ঢাকা, বুধবার 12 February 2020, ২৯ মাঘ ১৪২৬, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

খাস চরবেলতৈল বালিকা বিদ্যালয়

খাস চর বেলতৈল বালিকা বিদ্যালয় (১৮৯২ সালে স্থাপিত) বর্তমানে চর বেলতৈল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

মুহম্মদ মতিউর রহমান:

ছায়া-ঢাকা, পাখি-ডাকা, সবুজে-শ্যামলে ঘেরা একটি গ্রাম-নাম চর বেলতৈল। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার অন্তঃর্গত। বাংলাদেশের আটষট্টি হাজার গ্রামের মধ্যে এটিও একটি। আলাদা তেমন কোন বৈচিত্র্য নেই। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত এ গ্রামটি ছবির মত সুন্দর, সবুজে-শ্যামলে অপরূপ, মধুময়। এ গ্রামের ছায়া-ঢাকা, খাল-নালা বেষ্টিত মায়াময় পরিবেশে ১৮৯২ সালে ‘খাস চরবেলতৈল বালিকা বিদ্যালয়’ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মুনশী জহিরউদ্দিন ও তদ্বীয় ভ্রাতা মুনশী ওয়াহেদ আলী। মুনশী ওয়াহেদ আলীর বাড়িতে চৌচালা টিনের ঘরে বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী চরবেলতৈল গ্রামের কৃতি সন্তান মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্য-রতœ। নজিবর রহমানের একমাত্র বোন নূরজাহান বেগম ছিলেন মুনশী জহিরউদ্দিনের স্ত্রী। 

চরবেলতৈল গ্রামের গৌরবময় ঐতিহ্যের লালনে যাঁর অবদান অনেকটা একক ও কিংবদন্তীতুল্য তিনি হলেন মুনশী ওয়াহেদ আলী পণ্ডিত। তিনি তাঁর বড় ভাই মুন্শী জহিরউদ্দীন পণ্ডিতের সহযোগিতায় ১৮৯২ সালে তাঁর বাড়ির আঙিনায় একটি বিশাল চৌচালা টিনের ঘরে ‘খাস চরবেলতৈল বালিকা বিদ্যালয়’ স্থাপন করেন। ১৮৯২Ñ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ষাট বছর তিনি উক্ত বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তদ্বীয় স্ত্রী রমিছা খাতুনও উক্ত বিদ্যালয়ে সুদীর্ঘকাল শিক্ষয়িত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করে ১৯৫২ সালে অবসর গ্রহণ করেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই স্ত্রীশিক্ষার প্রসারে সমগ্র জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। বিদ্যালয়টিতে একসময় অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাদান করা হতো। শিক্ষাদান পদ্ধতিও ছিল কিছুটা স্বতন্ত্র। বাংলার সাথে আরবিও পড়ানো হতো। আমপারা, কুরআন শরীফের সাথে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ পাঠ্য ছিল। ১৯৬৭ সালে গ্রামরে এক বৃদ্ধা রমণীর মুখে ‘মেঘনাদ বধ কাব্যে’র দীর্ঘ একটি অধ্যায়ের মুখস্ত আবৃত্তি শুনে আমি বিস্ময়-পুলকে অভিভূত হয়েছি। তিনি এ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। 

প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মুনশী ওয়াহেদ আলী বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ ৬০ বছর কাল অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৫২ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তদ্বীয় স্ত্রী মোসাম্মৎ রমিছা খাতুন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সহকারী শিক্ষয়ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করে ১৯৫২ সালে তিনিও অবসর গ্রহণ করেন।  

বাংলার নারী জাগরণ ও নারী শিক্ষার অগ্রদূত হিসাবে পরিচিত বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২) নারী শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে ১৯০৯ সালে ভাওয়ালপুরে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে অল্পদিন পর স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি পরবর্তীতে ১৯১২ সালে কলকাতায় উক্ত স্কুল পুনরায় চালু করেন। বাঙালি মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষা বিস্তারে এ প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া, বেগম রোকেয়া ১৯১৬ সালে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি মুসলিম নারী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদেরকে অধিকার-সচেতন ও জাগরণের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে তোলার প্রয়াস পান। সারা জীবন তিনি নারী উন্নয়নে গ্রন্থ রচনা, সভা-সমিতি গঠন, সামাজিক আন্দোলন ও নানাবিধ উপায়ে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। নারী জাগরণের ইতিহাসে তাই তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। 

তবে বেগম রোকেয়ার কর্ম-প্রচেষ্টা মূলত নগর-কেন্দ্রিক ছিল। সাধারণত সভ্যতা-সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশ প্রথমত নগরকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কিন্তু বেগম রোকেয়ার স্কুল প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পূর্বে বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১৮৯২ সালে ‘খাস চরবেলতৈল বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হলেও ইতিহাসে তার নাম নেই এবং এ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাগণ ও এর শিক্ষক-শিক্ষয়ত্রী মুনশী ওয়াহেদ আলী ও মোসাম্মৎ রমিছা খাতুন নারী শিক্ষা বিস্তারে যে অনন্য অবদান রেখে গেছেন, বাংলার শিক্ষিত মহল সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অপরিজ্ঞাতই রয়ে গেছে। অথচ আজ থেকে প্রায় ১২৮ বছর পূর্বে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি অজ পাড়াগাঁয়ে নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁরা যে ঐতিহাসিক গৌরবময় কীর্তি স্থাপন করে গেছেন, বাংলার নারী জাগরণের ইতিহাসে তার গুরুত্ব অপরিসীম।   

চরবেলতৈলের ইতিহাস-খ্যাত অমর কথাশিল্পী মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরতেœর সাথে মুনশী ওয়াহেদ আলীর খুব হৃদ্যতা ছিল। নিকট প্রতিবেশী এবং আত্মীয়তা ছাড়াও তাঁরা ছিলেন অভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। দু’জনেই সারা জীবন শিক্ষকতা করেছেন এবং শিক্ষার প্রসারে বিশেষত অনুন্নত মুসলিম সমাজের উন্নতিকল্পে শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার প্রসারে তাঁরা দু’জনেই সারা জীবন অতিশয় নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন। নজিবর রহমান বিভিন্ন স্থানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করলেও ছুটি উপলক্ষে প্রায়ই গ্রামের বাড়িতে আসতেন। সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামের কবি রজনীকান্ত সেনের (১৮৬৫-১৯১০) স্কুলে তিনি যখন প্রধানশিক্ষক ছিলেন, তখন কান্তকবির অনুরোধে তিনি কয়েক বছর সপরিবারে কবির বাড়িতে তাঁর জন্য নির্মিত বাসায় অবস্থান করেন। মুনশী ওয়াহেদ আলী সে সময় দশ/বার মাইল পথ হেঁটে ভাঙ্গাবাড়ি গিয়ে সাহিত্যরতেœর সঙ্গে দেখা করতেন এবং অনেক সময় বিভিন্ন জটিল বিষয় বিশেষত ‘মেঘনাথ বধ কাব্য’ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতেন। মুনশী ওয়াহেদ আলী গুরু ট্রেনিং (জি.টি) পাশ ছিলেন। এখনকার মত সেকালে তো কোন অভিধান বা সহায়ক গ্রন্থ ছিল না। তখন বহু শ্রম স্বীকার করে দূরবর্তী কোন বিশিষ্ট বিদ্বান ব্যক্তির নিকট গিয়ে এভাবে জ্ঞানার্জনের নিয়ম ছিল। তখন বিদ্যার্জন ছিল একটি দুরূহ কর্ম, বিদ্যাদান ছিল দুরূহতম। কঠিন পরিশ্রম আর একান্ত নিষ্ঠার দ্বারা শিক্ষকগণ তাঁদের দায়িত্ব পালন করতেন। 

নজিবর রহমান ছুটিতে প্রায়ই আসতেন চরবেলতৈল তাঁর বাড়ি তখা শ্বশুর বাড়িতেও। চরবেলতৈলে এলে তিনি যথারীতি বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করতেন এবং স্কুলের শিক্ষাদান ও অন্যান্য ব্যাপারে নানা মূল্যবান পরামর্শ দিতেন। চরবেলতৈল এবং তার আশে-পাশে অনেক উল্লেখযোগ্য স্থান, পরিবেশ ও ঘটনা তাঁর বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে স্থান লাভ করেছে। তিনি ছিলেন বাস্তব জীবনশিল্পী, এটা তারই পরিচয় বহন করে।

গ্রামের প্রায় সব মেয়েই বিদ্যালয়ে পড়তো। শিক্ষাদান ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক। মেয়েরা সকাল বেলা নাস্তা খেয়ে আসতো, দুপুরে খাবার জন্য ছুটি পেত। দুপুরের খাবার ও জোহরের নামাযের পর আবার ক্লাস শুরু হতো। আছরের নামায পড়ে সকলে বিদায় নিত। বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য একটি শান বাঁধা বড় ইন্দারা (পাকা কূপ) তৈরী করে দেয়া হয়। কূপ থেকে পানি তুলে ছাত্রীরা পান করতো, অজু করতো। সেকালে ঐ কূপের পানি পাড়ার সকল বাসিন্দা পানীয় হিসাবে ব্যবহার করতো। তৎকালে সিরাজগঞ্জ মহকুমার নামকরা সাব ডিভিশনাল অফিসার (এস.ডি.ও) আইসিএস কর্মকর্তা জনাব ইসহাক অত্র বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে সেখানে বয়স্কদের শিক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বিদ্যালয়ের জন্য তিনি একটি হ্যাজাক লাইট দান করেন। এছাড়া, থানা শিক্ষা অফিসার, মহকুমা শিক্ষা অফিসার, জেলা শিক্ষা অফিসার, বিভাগীয় শিক্ষা অফিসারগণও নিয়মিতভাবে স্কুল পরিদর্শনে আসতেন এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করতেন।   

একসময় দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্য তালিকাভুক্ত ‘পাবনা জেলার সংক্ষিপ্ত ভূগোল’ বইটির প্রণেতা ছিলেন শাহজাদপুর উপজেলার অন্তর্গত তালগাছি গ্রামের আব্দুল মজিদ মিঞা। তাতে পাবনা জেলার প্রসিদ্ধ স্থানগুলোর বর্ণনায় এক জায়গায় উল্লেখ ছিলÑ ‘চর বেলতৈল গ্রাম স্ত্রীশিক্ষার জন্য বিখ্যাত’। প্রবাদ বাক্যের মত এলাকায় আর একটি কথা প্রচলিত ছিলÑ ‘যদি শিক্ষিতা কণে পেতে চাও, চরবেলতৈল গ্রামে চলে যাও’। ‘পাবনা জেলার সংক্ষিপ্ত ভূগোল’ বইতে এ প্রবাদ বাক্যটি এক নিভৃত, অনন্য গৌরব ও বৈশিষ্ট্যেদীপ্ত চরবেলতৈল গ্রামের গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস শুধু চরবেলতৈল গ্রামে সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। কথায় বলে, ‘আকাশে চাঁদ উঠলে সর্বত্র তার আলো ছড়িয়ে পড়ে।’ চরবেলতৈল গ্রাম নারী শিক্ষার আলোয় উদ্দীপ্ত হওয়ার সাথে সাথে পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও সে আলোর দীপ্তি ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ে। 

ওয়াহেদ আলী-দম্পতি শুধু নিজেদের স্কুল নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন না। বিদ্যালয় থেকে যেসব ছাত্রী পাশ করে বিয়ের পর স্বামী-গৃহে যেত, তাদের অনেকের মাধ্যমেই তাদের স্বামীর গ্রামে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনে তাঁরা সাহায্য করতেন, উৎসাহ দিতেন। এভাবে এলাকার বিভিন্ন গ্রামে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনে তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদান রেখেছেন। এরূপ একটি বিদ্যালয়ের উল্লেখ করা যায়। চরবেলতৈল গ্রাম থেকে প্রায় ১৫/১৬ মাইল দূরে কামারখন্দ থানার তামাই গ্রামে মুনশী জহিরউদ্দিনের কন্যা আফলাতুন খাতুনের চেষ্টায় এ স্কুলটি গড়ে ওঠে। তাঁর স্বামী খোন্দকার ছবদর আলীর বাড়িতে এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করে তিনি এখানে আজীবন শিক্ষকতা করেন। আফলাতুন খাতুন ওরফে জামিলা খাতুন পাকিস্তান আমলে প্রেসিডেন্ট আউয়ুব খাঁর সময়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষয়িত্রী হিসাবে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ পুরস্কার ও  গোল্ড মেডেল লাভ করেন। এটা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চরবেলতৈল গ্রামেরই এক অনন্য গৌরব। খাস চরবেলতৈল বালিকা বিদালয়ে পড়াশুনা করে অনেক মেয়ে বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ির পরিবেশকেও নানাভাবে আলোকিত করে তোলেন। এরকম বহু উদাহরণ আছে। এখানে মাত্র তিনটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি। 

গ্রামের পশ্চিম পাড়ার মুন্শী বদরুদ্দিনের এক বোন, যিনি এ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন, তিনি ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ পুরোটা মুখস্ত বলতে পারতেন। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর পরিবারকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছিলেন। চরবেলতৈল গ্রামের মনসুরউদ্দিন সরকারের এক বোনের বিয়ে হয়েছিল কামারখন্দে। তাঁর স্বামী ছিলেন একজন দ্বীনদার আলেম। তাঁর ছেলেরাও সবাই কুরআনে হাফেজ ও আলেমে দ্বীন ছিলেন। এ দ্বীনদার, সজ্জন, অভিজাত পরিবার এলাকায় দ্বীনি শিক্ষা প্রচারে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। চরবেলতৈল গ্রামের বজলর রহমানের বড় মেয়ে জাহানারা বেগম ছিলেন বিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী। তাঁর বিয়ে হয়েছিল সলপ গ্রামে ফজলুর  রহমান চৌধুরীর সঙ্গে। ফজলুর রহমানের ভাই একসময়কার খ্যাতনামা কবি ওসমান চৌধুরী। ওসমান চৌধুরীর ছেলে ডক্টর জুলফিকার মতিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান। এলাকায় শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় এ অভিজাত ও স্বচ্ছল পরিবারটির যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। এভাবে খাস চর বেলতৈল বালিকা বিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রী বিয়ের পর নিজ নিজ এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একটি প্রদীপ থেকে কীভাবে সহস্র প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হয়, এটা তারই দৃষ্টান্ত।         

মুনশী ওয়াহেদ আলী মনে করতেন, একটি ছেলেকে শিক্ষিত করার অর্থ সমাজের একজন মানুষকে শিক্ষিত করা আর একজন মেয়েকে শিক্ষাদানের অর্থ একটি পরিবারকে শিক্ষিত করা। এ দর্শনে বিশ্বাসী হয়েই তিনি স্ত্রী-শিক্ষা প্রসারে অধিক উৎসাহী হয়ে সস্ত্রীক এ মহান পেশায় আজীবন গভীর নিষ্ঠার সাথে নিয়োজিত ছিলেন। সে কারণে গ্রামে কোন অশিক্ষিতা মেয়ে ছিল না বললেই চলে। কিন্তু এজন্য তাঁকে যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। পর্যাপ্ত অর্থকরী, ধন-সম্পত্তি তাঁর ছিল না। ধন-সম্পত্তির প্রতি তাঁর তেমন আগ্রহও ছিল না। তাঁর কাজ বা  ব্রত ছিল একটাই-স্ত্রী শিক্ষার প্রসার, যে কোন ভাবেই হোক, গ্রামের সব মেয়েকে শিক্ষিতা করে তোলা। সেকাজে তিনি সফল হয়েছিলেন। তাঁর এ কাজে পূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী মোসাম্মৎ রমিছা খাতুন। বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষকতা করা ছাড়াও তাঁরা উভয়েই প্রত্যুষে ফজর নামাজের পর নিজ বাড়িতে পাড়ার ছেলেমেয়েদেরকে প্রতিদিন কুরআন শিক্ষা দিতেন। এছাড়াও ওয়াহেদ আলী পন্ডিত নিজে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন। তিনি বিনামূল্যে পরিবার ও গ্রামবাসীদের অসুখ-বিসুখে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতেন।   

একটি নিভৃত গ্রামে এ কাজটি যে কত দুরূহ ছিল, তা কেবল ইতিহাস-জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিই উপলব্ধি করতে পারবেন। অপরিমেয় ত্যাগ, ধৈর্য ও নিরলস সাধনায় ওয়াহেদ আলী দম্পতি দুরূহ বাধার বিন্ধ্যাচল পেরিয়ে সুদীর্ঘ ষাট বছর পর্যন্ত একটি অশিক্ষিত-কুসংস্কারাচ্ছন্ন নিভৃত গ্রাম তথা এলাকায় শিক্ষার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করে রেখেছিলেন তা বাংলার সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে ক্ষুদ্র হলেও এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাসে এর গুরুত্ব মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। অনেক মহৎ ব্যক্তির কথা আমরা জানি, তাঁদের অবদানের কথাও আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে থাকি, কিন্তু এ শিক্ষাব্রতী দম্পতির কথা, যাঁরা তাঁদের সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারে, তাঁদের বিরল অবদানের কথা স্মরণ করার কোন ব্যবস্থাই নেই আমাদের সমাজে। সমাজে তাঁদের যথোপযুক্ত স্বীকৃতিদানেরও কোন ব্যবস্থা নেই। কথায় বলে, ‘যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না।’

গ্রামে স্ত্রী শিক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা করার পর ছেলেদের শিক্ষাদানের কাজও সম্পন্ন হয়। ওয়াহেদ আলী পন্ডিতের বাড়ির সামনে বিশাল চৌচালা টিনের ঘরটি ছিল ‘খাশ চরবেলতৈল বালিকা বিদ্যালয়’ আর তার পাশেই (পণ্ডিত জহিরউদ্দীন মুন্শীর বাড়ির সামনে) ছনের চৌচালা টিনের ঘরে তদ্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র আবু মুহাম্মদ গোলাম রাব্বানীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘চর বেলতৈল বালক  বিদ্যালয়’। সেখানে তিনি প্রধান শিক্ষক এবং তাঁর এক চাচাতো ভাই মুনশী শফিউদ্দিন (জহিরউদ্দীনের ছেলে) সহকারী শিক্ষক নিযুক্ত হন। স্কুলের ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরে তেলকূপি নিবাসী মজিবর রহমান তৃতীয় শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। আমি যখন ঐ স্কুলের ছাত্র, তখন এ তিনজনকে শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলাম। শফিউদ্দিনের অবসর গ্রহণের পর কাদাই বাদলার আব্দুল কাদের মাস্টার তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। 

বাড়ির উপর দু’টি স্কুলগৃহের স্থান সংকুলান না হওয়ায় ওয়াহেদ আলী ভ্রাতৃত্রয় ১৯৪৪ সালে স্কুলের জন্য জমি দান করেন। ১৯৫২ সালে বালিকা ও বালক বিদ্যালয় দু’টি একীভূত হয়ে নতুন নাম পরিগ্রহ করে ‘চর বেলতৈল প্রাইমারি স্কুল’। এ একীভূত স্কুলের প্রধানশিক্ষক হন আবু মুহম্মদ গোলাম রব্বানী। তখন তাঁর অন্যতম সহকারী ছিলেন, মুনশী পরিবারের হাজী মাহতাব উদ্দিনের জ্যেষ্ঠ পুত্র মোতাহার হোসেন। আবু মুহাম্মদ গোলাম রাব্বানী মোট তেত্রিশ বছর শিক্ষকতার দায়িত্ব অতি নিষ্ঠা ও সুনামের সাথে পালনের পর অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর অবসর গ্রহণের পর এ স্কুলের প্রধানশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন তদ্বীয় দ্বিতীয় পুত্র আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাক ফেরদৌসী। চর বেলতৈল গ্রামের ঐতিহ্যের সাথে এ বিদ্যালয়ের এক ঘনিষ্ঠ গৌরবময় স্মৃতি বিজড়িত। আর সে গৌরবময় স্মৃতির সাথে মুন্শী বাড়িটিও একসময় লোকমুখে ‘প-িত বাড়ি’ হিসাবে এলাকায় সুপরিচিত হয়ে ওঠে। 

বৃটিশ আমলে আমরা যখন বালক বিদ্যালয়ে পড়া শুরু করি তখন আমরা কলা পাতায় লিখতাম। সেকালে কাগজ ছিল খুব দু®প্রাপ্য। কলাপাতার কাগজ, নলখাগড়ার ডাল কেটে কলম আর চাল পুরিয়ে তা বেটে কালি বানিয়ে আমরা লেখার চর্চা করতাম। তখনো পাকিস্তান হয়নি। ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান হয় তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। ততদিনে অবশ্য আমরা শ্লেটে লেখা শুরু করেছি। বিদ্যালয়ে আমার সহপাঠীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ ইঞ্জিনিয়ার নওশের আলী, আব্দুল লতিফ জিন্নাহ বি.এ.বি.এড, মঈদুল ইসলাম (রাজশাহী বেতার কেন্দ্রের প্রাক্তন কর্মচারী), আব্দুর রাজ্জাক (ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রাক্তন কর্মচারী), মাওলানা আব্দুর রশিদ, গোলাম মোস্তফা, হাছান আলী প্রমুখ। 

বালক এবং বালিকা দু’টো বিদ্যালয়ের অবস্থান পাশাপাশি হলেও বয়সে এবং কৌলিন্যে বালিকা বিদ্যালয়টির মর্যাদা ছিল স্বভাবতই অনেক বেশি। থানা, মহকুমা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসতেন। সিরাজগঞ্জের এক সময়কার জাঁদরেল মহকুমা অফিসার জনাব ইসহাক, আই.সি.এস একবার বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসেছিলেন। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলায় শিক্ষা-বিস্তার ও সমাজসেবামূলক বহুবিধ কাজে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন। বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে গ্রামে নৈশ বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য তিনি একটি হ্যাজাক লাইট উপহার দিয়েছিলেন। বালিকা বিদ্যালয়ে তখন মুনশী ওয়াহেদ আলী ও তদ্বীয় জ্যৈষ্ঠ পুত্র আবু মুহম্মদ গোলাম রব্বানীর উদ্যোগে বয়স্কদের জন্য নৈশ বিদ্যালয় চালু হয়। সাধারণত বর্ষা মওকুমে বজ্রা নৌকায় করে সরকারি উচ্চ কর্মচারীগণ বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসতেন। একবার রাজশাহী বিভাগের তৎকালীন ইন্সপেক্ট্রেস অব স্কুল্স বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসেছিলেন। সে কী হুলস্থূল কা-। তিনি দীর্ঘক্ষণ স্কুল পরিদর্শন করে পরিদর্শন-খাতায় ইংরেজিতে চমৎকার মন্তব্য লিখেছিলেন। তাদের খাওয়া-দাওয়ার জন্য বিরাট আয়োজন করা হয়েছিল। আরো অনেক নামকরা ব্যক্তির মন্তব্যসহ উক্ত পরিদর্শন-খাতাটি দীর্ঘকাল পর্যন্ত বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ছিল। এরপর সে মূলবান খাতাটি কোথাও কীভাবে উধাও হয়ে যায়, জানি না। 

উন্নত শিক্ষা-ব্যবস্থার কারণে প্রাচীন কাল থেকেই গ্রামের অধিকাংশ নারী-পুরুষ শিক্ষিত, ভদ্র ও সংস্কৃতিবান হিসাবে পরিচিত। গ্রামের উচ্চ শিক্ষিত সব পুরুষই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত। এদের মধ্যে অনেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। মোটের উপর ‘শিক্ষা উন্নতির সোপান’-এ প্রবাদ বাক্যটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য।    

চর বেলতৈল গ্রামের উত্তর পাশে কাঁটাখালি বিলের ধারে বিশাল ঈদগাহ্ ময়দান। পার্শ্ববর্তী সাত গাঁয়ের লোক বছরে দু’ঈদের নামায এখানে একসঙ্গে আদায় করে। নামাজ শুরুর অনেক আগে থেকে বক্তৃতা শুরু হয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে যখনই বাড়িতে ঈদ করতে গেছি, তখনি এ মাঠে ঈদের জামাতে বক্তৃতা দিয়েছি। নামাযের পর সকলের সাথে কোলাকুলি করেছি। নামায শেষে গ্রামের শিক্ষিত যুবকেরা দল বেঁধে গ্রামের পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে পোলাও, কোর্মা, খিচুড়ি, ফিরনি খেয়েছি। ঈদের দিন বিকাল বেলা গ্রামের মাঠে নানারকমের খেলাধুলা ও শিশুদের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা হতো। বড়দের সালাম, সমবয়সীদের শুভেচ্ছা আর ছোটদের আদর করে, হৈচৈ করে কাটত ঈদের সারাটা দিন। সারা গ্রামে তখন ঈদের উৎসব। সে উৎসবে ধনী-গরীব সকলে শরীক হতো। কত আনন্দমুখর পরিবেশে সে ঈদের দিনগুলো সকলে মিলে একসাথে উদ্যাপন করেছি, তার ইয়ত্তা নেই। এখন আর বাড়িতে ঈদ করার সুযোগই হয় না। 

গ্রামের উত্তর পাশে ফসলের মাঠ। মাঠের পরে মুলকান্দি, বেলতৈল, গোপীনাথপুর গ্রাম এবং পশ্চিম পাশে কাদাই বাদলা ও চর কাদাই গ্রাম। বেলতৈলে একটি হাইস্কুল, ডাকঘর ও বাজার রয়েছে। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার সপ্তাহে দু’দিন এখানে হাট বসে। বেলতৈল হাইস্কুল তখন ছিল মধ্য ইংরাজি স্কুল। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের পাঠ শেষ করে তখন এখানে ভর্তি হতো অধিকাংশ ছেলেমেয়ে। এ প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্কুলে পড়াশোনা করেছেন বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরতœ, ‘পারস্য প্রতিভার প্রখ্যাত লেখক সু-সাহিত্যিক মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ প্রমুখ।  

বেলতৈলের পাশেই ঘোড়াশাল গ্রাম। এ গ্রামেই মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ্র জন্ম, যিনি শিক্ষা বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারী হিসাবে অবসর গ্রহণের পর বাংলা একাডেমীর যাত্রারম্ভে প্রথম স্পেশাল অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নামে তাঁর গ্রামের সন্নিকটে বেতকান্দি হাটখোলায় একটি কলেজ হয়েছেÑ নাম ‘মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ কলেজ’। কাদাই বাদলার একজন বিখ্যাত ব্যক্তি হলেন মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ। তিনি একাদিকক্রমে বিশ বছর বেলতৈল ইউনিয়নের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কাদাই বাদলা গ্রামের পাশে শ্রীফলতলা গ্রামে আর এক স্বনামখ্যাত চক্ষু-চিকিৎসক ডাক্তার এম. এ মতীনের জন্ম। তিনি একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশের প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রী থাকাকালে তিনি নিজ গ্রামে একটি হাসপাতাল ও মায়ের নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে তিনি সিরাজগঞ্জ শহরে একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ করেন। তাঁর স্ত্রীও একজন নামকরা ডাক্তার।  

নানাদিক দিয়ে চরবেলতৈলের এখন আরো অনেক উন্নতি হয়েছে। শিক্ষিতের হার বহু গুণে বেড়েছে। উচ্চ শিক্ষিতের হারও অনেক বেড়েছে। গ্রামের বহু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উচ্চ সরকারি কর্মচারী, অধ্যাপক এখন চর বেলতৈলের মুখ উজ্জ্বল করেছে।  বেশ কয়েকজন ইংল্যান্ড, আমেরিকায়ও উচ্চ শিক্ষা লাভ করেছে। গ্রামে রাস্তা-ঘাট হয়েছে। বেশ কয়েকটি ব্রীজ-কালভার্টসহ সড়ক নির্মিত হয়েছে। গ্রামের মসজিদটি দ্বিতল হয়েছে। পূর্ব পাড়ায় একটি মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং নজিবর রহমানের নামে পাঠাগার নির্মিত হয়েছে। পশ্চিম পাড়ায় আরো একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মেয়েদের হাইস্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, খেলার-মাঠ, ক্লাব ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। 

গ্রামের সামনে চরবেলতৈল মডেল স্কুলের পশ্চিম পাশে একটি জায়গা কিনে আমি আমার আব্বা-আম্মার নামে ‘আবু মুহম্মদ গোলাম রব্বানী ও মোসাম্মৎ আছুদা খাতুন হাফিজিয়া ফোরকানিয়া মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠা করেছি। মাদরাসা ভবনে ভবিষ্যতে একটি পাঠাগার ও দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। মাদরাসাকে কেন্দ্র করে এখন প্রতি বছর সেখানে বাৎসরিক মহফিল হয়। আমার চোখের সামনে বিগত আট দশক ধরে গ্রামের বিভিন্নমুখী উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করে আনন্দে প্রাণ ভরে ওঠে। কিন্তু এখনো যে অনেক কিছুই করার বাকী! গ্রামের শিক্ষিত ও বিত্তবানেরা ঐক্যবদ্ধভাবে পরিকল্পনা নিয়ে গ্রামোন্নয়নে আরও অনেক কিছু করার প্রয়োজন রয়েছে। এ লক্ষ্যে ২০১২ সালে আমি ঢাকায় চরবেলতৈল প্রবাসীদের নিয়ে একটি সভার আয়োজন করেছিলাম। আমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় আমার প্রস্তাবানুযায়ী উপস্থিত সকলের সম্মতিতে ‘ঢাকা প্রবাসী চরবেলতৈল গ্রাম সমিতি’ গঠিত হয়। আমার পরিকল্পনা ছিল সমিতির উদ্যেগে চরবেলতৈলে একটি কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে থাকবে একটি পাঠাগার, একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, গ্রামের বেকার তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের জন্য সেলাই শিক্ষা কেন্দ্র, কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার, বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প, খেলাধূলা, সভা-সমিতি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যবস্থা থাকবে। সভায় আমার পরিকল্পনা সবিস্তারে বর্ণনা করে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সে রূপরেখাও তুলে ধরেছিলাম। উপস্থিত সকলে তাতে গভীর আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদর্শন করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত শেষ পর্যন্ত আমার লালিত স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেছে। তবে জীবন-সায়াহ্নে আমি এ প্রত্যাশা করি যে, ভবিষ্যতে কেউ না কেউ হয়তো এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবেন। কোন মহৎ স্বপ্ন ও সৎ-প্রচেষ্টা কখনো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় না। 

গ্রামের শিক্ষিতজনদের অনেকেই দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এবং লন্ডন আমেরিকাসহ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রামের অনেকেই বাড়ি-ঘর করে সুখে-শান্তিতে জীবন-যাপন করছেন। তাদের সকলেরই শিকড় সংলগ্ন রয়েছে এ চরবেলতৈলের নিভৃত পল্লীর মাটিতে। মাটির টানে তারা নিশ্চয়ই সে স্মৃতি কখনো বিস্মৃত হবে না। শিকড়ের টানে জন্মভূমির প্রতি দায়িত্ব পালনে তারা এগিয়ে আসবেন বলে দৃঢ় বিশ্বাস।  

আমরা অনেকেই এখন আর গ্রামে থাকি না। তবু মাতৃস্নেহের মতই মায়াবী মুগ্ধতা আর অপত্য স্নেহের আকিঞ্চন নিয়ে গ্রামের স্মৃতি জেগে রয়েছে মনের মুকুরে। ইতঃমধ্যে দীর্ঘ বিশ বছর আমি বিদেশে প্রবাস-জীবন কাটানোর সময় প্রতি বছর বাৎসরিক ছুটি উপলক্ষে দেশে এলে অন্তত একদিনের জন্য হলেও গ্রামে গিয়েছি এক অদৃশ্য, অনিবার্য মায়ার টানে। আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের এক মুখর অধ্যায় অতিবাহিত হয়েছে এ নিভৃত, শ্যামলীম পল্লীর ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা, অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি, স্বপ্নময়, সবুজ-সুন্দর এ গ্রামটিতে। কালের আবর্তনে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে, পরিবর্ধন হয়েছে আমার গ্রামেরও, আমার নিজ বাড়িটি, যেখানে একসময় অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর কল-কোলাহলে মুখর থাকতো, আমার দাদা-দাদী, আব্বা-আম্মা, আমার নয় বোন, তিন ভাইয়ের আনন্দ-চঞ্চল পদচারণায় যে বাড়িটি ছিল সদা কল্লোলিত-মুখরিত, সে বাড়িটি আজ তার পুরানো ঐতিহ্য ও অবয়ব হারিয়েছে। 

তবু অতীতের স্মৃতিময়, মধুময়, চিত্র-বিচিত্র শৈশবের সে শ্যামল-সুন্দর গ্রামের মায়াময়, আনন্দ-চঞ্চল ছবিটি আমার মনের অতন্দ্র, স্বপ্নাচ্ছন্ন ভুবনকে সর্বদা আন্দোলিত করে। আমার পরম শ্রদ্ধেয় দাদা-দাদী-আব্বা-ভাইয়ের শ্রমে-ঘামে গড়া প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের গৌরবময় স্মৃতি আমার হৃদয়-মনকে গভীরভাবে আনন্দ-বেদনায় আপ্লুত-অভিভূত-আন্দোলিত করে নিরন্তর। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ