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে কর্ণফুলি চ্যানেলের নাব্যতা ৯.২ মিটার হতে ৯.৫ মিটারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে বন্দরে চলাচলকারী জাহাজের দৈর্ঘ্য ১৮৬ মিটার হতে বর্তমানে ১৯০ মিটারে উন্নীত হয়েছে। বন্দরে বড় ধরনের জাহাজ ভিড়তে পারায় কন্টেইনার/ পণ্য পরিবহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর সক্ষমতা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাবে ২০১৯ সালে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর মোট ২৬.৬৭ লক্ষ টিইইউস (বিশ ফুট দৈর্ঘ্যের কন্টেইনার) কন্টেইনার হ্যান্ডল করেছে। পরামর্শকের হিসাব অনুযায়ী নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) ১০টি শীপ-টু-শোর গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং বিদ্যমান অবস্থায় প্রতিবছর ১০ হাজার টিইইউস করে সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে ৬টি শীপ-টু-শোর গ্যান্ট্রি ক্রেন এনসিটিতে যুক্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর হতে ৬ কিলোমিটার দূরে বে-টার্মিনালের অবস্থান। প্রস্তাবিত স্থানটি চট্টগ্রাম বন্দরের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে উত্তর হালিশহর এলাকায় অবস্থিত। স্থানটির পূর্বে পোর্ট এক্সেস রোড ও রেল লাইন এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর দ্বারা বেষ্টিত। পোর্ট এক্সেস রোড হতে বঙ্গোপসাগরের উচ্চ জোয়ারের সীমারেখা পর্যন্ত স্থানটি প্রস্তাবিত বে-টার্মিনালের স্থান।
উপকূল সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১১ কিলোমিটার প্রলম্বিত চর জেগে উঠেছে। বঙ্গোপসাগর উপকূলে জেগে ওঠা চরটি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দৃশ্যমান ছিলনা। ধীরে ধীরে পলির জমাট প্রক্রিয়ায় চরটি সমুদ্র উপকূল হতে ৮০০ মিটার দূরে জেগে ওঠে। চরটির মাটির প্রকৃতিতে বালির আধিক্য রয়েছে। গঠিত চর ও উপকূল তীররেখার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে একটি চ্যানেলের সৃষ্টি হয়েছে।
চ্যানেলটির গভীরতা ৭ থেকে ১০ মিটার। অন্যদিকে চরের পশ্চিম পাশেই চট্টগ্রাম বন্দরের বহিঃনোঙ্গর এবং সেখানে পানির গভীরতা ১২-১৩ মিটার। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ১৯৯০ সাল হতে পরিচালিত জরিপে দেখা যায় বালির চরটি সময়ের সাথে ক্রমান্বয়ে জেগে উঠছে এবং চরটি স্থায়ী প্রকৃতির। বর্তমানে বালির চরটি ভাটার সময় সম্পূর্ণভাবে দৃশ্যমান হয়।
বে-টার্মিনাল নির্মাণে অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ৮৯০ একর জমি ছাড়াও সমুদ্র থেকে ভূমি পুনরুদ্ধার করার পর জমির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২৫০০ একর। বে-টার্মিনালের তুলনামূলক সুবিধাদির মধ্যে বন্দর নির্মাণের অবস্থানগত উপযুক্ততা, জাহাজ চলাচলের জন্য উপযুক্ত নাব্যতা এবং পশ্চাৎভূমির সাথে সড়ক ও রেলপথের যোগাযোগ সুবিধা অন্যতম।
চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান জেটিসমূহে ৯.৫০ মিটার গভীরতা সম্পন্ন জাহাজ ভিড়ানো সম্ভব হয়। বে-টার্মিনাল নির্মিত হলে ১০ থেকে ১২ মিটার গভীরতাসম্পন্ন জাহাজ অনায়াসে বার্থিং করতে পারবে।
বহিঃনোঙর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং নেভিগেশন চ্যানেলের প্রশস্ততা মাত্র ২৫০-৩০০ মিটার। কর্ণফুলী চ্যানেলটি খুবই আঁকা-বাঁকা থাকায় জাহাজ চলাচলে ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। পক্ষান্তরে বে-টার্মিনাল থেকে বহিঃনোঙ্গরের দূরত্ব মাত্র ১ কিলোমিটার। চ্যানেলের প্রশস্ততা ৮০০-১২০০ মিটার। জাহাজ মুভমেন্ট এবং হ্যান্ডলিং অধিকতর ঝুঁকিমুক্ত থাকবে। তাছাড়া বে-টার্মিনাল চ্যানেলে কোনো বাঁক নেই তাই ১৯০ মিটার এর অধিক দৈর্ঘ্যরে জাহাজ ভিড়ানো সম্ভব হবে। পণ্য মূল্যও কমে যাবে যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
চট্টগ্রাম বন্দরে জোয়ারের সময়ে ১ নং জেটি থেকে এনসিটি পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৬-১৭টি জাহাজ বার্থিং করা সম্ভব হয়। পক্ষান্তরে বে-টার্মিনালে ৩০-৩৫ টি জাহাজ একই সময়ে বার্থিং করা সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে ১ নং গেট থেকে এনসিটি পর্যন্ত অপারেশনাল এরিয়ার পরিমাণ প্রায় ৪০০ একর। পক্ষান্তরে, বে-টার্মিনালের জন্য প্রায় ৮৯০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। সমুদ্র থেকে ভূমি পুনরুদ্ধার করার পর জমির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২৫০০  একর যা চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশনাল এরিয়ার প্রায় ছয় গুণ। চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কের কানেকটিভিটি চট্টগ্রাম নগরীর মধ্য দিয়ে। বে-টার্মিনাল পোর্ট এক্সেস রোড এবং ছয় লেনবিশিষ্ট সার্কুলার সড়কের মাধ্যমে বে-টার্মিনালের কানেকটিভিটি নগর ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে। নদীপথে ঢাকামুখী লাইটার জাহাজ চলাচলেও বে-টার্মিনাল হতে যোগাযোগে ৪-৬ ঘণ্টা দূরত্ব কমে যাবে।
চট্টগ্রাম বন্দর ১৩২ বছরের পুরানো। গত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর প্রায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। তার বিপরীতে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে একটি বে-টার্মিনাল পরিকল্পিতভাবে এবং আর্ন্তজাতিক মানের হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির প্রধান গেটওয়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের অগ্রগতি ও স্থবিরতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় জাতীয় অর্থনীতিতে। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সার্বক্ষণিক সচল রাখা এবং ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করাই হচ্ছে বন্দরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই বাংলাদেশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত করতে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ জরুরি। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বন্দর কর্তৃপক্ষ স্ট্র্যাটেজিক মাস্টারপ্লান প্রণয়ন করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বে-টার্মিনালের যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন তার নির্মাণকাজ শেষে অপারেশনে গেলে দেশের অর্থনীতির চাকা আরও বেগমান করবে বলে আশা করা যায়। -পিআইডি প্রবন্ধ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ