ঢাকা, মঙ্গলবার 05 February 2019, ২৩ মাঘ ১৪২৫, ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আলোচনায় ‘জাহালমকান্ড’॥ বিব্রত দুদক তদন্ত কমিটি

বিনাদোষে কারাবাস শেষে বাড়িতে ফেরার পর জাহালামকে দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে পুতঃপবিত্র করে নিচ্ছেন স্বজনরা

* প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুদকের বিচার চাই: জাহালম
* দুদকের গাফিলতির শিকার জাহালম : শাহদীন মালিক
তোফাজ্জল হোসেন কামাল : পাটকল শ্রমিক ‘জাহালমকাণ্ড’ এখন দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। রাষ্ট্রীয় একমাত্র দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ‘দুদক’-এর গাফিলতি-অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার শিকার জাহালম বিনাদোষেই ৩৩টি মামলায় আসামী হয়ে ১ হাজার ৯২ দিন কারাবাসের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্তি পেয়ে এখন মায়ের কোলে। দুদকের এহেন কাণ্ডে তাদের বিরুদ্ধে চলমান নানা অভিযোগকে আরও পোক্ত করলো। জাহালমের ঘটনায় দুদক এখন বিব্রত। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গতকাল সোমবার জানান, জাহালমের ঘটনায় দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের যদি কোনো গাফিলতি থেকে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা জজ পদমর্যাদার দুদকের একজন পরিচালককে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গনমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, জাহালমকে ফাঁসিয়েছেন দুদকের যে নয় কর্মকর্তা, তাঁদের আটজনেরই পদোন্নতি হয়েছে। এখানে দেখা যাচ্ছে, সরষের ভেতরেই ভূত আছে। এই ভূত তাড়ানোর জন্য দুদকেই একটি শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।
সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে আবু সালেক নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করে দুদক। কিন্তু দুদকের ভুলে সালেকের বদলে তিন বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছে টাঙ্গাইলের জাহালমকে।
টাঙ্গাইলের জাহালম একজন পাটকল শ্রমিক। গরিব মানুষ। যিনি কোনো দিন ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেননি, তাঁর আর্থিক যে অবস্থা, তাতে হয়তো তাঁর নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না, সে বিষয়েও সন্দেহ আছে। তারপরও দুদক তাঁকে ভয়ংকর ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে ৩৩টি মামলা দিয়েছে। আর সেই মামলায় তাঁকে তিন বছর বিনা বিচারে জেলে আটকও থাকতে হয়েছে। সোনালি ব্যাংক থেকে সাড়ে ১৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন আবু সালেক নামের এক লোক। কিন্তু দুদক সালেকের স্থলে জাহালমকে জেলে ঢুকিয়ে বলেছে, তুমিই অপরাধী।
জাহালম যতই বলেছেন, ‘আমি সালেক না, আমি কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিইনি।’ কিন্তু দুদক ও পুলিশ জোর দিয়ে বলেছে, ‘না, তুমিই সালেক, তোমাকেই জেল খাটতে হবে। শাস্তি পেতে হবে।’
দুদক বড় বড় দুর্নীতিবাজকে ধরতে পারে না, কিন্তু জাহালমের মতো নিরীহ মানুষকে জেল খাটাতে পারে। এই না হলে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন!
জাহালম বিনাদোষে ১ হাজার ৯২ দিন কারাগারে ছিলেন। তিনি এখন মুক্ত মানুষ। কিন্তু তাঁর জীবন থেকে যে তিনটি বছর ঝরে গেল, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
জাহালমের ঘটনায় অগ্রদূত পরিচালিত ‘সবার উপরে’ চলচ্চিত্রের অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের সেই বিখ্যাত সংলাপই মনে পড়ে, ‘ফিরিয়ে দাও আমার ১২টি বছর।’ জাহান্নামের জীবনের ১ হাজার ৯২দিন ফিরিয়ে দিন।
১ হাজার ৯২ দিন পর মুক্তি
দুই দিন পর নিরীহ জাহালমের কারা মেয়াদের তিন বছর পূরণ হবে। জাহালম গ্রেপ্তারের পর থেকে বড় ভাই দরিদ্র শাহানূর দিনের পর দিন আদালত থেকে কারাগার, কারাগার থেকে আদালত ঘুরে বেড়িয়েছেন। রোববার দুপুরে জাহালমের ভাই শাহানূর যখন সংবাদ পান জাহালমকে হাইকোর্ট মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, তখন তিনি ছুটে আসেন কাশিমপুর কারাগারে। বিকেল চারটা থেকে কারাগারের ফটকে অপেক্ষা করতে থাকেন শাহানূর। তাঁর গায়ে কেবল একটি টি-শার্ট। রাত বাড়ার সঙ্গে শীতে কাঁপতে থাকেন শাহানূর। রাত ১০টার দিকে শাহানূর বলছিলেন, ‘আজ আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন। আমার ভাই মুক্তি পাবে। ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি যাব।’ রোববার দিবাগত রাত একটার দিকে কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন জাহালম। প্রায় নয় ঘণ্টা অপেক্ষার পর শাহানূর কাছে পেলেন ছোট ভাই জাহালমকে। আর জাহালম মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিলেন ১ হাজার ৯২ দিন পর।
জেল থেকে বের হয়ে কাশিমপুর কারাফটকে সাংবাদিকদের জাহালম বলেন, ‘কখনো বিশ্বাস করতে পারিনি ছাড়া পাব।’ বিনাদোষে জেল খাটতে হলো। এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন জাহালম। সে সময় হাইকোর্টকে ধন্যবাদ জানান জাহালম। একই সঙ্গে তিনি প্রথম আলো ও মানবাধিকার কমিশনকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। 
জাহালমেরা তিন ভাই, তিন বোন। সবার বড় শাহানূর। যিনি একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। টাঙ্গাইলের নাগরপুরে ছোট একটি দোকান আছে। তাঁর তিন সন্তান। জাহালম নরসিংদীর একটি জুটমিলে চাকরি করতেন। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সেখানেই থাকতেন। জাহালমের মা মনোয়ারা অন্যের বাড়িতে কাজ করে আসছেন অনেক আগে থেকে। জাহালমের ছোট বোন তাসলিমার বয়স যখন তিন বছর (এখন বয়স ২৩ বছর) তখন বাবা আরেকটি বিয়ে করেন। এরপর থেকে জাহালমের মা মনোয়ারায় সংসারের হাল ধরেন। তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করে তাঁর ছেলে মেয়েকে বড় করে তোলেন। জাহালমের বড় ভাই শাহানূর জানালেন, তাঁর মায়ের জন্মের সময় মারা যান তাঁর নানি। মা তখন পালক বাবার কাছে বেড়ে ওঠেন। সেই পালক বাবা মনোয়ারাকে বিয়ে দেন।
৩০টি বছর পরের বাড়িতে থেকেছেন তাঁরা। সেখানে তাঁদের জন্ম, বেড়ে ওঠা। বছর কয়েক আগে ধারদেনা করে ১০ শতাংশ জায়গা কেনেন। সেখানে টিনের দোচালা দুটি ঘর তোলেন। জাহালমের মা মনোয়ারা জানান, জন্মের পর থেকে কষ্ট করে গেছেন। পরের বাড়িতে কাজ করে তাঁর সারাটা জীবন কাটছে। অনেক কষ্টে ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছেন। মনোয়ারা আরও জানালেন, যেদিন থেকে তাঁর ছেলে জাহালমকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো, সেদিন থেকে তাঁদের জীবনের আরেকটি চরম কষ্টের অধ্যায় শুরু হয়। বড় ছেলে শাহানূর জাহালমকে মুক্ত করার জন্য কষ্ট করে চলেছেন।
মনোয়ারা বললেন, মামলার শুনানির দিন থাকলে জাহালমকে দেখার জন্য টাঙ্গাইল থেকে ঢাকার আদালতে যান তাঁর বড় ছেলে জাহালম। প্রায় শুনানির তারিখে তিনি অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার করে আনেন। সেই টাকা নিয়ে শাহানূর জাহালমের কাছে ছুটে যান। এভাবে অনেকের কাছ থেকে সুদের টাকা নিয়েছেন, নিয়েছেন এনজিওর ঋণ। এখন প্রায় প্রতিদিন পাওনাদার বাড়িতে আসেন। একজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে আরেকজনকে দেন।
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, তাঁদের তদন্তে যখন জাহালম নিরপরাধ প্রমাণিত হন, তখন চিঠি দিয়ে দুদককে জানানো হয়। কথা বলেন দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে। অধিকতর তদন্ত করার অনুরোধ করেন।
দুদক অধিকতর তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়। দুদকের তদন্তে উঠে আসে, জাহালম নিরপরাধ। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য বিচারিক আদালতের কাছে আবেদন করেন। গত ৩০ জানুয়ারি প্রথম আলোয় ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি সেদিন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত। শুনানি নিয়ে আদালত জাহালমের আটকাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বতঃপ্রণোদিত রুল জারি করেন। একই সঙ্গে নিরীহ জাহালমের গ্রেপ্তারের ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি, মামলার বাদী দুদক কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্র সচিবের প্রতিনিধি ও আইন সচিবের প্রতিনিধিকে ৩ ফেব্রুয়ারি  সকাল ১০টায় সশরীরে আদালতে হাজির থাকার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
এরই ধারাবাহিকতায় রোববার দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি হিসেবে দুদকের মহাপরিচালক (তদন্ত), মামলার বাদী আব্দুল্লাহ আল জাহিদ, স্বরাষ্ট্র সচিবের (সুরক্ষা) প্রতিনিধি যুগ্ম সচিব সৈয়দ বেলাল হোসেন এবং আইন সচিবের প্রতিনিধি সৈয়দ মুশফিকুল ইসলাম আদালতে হাজির হন।
শুনানি নিয়ে সোনালী ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের করা সব মামলা থেকে নিরীহ জাহালমকে অব্যাহতি দিয়ে গতকালই মুক্তি দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ‘এক নির্দোষ লোককে এক মিনিটও কারাগারে রাখার পক্ষে আমরা না।’
একই সঙ্গে হাইকোর্ট এই ভুল তদন্তের সঙ্গে কারা জড়িত, তাঁদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। না হলে আদালত এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন বলে জানান।
মায়ের কোলে জাহালম
আগেই বড় ছেলে শাহানূরের কাছ থেকে মা মনোয়ারা জেনে গেছেন, জাহালম জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। খবর পেয়ে অপেক্ষায় মা মনোয়ারা, কখন বাড়ি ফিরবেন তাঁর আদরের খোকা জাহালম, যাঁকে তিনি তিন বছর দেখেননি। রাতের অন্ধকারে ঘন কুয়াশায় মোবাইলের আলো দূর থেকে দেখে ছুটে এলেন মা মনোয়ারা। জাহালমকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে জড়িয়ে ধরলেন মনোয়ারা। বাড়ি থেকে কিছু দূরে ফাঁকা মাঠে কান্নার রোল...। মা মনোয়ারার আহাজারি। জাহালমের কপালে চুমু দিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন, ‘কার মাথায় বাড়ি দিছিলাম যে আমার এত বড় সর্বনাশ করেছিল।’ ডুকরে ডুকরে কেঁদে চলেন মা মনোয়ারা।
মনোয়ারা যখন জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছিলেন, তখন জাহালমকে জড়িয়ে ধরেছেন বোন শাহানা ও তাসলিমা। তাঁরাও তখন চিৎকার করে বিলাপ করছিলেন। শাহানা বলছিলেন, ‘আমার ভাই, কোন অন্ধকারে ছিলি এত দিন।’ বাড়ির কাছে ফাঁকা মাঠে কান্নার আওয়াজ শুনে তখন দুএকজন প্রতিবেশী ছুটে আসেন জাহালমের কাছে। এরপর মা মনোয়ারাকে জড়িয়ে ধরে মাঠের আল ধরে বাড়ির উঠানে আসেন জাহালম। সেখানে আবারও জাহালমকে জড়িয়ে ধরে বুকফাটা কান্না শুরু করেন মনোয়ারা। তখন মনোয়ারা কান্নার সুরে বলতে শুরু করেন তাঁর যত বেদনার কথা। বার বার বলতে থাকেন, ‘আমার সোনার ব্যাটা বিনাদোষে তিন তিনটা বছর জেল খাটল। আমার সোনার ব্যাটা আজ বাড়ি ফিরল।’
মনোয়ারা বললেন, ‘ব্যাটাগোর জন্য জীবনভর অনেক কষ্ট করেছেন। মায়ের আহাজারি দেখে জাহালমও মা মা বলে চিৎকার করে আহাজারি করতে থাকেন। জাহালমের মুখে শুধু একটাই বুলি, ‘মাগো, মা।’ ঘুরেফিরে মনোয়ারার একটাই কথা, ‘এই জীবনে এই দৃশ্য আমি ভুলবার পারুম না। কত কষ্টে কেটেছে আমার ব্যাটার দিনরাত।’
জাহালমকে দুধ দিয়ে গোসল
গতকাল সোমবার ভোর চারটার দিকে বড় ভাই শাহানুরকে সঙ্গে নিয়ে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে গ্রামের বাড়িতে ফেরেন তিনি। এ সময় বাড়িতে অপেক্ষায় থাকা তার মা মনোয়ারা বেগম ছেলেকে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে তাকে ঘরে তোলা হয়।
রোববার দিবাগত রাত একটার দিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়া পান জাহালম। পরে ভাই সাহানুর মিয়ার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে রওনা হন।
জাহালমের আসার খবর পেয়ে বাড়িতে অপেক্ষা করতে থাকেন স্বজনরা। ভোর চারটার দিকে বাড়িতে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। মা ও বোনকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জাহালমও। তাদের দেখে কান্না ধরতে পারেনি সেখানে উপস্থিত প্রতিবেশিরাও। পরে জাহালমকে দুধ নিয়ে গোসল করিয়ে ঘরে তোলেন তা মা। এ সময় জাহালমের মা মনোয়ারা বলেন, যারা তার ছেলের ক্ষতি করেছে আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন।
দুদকের তদন্ত কমিটি
বিনা অপরাধে জাহালমের তিন বছর কারাভোগের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গতকাল সোমবার এ কথা জানান।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, জাহালমের ঘটনায় দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের যদি কোনো গাফিলতি থেকে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা জজ পদমর্যাদার দুদকের একজন পরিচালককে প্রধান করে কমিটি করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুদকের বিচার চাই: জাহালম
অপরাধী না হয়েও তিন বছর জেলে কাটাতে হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুদকের বিচার চেয়েছেন পাটকলকর্মী জাহালম। গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে বেরিয়ে দুদকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের জাহালাম বলেন, “কোনো অপরাধ না করেও দুদক আমাকে মিথ্যা মামলায় তিন বছর কারাগারে আটকে রেখেছে; আমি দুদকের কঠিন বিচার চাই। তাদের কারণে আমি জেলখানায় অনেক কষ্টে দিন কাটিয়েছি। কারাগারের ওয়ার্ডে সেবকের কাজকর্ম করেছি। এর আগে আমি দুদককে বলেছিলাম, আমি সালেক নই, আমি জাহালম। কিন্তু তারা তা বিশ্বাস করেনি।”
জাহালম বলেন, “আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমি এর ক্ষতিপূরণ চাই। আমি চাকরি চাই। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের বিচার চাই। আমাকে মুক্তি দেয়ায় আদালতকে ধন্যবাদ জানাই। আমি ভাবতে পারিনি জীবনে কারামুক্ত হতে পারব। আজ মুক্তি পেয়ে আমার খুব ভাল লাগছে।”
দুদকের গাফিলতির শিকার জাহালম
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক’র কাছে জাহালমের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, মাননীয় আদালতের আদেশে দেশবাসী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে। জাহালমের প্রতি ভীষণ অন্যায় করা হয়েছিল। অনেক দেরিতে হলেও আদালতের উদ্যোগে তাঁর একটা প্রতিকার মিলেছে। এই অন্যায়টা যাঁরা আদালতের দৃষ্টিতে এনেছেন, আদালতকে সাহায্য করেছেন, সবাই প্রশংসার দাবিদার।
কিন্তু মনটা সম্পূর্ণ ভরেনি। জাহালমের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া বছরগুলো কেউ তাঁকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তবে এ রকম অন্যায়, অবিচার হলে পরে সেটি শোধরানো হয় এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে অন্যায়ের শিকার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে রাষ্ট্র অর্থসাহায্য দিয়ে কিছুটা হলেও তাঁর অপূরণীয় ক্ষতি ঘোচানোর চেষ্টা করে। ভালো হতো কোনো আইনজীবী যদি জাহালমের পক্ষে আপাতত কিছু ক্ষতিপূরণ চাইতেন। আমার বিশ্বাস, আদালত তখন এককালীন ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতেন।
অবিলম্বে কিছু ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার জাহালমের নিঃসন্দেহে আছে। আমার ধারণা, এই সপ্তাহেই আদালতে গিয়ে তাঁর জন্য কেউ এককালীন ক্ষতিপূরণের দরখাস্ত করলে সেটা আদালত নিশ্চয়ই বিবেচনায় নেবেন।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গাফিলতি অনেক। জাহালমের ঘটনায় সেটি খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুদক তার মামলাগুলো যেভাবে তদন্ত ও পরিচালনা করছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সংস্থাটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সততা, সক্ষমতাসহ সবকিছু নিয়ে বিশদ পর্যালোচনার সময় এসেছে। দু-চারজন বাদে রাঘববোয়ালদের দোষ প্রমাণ করার বিশেষ কোনো নজির ইদানীংকালে দুদক দেখাতে পারেনি।
দুদকের বহু মামলা বছরের পর বছর তদন্তাধীন আছে। সবচেয়ে প্রথম মনে পড়ছে বেসিক ব্যাংকের রাঘববোয়ালদের কথা। এত সমালোচনা ও তথ্যপ্রমাণ, তারপরও দুদক এই মামলায় কী করেছে? কম গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জামিন না পেয়ে জেলে থাকছেন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, আর রাঘববোয়ালরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব কিছু খতিয়ে দেখতে হবে।
দুদকের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণেই জাহালমের কারাবাস: রিজভী
অপরাধী না হয়েও পাটকল কর্মী জাহালমের তিন বছর কারাভাগের ঘটনায় ‘ক্রিমিনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের’ চিত্রই ভেসে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “নির্দোষ জাহালম ১হাজার ৯২ দিন কারাগারে ছিলেন শুধুমাত্র আওয়ামী সরকারের ক্ষমতা-আশ্রিত দুর্নীতি দমন কমিশনের এর রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে। এই কমিশনের কারণেই দেশে ‘ক্রিমিনাল ইকোনমি’ আশকারা পেয়ে পত্র-পল্লবে বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।” “জাহালমের দীর্ঘদিন কারাভোগের ঘটনায় দুদকের ভূমিকা নজীরবিহীনভাবে ন্যক্কারজনক। এই ঘটনায় দেশে একটি ‘ক্রিমিনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের’ ছবিই ভেসে ওঠে।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ