ঢাকা, বুধবার 12 February 2020, ২৯ মাঘ ১৪২৬, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

মিডিয়া চ্যালেঞ্জ এবং আমাদের সাংস্কৃতিক গন্তব্য

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

একসময় মিডিয়া ছিল ডাকযোগাযোগ এবং বিনোদন সংস্কৃতি ছিল পার্বনিক উৎসবের মতো। চিঠি লেনদেনও ছিল সীমিত পরিসরে এবং বিনোদন সংস্কৃতিও ছিল আনুষ্ঠানিক। রাজা বাদশাহদের জলসা ঘরে সঙ্গীত নৃত্যের আয়োজন থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে এসব ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিল। বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন লোকজ অনুষ্ঠানই ছিল সাধারণ মানুষের বিনোদনের খোরাক। কিন্তু বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতায় বিনোদনের পুরো বাক্স এখন সকলের ঘরে ঘরেই শুধু নয়, মোবাইল ও ইন্টারনেট টেকনোলজীর মাধ্যমে সকলের হাতের তালুবদ্ধ হয়ে পড়েছে গোটা যোগাযোগ মাধ্যম। ফলে আমাদের শিশুরাও এখন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ‘ইছড়েপাকা’ শব্দকে টেক্কা দিয়ে অবাক হবার মতো নানা রকম কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। এটা যতটা পজিটিভ ক্ষেত্রে দেখা যায় তার কোন অংশেই কম দেখা যাচ্ছে না নেগেটিভ সাইটেও। অন্যদিকে খেলার মাঠসহ ক্রীড়াবিনোদনের স্থান, সময় ও পরিবেশ সংকুচিত হবার ফলে আমাদের স্বপ্নের নতুন প্রজন্ম কম্পিউটার, ল্যাপটপ এবং ভিডিও গেমসকে নেশার মতো আঁকড়ে ধরেছে। ফলে শারিরিকভাবেও যেমন তারা অনেকটা দূর্বল হয়ে গড়ে উঠছে তেমনি চিন্তাগতভাবেও তাদের অন্যরকম একটা অবস্থান তৈরি হচ্ছে। কারণ তাদের ব্যবহৃত বিনোদন মাধ্যমগুলো আমাদের দেশজ এবং স্বকীয় কালচারের ভিত্তিতে তৈরি নয়। সুতরাং পরিবেশ পরিপ্রেক্ষিত এবং আশা-আকাঙ্খার সমন্বয় করতে চাইলে এখনই নতুনভাবে চিন্তা করার মোক্ষম সময়।

মিডিয়া বা গণমাধ্যম মানুষের জীবন প্রণালীতে ভিন্নমাত্রার মেরুকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজ সভ্যতার বিকাশ ও ব্যত্যয়েও এর ভূমিকা অপরিসীম। এটি মানুষকে যেমন গড়ার স্বপ্নে আন্দোলিত করে তেমনি ভাঙার মিছিলেও উত্তেজিত করে তোলে। নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় কিংবা মানবিক মৌল অধিকার নিশ্চিতকল্পে অন্যের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক ভূমিকা পালনেও আগ্রহী করে তোলে। ইতিহাসের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এর উজ্বল দৃষ্টান্ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পরে চিন্তাশীলদের মাঝে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও স্থাপনা সংরক্ষণের তাগিদ অনুভূত হয়। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় যে মানবিক বিপর্যয় চোখে পড়ে তার চেয়েও বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে সাংস্কৃতিক পরিম-লে। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় দীর্ঘ সাধনায় তৈরিকৃত ইতিহাস ঐতিহ্য আর সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ। তাইতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক স্থাপনা রক্ষার নিমিত্তে বিশ্বসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়াস চলে। বিখ্যাত রুশ লেখক ও শিল্পী নিকোলাই রোয়োরিখ এ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৩৫ সালের ১৫ এপ্রিল প্রায় কুড়িটিরও বেশি দেশের সাথে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত একটি দলিল সম্পাদিত করেছিলেন। এ দলিলের মূল লক্ষ্য ছিল শিল্প-সংস্কৃতি, বৈজ্ঞানিক সংস্থা ও ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজরিত বিষয়সমূহের সংরক্ষণ করা। এসব বিষয় নিদিষ্ট কোন প্রতিপক্ষের নয়, বরং আর্ন্তজাতিক সম্পদ মনে করে এসবকে সামরিক বিরোধের উর্ধ্বে রেখে সংরক্ষণের প্রয়াস চালাতে গুরুত্বারোপ করা হয়। ইতিহাসে এটাকে ‘রোয়োরিখ চুক্তি’ হিসেবে বিবেচিত করা হয়। এ চুক্তির ফলাফল খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও যুদ্ধকালীন সময়ে ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধারণ করা প্রতিষ্ঠানসমূহ কিছুটা নিরাপত্তা অনুভব করেছিল এ কথা বলাই যায়। মূলত সেই চুক্তির তারিখটিকে সামনে রেখে বিশ্বে বহু দেশে ১৫ এপ্রিল আন্তজার্তিক সাংস্কৃতিক দিবস উযযাপিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে জাতিসংঘ ২০০২ সাল থেকে ২১ মে ‘ওয়াল্ড ডে ফর কালচারাল ডাইভার্সিটি ফর ডায়ালগ এন্ড ডেভেলপমেন্ট’ বা ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র দিবস’ পালন করে আসছে। বিভিন্ন ক্ষয়িষ্ণু নৃগোষ্ঠির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখাই এ দিবসে পালনের মূল লক্ষ্য। সেইসাথে ২১ মার্চ উযযাপিত হয়ে আসছে ‘বিশ্ব পুতুলনাট্য দিবস’। ইসলামী সংস্কৃতি, শিল্প, ইতিহাস ঐতিহ্য, শান্তিসংলাপ, জ্ঞানচর্চা ও ইসলামী বিশ্বাসের আলোকে চলচ্চিত্র নির্মাণকে সামনে রেখে ১১ মার্চ উযযাপিত হচ্ছে ‘ইসলামী সংস্কৃতি দিবস’। দিবসটি ২০১০ সালে আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোর বিশিষ্ট লেখক জাবেদ মুহাম্মদ এ দিবসের সূচনা করেন।

জীবনের রঙই মুলত সংস্কৃতি। বিশ্বাস এর নিয়ামক শক্তি। আর কালকে ধারন করেই সাহিত্য-সংস্কৃতির পথচলা। যাত্রাপথেও রয়েছে খানিকটা বৈচিত্রময়তা। জীবনের প্রতিটি মোহনায় পরিপুর্ণ বিশ্বাস থাকলেই একজন মানুষ তার রুচিবোধকে বাক ঘুরানোর উপযোগী করে গড়ে তুলতে প্রয়াস চালাবে, আর যদি বিশ্বাসী না হয় কিংবা বিশ্বাসের মাত্রা যদি অন্যরকম হয় সে প্রভাবও রুচিবোধে পড়বে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বাস যত গভীর হবে তার আলোকেই তার রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যাবে। পরকালীন জবাব দিহিতা ও তার উত্তোরণের ব্যাপারে যদি নির্ভেজাল ও খাঁটি বিশ্বাস থাকে তবে সে তার রুচিবোধকে অন্যায় মুক্ত রাখতে অবশ্যই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হবে; এটা জীবনের একান্ত বিষয় থেকে শুরু করে সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি সংস্কৃতি, এমন কি আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী পর্যন্তও হোক না কেন। 

 

অধুনাবিশ্বে পারমানবিক যুদ্ধের চেয়ে সাংস্কৃতিক চিন্তার যুদ্ধ কোন অংশেই কম নয়; বরং পারমানবিক অস্ত্র মানুষকে দৈহিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে পক্ষান্তরে সংস্কৃতির অস্ত্র মানুষের চিন্তা, মনন এবং স্বপ্নগুলোর বিবর্তন ঘটিয়ে নৈতিক অবক্ষয়ের মাধ্যমে শেকড়কাটা কিংবা বনসাই বৃক্ষ বানিয়ে ক্ষুধা তৃষ্ণায় নিঃশেষ করে দেয়। আক্রান্ত মানবগোষ্ঠী বিশ্বাস আর প্রত্যয় নিয়ে সত্যিকার মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা তো দূরের কথা, বেড়ে ওঠার স্বপ্ন পর্যন্ত ভুলে যায়; আর এটা হঠাৎ মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রনাদায়ক।

তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। আধুনিকতা শব্দটি ‘ওয়েষ্টার্ণ কালচার’-এর ফ্যাশনে উত্তর আধুনিকতার নামে প্রকারান্তরে চিন্তা ও বাহ্যিকতায় পশ্চিমাবিশ্বের প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রচলিত হয়ে আসছে। আর তারই একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবেই আমরা নিজেদেরকে মানিয়ে নিচ্ছি; এমনকি পশ্চিমা সংস্কৃতির ধারক বাহক হিসেবে ভাবতে গর্ববোধ করছি। মুসলিম সংস্কৃতির মূলকথা ঈমান বা বিশ্বাস হলেও পশ্চিমাবিশ্ব সংস্কৃতি বলতে চিত্তবিনোদনের উপায়কেই উপস্থাপিত করছে। কেননা বিশ্বাসের ভীতে আঘাত করতে বাধা যতটা প্রকট হবে, চিত্তবিনোদনের নামে অশ্লিল গান, নৃত্য, নগ্নতা, উলঙ্গপনা প্রভৃতির নেশায় বাগিয়ে নেয়া ততটা কঠিন নয়। তাইতো মর্ডানিজম, সোশালিজম তথা আধুনিকতা ও সামাজিক আভিজাত্যের খোলসে যুবক-যুবতীর নগ্নতা, লিভটুগেদার, নারী দেহের উলঙ্গ প্রদর্শনী এসব নির্লজ্জতা ও রুচিহীনতাকে শিল্প সৌকর্যের নান্দনিক বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়ে থাকে। সে প্রেক্ষিতে খেলাধুলা থেকে শুরু করে যে কোন আনুষ্ঠানিকতায় যে যত নগ্নতা প্রদর্শন করতে সক্ষম সে তত অভিজাত, উন্নত, উত্তরাধুনিক ও মুক্ত সংস্কৃতির স্বার্থক শিল্পী হিসেবে বিবেচিত। নারীদেহের নগ্ন উপস্থাপনাকে আধুনিক শিল্পের নান্দনিকতার পূর্ণাঙ্গ রূপ হিসেবে কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধে, নাটকে, সিনেমায় কিংবা অন্য কোন বিনোদন অনুষ্ঠানে স্বার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সত্যিকার অর্থে নারী সৌন্দর্যকে নান্দনিকতার মোড়কে নগ্নচিত্রে উপস্থাপিত করে নৈতিক পদস্খলনকে বাহন বানিয়ে শয়তান মানব মনে ছড়িয়ে পড়ে ।

বিশ্বাস সব সময়ই পরিবর্তনশীল। তাই মনের সামনে বিভিন্ন চিত্র প্রদার্শিত হতে হতে যেটা হৃদয়গ্রাহী ও মনে ক্রিয়াশীল হবে সেটার প্রতিই সৃষ্টি হবে বিশ্বাস। আর বিশ্বাস সৃষ্টির প্রধান বাহন প্রচার বা মিডিয়া। যে জাতি সংবাদ ও তথ্য প্রযুক্তি তথা গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে যত উন্নত সে জাতির বিশ্বাস, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, সভ্যতা তথা জীবনযাত্রা ততটা সমৃদ্ধ এবং  সেই সমৃদ্ধ ইতিহাস ও আতœবিশ্বাসের উপর ভর করেই তারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। তাই মহানবীসহ (স.) মুসলমানগণ শুধুমাত্র ধর্মীয় বিষয়েই সচেতন ছিলেন না বরং রাজনীতি, সমাজ, দর্শন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সমরনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রেও তারা সচেতনতার সাথে সংবাদ ও তথ্য সংগ্রহ করেই পথ চলতেন। এমনকি চরম নির্যাতনের মধ্যে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পূর্বে মহানবী (স.) মদীনার সঠিক অবস্থা অবগত হবার জন্য বিশ্বস্ত সাহাবী হযরত মুসাবকে (রা.) প্রেরণ করেছিলেন। যে যুগে কাগজের প্রচলন না থাকলেও তথ্য সংরক্ষনের জন্য মহানবী (স.) ও সাহাবীগণ খুবই তৎপর ছিলেন এবং চামড়া, হাড়, গাছের ছাল, পাতা এমনকি পাথরে খোদাই করে তথ্য সংরক্ষণ করেছিলেন। সুতরাং বিজ্ঞানের এ চরম উৎকর্ষতা ও উত্তর আধুনিক কালে সেই মুসলিম জাতি সংবাদ ও তথ্য প্রযুক্তির অংগনে পিছিয়ে থাকবে তা কল্পনাও করা যায়না।

বাংলাদেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অভাব যতটা তার চেয়ে বেশি অভাব মূল্যবোধ সম্পন্ন সুনাগরিক। এ ধরনের নাগরিক তৈরি করতে পারলেই কাংখিত সোনালী স্বপ্নের সোনার দেশ গড়া সম্ভব। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশ স্বাধীনতার চারদশক পার করলেও এ পর্যন্ত শিক্ষা, সংস্কৃতি ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোন নীতিমালা প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়নি। বরং ক্রমশ ধর্মহীন শিক্ষা পদ্ধতি, নৈতিকতাহীন সংস্কৃতি এবং বল্গাহীন হলুদ সাংবাদিকতার নীতি আমাদের গ্রাস করে ফেলছে। সেইসাথে বিদেশী শব্দের চমকপ্রদ ব্যবহার আমাদের জনগোষ্ঠীকে অন্ধ বানিয়ে ফেলছে। বিদেশী পোষাক, বিদেশী পণ্য, বিদেশী সংস্কৃতি, বিদেশ নির্ভর তথ্যপ্রযুক্তি এমনকি নিজেকেও একজন বিদেশী ফ্যশনের মানুষ পরিচয় দিতে কেউ কেউ স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। মনে মগজে, শরীরে-দেহে, সমাজ-সংস্কৃতিতে, অর্থনীতি-রাজনীতিতে আমরা পুরোপুরি বিদেশী ফানুসের পেছনে ছুটতে পছন্দ করি।

ইসলাম প্রচারমাধ্যম বা মিডিয়াকে দাওয়াত বলে সম্মোধন করে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সে হিসেবে মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা ছিল মুসলমানদের হাতে। অথচ বিশ্বব্যাপী তথ্য প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক মিডিয়ার নিয়ন্ত্রন এখন পুরোদমে পাশ্চাত্য জগতের অমুসলিমদের হাতে। পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সংস্থা এসোসিয়েট প্রেস বা এপির সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত। ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল বা ইউ পি আই একটি মার্কিন বার্তাসংস্থা। রয়টারের ঠিকানা বৃটেন এবং এ এফ পির সদর দপ্তর ফ্রান্সে। এ চারটি বার্তা সংস্থাই বিশ্বের সংবাদ প্রবাহের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ ছাড়াও বিবিসি, সিএনএন, স্কাই নিউজসহ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সবগুলো কেন্দ্রই অমুসলিমদের দখলে। যে সব মানুষ উন্নয়নশীলবিশ্বে নিজেদের মতলব হাসিলের মত কাজ করতে করতে স্থানীয় জনগণের বোধ বিশ্বাস তথা স্বকীয় সংস্কৃতিবৃক্ষের শেকড়কাটার কাজ করছে এ সকল মিডিয়া তাদেরকে উদারপন্থী, মানবতাবাদী ও দেবতার আসনে আসীন করতে যথাসম্ভব সকল প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। পক্ষান্তরে উন্নয়নশীলবিশ্বে তথা বিশেষত মুসলিমবিশ্বে যখন প্রকৃত দেশ প্রেমিক ও স্বাধীনচেতা কোন দেশ বা দলের বিরুদ্ধে নির্যাতন চলে কিংবা কোন দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানগণ যখন নির্যাতিত হয় তখন তারা সে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকে কিংবা তাদের কর্মসূচী ও অবস্থাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে সালমান রুশদি, তসলিমা নাসরিন কিংবা দাউদ হায়দারের মতো মুসলিম নামধারী ব্যক্তিদের টাকার বিনিময়ে খরিদ করে যখন স্বজাতীয় মুসলমানদের বোধবিশ্বাসে আঘাত হানে তখন তারা এ কর্মকা-কে ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবধিকার বলে সমর্থন ও মদদ যোগায়। অবশ্য এটা তাদের দোষের কিছু নয়, কারণ তাদের মিডিয়া তাদের কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন তারা বিশ্বমানবতাবাদী হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে চায়, তখনই এ বেদনা বেশী অনুভূত হয়।

পক্ষান্তরে যারা জাতিসত্ত্বাকে বাঁচানোর তাকিদে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি তারাও ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ। ইসলামী মূল্যবোধের গান হলে তার গ-ি কতটুকু হবে? মিউজিক চলবে কিনা? চললে কেমন ধরনের মিউজিক ব্যবহার করা যাবে? নাটকে নারী চরিত্র চলবে কিনা? কবিতা ও সাহিত্যে প্রেম বিষয়ক কিছু বৈধ কিনা ইত্যাদি, ইত্যাদি প্রশ্ন। এতে কেউবা গানে মিউজিক, নাটকে নারী চরিত্র ও সাহিত্যে প্রেমকে অবৈধ ঘোষণা করছি, কেউবা মনে করি যে, আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে এগুলো ছাড়া সংস্কৃতি চর্চাই সম্ভব নয়। ফলে আজও আমরা জাতির সামনে সংস্কৃতির কোন মডেল দাঁড় করাতে পারিনি। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে তৈরী হয়েছে হাজারো ছিদ্রপথ, তাই সমকালীনবিশ্বেও প্রতিযোগিতামূলক আধুনিক জ্ঞান অর্জনের কোন বিকল্প নেই, সেটা হোক মিডিয়া কিংবা বিনোদন মিডিয়া। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে শরিয়াতের আধুনিক গবেষণা এখন সময়ের দাবী। ১৯২৬ সালে এক বক্তৃতাতে জ্ঞান অর্জনের উপর গুরুত্বারোপ করে ইকবাল বলেন, “যারা নিজেরা সংবাদপত্র পড়তে অপারগ তারা যেন অন্যদের কাছ থেকে শুনে নেয়, কেননা সমকালীন বিশ্বে যে সব জাতি কর্মতৎপর রয়েছে তাদের মধ্যে অধিকাংশ জাতিই মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে।’ 

আমরা যারা লিখছি, সংস্কৃতি চর্চায় যোগান দিচ্ছি তারা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে, আমরা কি লিখছি, কেন লিখছি? আমাদের মঞ্জিল কোথায়? কোনটাকে আমি সফলতা বলছি? বিজ্ঞানের এ উজ্বল সময়ে আমাদের প্রজন্মের জন্য কি রেখে যাচ্ছি? তাদের হাতের কাছে যা ঘুর ঘুর করছে আমার প্রয়াস কি তার চেয়ে স্বকীয় ও নৈতিক মানসম্পন্ন? অন্যরা যখন স্বকীয় সংস্কৃতি চর্চায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলছে তখন আমাদের বিশ্বাসের সংস্কৃতিচর্চার অবস্থান কোথায়? সব বিষয়ই এখন ভাবনার বিষয় বৈকি। তবে এ বিষয়ে হতাশাক্লিষ্ট না হয়ে বরং যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণই সময়ের দাবী।

‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত’ এ শ্লোগানকে মাথায় রেখে তাদের উপযোগী বিনোদন না দিতে পারলে ডোরেমন, মটুপাতলু, পাওয়ার রিঞ্জারসসহ অনৈকতাসম্পন্ন কার্টুনে তাদেরকে আবদ্ধ করে রাখবেই। মানসম্মত সিরিয়াল না দিতে পারলে ভারতীয় চ্যানেলের সিরিয়ালে আমাদের নারী সমাজকে আটকে রেখে ঐতিহ্যবাহী পরিবারতন্ত্রকে চিরতরে ভেঙ্গে খান খান করে দিবে। অন্যদিকে হিন্দি ও কাটপেষ্ট ফিল্মে আমাদের যুবসমাজকে যেমন ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে যাবে তেমনি ইন্টারনেটের অনৈতিক ওয়েবসাইটগুলো মুখিয়ে আছে যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয় তৈরির জন্যে। এমতাবস্থায় বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে মানসম্পন্ন ও আদর্শিক প্রক্রিয়ায় বিনোদনের সংস্কৃতির সঠিক ধারণা উপস্থাপন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার জন্য প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতিসংগঠনসমূহকে আরো সহযোগিতা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় অঞ্চলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবী। বিশেষকরে মিডিয়া অঙ্গনে লোক তৈরির জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা জরুরী। বিভাগীয় শহর ছাড়াও দেশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রসমূহে নিজস্ব বলয়ে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়তে উৎসাহিত করা। সুষ্ঠু পরিকল্পনার ভিত্তিতে জ্ঞানচর্চা আরো বৃদ্ধি করে যোগ্যতারভিত্তিতে জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে মজবুত সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিশ্বাসী ঘরানার মিডিয়া ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ