ঢাকা, শনিবার 15 February 2020, ২ ফাল্গুন ১৪২৬, ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

পরিবহন আইন কঠোর হলেও চালকরা এখনো বেপরোয়া

নাছির উদ্দিন শোয়েব: সড়ক পরিবহন আইন নতুন করে সংস্কার করার পরও দুর্ঘটনা কমছে না। কঠোর আইনেও সড়ক-মহাসড়কে বেপরোয়া চালকদের নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়েই চলছে। প্রায় প্রতিদিনই সড়কে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। গতকাল শুক্রবারও গোপালগঞ্জের ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও নসিমনের সংঘর্ষে পাঁচ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও সাতজন। জানুয়ারি মাসে দেশে ৫৩১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৪৭ জন। গত বছরের ডিসেম্বর মাসের তুলনায় জানুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনার হার ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়েছে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্ঘটনা রোধে সরকার গত বছর ‘নতুন সড়ক পরিবহন’ আইন প্রণয়ন করে সরকার। যদিও শুরুতেই আইনটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে হোঁচট খায় সংশ্লিষ্টরা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের তখন বলেছিলেন, পরিবহন শ্রমিকরা আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনের দাবি জানিছে। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ নতুন সড়ক আইনের ৯টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব দেয় সরকারকে। চালকদের লাইসেন্স-সংক্রান্ত ও যানবাহনের আকৃতি পরিবর্তন-সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি জুন পর্যন্ত নতুন আইনে হবে না বলে ঘোষণা দেন তিনি। এ ছাড়া আইন সংশোধন-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সুপারিশ আকারে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে তিনি তখন জানান। পুলিশ জানায়, তারপরও নতুন পরিবহন আইনটি বাস্তবায়ন চলছে।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এতেও থেমে নেই দুর্ঘটনা। আগের মতোই বেপরোয়া চালকরা। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটছে। একেকটি দুর্ঘটনায় নিশেঃষ হচ্ছে একেটি পরিবার। এদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু তথা হত্যায় অভিযুক্তদের সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করেছেন সড়কে সন্তানহারাদের অভিভাবক ও স্বজনরা। একজোট হয়ে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন তারা।
অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে গঠিত সংগঠনের নেতারা নানা চাপে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের (নিশচা) চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়ে বিষোদগার করেছেন সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান। ইলিয়াস কাঞ্চন এর প্রতিবাদ করে শাহজান খানকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। তিনি বক্তব্য প্রত্যাহার না করায় ইলিয়াস কাঞ্চনের মানহানির মামলায় সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে আদালতে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এরআগে যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক নেতাকে বিভিন্ন মামলায় আটক হয়ে জেল খাটতে হয়েছে।
এদিকে নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না বলে মন্তব্য করেছেন নিরাপদ সড়ক চাই'র (নিসচা) চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। কোনো দেশে যুদ্ধেও এত মানুষের মৃত্যু হয় না। ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ২০১৮ সালের যে সড়ক পরিবহন আইন করা হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। একটি মহল, একটি গোষ্ঠীর চাপের কারণে আইনটি সেভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। যতদিন পর্যন্ত এই আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে না, ততদিন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না। সড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যু, পঙ্গুত্বের হার কমবে না। আমি আশা করবো, কর্তৃপক্ষ যারা আছেন, তারা যেন এই আইন পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করেন। আমরা যদি সরকারকে চাপ না দেই এই আইন বাস্তবায়ন হবে না। আইন বাস্তবায়ন না হলে এরকম সড়কে মৃত্যু চলতেই থাকবে। ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা হয় মানুষের ভুলের জন্য। আইন না মানার জন্য। নিয়ম না মানার জন্য। আইনের সঠিক প্রয়োগ না করার জন্য। নিয়ম না মেনে রাস্তা পারাপারের ঘটনায় কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা দেশে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। নিয়ম না মানলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করছে, আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত সড়কে নতুন গাড়ি নামছে। কিন্তু আমরা যদি এখনো নিয়ম না জানি, না মানি, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যাবে না।
নতুন সড়ক পরিবহন আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন-ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেসসহ বিভিন্ন কাগজপত্র হালনাগাদের জন্য মালিক-শ্রমিকদের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। এই ‘আইন (সড়ক পরিবহন আইন) স্থগিত করা হয়নি, সবই (বাস্তবায়ন) চলবে। সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা জোরদারকরণ এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নে গঠিত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য টাস্কফোর্সের প্রথম সভা শেষে সাংবাদিকদের গত বছর এ কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, গত মাসে (জানুয়ারি) দেশে ৫৩১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৪৭ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১১৪১ জন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর মাসের তুলনায় জানুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনার হার ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়েছে। মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪১ দশমিক ৬১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৯ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে এবং ২১ দশমিক ২৮ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে হয়েছে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, চট্টগ্রাম মহানগরে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি আরও জানায়, জানুয়ারি মাসে ৪৩টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩৪ জন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছেন। নৌ-পথে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৩০ জন। জানুয়ারিতে সড়কে ১৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ বাস, ২৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ কার-জিপ-মাইক্রোবাস, ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক, ১২ দশমিক ২১ শতাংশ নছিমন-করিমন ও লেগুনা দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এর মধ্যে গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ৫৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, মুখোমুখি সংঘর্ষ ১৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, খাদে পড়ে গেছে ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ, চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ, ট্রেনের ধাক্কায় শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণে ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে”Í জানায় যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
কয়েকটি ঘটনা: ১৩ ফেব্রুয়ারি বগুড়া-নগরবাড়ি মহাসড়কে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে বাসচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই স্কুলছাত্র নিহত হয়। এ ঘটনায় আরও এক স্কুলছাত্র আহত হয়।
১২ ফেব্রুয়ারি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় যাত্রীবাহী বাসের চাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। একই দিন রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বালুবাহী ট্রাককে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছে পিকআপ ভ্যান। এতে ঘটনাস্থলেই পিকআপ আরোহী দুই ব্যক্তি নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত দুইজন। ১১ ফেব্রুয়ারি শেরপুরে মাইক্রোবাস চাপায় দুজন নিহত হয়। একই দিন সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটায় বাসচাপায় সাত্তার শেখ (৩৬) নামে এক পান ব্যবসায়ী নিহত হন। নিহত পান ব্যবসায়ী সাত্তার শেখ পাটকেলঘাটা থানার কুমিরা ইউনিয়নের রাঢ়ীপাড়া গ্রামের মৃত শামসুর রহমানের ছেলে।
৯ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে রাকিব হোসেন (২৫) নামে মোটরসাইকেল আরোহী এক যুবক নিহত হন। ৮ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার বানিয়ারছড়া স্টেশনে ঢাকাগামী স্টার লাইন পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস উল্টে খাদে পড়ে এক নারীসহ ৪ জন মারা যান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ