ঢাকা, মঙ্গলবার 24 December 2019, ৯ পৌষ ১৪২৬, ২৬ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

হারিয়ে গেছে ডজনখানেক নদী 

এইচ এম আব্দুর রহিম: মাইকেল মধু সুদনের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদ এখন মৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃত প্রায়। ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় দেশের কপোতাক্ষ নদসহ ডজন খানেক নদী মরে গেছে। কপোতাক্ষ নদে এক সময় ছিল প্রবল স্রোত। নৌকা লঞ্চ ষ্টিমার চলাচল করত। এখানকার মাঝিরা পাল তুলে ভাটিয়ালী গান ধরত, এখন তা স্বপ্ন। যশোর থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে। এই কপোতাক্ষ নদীর তীরে বটগাছের নীচে বসে মাইকেল মধুসুদন দত্ত সাহিত্য চর্চা করতেন। এছাড়া প্রায় ডজন খানেক নদী মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে। ফলে এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতির উপর।

 নদীর পানি প্রবাহের উপর বাংলাদেশের জম্ম, নদী বিপন্ন হলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়। নদী হারানোর সর্বনাশ ১-২ বছরে, ১-২ দশকে বুঝা যায় না। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের জিডিপি যে কয়েক গুন বেড়েছে তার হিসাব আমাদের কাছে আছে; নদী কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশে প্রাণ এই নদী নালার কতটা জীবনহানি ও জীবন ক্ষয় হয়েছে, এর ক্ষতির পরিসংখ্যান গত হিসাব আমাদের কাছে নেই। বাংলাদেশের নদীগুলো যেভাবে খুন হচ্ছে, কারণ হিসাবে ভাগ করলে এর পিছনে তিনটি উৎস শনাক্ত করা যায়। এগুলো হলো-প্রথম, ভারতের অন্যায় একতরফা আগ্রাসী তৎপরতা। দ্বিতীয় বাংলাদেশের নদী বিদ্বেষ উন্নয়ন কৌশল এবং তৃতীয়ত দেশের নদী দখলদারদের সাথে পুলিশ প্রশাসনসহ রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসাজস। ভারত বাংলাদেশের অভিন্ন নদী ৫৪টি । এগুলোর সাথে সর্ম্পকিত ছোট নদী, শাখা নদীর সংখ্যা ছিল সহস্রাধিক। এখন ও দুই শতাধিক নদী কোন রকম বেঁচে আছে। কংক্রিট কেন্দ্রিক তথাকথিত ‘উন্নয়নের বড় শিকার বাংলাদেশের নদী-নালা’। বাংলাদেশ অংশে নদীর বিপন্নতা ঘটেছে ভারত তুলনায় অনেক বেশী । একতরফা আক্রমণে বাংলাদেশের ছোট নদী এখন এক একটি মৃতদেহ কিংবা মুমুর্ষু। কার্যত বাংলাদেশের বৃহৎ চার নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, এখন বিপর্যস্ত  এবং আরো আক্রমণের মুখে। ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ভারতের নদী বিধ্বংসী উন্নয়ন যাত্রা গত চার দশকে বাংলাদেশের বৃহৎ নদী পদ্মা ও এ সম্পর্কিত অসংখ্য ছোট নদী, খাল-বিলকে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত করেছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর উল্লেখযোগ্য অংশ শুকিয়ে গেছে। ভারসাম্যহীন পানি প্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চলের কৃষি। সেচের জন্য চাপ বাড়ছে ভূগর্ভস্ত পানির উপর, যা দীর্ঘ মেয়াদে আর ও জটিল পরিবেশগত সংকট তৈরী করছে। শুধু তাই নয়  পদ্মা নদীর এই ক্ষয় তার সঙ্গে সংযুক্ত নদীগুলোকে দুর্বল করেছে, যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে সুন্দরবন পর্যন্ত। সুন্দরবনের কাছে নদীর প্রবাহ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় লবণাক্ততা বেড়েছে তাতে ক্ষয় হচ্ছে পানি নির্ভর বনের জীবন । ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশ নয় পশ্চিমবঙ্গের আশে পাশে পড়েছে। একদিকে পানি শুন্যতা, অন্যদিকে অসময়ের বন্যা এবং অতিরিক্ত পলি। সম্প্রতি বিহারের মানুষ শাবল নিয়ে মিছিল করেছে ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেয়ার দাবীতে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও এই বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার দাবী জানিয়েছেন। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতাও ভারতের বাঁধ কেন্দ্রিক উন্নয়ন ব্যবসায়ী তাদের পৃষ্ঠপোষক বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠিকে থামাতে পারেনি। তাছাড়া ভারতের শাসকদের চিন্তা পদ্ধতিতে ভাটিরদেশ বাংলাদেশের অধিকার বিষয় একবারে অনুপস্থিত। মনিপুরে টিপাইমুখ বাঁধের প্রস্তুতি পুরোটাই চলেছে একতরফাভাবে। এখন ও এর হুমকি চলে যায়নি। এই বাঁধ বাংলাদেশের আরেক বৃহৎ বড় নদী মেঘনার জন্য যে বড় হুমকি হবে তা বাংলাদেশ ভারতের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকে বলে আসছেন। ম্যাপ দেখলে দেখা যায়, ভারত থেকে বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত নদীগুলোর উপর বিভিন্ন স্থানে কাটার মত বাঁধ। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রে ও তাই ঘটছে। ভাটির দেশকে না জানিয়ে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে যেভাবে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে, তা স্পষ্টই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। গ্রীষ্মে তাই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির অভাবে খাঁ খাঁ করে। তিস্তার পানি প্রবাহ এখন দশ শতাংশ নেমে এসেছে। ফারাক্কা ও গজলডোবা ছাড়া ও মনু নদীতে নল কাথা বাঁধ, যশোরের কোদলা নদীর উপর বাঁধ, খোয়াই নদীর উপর চামখা ঘাচ বাঁধ, বাংলা বান্দা মহানন্দা নদীর উপর মহারাণী বাঁধ, এবং মুহুরি নদীর উপর কালসি বাঁধসহ আর ও ১৫-২০টি বাঁধ কার্যকর রয়েছে। এখানেই শেষ নয়। ভারত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পৃথিবীর বৃহৎ নদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে । এই প্রকল্প অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার পানি ১৪টি খননকৃত খালের মাধ্যমে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের দিকে প্রবাহিত করা হবে। এটি কার্যকর হলে অন্যান্য নদীর সঙ্গে বাংলাদেশের আর একটি বৃহৎ নদী যমুনা আক্রান্ত হবে। শুকিয়ে যাবে নদী উপনদী। দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের নদ নদী খাল অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে পানি প্রবাহের উপর পঞ্চাশ দশক হতে ধারাবাহিক হিসেবে আক্রমণ এসেছে। উন্নয়ন নামক বিভিন্ন প্রকল্পের সুবাদে। এই প্রকল্প করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থার। ঋণের টাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ বাঁধসহ নির্মাণমুখী কর্মসূচি হিসেবে। দেখা গেছে এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলে ও এক পর্যায়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ হয়নি, সেচ সুবিধা কাজ করেনি এবং মূল লক্ষ্য খাদ্য উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধ কেন্দ্রিক উন্নয়ন বা নির্মাণ কাজ বিদেশি ঋণের টাকায় হয়। ফলাফল যাই হোক, ঋণদাতা, কনসালট্যান্ট, ঠিকাদার, আমলা এবং ভূমি দস্যুদের লাভ অনেক। এর অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এখানে শুধু একটা দৃষ্টান্ত দেই । বড়াল নদী বাংলাদেশের দুই প্রধান নদী পদ্মা এবং যমুনার সংযোগ নদী। দৈর্ঘ্য প্রায় ২০৪ কিলোমিটার, ১২০ মিটার প্রস্থ এর অববাহিকা ৭৭২ বর্গকিলোমিটার। এরই সঙ্গে চলন বিল। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এর মুখে স্লুইজ গেট, ক্রসড্যাম, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। অন্য প্রকল্পগুলোর মতো এটিও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, নৌপথ সম্প্রসারণ লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রথম তিন বছর ভাল উৎপাদন দেখা যায়। এর পর শুরু হয় বিপর্যয়। ফারাক্কার কারণে পদ্মার প্রবাহ কম ছিল। উপরন্তু বড়াল নদীর মুখে স্লুইজ গেট বসানোর কারণে পদ্মা থেকে আসা পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ¯্রােত কমে যায় জলাবদ্ধতা দেখা যায়। যমুনা যেখানে বড়াল গিয়ে মেশে, সেখানে পানি প্রবাহ নি¤œ স্তরে নেমে যাওয়ায় যমুনা নদী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভাঙ্গন  বিস্তৃত হয়। অববাহিকায় প্রায় এক কোটি লোকের জীবন ও জীবিকা এখন হুমকির মুখে। বড়াল শুকিয়ে যে জমি উঠেছে, তা এখন নানা জনের দখলে। তৃতীয়ত বিভিন্ন নদীর মরন দশা হলে ক্ষমতাবান ব্যক্তি গোষ্ঠির লাভ। দুর্বল হয়ে গেলে জমি ক্রমাগত জীতে রূপান্তরিত লাভ করে। তখন তা দখল করা সহজ হয় । নদী বাঁচলে তার  মূল্য টাকার অঙ্কে পরিমাণ করা যায় না। কিন্তু তার থেকে উঠে আসা জমির পরিমাণ শত হাজার কোটি হয়ে যায়। ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় নদী  একটি আর একটির সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের ২৫ শতাংশ জনগোষ্ঠির যোগাযোগের মাধ্যম নৌপথ। স্বাধীনতার পর বিআইডব্লিউটি এ যে জরিপ করে, তাতে বাংলাদেশের নদী পথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ দেশের মোট আয়তনের ৭ শতাংশ। শুষ্ক মওসুমে তা আরো নীচে নেমে আসে। ইতিমধ্যে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী পথ হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে ১৩টি নদী। আর ও সাতটি নদী মৃতপ্রায়। এসব নদী দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহকে সচল করে রাখে। নদী পথে মালামাল বহন ও লোকজন চলাচল কমে গেছে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৯৭৫ সালে যেখানে দেশের মোট পরিবহন ক্ষেত্রে নৌ পথে যাত্রী পরিবহন ১৬ শতাংশ ও মালামাল পরিবহন ৩৭ শতাংশ ২০০৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮ ও ১৬ শতাংশ। সড়ক পথের তুলনায় নৌ পথে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও ঝুঁকি অনেক কম। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০০০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নৌপথে ৩২৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ২৪৫৫ জন যাত্রী। গড়ে প্রতি বছর ১৬৪ জন মারা গেছে । সড়ক পথে প্রতি বছর গড়ে ৪০০০ জন মারা যায়, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে আর ও বেশী। গত চার দশকে ভারতের নদী বিধ্বংসী উন্নয়ন যাত্রা এদশের বৃহৎ নদী পদ্মা ও এ সর্ম্পকিত অসংখ্য ছোট নদী,খাল বিল কে বিপর্যয় করেছে। পদ্মা নদী শুকিয়ে গেছে। এদিকে বর্ষা মওসুমে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় উপকূলীয় বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছে  বর্তমানে উপকূলীয় বাঁধগুলো এত জরাজীর্ণ যে এসব এলাকার কোটি কোটি মানুষ চরম আতংক উদ্বেগ উৎকন্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। শুধু সাতক্ষীরা, খুলনা উপকূলীয় এলাকায় সাড়ে ৮শত কিলোমিটার ওয়াপদা বাঁধ জরাজীর্ন হয়ে পড়েছে। যে কোন মুহূর্তে এসব বাঁধ ভেঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে। জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। ১৯৬৯ সালে বঙ্গোপসাগরের তরঙ্গমালা হতে রক্ষা করার জন্য মূলত: এসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এসব বাঁধের স্থায়িত্ব ধরা হয় বিশ বছর। কিন্তু ৪০ বছর উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পর ও যথাযথভাবে এসব বাঁধ সংস্কার করা হয়নি। ফলে বিশাল বিস্তৃত এলাকা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। ১৯৮৮ সালের ২৯ শে নভেম্বর হারিকেন ঝড়, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডর, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলায় উপকূলীয় এলাকা লন্ড ভন্ড হয়ে যায়। প্রায় ৩শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে, হাজার হাজার বসতবাড়ি নদীর সাথে বিলীন হয়ে যায়। এর পর থেকে উপকূলীয় বাঁধ জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। এসব বাঁধগুলো সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। এদিকে বহু নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক সঙ্কটের দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরের নদী পথ না থাকায় বর্ষা মওসুমে পানি নিষ্কাশন করা যাচ্ছে না। ফলে হাজার বিঘা জমি বর্ষা মওসুমে অনাবাদী থাকছে। চীনের হোহাংহো নদীকে চীনের দু:খ বলা হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলো থেকে পানি নিষ্কাশন করতে না পারায় দেশের নদী দেশবাসীর দু:খের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মওসুমে লোকালয় রক্ষা করার জন্য যে সব বাঁধ ইতিপূর্বে নির্মাণ করা হয়েছিল তা এখন সংস্কার করা দরকার নইলে জানমালের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ