ঢাকা, বুধবার 8 May 2019, ২৫ বৈশাখ ১৪২৬, ২ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রমযানের প্রথম দিনে গোটা রাজধানীতে বাহারি ইফতারির পসরা

স্টাফ রিপোর্টার : পবিত্র মাহে রমযানের প্রথম দিন অতিবাহিত হয়েছে। রাজধানীর নামি-দামী হোটেল থেকে শুরু করে ফুটপাত সর্বত্রই ইফতারের পসরা সাজিয়ে রেখেছিল বিক্রেতারা। রাজধানীর এমন কোনো রাস্তা নাই যেখানে ইফতারি পাওয়া যায় নাই। ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল বিক্রেতাদের। আশানুরুপ ক্রেতাও মিলেছে। প্রত্যেকটা ইফতারির দোকানেই ক্রেতাদের লাইনে দাঁড়িয়ে ইফতার সামগ্রী কিনতে হয়েছে। আসরের নামাজের পর থেকেই রাস্তায় ক্রেতাদের ব্যাপক ভিড় ছিল। রমযানের প্রথম দিন হওয়ায় গোটা রাজধানী সেজেছিল বাহারি ইফতারির সাজে। বাহারি সব ইফতারে সেজেছিল প্রাচীন ঢাকার ইতিহাস আর ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র চকবাজারসহ পুরো রাজধানী। ইফতারের আয়োজনে ছিল লোভনীয় রসনা বিলাসের সব খাবার। কোয়ালিটি ভেদে দামেরও রয়েছে ভিন্নতা। হাক-ডাক আর কোলাহলে চলছে বেচা-বিক্রি। মানুষের ভীড়ে বিক্রেতারা গলা ছেড়ে হাক ছাড়ছে মন ভুলানো নানা কথায় ও বাক্যে। ‘বড় বাপের পোলা খায়, ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়’। চকবাজার মানেই বাহারি ইফতারির পসরা। এ বাজারের ঐতিহ্যবাহী ইফতারসামগ্রীর সুখ্যাতি দেশজুড়েই। সেখানকার যেসব ইফতারসামগ্রী ভোজন রসিকদের সব থেকে বেশি আকৃষ্ট করে তার মধ্যে অন্যতম শাহী জিলাপি। এখানে এক জিলাপির দাম ৪০০ টাকা।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর চকবাজার, বেইলি রোড, আজিমপুর, সেন্ট্রাল রোড, ঝিগাতলা, কলাবাগান, গুলশান-১, বনানী সহ প্রতিটি স্থানে বাহারি ইফতারি নিয়ে বসেছে দোকানিরা। দেশীয়ও পাশ্চাত্য ধাচের খাবারও মিলছে এসব দোকানে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মঙ্গলবার বিকেলে সামিয়ানা এবং প্যান্ডেল সাজিয়ে ইফতারি বিক্রি করেছেন চকের ব্যবসায়ীরা। বাহারি ইফতারের পসরায় সাজানো হয়েছে ঢাকার প্রাচীন এ স্থানটিতে। দুপুর থেকেই চকবাজার ছাপিয়ে পুরান ঢাকার অলিগলির বাতাসে ভাসছে নানা স্বাদের মুখরোচক খাবারের মনকাড়া সুবাস।
রসে টইটুম্বুর শাহী জিলাপি দেখলে যে কারও মুখে পানি এসে যায়। তাই তো রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চকবাজারে ইফতার কিনতে আসাদের একটি বড় অংশই শাহী জিলাপি না কিনে ফিরতে পারেন না। আর ক্রেতাদের কাছে লোভনীয় করে তুলতে ব্যবসায়ীরাও তাদের হাতের কারুকাজে নানা আকারের শাহী জিলাপি তৈরি করেন।
এখানকার ইফতার সামগ্রির মধ্যে রয়েছে, সুতি কাবাব, জালি কাবাব, টিকা কাবাব, ডিম চপ, কবুতর- কোয়েলের রোস্ট, ঐতিহ্যবাহী বড় বাপের পোলায় খায়, খাসির রান, গোটা মুরগি ফ্রাই, মুরগি ভাজা, ডিম ভাজা, পরোটা, শাহী কাবাব, সুতি কাবাব, সাসলিক, ভেজিটেবল রোল, চিকেন রোল, খাসির রানের রোস্ট, দইবড়া, হালিম, লাচ্ছি, পনির, পেস্তা বাদামের শরবত, লাবাং, মাঠা পাওয়া যাচ্ছে দোকানগুলোতে। আর পরিচিত খাবারের মধ্যে বেশি পাওয়া যাচ্ছে কিমা পরোটা, ছোলা, মুড়ি, ঘুগনি, সমুচা, বেগুনি, আলুর চপ, পিয়াজু, জিলাপিসহ নানা পদের খাবার।
বিক্রেতারা জানায়, বংশগতভাবে দীর্ঘদিন ধরে এই জায়গায় ইফতারির ব্যবসা করছেন তারা। তাদের বাবা, দাদা, তার বাবারাও এখানে ইফতার সামগ্রী বিক্রি করতেন। ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তাদের এই ব্যবসা। তবে, এখন অনেকেই নতুন নতুন এখানে এসেছেন বলেও জানান তারা। এখানকার খাবারের মধ্যে একটি নবাবী স্বাদ ও আমেজ থাকে।
রাজধানীর শ্যামলি থেকে চকবাজারে ইফতারি কিনতে এসেছেন কাউছার আজম। তিনি জানান, প্রতিবছর তিনি চকবাজার থেকে প্রথম দিন ইফতার কিনেন। এখানকার ইফতারি অন্যান্য স্থান থেকে আলাদা। তাই তিনি এখানে আসেন। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরাও চকবাজারের ইফতার পছন্দ করেন। তাই প্রথম দিনই ইফতারি কিনতে এসেছি। একই সময় গতবারের তুলনায় ইফতারির দাম কিছুটা বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন।
দাম বেশি নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কয়েকজন বিক্রেতারা বলেন, এবছর গরু ও খাসির মাংসের দাম বাড়তি। এ ছাড়া চিনিসহ অন্যান্য পণ্যের দামও বেশি। তাতে ইফতার বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
বিক্রেতারা জানান, পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের বাড়ির তৈরি ইফতারির চেয়ে দোকানে তৈরি ইফতারি দিয়েই ইফতার করতে অভ্যস্ত। যে কারণে পুরো রমজান জুড়েই চকের ইফতিারির বাজার থাকে সরগরম। তবে শুধু পুরান ঢাকার বাসিন্দাই নন। রাজধানীর অন্যান্য এলাকার বাসিন্দারা ও রমজানে চক বজার থেকে ইফতার সামাগ্রী নিতে আসেন। এবার নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ইফতার সমাগ্রীর দাম বেড়েছে বলে জানান তারা।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বড় বাপের পোলায় খায় বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজিতে। ব্যবসায়ি সালেহ আহমেদ জানায়, এই ইফতার আইটেমটি তেরি করা হয়েছে ২৭টি পদ দিয়ে। এছাড়া খাসির রোস্ট পিস আকার ভেদে ৪৪০ থেকে ৬৫০ টাকায়, মুরগির রোস্ট পিস ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, গরুর সুতি কাবাব ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি, দইবড়া কেজি ১৮০ থেকে ২৩০ টাকা, কবুতরের রোস্ট ১৫০ টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে। কোয়েল প্রতি পিস ৬০ থেকে ৭০ টাকা। এ ছাড়া চিকন জিলাপি কেজি ১৫০ টাকা, বড় শাহী জিলাপি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
রোজার প্রথমদিন মঙ্গলবার চকবাজারে গিয়ে দেখা যায়, জিলাপির পসরা সাজিয়ে বসেছেন একাধিক ব্যবসায়ী। সাধারণ জিলাপি ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি, শাহী জিলাপি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি আর ঘিয়ে ভাজা জিলাপি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি। চকবাজারে প্রায় ২০ বছর ধরে শাহী জিলাপি বিক্রি করেন নাজিমউদ্দিন। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে তিনি এবার তৈরি করেছেন দুই কেজি ওজনের জিলাপি। প্রতি কেজি ২০০ টাকা দরে তিনি এক পিস জিলাপি বিক্রি করছেন ৪০০ টাকায়। বড় আকারের এই জিলাপির পাশাপাশি ছোট আকারের জিলাপিও বিক্রি করছেন নাজিমউদ্দিন। ২৫০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের এসব জিলাপির কেজিও ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন তিনি।
বেইলি রোডের ইফতারি যায় মন্ত্রী পাড়ায়। রাজধানীর অভিজাত শ্রেণীর মানুষের ইফতারির বাজার হিসেবে খ্যাত বেইলি রোড। মন্ত্রিপাড়ার বাসিন্দা, ব্যাংকার, বিভিন্ন সরকারি আমলা ও কর্মকর্তা, বড় ব্যবসায়ি এবং শিল্পপতিরাই মূলত এখানকার ক্রেতা। তবে সাধারণ মানুষেরও ভীড় জমে এখানে। এখানে ফখরুদ্দিনের ইফতার, কাচ্চি বিরিয়ানি ও খাসির হালিমের ক্রেতাই বেশি। এছাড়াও রয়েছে স্কাইলার্ক, গোল্ডেন ফুড, আমেরিকান বার্গার, ক্যাপিটাল কনফেকশনারি, রেডকোর্ট, বুমার্স, মিস্টার বেকারস, কেএফসি, পিৎজা হাটসহ সব লোভনীয় সব ফাস্টফুডের দোকান। দোকানভেদে বেইলি রোডে রয়েছে দামেরও তারতম্য। চিংড়ি মাছের বল ৪০-৫০ টাকা, দইবড়া ১০০ থেকে ২০০ টাকা, সমুচা ১০-১৫, জিলাপি ১৬০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি, হালিম ৫০ থেকে ৫০০, টানা পরোটা ৩০, কিমা পরোটা ৪৫, চিকেন ললি ৪৫-৬০, বিফমিনি কাবাব ৪০-৫০, চিকেন সিংগার স্টিক ৩০, আলু চপ প্রতিপিস ৫-২০, বেগুনি ও পেঁয়াজু ৫-১০, ছোলা প্রতি কেজি ২০০-২২০, প্রতিপিস শিক কাবাব ৬০, ঝালফ্রাই প্রতি কেজি ৪০০, বিফঝোল চাপ ৫৫০-৬০০ এবং ফালুদা ১৬০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি গরুর কিমা ৬০০ টাকা, গরুর মগজ ৭০০-৮০০, জাম্প রোস্ট ৪০০-৪৫০, দেশী মুরগি প্রতিপিস ২৫০, গরুর শিক কাবাব পিস ৬০ এবং খাসি কাবাব ৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়।
পুরো রমজান জুড়ে মাঠে থাকবে ভোক্তা অধিকারের মোবাইল কোর্ট। দোকানগুলোতে সামান্য ত্রুটি পেলেই বড় অঙ্কের জরিমানাসহ নানা ধরণের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও খাদ্যে ভেজাল দেয়া যাবে না। এজন্য রমজানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর ইফতার সামগ্রী তৈরির বিষয়ে বিক্রেতাদের সতর্ক করা হচ্ছে। আইন অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন চকের ইফতার বাজার পরিদর্শনের গিয়ে বলেন, যারা খাদ্যে ভেজাল মেশাবে তাদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ