ঢাকা,বৃহস্পতিবার 19 December 2019, ০৪ পৌষ ১৪২৬, ২১ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

নতুন সভ্যতার অপেক্ষায় মানবজাতি

যদি সচেতন কোন মানুষকে প্রশ্ন করা হয়, মানবজাতির জন্য এখন সবচাইতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো কী? অনেক বিষয়ের কথাই তিনি হয়তো উল্লেখ করবেন। তবে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, দূষণমুক্ত পানীয় পরিবেশন, বসবাসযোগ্য আবাসন, উগ্রতামুক্ত মানবিক রাজনীতি এবং যুদ্ধ ও আগ্রাসনমুক্ত বিশ্ব ব্যবস্থার কথা নিশ্চয় তার প্রয়োজনীয় তালিকায় স্থান পাবে। এই যখন মানুষের আকাক্সক্ষা বা প্রয়োজন, তখন আমাদের প্রিয় পৃথিবীতে অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ বাড়ে কোন বিবেচনায়? এএফপি সূত্রে ১০ ডিসেম্বর মুদ্রিত পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ব জুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। শুধু গত বছরই দেশে দেশে অস্ত্রের বিক্রি বেড়েছে ৫ শতাংশ। আর অস্ত্রবাজারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় দেশগুলো। সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এস আইপি আর আই) এক নতুন প্রতিবেদন এ তথ্য জানিয়েছে।

৯ই ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রনির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কল্যাণে ২০১৮ সালে ১০০টি বড় অস্ত্রনির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার কোটি (৪২০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারে। বিপুল পরিমাণ এই অর্র্থে ৫৯ শতাংশই তথা ২৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার গেছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর পকেটে। তাদের এ উপার্জন আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। এস আই পিআর আইয়ের অস্ত্র হস্তান্তর ও সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত কর্মসূচির পরিচালক অডে ফ্লিউর‌্যান্ট বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ আগে থেকেই বেশি ছিলো। তার উপর গত এক বছরে (২০১৮) এই বিক্রি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিজ অবস্থান আরও জোরদার করার লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে অস্ত্র বিক্রিতে আগের চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে দেশটির অস্ত্রনির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। অস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রাশিয়া। এই বাজারে ৮ দশমিক ৬ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তার হাতে। এর পরে রয়েছে যথাক্রমে যুক্তরাজ্য (৮ দশমিক ৪ শতাংশ) ও ফ্রান্স (৫ দশমিক ৫ শতাংশ)। আর গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, শীর্ষ ১০০ অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তিন থেকে সাতটি চীনের মালিকানাধীন।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো বর্তমান সময়ে জাতিসংঘকে যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তারা নিয়ন্ত্রণ করছে বিশে^র অস্ত্রবাজারও। ফলে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিও তাদের নিয়ন্ত্রণেই। দুঃখের বিষয় হলো তাদের নেতৃত্বে বিশ্বে বাড়ছে অস্ত্র বিক্রির হার। যখন অস্ত্র বিক্রির হার বাড়ে, তখন সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে- আমাদের প্রিয় এই পৃথিবী শান্তির পথে হাঁটছে না। বিশ্ব নেতাদের দম্ভ ও যুদ্ধংদেহী মনোভাবের প্রভাব আমাদের এই অঞ্চলেও লক্ষ্য করছি। বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ন্যায়, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বদলে আমরা লক্ষ্য করছি দমন-পীড়ন ও শক্তি প্রয়োগের অমানবিক প্রবণতা। আসলে ভুল নেতৃত্বের কারণে পুরো মানব সভ্যতায় এখন পতিত হয়েছে এক মহাসংকটে। ফলে মানুষের খাদ্য, পানি ও পরিবেশ সংকট দূর হচ্ছেনা। উপরন্তু উগ্রতা, আগ্রাসন ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বিশ^কে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। এমন বাস্তবতায় নতুন সভ্যতার অপেক্ষায় আছে পুরো মানবজাতি। কিন্তু সে পথে নেতৃত্ব দেবে কে?

উন্নত ও মানবিক বিশ্ব পরিগঠনে অস্ত্রের তেমন কোনো প্রয়োজন নেই। তারপরও বর্তমান সভ্যতায় অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়েই চলেছে। সভ্যতার শাসকদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভ্রান্ত নেতৃত্বের কারণেই বিশ্ব আজ এমন সংকটে পড়েছে। আর এই বিষয়টিও আজ স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে, যারা অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে বাড়িয়ে তোলেন তারা কখনো বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবেন না। অস্ত্র উৎপাদনের মত ভারীশিল্পের ভার বহনে সব দেশ সক্ষম নয়। বড় বড় দেশগুলোই এ শিল্পে বিপুল বিনিয়োগ করে থাকে। বিপুল বিনিয়োগের অস্ত্র গুদামে পড়ে থাকলে তো তাদের বড় ক্ষতি। আর নতুন উৎপাদন সংরক্ষণের জন্যতো গুদাম খালি করা প্রয়োজন। তাই গুদাম খালি করতে হলে তাদের প্রয়োজন যুদ্ধ। ফলে তাদের তৈরি করতে হয় যুদ্ধক্ষেত্র। 

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই আমরা সেই যুদ্ধক্ষেত্রগুলো লক্ষ্য করলাম ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়াসহ আরো কিছু দেশে। প্রসঙ্গত এখানে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর অভিযানের কথা উল্লেখ করা যায়। আফগানিস্তান থেকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সেনা প্রত্যাহার করেছে প্রায় ৩০ বছর আগে। কিন্তু তাদের যুদ্ধাভিযানের খেসারত আজও দিতে হচ্ছে আফগান জনগণকে। ওই যুদ্ধের সময় আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে মাইন পুঁতে রেখেছিল সোভিয়েত সৈন্যরা। সেই মাইনগুলোর কোনো কোনোটা আজও বিস্ফোরিত হয়। এতে প্রাণ হারায় মানুষ। আফগানিস্তানের বামিয়ান প্রদেশের কিছু পাহাড়কে এখনো ভয় পায় স্থানীয় বাসিন্দারা। বাঘ-ভাল্লুক কিংবা বিষাক্ত প্রাণীকে নয়, তাদের ভয় অভিস্ফোরিত মাইন ও বোমাকে। বামিয়ানের পাহাড়গুলো খুবই সুন্দর। চকলেট রঙের এসব পাহাড়ে তুষার পড়লে অভাবনীয় এক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। এছাড়া পাহাড়ের গায়ে জন্ম নেওয়া গাছে পাওয়া যায় সুস্বাদু ফলও। ওই ফল সংগ্রহে গত ১৭ মে এক পাহাড়ে গিয়েছিল ১৪ বছরের মুজতাবাসহ তিনবন্ধু। কিন্তু ফল নিয়ে ওদের আর ফেরা হয়নি। মাইনের বিস্ফোরণে নিহত হয় তিনজনই। অথচ মুজতাবার মতো অনেক শিশুরই জানা নেই সোভিয়েত হামলার কথা। মুজতাবার বাবা গোলাম মাহাইউদ্দিন বলেন, পাহাড়ে আমি আমার ছেলের মাথা এবং বুকের কিছু অংশ পেয়েছিলাম। তিনি আরো জানান, সোভিয়েত বাহিনী বোমাগুলো ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের দিকে ফেলেছিল। তারা মাইন ও পুঁতে রেখেছিল পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায়। সেই যুদ্ধের কথা স্পষ্ট মনে আছে মাহাইউদ্দিনের। সে সময় তিনি মুজাহিদীন যোদ্ধাদের জন্য চা নিয়ে যেতেন ওই পাহাড়ে। 

সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার পর পাহাড়গুলোয় পুঁতে রাখা মাইন উদ্ধারে কাজ করেছিল ডেনিশ ডিমাইনিং গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযান শেষে বামিয়ানের পাহাড়গুলোকে তারা ঝুঁকি মুক্তও ঘোষণা করেছিল। কিন্তু তারপরও প্রায়ই পাহাড়গুলোতে বোমা ও পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। আাফগান সরকারের তথ্য অনুসারে আফগানযুদ্ধের সময় সোভিয়েত বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন ও অবিস্ফোরিত বোমার আঘাতে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৩৯১ জনের প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের অর্ধেকেরও বেশি শিশু। এমন চিত্র কি আমাদের এ কথা বলে দেয় না যে, উন্নত ও মানবিক বিশ^ পরিগঠনে যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন নেই? তাহলে সময়রাস্ত্রের এত প্রতিযোগিতা কেন?

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ