ঢাকা, মঙ্গলবার 25 February 2020, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬, ৩০ জমাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপে শেয়ারবাজারে টানা দরপতন

স্টাফ রিপোর্টার : টানা উত্থানের পর দেশের শেয়ারবাজারে টানা দরপতন দেখা দিয়েছে। গতকাল সোমবার পর্যন্ত এ নিয়ে টানা তিন কার্যদিবস দরপতন হলো। বিনিয়োগকারীরা বিক্রির চাপ বাড়ানোয় এমন হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব ইউনুসুর রহমান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের সংবাদে বিনিয়োগকারী শেয়ার ক্রয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। এতে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ে। ফলে মূল্যসূচকের বড় উত্থান হয়। যারা আগের শেয়ার কিনেছেন, এখন তাদের একটি অংশ মুনাফা তুলে নেয়ার জন্য বিক্রির চাপ বাড়িয়েছেন। শেয়ারবাজারে টানা দরপতন দেখা দিলেও তাতে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, এই দরপতন স্বাভাবিক। শিগগির বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী  প্রবণতায় ফিরবে।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, টানা উত্থানের কারণে এখন বাজারে কিছুটা বিক্রির চাপ রয়েছে। যারা আগে কিনেছেন তারা মুনাফা তুলে নেয়ার জন্য বিক্রি করছেন। এ কারণে বাজার কিছুটা নিম্নমুখী। এটা স্বাভাবিক। এভাবেই বাজার আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল সোমবার লেনদেনের শুরু থেকেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) একের পর একটি  প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দরপতন হতে থাকে। লেনদেনের শেষ পর্যন্ত এই বেণতা অব্যাহত থাকে। ফলে দিনের লেনদেন শেষে বড় পতন হয় মূল্যসূচকের।
এদিন ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া ১০৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম আগের দিনের তুলনায় বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২০১টির। অপরিবর্তিত রয়েছে ৫১টির দাম। বেশিরভাগ  প্রতিষ্ঠানের এই দরপতনের কারণে ডিএসইর  ধোন মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৪৮ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ৬৫০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক ২০ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৫৯১ পয়েন্টে নেমে গেছে। আর ডিএসইর শরিয়াহ্ সূচক ১২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৭৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
সূচকের এই পতনের দিনে ডিএসইতে কমেছে লেনদেনের পরিমাণও। দিনভর বাজারটিতে লেনদেন হয় ৬০০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আগের দিন লেনদেন হয় ৬৬৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। সে হিসেবে লেনদেন কমেছে ৬৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
টাকার অঙ্কে ডিএসইতে সব থেকে বেশি লেনদেন হয়েছে ভিএফএস থ্রেড ডাইংয়ের শেয়ার। কোম্পানিটির ২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা গ্রামীণফোনের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ২০ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ওরিয়ন ফার্মা। এ ছাড়া লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে রয়েছে- কনফিডেন্স সিমেন্ট, এসকে ট্রিমস, বিএসআরএম, লাফার্জাহোলসিম, গাল্ডেন হার্ভেস্ট, সিলভা ফার্মাসিউটিক্যাল এবং কাশেম ইন্ডাস্ট্রিজ।
অপর শেয়ারবাজর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১০০ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ২৭৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ২৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। লেনদেনে অংশ নেয়া ২৪৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৪টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৩২টির এবং ২৮টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
ডিএসইর চেয়ারম্যান সাবেক আমলা ইউনুসুর রহমান : এদিকে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক  প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব ইউনুসুর রহমান। গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ সভায় পরিচালকদের সম্মতিক্রমে সাবেক এই আমলাকে  প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়।
ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন আইন অনুযায়ী, স্টক এক্সচেঞ্জের স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচন করতে হয়। এরই ভিত্তিতে সম্প্রতি স্বতন্ত্র পরিচালক হওয়া ইউনুসুর রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নেন ডিএসইর পরিচালকরা।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে ডিএসইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাশেমসহ স্বতন্ত্র পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান মিয়া, মনোয়ারা হাকিম আলী, ওয়ালীউল ইসলাম, ড. এম কায়কোবাদ ও অধ্যাপক ড. মাসুদুর রহমান অবসর গ্রহণ করেন।
এরপর ডিএসইর  প্রস্তাবিত তালিকা থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ছয়জন স্বতন্ত্র পরিচালকের নিয়োগ অনুমোদন দেয়।
নিয়োগ পাওয়া স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক  প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব ইউনুসুর রহমান। এছাড়া সালমা নাসরিন, মো. মুনতাকিম আশরাফ, হাবিবুল্লাহ বাহার এবং অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদ স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। অধ্যাপক মাসুদুর রহমান পুনঃনিয়োগ পান।
ডিএসইর পর্ষদে যুক্ত হওয়ার আগে ইউনুসুর রহমান যুক্তরাজ্যের (ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট) ডিএফআইডির অর্থায়নে ‘বিজনেস ফাইন্যান্স ফর পুওর ইন বাংলাদেশ’ (বিএফপি-বি) শীর্ষক  প্রকল্পে সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার হিসেবে খণ্ডকালীন কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) শোসন ক্যাডারে যোগদান করা ইউনুসুর রহমান স্থানীয় ও কেন্দ্রীয়  শোসনের বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব ছাড়াও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব (শোসনিক ধোন), জন শোসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্ট বিভাগের (ইআরডি) যুগ্ম-সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৯ সালে বরিশাল জেলায় জন্মগ্রহণ করা ইউনুসুর রহমান ১৯৭৫ সালে যশোর থেকে মেধা তালিকায়  থেম বিভাগে দ্বিতীয় স্থানসহ এসএসসি এবং ১৯৭৭ সালে মেধা তালিকায় থেম বিভাগে তৃতীয় স্থানসহ এইচএসসি পাস করেন। ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি হিসাব বিজ্ঞানে থেম শ্রেণিতে স্নাতক এবং ১৯৮১ সালে  থেম শ্রেণিতে স্নাতকোওর ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৮৭ সালে তিনি ফ্রান্সের প্যারিস থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ডি পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে পাবলিক ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা অর্জন করেন। অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন ক্রস ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসা  শোসনে এমবিএ ডিগ্রিও সম্পন্ন করেন সাবেক এই সচিব।
দীর্ঘ ৩৫ বছরের পেশাগত জীবনে ইউনুসুর রহমান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানসহ স্থানীয়  শোসন এবং মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি খুলনা বিভাগে বিভাগীয় কমিশনার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং মৌলভীবাজারে জেলা  শোসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত জেলা  শোসক (এডিসি), বরগুনা জেলার সদর উপজেলা ও ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
উল্লেখ্য, স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদে ১৩ জনের মধ্যে সাতজন স্বতন্ত্র পরিচালক ও চারজন শেয়ারহোল্ডার পরিচালক রয়েছেন। এ ছাড়া একজন কৌশলগত বিনিয়োগকারীর মনোনীত পরিচালক এবং পদাধিকার বলে পর্ষদে আরেকজন রয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ