ঢাকা, শুক্রবার 14 February 2020,১ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

ফাল্গুনের আবহে রঙিন একুশের বই মেলা 

বুধবার রাতে বাংলা একাডেমির গ্রন্থ উন্মোচন প্রাঙ্গণে বিশিষ্ট ব্যাংকার গবেষক ও লেখক আবু রেজা মো. ইয়াহিয়ার লিখিত সুখ সাফল্যের মায়াবী জগৎ নামক গ্রন্থের মোকড় উন্মোচন করা হয় -সংগ্রাম

ইবরাহীম খলিল: পরনে বাসন্তী রঙের শাড়ি, খোঁপায় হলুদ গাঁদার মালা। এক হাতে বই, অন্য হাত বন্দী হলুদ পাঞ্জাবি পরা প্রিয় মানুষের হাতে। শীতের শেষ বিকেলে এমন সাজেই সেজেছিল গতকালের পুরো বইমেলা। গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল ফাগুন মাস শুরুর আগের দিন এবং মাঘ মাসের শেষ দিন। একদিন আগেই বই মেলায় পাওয়া গেল ফাল্গুনের আবহ। এদিন বিকেলে অমর একুশে বইমেলার দুয়ার খুলতেই প্রকৃতির রঙে নিজেদের সাজিয়ে নেওয়া পাঠক-দর্শনার্থীরা প্রবেশ করে মেলা চত্বরে। বসন্ত না এলেও তার আগমনী বার্তায় মেলায় লেগেছিল ফাল্গুনের রঙ। তাইতো মেলাজুড়ে যেদিকেই চোখ গেছে, শুধুই হলুদ আর বাসন্তী রঙের সমারোহ।

ধানমন্ডি থেকে সপরিবারে বই মেলায় আসা তানিয়া আফরিন ছোট্ট ছেলে-মেয়েসহ স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সেজেছিলেন বসন্তের রঙে। তিনি জানান, বই কেনার জন্য মেলায় আগেই এসেছি। বাচ্চাদেরও নিয়ে এসেছিলাম শিশুপ্রহরে। তবে শীতের শেষ আর বসন্ত শুরুর সন্ধ্যাটার স্বাক্ষী হতেই সবাই মিলে চলে এলাম ঘুরতে। শেষবেলা কিনে নেবো দুটো বই। গতদিন পুরো মেলা চত্বরজুড়েই ছিল এমন দৃশ্য। শীতের শুষ্কতাকে বিদায় করে, সজীবতার আহ্বান জানিয়ে বইপ্রেমীরা এসেছিলেন বইমেলায়। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় এদিন নবীন পাঠকরাই মুখর করে তোলেন মেলা প্রাঙ্গণ। বই কেনার পাশাপাশি আড্ডা-গল্পে মেতে ছিলেন সবাই। শীতের এ শেষ বিকেলে একটু ভিড়ই আশা করছিলেন প্রকাশকরা। তবে শুক্রবার শিশুপ্রহরে বেচা-কেনা বেশি হবে বলেই মনে করেন তারা। 

প্রিয়মুখ প্রকাশনীর প্রকাশক আহমেদ ফারুক বলেন, মেলা আস্তে আস্তে জমে উঠছে। বইয়ের বিক্রি বাড়ছে প্রতিদিনই। অন্যবার ভালোবাসা ও ফাল্গুন উৎসব আলাদা হতো বলে দুটো দিন পাঠকের ভিড় থাকতো বেশি। এবার একই দিনে হওয়ায় এবং ছুটির দিন হিসেবে শুক্রবার মেলা আরও বেশি জমে উঠবে বলে আশা করছি। বসন্তের আগমনী ছোঁয়া শুধু পাঠকের মাঝেই নয়, রাঙিয়ে তুলেছিল বইমেলার স্টলের বিক্রয়কর্মীদেরও। শুধু ভিড়ই ছিল না, ছিল প্রকাশকদের মুখে হাসি ফোটানোর মতো বিক্রিও। মেলার প্রায় প্রতিটি স্টলেই ছিল বইপ্রেমীদের ভিড়।

মেলার ১৩তম দিন আজ শুক্রবার। সপ্তাহ ঘুরে ফিরে এলো শিশুপ্রহর। শিশুপ্রহরে শিশুরা আসে মা-বাবার সঙ্গে আসে দলে দলে। সেইসাথে ছুটির দিন থাকায় বেড়ে যায় পাঠক ক্রেতাদের আগমন। বেড়ে যায় বিক্রি। মেলা চলবে সকাল ১০:০০টা থেকে রাত ৯:০০টা পর্যন্ত। এরমধ্যে সকাল ১১:০০টা থেকে বেলা ১:০০টা পর্যন্ত মেলায় থাকবে শিশু প্রহর। সকাল ১০:০০টায় শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। 

এদিকে গতকাল বিকেল ৪:০০টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সুব্রত বড়ুয়া রচিত বঙ্গবন্ধুর জীবনকথা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন বড়ুয়া। আলোচনায় অংশ নেন লুৎফর রহমান রিটন এবং মনি হায়দার। লেখকের বক্তব্য দেন সুব্রত বড়ুয়া। সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল এনডিসি।

প্রাবন্ধিক বলেন, আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শ দর্শন জানা এবং চর্চা করা। নতুন প্রজন্মের নবীন-তরুণদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যত আগ্রহ সৃষ্টি করা যাবে, তারা ততই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সোনার বাংলা গড়ার পক্ষে এটা হতে পারে অত্যন্ত জরুরি উদ্যোগ। সুব্রত বড়ুয়া রচিত বঙ্গবন্ধুর জীবনকথা গ্রন্থখানি কিছুটা হলেও আমাদের এগিয়ে দেবে সেই লক্ষ্যে। উক্তি-ভাষ্যে, আলোচনায় বঙ্গবন্ধুকে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে বিশ্বনেতার মানদণ্ডে। 

আলোচকরা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিশাল সমুদ্রের মতো যিনি তাঁর চেতনায় ধারণ করেছেন বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর জীবনকথা গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখক সুব্রত বড়–য়া বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামী জীবনকে ইতিহাস ও তথ্যের ভিত্তিতে তুলে আনার প্রয়াস পেয়েছেন। এককথায় বলা যায় সাবলীল ভাষায় লেখা বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম বিষয়ক এটি এক অনন্য গ্রন্থ। 

গ্রন্থের লেখক বলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবনকথা গ্রন্থটি লেখার পেছনে যে দুটি বিষয় আমার প্রেরণা হয়ে কাজ করেছে তা হলো বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। এ গ্রন্থে আমি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর জীবনকে ইতিহাস, সংগ্রাম ও কর্মের প্রেক্ষাপটে তুলে আনার চেষ্টা করেছি। 

সভাপতির বক্তব্যে ড. মোঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল এনডিসি বলেন, সুব্রত বড়–য়ার লিখিত এ গ্রন্থ অত্যন্ত তথ্যনিষ্ঠ এবং বিশ্লেষণ-ঋদ্ধ। আমাদের এবং নতুন প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় একটি গ্রন্থ। বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু একই সূত্রে গাঁথা। অতীতে বহুবার বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে তাঁর নাম মুছে দেবার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে কিন্তু তা সফল হয়নি। কারণ, বাংলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর চিরকালের জন্য স্থান করে নিয়েছেন। 

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, মৌলি আজাদ, রাসেল আশেকী এবং শোয়েব সর্বনাম। 

কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি মাহবুব সাদিক, শাহজাদী আঞ্জুমান আরা, মুনীর সিরাজ এবং মাসুদ হাসান। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মো. শাহাদাৎ হোসেন, অনিমেষ কর এবং তামান্না সারোয়ার নীপা। নৃত্য পরিবেশন করেন সৌন্দর্য প্রিয়দর্শিনী ঝুম্পা-এর পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘জলতরঙ্গ ডান্স কোম্পানী’র নৃত্য শিল্পীবৃন্দ। সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী দীনাত জাহান মুন্নী, আঞ্জুমান আরা শিমুল, কাজী মুয়ীদ শাহরিয়ার সিরাজ জয়, মোঃ রেজওয়ানুল হক এবং সঞ্জয় কুমার দাস। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন পলাশ হালদার (পারকেশন), টুটুল বড়ুয়া (বেইজ গীটার), এমিল মুরছালিন (গীটার), মো জাহিদুর রহমান (কী-বোর্ড) এবং পলাশ চক্রবর্তী (অক্টোপ্যাড)। 

আজ অমর একুশে বইমেলার ১৩তম দিন। মেলা চলবে সকাল ১০:০০টা থেকে রাত ৯:০০টা পর্যন্ত। সকাল ১১:০০টা থেকে বেলা ১:০০টা পর্যন্ত মেলায় থাকবে শিশু প্রহর। সকাল ১০:০০টায় শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। 

বিকেল ৪:০০টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আসাদ চৌধুরী রচিত সংগ্রামী নায়ক বঙ্গবন্ধুর শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন শোয়াইব জিবরান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন আনিসুর রহমান এবং নূরুন্নাহার মুক্তা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক খুরশীদা বেগম। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ