ঢাকা, মঙ্গলবার 24 December 2019, ৯ পৌষ ১৪২৬, ২৬ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

মুসলিম নারী প্রতিভা যুগে যুগে

মনসুর আহমদ: মুসলিম খেলাফত অবসানের সাথে সাথে মুসলিম নারী সমাজ যেন হেরেমে বন্ধী হল। এর পর থেকে মুসলিম জাহানে সমাজ- সংস্কৃতি- শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের পদচারণা যেন স্তব্দ হয়ে গেল। এে ছাড়াও মুসলিম নারীদে ইতিহাস -ঐতিহ্য এত কম আলোচিত হয়েছে যে, আজকের নবীন বংশধরেরা মনে করতে পারছে না যে, তাদের পূর্ববর্তী মায়েরা ছিলন অতি উচ্চ স্তরের মহিলা-শুধু ধর্মীয় জীবনেই নয়, সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তাদের ছিল উজ্জ্বল ঈর্ষণীয় ভূমিকা।এই ইতিহাস ও গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য সম্পর্কে অনবহিত থাকার কারণে আমাদের বর্তমান মা বোনেরা নারী অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে যে সব কথা বার্তা বলেন তার মধ্যে একটি আত্মসমর্পিত মনোভাব ফুটে ওঠে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে পশ্চিমা জগতে নারী অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া সঞ্জাত চেতনা জাগ্রত হয়েছে তার ঢেউয়ে আধুনিক মুসলিম নারী সমাজও যেন তলিয়ে যাচ্ছে। আজ তারা তাদের অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য ভুলে গিয়ে যেন অপরাধীর কাঠ গড়ায় দাঁড়িয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে স্বস্তি অনুসন্ধান করছে। ব্যাপারটি এ রকম হওয়ার কথা ছিল না। যখন গোটা বিশ্বের নারী সমাজ ছিল পিছিয়ে, তখন ইসলাম নারী সমাজকে সামনে এগিয়ে দিয়েছিল, যার পরিণতিতে তারা জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছিল একটি বিশ্ববিজয়ী জাতি। 

প্রথমেই স্মরণ করা যাক ইসলামের প্রাথমিক কালের কথা। হজরত মুহাম্মাদ (স.)-এর জীবদ্দশায় ও তাঁর ওফাত পরবর্তী অধ্যায়ে হজরত আয়েশা (রা.) ও হজরত ফাতেমার (রা.) যে অদম্য সাহসিকতা নিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার খেদমত করেছেন তা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। হাদিস, ফিকাহ এবং ইলমে তাফসীরের ক্ষেত্রে হজরত আয়েশা (রা.)-এর অবদান বিশ্বে আলেম সমাজ শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে। 

হজরত আয়েশা (রা.) তাঁর ৬৫ বৎসর জীবদ্দশায় ২২১০টি হাদিস বর্ণনা করেন। তিনিন একাধারে ছিলেন সমসাময়িক যুগের অন্যতমা ফকীহা, আলিমা ও বিশেষ মর্যদার অধিকারিনী। অসংখ্য হাদিস বর্ণনাসহ যুদ্ধের বিবরণ দানে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুনিপুনা। কবিতা আবৃতি ও রচনায়ও তাঁর দক্ষতা ছিল অতি চমৎকার। অসংখ্য সাহাবা ও তাবেয়ী তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। উরওয়া ইেবনে যুবায়ের ও কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ (ভাগিনাদ্বয়) তাঁর থেকে বেশি রেওয়ায়েত করেছেন। 

অন্যান্য উম্মুল মুমিনীনগণও বেশ হাদিস রেওয়ায়েত করেছেন। উম্মুল মুমিনীন হজরত উম্মে সালমা ৩৭৮টি, হজরত হাফসাহ ৬০টি, উম্মে হাবিবাহ ৬৫টি, হজরত মাইমুনাহ ৪৬টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়াও হজরত উম্মে হানী ৪৬টি, হজরত আসমা বিনতে আবু বকর ৫৬ টিও উম্মে আতিয়াহ ৪১টি হাদিস রেওয়ায়েত করেন। 

ড. মুহাম্মাদ জুবায়ের সিদ্দিকী বলেন, মুসলিম ইতিহাসের প্রত্যেকটি যুগ পর্যায়ে পুরুষ সহযাত্রী মুসলিমদের পাশাপাশি বহু প্রখ্যাত কীর্তিমান মুসলিম রমনী রেওয়ায়েতকার হিসেবে বিদ্যমান ছিলেন।” 

এ প্রসঙ্গে আমরা দেখতে পাই পুরুষ মুফাসসির দের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চ শিক্ষিতা নারী ছিলেন উম্মে আল দারদা, যাকে হাসান আল বসরী ও ইবনে শিরিন-এর চেয়েও উচ্চ মর্যাদায় আসীন করে ছিলেন মুসলিম বিদ্যানুরাগীগণ। এ ছাড়াও হাদিস শাস্ত্রে দেখা যায় আমরা নামীয় বিদূষী নারীকে। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মদীনার মহামান্য বিচারক আবুবকর ইবনে হাজম। এ মহিলার পা-িত্যে বিমোহিত হয়ে খুলিফা ওমর ইবনে আবদুলল আজিজ ‘আমরা’ কে আদেশ দিয়ে ছিলেন তাঁর সংগ্রহীত সমস্ত হাদিস লিপি বদ্ধ করতে।

হাদিস শাস্ত্রে জয়নাব বিনতে সুলায়মান ছিলেন আর এক উজ্জ্বল নাক্ষত্র। কারিমা আল মারওয়াজিয়া সহীহ আল বোখারীর সবচেয়ে নির্ভর যোগ্য টীকাকার হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। হেরাতের আলেমগণ তাঁর ছাত্রদেরকে সহীহ আল বোখারীর জ্ঞানার্জন করার জন্য কারিমার দ্বারস্থ হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আল খতিব আল বাগদাদী তাঁর ছাত্র ছিলেন। 

উমাইয়া যুগে নারীরা সামাজিক স্বাধীনতা ভোগ করত। “হজরত ইমাম হুসাইনের কন্যা সাঈদা সখিনা, তালহার কন্য আয়েশা, মক্কার খার্কা এবং ওয়ালিদের মহিসী উম্মুল বানীন ছিলেন ঐ যুগের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ও প্রতিভা সম্পন্ন মহিলা। খলিফা মুয়াবিয়ার কন্যা আতিকা এবং আবদুল মালিকের স্ত্রী আতিকা খলিফাদের উপরে প্রচুর প্রভাব খাটাতেন। আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও নারীগণ পশ্চাদপদ ছিলেন না। এ যুগের তাপসী রাবেয়া সাধ্বী ও সাধিকা রূপে আজও মুসলিম জগতে পরিকীর্তিত হচ্ছেন। এ ছাড়াও ঐ যুগের বহু আরব নারী কবিতা রচনা ও আবৃত্তির জন্য খ্যাতি অর্জন করেন।” 

উমাইয়া পরবর্তী আব্বাসীয় যুগে পুরুষের সঙ্গে নারীরাও শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন। বিশেষত সঙ্গীত বিদ্যায় তারা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে ছিলেন। এ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদূষী নারী ছিলেন উবাইদা, শাইখা, শুহদা, যাইনাব, উম্মুল মুয়াইদ। রাজনীতির ক্ষেত্রে হারুণ আর-রশীদের মাতা খাইজুরান এবং মহিয়সী জুবাইদা এবং মামুনের স্ত্রী বুরান আব্বাসীয় যুগের শ্রেষ্ঠ গৌরব স্বরূপ ছিলেন। খলিফা হারুণ আর-রশীদের যোগ্য সহধর্মিনী যুবাইদা ফোরাত হতে মক্কা পর্যন্ত একটি নহর খনন করেন, যা ‘নহরে জোবায়দা’ নামে আজও মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। 

হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ নগরী বিধ্বস্ত হওয়ার পরেও মোঙ্গলগণ সেখানে অনেক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। হালাকু খানের জননী বোখারাতে দুইটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ গুলির প্রতেকটিতে দৈনিক ১০০০ ছাত্র অধ্যয়ন করত। মধ্য এশিয়ার তৈমুর লঙের স্ত্রী একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন। 

তৈমুরের বংশধর মোগলদের হেরেমে অনেক সাহসিনী বিদূষী নারী বর্তমান ছিলেন। সম্রাট বাবরের কন্যা গুলবদন ছিলেন এক উঁচু স্তরের কবি। তিনি বাবর ও হুমাযুনের উপরে রচনা করেন ‘হুমায়ুন নামা’। হুমায়ুনের বোনের কন্য শাহজাদী সেলিমা ছিলেন মোগল হেরেমের অন্যতম উল্লেখ যোগ্য বিদূষী রমনী। ঐতিহাসিক বদায়ুনী সেলিমা বেগমকে একজন জ্ঞানী পণ্ডিত ও কবি হিসেবে উল্লেখ করেন। সেলিমা বেগম কবিতায় ছদ্ম নাম ব্যবহার করতেন। তাঁর কলমী নাম ছিল মখ্ফী। এ ছাড়া নূরজাহান, মমতাজ বেগম ও জাহানারার নাম জানে না এমন লোক খুব কম পাওয়া যাবে। মোগল পরিবারের সবচাইতে বিখ্যাত ছিলেন জেবুন্নেসা। আওরঙ্গজেবের কন্য বেগম জেবুন্নেসা ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত কবি। শাহজাদী জেবুন্নেসাও ‘মখফী’ ছদ্ম নামে লিখতেন। তাঁর কবিতা সংগ্রহ ‘দেওয়ানে মখফী’ ফারসী সাহিত্যের এক বিরাট সম্পদ।

মোগল বংশের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। তাঁর স্ত্রী জিনাত মহল। এই বীর নারীর প্রেরণায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল এ দেশের সিপাহী জনতা। জিনাত মহল শেষ চেষ্টা করেছিলেন মোগল শাসন বাঁচিয়ে রাখতে, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। যার শেষ পরিণতিতে বার্মার মাটিতে মিশে যেতে হল হল মোগল সম্রাজ্ঞী জিনাত মহলকে।

রাজনীতির অঙ্গনে মুসলিম মহিলাদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। চাঁদ সুলতানা ও সুলতানা রিজিয়ার নাম রাজনীতির ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে থাকবে।

ফারসী সাহিত্যে মুসলিম নারীদের রয়েছে বিশেষ অবদান। ‘আদিবুল মামালিক’ ফারহানী বিশ শতকের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা কবি। শুধু কাব্য জগতে নয়, নারী স্বাধীনতা ও নারী অধিকার সম্পর্কে তিনি বেশ সংখ্যক প্রবন্ধও রচনা করেন। এ জন্য তাঁকে ‘আদিবাতুজ জামান’ (কালের গৌরব) আখ্যায় ভূষিত করা হয়। 

বিংশ শতাব্দীর আর একজন বিখ্যাত কবি পারভীন ইতেশামী। ইতেমশামী ছিলেন নারী প্রগতিতে বিশ্বাসী। ‘দিওয়ান’ নামে তাঁর একটি কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ছয় হাজার চরণের কবিতা রয়েছে। 

ইসলামী জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে আধুনিক নারী সমাজ বেশ সচেতন। পশ্চিমা জগতের মরিয়ম জামিলা এ ক্ষেত্রে এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন ধর্মান্তরিত নও মুসলিম। পশ্চিমা জগত ছেড়ে তিনি পাকিস্তানের স্থায়ী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর বিখ্যাত বই ‘ইসলাম এ্যা- মডার্নিজম’ ইসলামী চিন্তার জগতে এক বিরাট আন্দোলন সৃষ্টি করেছে।

বিশ্ব ইসলামী আন্দেলনে মহিলা সমাজ পিছিয়ে নেই। ইসলামী আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা মিশরের জয়নাব আল গাজারী। তিনি ছিলেন মুসলিম সংগঠনের নেত্রী। তাঁ উপরে মিশরের জেলখানায় যে শারীরিক নির্যাতন চালান হয় তা ভাষায় অবর্ণনীয়। সেই লোম হর্ষক কাহিনী নিয়ে তিনি রচনা করেছেন ‘কারাগারে রাত দিন’।

তিনি ট্রাইবুন্যালের সামনে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে বলেনঃ আমার উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়ার কী প্রযোজন আছে? যদি আমার প্রাণ নিতে চাও, তা সব সময় দিতে প্রস্তুত। তাঁতে দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। এই মহীয়সী নারী অনেক রুহানী সন্তান রেখে পরপারে চলে গেছেন। 

এ ছাড়াও এ প্রসঙ্গে নাম করতে হয় সাইয়েদ কুতুবের বোন হামিদা কুতুবকে। তাঁকে তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। অন্য আর এক বোন আমিনা কুতুবকে জেল খানায় নির্যাতন করা হয় এবং সেখানেই তিনি শাহাদত বরণ করেন। এ ছাড়াও বিপ্লবী নারী হিসেবে তুরস্কের হালিমা এদিব হানুম মুসলিম নারী সমাজের গৌরব। 

অসংখ্য নারী প্রতিভাদের মধ্য হতে মাত্র কয়েক জনের নাম সংক্ষেপে উল্লেখ করা হল। আমাদের দেশে গৌরবোজ্জ্বল নারীদের মথ্যে জানারা আজহারী, হাফেজা আসমা ও শামসুন্নাহর নিজামীর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য।

এখানে যে সব নারী চরিত্র উল্লেখ করা হল তারা সবাই ছিলেন ইসলামী বিধি বিধানের গভীর অনুসারী। আজ যে সব মা বোনেরা পৃথিবীতে দেশে দেশে ইসলামকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে দেখতে চান, তাদের উচিত এসব মহিলাদের জীবনাদর্শ সামনে রখে নির্ভীক ভাবে সামনে এগিয়ে চলা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ