ঢাকা, সোমবার 16 September 2019, ১ আশ্বিন ১৪২৬, ১৬ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

শরতের শিশির ভেজা প্রভাতে শুভ্র শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ-কোমল সুবাস

মুহাম্মদ নূরে আলম: শরত বন্দনায় এগিয়ে রয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজারুল ইসলাম। বিদ্রোহী কবি’র তকমা কপালে আঁকা লৌহ মূর্তিরূপী এ কবিও শারদশ্রী দেখে আপ্লুত হয়ে শরত বন্দনায় বলেন, এল শারদশ্রী কাশকুসুমবসনা/রসলোক বাসিনী/লয়ে ভাদরের নদীসম রূপের ঢেউ/মৃদু মধুহাসিনী।/ যেনো কৃশাঙ্গী তপতী তপস্যাশেষে/সুন্দর বর পেয়ে হাসে প্রেমাবেশে। বাংলা বর্ষপঞ্জির ধারাবাহিকতায় আজ সোমবার পহেলা আশি^ন ১৪২৬। শরতের মধ্যভাগের প্রথম দিন। বাংলা ঋতুর হিসাব অনুযায়ী ভাদ্র-আশ্বিন এই দুই মাস শরতকালের রাজত্ব। শরতের সকালে শিশিরমাখা শিউলি ফুল দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু হেমন্তের প্রভাব বাড়ছে প্রকৃতিতে। সন্ধ্যা ও ভোরে এখন বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া ও কুয়াশা বা শিশির পড়া শুরু হয়ে  গেছে। আসলেই শরত বাংলাদেশের কোমল, স্নিগ্ধ এক ঋতু। শরত ঋতুর রয়েছে স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য। আমরা জানি, বাংলাদেশে ছয়টি ঋতু ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন রূপের পসরা নিয়ে হাজির হয়। এক এক ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন ফুলে ও ফলে, ফসলে ও সৌন্দর্য্যে সেজে ওঠে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো পৃথিবীর আর কোন দেশের প্রকৃতিতে ঋতুবৈচিত্র্যের এমন রূপ বোধ হয় নেই ।
ঋতুচক্রের বর্ষ পরিক্রমায় শরতের আগমন ঘটে বর্ষার পরেই। বর্ষার বিষণ্ণতা পরিহার করে শরত আসে আকাশে সাদা মেঘের ভেলা নিয়ে। প্রকৃতিতে বর্ষার বৈশিষ্ট্য এখনও বহমান। আর বর্ষার সে ধারাই এবার শিশির হয়ে ঝরবে শরতে। শিউলিবনের বুকে উঠবে দুরু দুরু কাঁপন, কাশবনের সাদা পালে লাগবে শুভ্র মেঘের হিমেল হাওয়ার দোলা। বার মাসে ছয় ঋতুর এদেশে ভাদ্র-আশ্বিন মাসজুড়ে প্রভাত রাঙাবে শরতের শিউলি ফুল। এদশের প্রতিটি ঋতুই বৈচিত্র্যময়। প্রকৃতি কখনো হয় প্রাণোচ্ছ্বলা চঞ্চলা তরুণী, কখনো হয় দীপ্ত চক্ষু শীর্ণ সন্ন্যাসিনী, কখনো বর্ষশীলা ক্রন্দনরতা অভিমানিনী, কখনো নিস্প্রভ জরাগ্রস্ত বৃদ্ধা, আবার কখনো বা শান্তশিষ্ট স্নেহময়ী জননী। আষাঢ় শ্রাবণের টানা বর্ষণের পর মেঘমুক্ত আকাশের অবারিত নীলে ঝিলমিল শরতের দিনলিপি। যার সৌরভ ছাড়া অপূর্ণ থাকে শরতের আলপনা আঁকা সে আর কিছুই নয়, শুভ্র শিউলি। শিউলি ফুল শরতকালের অন্যতম অনুষঙ্গ। শরতের শিশিরভেজা ঘাসে কমলা রঙের নলাকার বোঁটায় সাদা পাপড়ির অজস্র ফুল পড়ে থাকার দৃশ্য লোভনীয়। শিশিরভেজা ঘাসে খালি পা মাড়িয়ে শিউলি ফুল কুড়ানোর একটা আলাদা সুখ আছে। রাতে ফুটে সকাল না হতেই ঝরে পড়ে বলে এই ফুলকে বলে নাইট জেসমিন। শিউলি ছাড়াও এর আরো অনেক নাম আছে। যেমন- শিউলি, শেফালি, শেফালিকা (বাংলা), শেওয়ালি (মণিপুরী), পারিজাত (মারাঠি), পারিজাতম (তেলেগু), গঙ্গা শিউলি (উড়িষ্যা), হরসিংগার, রাগাপুষ্পী, মালিকা ইত্যাদি।
বলা হয়, মহাকবি কালিদাস থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং বিভূতিভূষণসহ অনেক কবি-সাহিত্যিক শিউলি ফুল নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ অন্তত আটটি গান ও ২১টি কবিতায় শিউলির প্রসঙ্গ এনেছেন নানাভাবে। শিউলির ভেতরেই যেন তিনি শরতের সব সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছেন। শরতের রূপ শান্ত-স্নিগ্ধ-কোমল। যেখানে মলিনতা নেই, আছে নির্মল আনন্দ আর অনাবিল উচ্ছ্বাস। কবি জীবনানন্দের ভাষায়, যৌবন বিকশিত হয় শরতের আকাশে। মহাকবি কালিদাসের ভাষায়, প্রকৃতি এ সময় নববধূর সাজে সজ্জিত হয়ে উঠে। শরতের মেঘহীন নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা কেড়ে নেয় প্রকৃতি প্রেমিকদের মন। এতে মুগ্ধ হয়েছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। বিলে শাপলা, গাছে গাছে শিউলির মন মাতানো সুবাস অনুভূত হয় শরতের ছোঁয়া। প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আলোড়িত করেছিল শরতের প্রকৃতি। পল্লী কবি জসীমউদ্দীন তাই শরতকে দেখেছেন বিরহী নারী হিসেবে।
মধ্যযুগের কবি চন্ডীদাসের বিখ্যাত উক্তি এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর। এখানে কবি শরত মাসের চিরাচরিত রূপ তুলে ধরেছেন। কবির দক্ষ হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় কবিতাটি অসাধারণত্ব লাভ করেছে। মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা নর-নারীর অব্যক্ত মনের বেদনার কথাই কবি এখানে বলেছেন।
শরতে শেফালি, মালতী, কামিনী, জুঁই আর টগর মাথা উঁচিয়ে জানান দেয় সৌন্দর্য। মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে দেয় চার পাশে। গ্রামীণ প্রকৃতিতে শরত আসে সাড়ম্বরে। যদিও ইট-কাঠের নগরীতে শরত থেকে যায় অনেকটা অনমশরালে। আবার, এই শরতেই হয়ে থাকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
ভাদ্র শেষ হতেই শুরু হয় আশ্বিন মাস। আর আশ্বিন মানেই তো শরত। গ্রামবাংলার দিঘিতে ফোটে পদ্ম ফুল, দিঘির পাশেই শেফালি গাছ। প্রভাতে গাছ থেকে ঝরে পড়ে শত শত শেফালি। এর সুগন্ধ মনে লাগায় ভালোবাসার রং। কেউ বা গাঁথে শেফালি ফুলের মালা। আবার কাশফুল যেন শরতেরই স্মারক। যেমন, বর্ষার স্মারক কদম ফুল। প্রকৃতিতে ফুলের সমারোহ মনে করিয়ে দেয় কেয়া-পাতার নৌকো গড়ে সাজিয়ে দেব ফুলে/ তাল-দিঘিতে ভাসিয়ে দেব চলবে দুলে দুলে...’। আসলে এযে শরতেই প্রতিচ্ছবি। আশ্বিন ভরা থাকে ফসলের খেত, মাঠ-প্রান্তর। ধানখেতের পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটান কৃষক। আশ্বিনে হাওরে, নদীপথে যেতে বাঙালির মন হয় উতলা। তাই পর্যটকরা বেরিয়ে পড়তে চায় এই ভাদ্রে। কিন্তু সে সুযোগ কোথায়? বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ভাবনায় আশ্বিন নিয়ে কোনো কর্মসূচি নেই। তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শরতে বেড়াতে পারেন।
শিউলি আমাদের প্রকৃতিতে শরৎ ঋতুর অনন্য উপহার হয়ে আসে। এদের আরেক নাম শেফালি। পারিজাত নামেও এরা পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম নাইট ফ্লাওয়ার জেসমিন)/Harsingar (হারসিঙ্গার)/কোরাল জেসমিন। শিউলি ছাড়া শরত যেমন নিষ্প্রাণ, তেমনি শারদীয় উৎসবও অনেকটাই অসম্পূর্ণ। মিষ্টি শিশিরের পরশ, ঢাকের শব্দ আর ভোরের শিউলি তলা-এসবই একে অন্যের পরিপূরক। গ্রাম কিংবা শহরে শিউলি এখনো দুর্লভ হয়ে ওঠেনি। ঢাকার বিভিন্ন পার্ক-উদ্যান এবং বাড়ির আঙিনায় সহজেই এ গাছের দেখা মেলে। তবে ফুলের আয়ু সীমিত সময়ের। রাতে ফুটে সুগন্ধ ছড়িয়ে সকালেই ঝরে যায়।
দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব থাইল্যান্ড থেকে পশ্চিমে বাংলাদেশ, ভারত, উত্তরে নেপাল ও পূর্বে পাকিস্তান পর্যন্ত এলাকা জুড়ে দেখতে পাওয়া যায়। শেফালি নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গ ও থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরি প্রদেশের রাষ্ট্রীয় ফুল। শিউলি গাছ নরম ধূসর ছাল বা বাকলবিশিষ্ট হয় এবং ১০ মিটারের মতো লম্বা হয়ে থাকে। গাছের পাতাগুলো ৬-৭ সেন্টিমিটার লম্বা ও সমান্তরাল প্রান্তের বিপরীতমুখী থাকে। সুগন্ধি জাতীয় এই ফুলে রয়েছে পাঁচ থেকে সাতটি সাদা বৃতি ও মাঝে লালচে-কমলা টিউবের মতো বৃন্ত। এর ফল চ্যাপ্টা ও বাদামি হৃৎপিন্ডাকৃতির। ফলের ব্যাস ২ সেন্টিমিটার এবং এটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রতিটি ভাগে একটি করে বীজ থাকে। শরত ও হেমন্তকালের শিশির ভেজা সকালে ঝরে থাকা শিউলি অসম্ভব সুন্দর দৃশ্যের অবতারণা করে।
পারিজাত শিউলির আরেকটি বিশেষ নাম। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে অনেকবার এসেছে শিউলি ফুল বা পারিজাতের কথা। প্রাচীনকালে এ ফুলের বোঁটার রঙ পায়েস ও বিভিন্ন মিষ্টান্নে ব্যবহার করা হতো। তাছাড়া শিউলির মালা খোঁপার সৌন্দর্য বাড়াতেও অনন্য। ফুল চ্যাপ্টা ধরনের। শিউলির পাতা ও বাকল বিভিন্ন রোগের মহৌষধ। ঔষধি হিসেবে ব্যবহার হয় শিউলির বীজ, পাতা ও ফুল। এই ফুল বোঁটা শুকিয়ে গুঁড়ো করে পাউডার বানিয়ে হালকা গরম পানিতে মেশালে চমৎকার রঙ হয়।
পরিশেষে বলা যায়, শরত প্রকৃতিকে অপরূপ রূপে সাজিয়ে যায় যার আবেশে অতি সাধারণ মানুষ ও ভাবাবেগে আপ্লুত হয়। শরত অবসাদগ্রস্ত মনেও নতুন প্রেরণার সঞ্চার করে। তাই তো আমরা প্রকৃতিতে দেখি, এই ঋতুতে কি অপূর্ব রঙের খেলা, কি অপরূপ রঙিন ভুবন সাজায় প্রকৃতি। শরতে প্রাণবন্ত রূপ নিয়ে হেসে ওঠে গ্রাম বাংলার বিস্তৃত দিগন্ত। তাইতো রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে হয়-শরতে আজ কোন অতিথি এল প্রাণের দ্বারে, আনন্দগান গা রে হৃদয়, আনন্দগান গা রে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ