ঢাকা, রোববার 6 October 2019, ২১ আশ্বিন ১৪২৬, ৬ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বন্যায় কৃষির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ॥ দুর্গতরা দুর্ভোগে

ইবরাহীম খলিল : কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও ভারতে গঙ্গার পানি বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের নদ-নদীর পানি বেড়ে অনেক জায়গায় বিপদসীমা অতিক্রম করেছিল। কয়েকটি নদীতে এখনও বিপদ সীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে ফসলী জমি। বাড়ীঘর। তবে বর্তমানে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজবাড়ীসহ ১৮ জেলার নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। পানি কমতে থাকা এলাকাগুলোতে নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এতে নদী পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ভাঙ্গন আতংক।
জানা গেছে, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, গোয়ালন্দ, কামারখালী এলাকায় পদ্মার পানি এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যদিও আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত কমে আসবে। ফলে এখন আর বড় ধরনের কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই।
গতকাল শনিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসের তথ্যানুযায়ী, গেল কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের প্রায় ২০ জেলায় অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে পাবনার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায় পদ্মার পানি বিপৎসীমার ১৪ দশমিক ২৮ সেন্টিমিটার এবং গোয়ালন্দে ৮ দশমিক ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া কুষ্টিয়ার কামারখালী এলাকায় গড়াই নদের পানি বিপদসীমার ৮ দশমিক ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টি না হলে পানি আরও কমবে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আজহার আলী বলেন, হঠাৎ পানি বাড়ার কারণে পাবনা অঞ্চলের কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় সাত কোটি টাকা । ১ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমির নানা প্রজাতির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে আধাপাকা ইরি ধান অনেক কৃষক ঘরে তুলতে পারেনি। কিছু পরিমাণ ধান কৃষক কাটতে পেরেছে। তবে সেটির বেশির ভাগ নষ্ট হয়েছে। আমরা সব কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি, পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে কৃষক যাতে আবার ফসল রোপণ করতে পারেন, সেই বিষয়ে তাদের সার্বিক সহযোগিতা দেওয়ার জন্য। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সরকারিভাবে তাদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে অবশ্যই তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ছবি: বাংলানিউজপদ্মায় পানি বাড়ার কারণে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে জেলার ছয়টি ইউনিয়নের বেশকিছু নিম্নাঞ্চলের মানুষ। ডুবে গেছে শীতকালীন সবজিসহ বিভিন্ন ফসল। পাবনা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, পাবনায় পদ্মা নদীর পানি বাড়ার কারণে প্রায় ১ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতগ্রস্ত হয়েছে। তবে সবচাইতে বেশি ক্ষতি হয়েছে শীতের আগাম বিভিন্ন ধরনের সবজি ও উঠতি ইরি ধান। এত দ্রুত পানি বেড়েছে যে, কোনো ফসল ঘরে তুলতে পারেনি বলে জানান স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। সরকারিভাবে আগাম বার্তা না পাওয়ার কারণে কৃষক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ কৃষকরা। তবে এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারি সহযোগিতার কথা বলেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
সবমিলিয়ে পাবনা ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী, রুপপুর, লক্ষ্মীকুণ্ড, সারাবাড়ি ইউনিয়নসহ পাবনা সদরের দোগাছি ইউনিয়নের কমরপুর, চরসাদিপুর, চর আশুতোষপুর, চর সাদিরাজপুর, রানীনগর, পীরপুরসহ পদ্মার পানির নিচে তলিয়ে গেছে প্রায় চরের ১০৫টি বসত বাড়ি। সবচাইতে বেশি পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়েছে পাবনা সদরের দোগাছি, ভাড়ারা ও ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশি, রুপপুর, লক্ষ্মীকুণ্ড ও দোগাছি ইউনিয়নের পদ্মারপাড় সংলগ্ন বেশকিছু চর অঞ্চল। এছাড়া জেলার বেশকিছু উপজেলা সুজানগর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরে নিম্নাঞ্চলের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ মোহাম্মদ কামাল জানান, টানা বৃষ্টি ও ভারতে গঙ্গার পানি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পায়। এতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ীসহ মোট ১৮ জেলা বেশি মাত্রায় প্লাবিত হয়। এসব জেলায় এরই মধ্যে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। যেসব এলাকার বাড়িঘর বেশি মাত্রায় প্লাবিত হয়েছে সেসব এলাকার মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়ে তাদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বৃষ্টিপাত কমে আসায় এখন পানি নামতে শুরু করেছে। এখন আর বড় ধরনের কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই। তবে সরকার সবধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
উল্লেখ্য, ভারতে অস্বাভাবিক বৃষ্টির কারণে গঙ্গার পানি বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ বন্যার কবলে পড়ে বাংলাদেশের কিছু অংশ। দেশের ২০ জেলায় বৃষ্টিপাত হলেও সাত জেলায় অস্বাভাবিকভাবে পানি বেড়ে যায়। পদ্মা অববাহিকার তিনটি নদ-নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার মধ্যে রয়েছে।
বন্যার কারণে বগুড়ার সারিয়াকান্দির কাছে বাঙ্গালী নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার হাটশেরপুর, নারচী, সারিয়াকান্দি সদর,ফুলবাড়ী, ভেলাবাড়ী, কতুবপুর ইউনিয়ন ও সারিয়াকান্দি পৌর এলাকার বাঙ্গালী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ।বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান জানান, সারিয়াকান্দিতে যমুনা ও বাঙালী নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও বিপদসীমর অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজান থেকে পানি আসার ফলে বরাবারের মত পানি বৃদ্ধি পেলে সারিয়াকান্দির যমুনার নদীর পূর্বাঞ্চল সব সময় প্লাবিত হয়ে থাকে। ঐ অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলের ফসলে কিছু ক্ষতি হয়ে থাকে। তবে এ পানি দ্রুত নেমে যাবে।
জেলার কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এখানে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। তবে উপজেলার চরাঞ্চলের অনেক কৃষক শীতকালীন সবজি চাষ করেছিল সেগুলোর ক্ষতি হয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকার রোপা আমন, মাসকলাই , শাকসবজি বন্যার পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে । উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায় ,বন্যায় ও অতিবৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলের ৯০ হেক্টর জমির রোপা আমন, ১৫ হেক্টর মাসকলাই বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে।
এদিকে আকস্মিক বৃদ্ধির পর পদ্মার পানি কমতে থাকায় মাদারীপুরের শিবচরে নতুন করে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙনের শিকার হয়েছে কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্রিজ, রাস্তাসহ অসংখ্য বসতবাড়ি।
শনিবার ভোরে কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের ৭৭নং কাঁঠালবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি ব্রিজ, রাস্তাসহ দোকানপাট ও অসংখ্য বসতবাড়ি ইতোমধ্যে পদ্মার বুকে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের অপেক্ষায় চরাঞ্চলের প্রায় একশ ঘর-বাড়ি।
জানা গেছে, গত কয়েক দিনে পদ্মার তীব্র স্রোত শিবচর উপজেলার চরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সরু খালের সৃষ্টি হয়। এখন পানি কমতে থাকায় স্রোতের তীব্রতা ব্যাপক বেড়ে খালের পাশে থাকা বিদ্যালয়, রাস্তাসহ অসংখ্য স্থাপনা নদীগর্ভে চলে গেছে। পদ্মার ভাঙনের ফলে অন্তত পাঁচশ পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব। এনখও ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, বসতবাড়িসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। কাঁঠালবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ভেঙে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামের প্রায় এক হাজার পরিবার ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য শুকনো খাবার, চাল ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ করা হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়ের পাঠদান চলমান রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ