ঢাকা, শুক্রবার 14 February 2020,১ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

চুয়াডাঙ্গায় ডাল চাষ হ্রাস স্থানীয় চাহিদাই পূরণ হয় না

চুয়াডাঙ্গার কেরু অ্যান্ড কোম্পানীর একটি মুশুরী ক্ষেত, ছবিটি চুয়াডাঙ্গা সদরের আকন্দবাড়ীয়া থেকে তোলা।

এফ,এ আলমগীর, চুয়াডাঙ্গা: চুয়াডাঙ্গা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে ডাল জাতীয় ফসলের আবাদ। এক সময় জেলায় ব্যাপকভাবে ডাল জাতীয় ফসলের আবাদ হলেও বর্তমানে নতুন নতুন ফসলের আবাদ শুরু হওয়া ও সেইসাথে কৃষি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবসহ নানা প্রতিকুলতায় বর্তমানে এ জাতীয় ফসলের আবাদের পরিমান কমতে কমতে তলানীতে ঠেকেছে। ১৯৭০-৭১ মওসুমে চুয়াডাঙ্গা জেলায় ডাল জাতীয় ফসল উৎপাদিত হয়েছিল ১৩ হাজার ৫৮৯ হেক্টর, সেখানে বর্তমানে জনসংখ্যা দ্বিগুনের বেশী হলেও কালের বিবর্তনে ১৯/২০ মওসুমে সেটা দাড়িয়েছে মাত্র ৮৬৯ হেক্টরে। জানা গেছে, এক সময় চুয়াডাঙ্গা জেলার ৪ উপজেলায় ব্যাপকভাবে ডাল জাতীয় ফসল ছোলা, মসুর, মুগ, কলাই, অড়হর, খেসারি ও মটরের আবাদ হতো। সে সময় উৎপাদিত ডাল এলাকার মানুষের চাহিদা পূরণ করেও বিপুল পরিমাণ ছোলা, মসুর, মুগ, কলাই, অড়হর, খেসারি যেত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ওই সময় পাবনার ঈশ্বরদী, ফরিদপুর, ফরিদপুরের চরমুগুরিয়া, ঢাকার মিরকাদিম, যশোরের বসুন্দিয়া থেকে ব্যবসায়ীরা জেলার দামুড়হুদা সদর, দর্শনা,  কার্পাসডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা, জীবননগর মোকাম থেকে ডাল কিনে ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যেতো। অত্র এলাকার ব্যবসায়ীরাও চালান করতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বছর ত্রিশেক আগে জেলার বিভিন্ন এলাকায় গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপনের ফলে সেচ সুবিধার উন্নতি ঘটলে নতুন ফসল হিসাবে ব্যাপকভাবে ইরি-বোরো ধানের আবাদে কৃষকরা ঝুঁকে পড়ে। এছাড়া বছর দশেক আগে সব্জিও ভূট্টাসহ খাট আবাদ অর্থাৎ কম সময়ে বেশী লাভজনক যেমন মওসুমি সব্জি বেগুন, লাউ, কুমড়া, শিম, কপি, মরিচ, গোলআলু, পটোলসহ নানা ধরনের আবাদ শুরু হলে ডাল জাতীয় ফসলের আবাদে ভাটা পড়তে শুরু করে যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে অল্প সময়ে অধিক ফলন ও বেশী লাভ হওয়ায় এসব চাষ এতটাই বেড়েছে যে জীবননগর, দর্শনা, আন্দুলবাড়ীয়া, কার্পাসডাঙ্গা, আলমডাঙ্গাও চুয়াডাঙ্গাসহ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্র কাঁচামালের আড়ৎ গড়ে উঠেছে। এখান থেকে প্রতিদিন ট্রাক ভর্তি শাকসব্জি ঢাকা, খুলনা, সাতক্ষীরা, গোয়ালন্দসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান করা হচ্ছে। চাষীদের দাবী ডাল জাতীয় আবাদে কৃষি বিভাগের সহযোগীতা পাওয়া যায় না। মান্ধাতার বীজ ব্যবস্থাপনা ও তুলনামূলক কম উৎপাদনের কারনে তেমন লাভজনক না হওয়ায় চাষী ডাল চাষে উৎসাহী নয়। তাছাড়া বিদেশ হতে আমদানীকৃত মসুরি ও মটর ডাল ৫০ টাকা কেজি পাবার কারনে চাষীদের লোকসান হওয়ায় তারা এ চাষে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বর্তমানের এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই এ অঞ্চল থেকে ডাল জাতীয় ফসলের আবাদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বর্তমানে এলাকার ডালের চাহিদা মেটাতে পুরোপুরি আমদানী নির্ভর হয়ে পড়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গায় বর্তমানে মোট জমির পরিমান ১ লক্ষ ১৫ হাজার হেক্টর, এর মধ্যে চাষযোগ্য জমির পরিমান ৯৪ হাজার ২২০ হেক্টর। ডাল চাষের ভরা মওসুমে চুয়াডাঙ্গায় শুধুমাত্র ভুট্টা চাষই হয়েছে ৪৬ হাজার ১২১ হেক্টর, যা চাষযোগ্য জমির অর্ধেক। এর বাইরেও রয়েছে বিপুল পরিমাণ শীতকালীন সব্জি চাষ। অপরদিকে চলতি রবি মওসুমে জেলায় ডাল জাতীয় ফসল মসুর আবাদ হয়েছে মাত্র ৭৫৫ হেক্টর, ছোলা আবাদ হয়েছে মাত্র ৯ হেক্টর, শীতকালীন মুগ আবাদ হয়েছে ৫৫ হেক্টর এবং খেসারি আবাদ হয়েছে ৫০ হেক্টর, সর্বমোট ৮৬৯ হেক্টর। এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ আলী হাসান দৈনিক সংগ্রামকে জানান- মূলত কৃষকরা যে ফসলে বেশি লাভবান হন সে ফসলেরই আবাদ করেন। তাছাড়া চুয়াডাঙ্গার সিংহভাগ অঞ্চল এক ফসলি অর্থাৎ ধান চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় চাষীরা ধানের আবাদ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে কৃষকরা রবি মওসুমে ভূট্টার আবাদ করে বেশি লাভবান হচ্ছে, আর এ আবাদে ঝুঁকিও কম। পাশাপাশি সারাদেশের মোট উৎপাদিত ভুট্টার এক চতুর্থাংশ চুয়াডাঙ্গাতে চাষ হচ্ছে। অপরদিকে ডাল জাতীয় ফসলের আবাদে তুলনামূলক লাভ কম হওয়ার সংগত কারনেই এর উৎপাদন কমে গেছে।

চুয়াডাঙ্গা জেলা যদিও রবি শষ্য তথা ডাল জাতীয় ফসল আবাদের উপযোগী, তথাপিও এই জেলায় চাহিদার তুলনায় ডাল জাতীয় ফসলের উৎপাদন অত্যন্ত কম। এর প্রধান কারন হলো এখনও পর্যন্ত ডাল জাতীয় ফসলের তেমন কোন উন্নত জাত উদ্ভাবন হয়নি। ফলে প্রচুর এলাকা ডাল জাতীয় শষ্য উৎপাদনের উপযোগী হলেও অন্যান্য ফসলের উফশী জাতের তুলনায় এর উৎপাদন খুবই কম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ