ঢাকা, মঙ্গলবার 24 December 2019, ৯ পৌষ ১৪২৬, ২৬ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

নৈতিকতার অবক্ষয় থেকে উত্তরণের উপায়

আখতার হামিদ খান: আমরা সম্ভবত আমাদের নৈতিক বিপর্যয়ের চরম সীমায় অবস্থান করছি; নৈতিক মূল্যবোধের অভাবে দিন দিন সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। তুচ্ছ ঘটনা বা সামান্য স্বার্থের জন্য কত মানুষকে জীবন পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। নৈতিক বা অনৈতিক যেভাবেই হোক, আমরা নিজের স্বার্থ হাসিল করতে মরিয়া।

দৈনন্দিন জীবনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় দিন দিন বেড়েই চলছে; যার লাগাম না টানলে জাতিকে চরম মাশুল দিতে হতে পারে। এখনই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে জাতি হিসেবে আমরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাব।

যে দেশে দিনের আলোয় জনসম্মুক্ষে একজন স্ত্রীর সামনে তার স্বামীকে হত্যা করা হয়, সে দেশের মানুষের নৈতিকতা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা আমরা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছি। আমরা বিশ্বজিৎ হত্যা দেখেছি, দিনের আলোয় জনসম্মুখে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাকে।

প্রতিনিয়ত আমাদের দেশের মা-বোনরা; এমনকি শিশুরা পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এসব কিছুই আমাদের নৈতিকতা বিপর্যয়ের চরম অবক্ষয়ের ফলাফল।

সম্ভবত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা ও পারিবারিক শিক্ষাব্যবস্থার গলদের কারণে আমাদের নৈতিকতার আজ এ বিপর্যয় ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। আমাদের দেশের পিতামাতারা সন্তানকে মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করে থাকেন; কিন্তু সে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে কিনা তার চেষ্টা আমরা কতটুকু করি?

আমরা শুধু সন্তানদের জিপিএ-৫ পাওয়ার পেছনে ছুটে বেড়াই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়, পাঠ্যসূচিতে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত বিষয় খুব কমই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা সন্তানদের শিশু বয়স থেকেই এত এত বইয়ের ভারে নুইয়ে ফেলি, ফলে তারা মেধাবী হয় ঠিকই; কিন্তু একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠে না।

নৈতিকতা বিপর্যয়ের ভয়াবহ এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? উত্তর হতে পারে, এ ক্ষেত্রে আমরা জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারি। জাপানিরা নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুশৃঙ্খল অমায়িক চরিত্রের অধিকারী একটি জাতি হিসেবে পরিচিত।

কিন্তু যে জাতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত অন্যতম খারাপ একটি জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল; তারা আজ এত ভদ্র, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন এবং সুশৃঙ্খল জাতি কেন? এ পরিবর্তন জাপানিরা হাজার বছর ধরে লালন করে আসেনি; মূলত এ পরিবর্তন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নির্মমতা আর মানবতা জাপানিদের চেয়ে আর বেশি কেউ উপলব্ধি করতে পারেনি; কেননা মানবজাতির ইতিহাসে প্রথম ও দ্বিতীয় পারমাণবিক নিউক্লিয়ার বোমার আঘাত যে শুধু তাদেরই সইতে হয়েছে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে ১৯৪৫ সালে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ও দ্বিতীয় পারমাণবিক হামলার শিকার হয় জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এ ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ‘যুদ্ধ নয় শান্তি’ এ আদর্শ সামনে রেখে তারা দেশ গড়ায় মনোযোগ দেয়।

এবার আসি জাপানিরা কেন এত ভদ্র, শান্তিপ্রিয়, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুশৃঙ্খল জাতি। এককথায় এ প্রশ্নের উত্তর হল- জাপানের আছে অবিশ্বাস্য একটি সুন্দর শিক্ষাব্যবস্থা; যা তাদের ভদ্র, শান্তিপ্রিয়, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুশৃঙ্খল একটি জাতিতে পরিণত করেছে।

জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে নৈতিক শিক্ষা। তাদের বিশ্বাস, আগে নীতি-নৈতিকতা, পরে পাঠ্য শিক্ষা। জাপানে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত অর্থাৎ চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত কোনো ধরনের পুঁথিগত বিষয়ে পরীক্ষা না নিয়ে শিশুদের শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক বিকাশের দিকেই বিশেষভাবে নজরদারি করা হয়।

স্কুল জীবনের প্রথম তিন বছর মেধা যাচাইয়ের জন্য নয়; বরং ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম ও ন্যায়পরায়ণতা শেখানো হয়। জাপানিরা নম্রতা, ভদ্রতা বা নীতি-নৈতিকতায় পৃথিবী খ্যাত। শুধু বয়সে বড় হওয়া নয়, বরং মনুষ্যত্বের বৈশিষ্ট্য তাদের চরিত্রে যেন প্রতিফলিত হয় এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে; এ সময় শুধু এ প্রয়াসই চালানো হয়।

স্কুলকে জীবনযুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার স্থান হিসেবে না দেখিয়ে জীবনকে সুন্দর করার একটি মিলনস্থান হিসেবে প্রদর্শন করার চেষ্টা করছে জাপান সরকার। ধারণাটি নিতান্তই সহজ-সরল হলেও এ বিষয়টির কারণেই জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা সব থেকে আলাদা এবং ভালোও বটে।

জাপানে শিশুদের স্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি আদব-কায়দা শেখানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়ে থাকে। গুরুজনদের সম্মান করা, মানুষের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেয়া, সবাই মিলে কাজ করা ইত্যাদি শিক্ষা একদম ছেলেবেলায় জাপানিদের মনে গেঁথে দেয়া হয়।

স্কুলে ভর্তির পর থেকে প্রথম চার বছর পর্যন্ত শিশুদের তাদের দোষ-গুণের মানদণ্ডে বিচার করা হয় না। তাদের মধ্যে কে ভালো বা কে খারাপ সে বিচার না করে বরং কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল সে শিক্ষা দেয়া হয়।

এর পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা উচিত বা কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় ইত্যাদি নীতিগত শিক্ষা প্রদানের ওপর জোর দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, পাশাপাশি প্রকৃতির মধ্যে পশুপাখির সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়- সেই শিক্ষাও ছাত্রছাত্রীরা স্কুল থেকেই পায়। তাছাড়া শিশুরা যাতে খুব অল্প বয়স থেকে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে, তার জন্য জামাকাপড় পরা, নিজে হাতে খাবার খাওয়া, নিজের জিনিস নিজেই গুছিয়ে রাখার মতো ছোট ছোট কাজ হাতে ধরে শিখিয়ে দেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার সর্বশেষ জাপান সফর শেষে তিনি ‘বাংলাদেশকে জাপান বানাব’ এ আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এ আশাবাদ অনুযায়ী বাংলাদেশকে জাপান বানাতে হলে প্রথমেই আমাদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা অর্জন করতে হবে।

আর এ শিক্ষা আমরা জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতার আলোকেই গ্রহণ করতে পারি। কাজেই পরিবার ও স্কুলজীবনের প্রথম থেকেই শুরু হোক নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা অর্জন। শিক্ষার লক্ষ্য হোক সত্যিকারের মানুষ হওয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ