ঢাকা, শুক্রবার 7 February 2020, ২৪ মাঘ ১৪২৬, ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বিদেশিদের চাকরি ও টাকা পাচার

বাংলাদেশে বিদেশিদের অবৈধভাবে চাকরি এবং টাকা পাচার করা প্রসঙ্গে অনেক উপলক্ষেই জানানো হয়েছে। গণমাধ্যমে এ সম্পর্কিত রিপোর্টও কম হয়নি। কিন্তু তথ্য-প্রমাণসহ রিপোর্ট প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়া সত্ত্বেও সরকারকে কখনো তৎপর হতে দেখা যায়নি। সরকারের এই প্রশ্নসাপেক্ষ নীরবতার সুযোগ নিয়ে বিদেশিরা শুধু অবৈধভাবে চাকরিই করছে না, প্রাপ্ত বেতনের সিংহভাগ তারা পাচারও করে দিচ্ছে। বেতনের বিপরীতে কর ফাঁকি দেয়ার ব্যাপারেও তারা রেকর্ড করে চলেছে। 

গত বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশÑ টিআইবির প্রকাশিত গবেষণা রিপোর্টে বিদেশিদের সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য জানানো হয়েছে, যেগুলো শুধু আশংকাজনক নয়, জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ভীতিকরও। ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত বিভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে টিআইবির পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে যে বিদেশিরা চাকরি করছে তাদের প্রায় সকলেই এসেছে ভ্রমণ ভিসায়। তিন মাস পরপর তারা ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য নিজেদের দেশে গিয়ে থাকে। সেখান থেকে নতুন ভিসা নিয়ে তারা বাংলাদেশে ফিরে আসে এবং আবারও চাকরি শুরু করে। অনেকে এমনকি ভিসার মেয়াদ না বাড়িয়েও চাকরিতে থেকে যায়। 

কিন্তু ভ্রমণ ভিসায় আগতদের জন্য চাকরি করা নিষিদ্ধ থাকলেও সে বিষয়ে সরকার যেমন কোনো ব্যবস্থা নেয় না, তেমনি ব্যবস্থা নেয়া হয় না তাদের বিরুদ্ধেওÑ যারা ভিসার মেয়াদ না বাড়িয়েও চাকরি করে। ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, আইনানুযায়ী একই ব্যক্তি বছরের পর বছর ধরে তিন মাসের ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে বসবাস ও চাকরি করতে পারে না। কিন্তু সব জানা থাকা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো একজন বিদেশির ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এমন অবস্থার সুযোগ নিয়েই ভ্রমণ ভিসায় আগত বিদেশিরা বাংলাদেশে বসবাস যেমন করছে তেমনি করছে চাকরিও।

টিআইবির গবেষণায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে এসেছে বিদেশিদের টাকা পাচারের তথ্য। হিসেব করে দেখা গেছে, প্রাপ্ত বেতন-ভাতার অর্থ থেকে বিদেশিরা বছরে প্রায় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা তাদের দেশে পাচার করে থাকে। তাছাড়া উপার্জিত বেতন-ভাতার বিপরীতে সরকারকে তারা কোনো করও দেয় না। যে স্বল্পসংখ্যক বিদেশি আয়কর রিটার্ন দাখিল করে তাদেরও অধিকাংশ নিজেদের বেতন-ভাতা অনেক কম, এমনকি চার ভাগের একভাগ দেখিয়ে থাকে। এভাবে সরকার বছরে বঞ্চিত হচ্ছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে। 

উল্লেখ্য, বিদেশিদের নিয়ে টিআইবিই প্রথম গবেষণা করেনি। অতীতের বিভিন্ন সময়ে অন্য কিছু সংস্থা এবং গণমাধ্যমের পক্ষ থেকেও জরিপ চালানো এবং গবেষণা করা হয়েছে। প্রতিটি রিপোর্টেই বিদেশিদের টাকা পাচার এবং কর ফাঁকি দেয়া সম্পর্কিত তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু কোনো উপলক্ষেই সরকারকে তৎপর হতে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। ফলে অবসান ঘটেনি বিদেশিদের অপতৎপরতারও। 

এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ বোর্ড, বেপজা ও এনজিও ব্যুরোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও জাতীয় স্বার্থে যথাযথ ভূমিকা পালনে অবহেলা করছে বলেই বিদেশিরা যথেচ্ছভাবে চাকরি করার এবং অবৈধ পন্থায় টাকা পাঠিয়ে দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে জানানো দরকার, বাংলাদেশে অবৈধভাবে চাকরিতে নিয়োজিতদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে ভারতীয়রাই অনেক বেশি। প্রসঙ্গক্রমে খোদ ভারতেরই সরকারি হিসাবের উল্লেখ করা যায়। মাত্র বছর দেড়েক আগের এই তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশ বর্তমানে দেশটির রেমিট্যান্স আয়ের চতুর্থ প্রধান উৎস। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত রেমিট্যান্স গিয়েছিল তিন দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সালে এসে সে রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। বর্তমানে এর পরিমাণ যে আরো অনেক বেড়ে গেছে সে বিষয়ে সংশয় নেই অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞদের। বলা দরকার, ভারত বিষয়টিকে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স বলতে চাইলেও এর বড় অংশই পাচার হয়ে গেছে ভারতীয়দের অবৈধ আয় থেকে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতীয়সহ বিদেশিদের টাকা পাচারের যে তথ্য টিআইবির গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে  তা সকল বিচারেই অগ্রহণযোগ্য। কারণ, দেশের ভেতরে ৬০ লক্ষাধিক শিক্ষিত বেকার থাকা সত্ত্বেও সরকারের প্রশ্রয়ে বিদেশিরা অবৈধভাবে চাকরি করার এবং টাকা পাচার করার সুযোগ পেয়েছে। সে সুযোগের তারা সদ্ব্যবহারও করছে সর্বতোভাবে। এজন্য দায়ী আসলে বিনিয়োগ বোর্ড। ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করা থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসা নবায়ন করা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে একমাত্র কর্তৃপক্ষ হলেও প্রশ্নসাপেক্ষ কিছু বিশেষ কারণে বিনিয়োগ বোর্ডকে বিদেশিদের, বিশেষ করে ভারতীয়দের ব্যাপারে রহস্যজনক ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয়রা এমনকি ভিসা নবায়ন না করেও বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে চাকরি ও ব্যবসা করে থাকে। তারা সরকারের অনুমতি ছাড়াই নিজেদের ইচ্ছামতো চাকরি ও ব্যবসা বদল করে। এ ধরনের ভারতীয়দের সংখ্যাও কয়েক লাখ।

আমরা মনে করি, ভারতীয়সহ বিদেশিদের অবৈধ চাকরি ও বসবাসের বিরুদ্ধে সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে তৎপর হওয়া এবং কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া চাকরিরত সকল বিদেশিকে দেশ থেকে বহিষ্কার তো করতে হবেই, একই সঙ্গে  টাকা পাচার বন্ধ করার লক্ষ্যেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা মনে করি, বিদেশিদের চাকরি ও টাকা পাচার বন্ধ করা গেলে দেশে বেকার সমস্যাও অনেকাংশে কমে যাবে। চাকরি পাবে বেকাররা। সেই সাথে পাচার হতে থাকা বিপুল অর্থের সদ্ব্যবহার করা গেলে উন্নয়ন কর্মকান্ডকেও সাবলীলভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। সুতরাং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া দরকার বিদেশিদের ব্যাপারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ