ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 February 2020, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ২ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

দূষণ আর অব্যবস্থাপনায় পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারছে না কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান, কক্সবাজার থেকে ফিরে: দূষণ আর অব্যবস্থাপনায় পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারছে না কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত পর্যটন, দেশীয় পর্যটক, ট্যুর অপারেটর ও হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীদের দায়িত্বহীন আচরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রশাসনের অক্ষমতার কারণে কক্সবাজারসহ আশপাশের পর্যটন এলাকা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। পৌরসভার কঠিন বর্জ্য রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়িতে ফেলার কথা থাকলেও সেখানে না নিয়ে শহরের কাছাকাছি বাঁকখালী নদীতে ফেলে দিচ্ছে। এই নদীর পানি এখন চরম দূষিত। আশপাশে নলকুপ থেকে আর স্বচ্ছ পানি উঠছে না। কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা সুয়ারেজ সিস্টেম না থাকা। এ বর্জ্য চলে যাচ্ছে সমুদ্রে। এতে একদিকে সমুদ্রের প্রাণীগুলোর সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। অন্যদিকে সমুদ্রের সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ না নিতে পারলে কক্সবাজার শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কক্সবাজার শহর, সমুদ্র সৈকত ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সর্বত্র অব্যবস্থাপনা ও অপরিচ্ছন্নতার ছাপ। বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে সৈকতে দৃশ্যমান ময়লা না থাকলেও সন্ধ্যার পর মশার যন্ত্রনায় বসে থাকা যায় না। পুরো শহর জুড়েই মশার এই রাজত্ব লক্ষ্য করা যায়। সুয়ারেজ সিস্টেম না থাকায় হোটেল মোটেল থেকে তরল বর্জ্য ড্রেন দিয়ে গিয়ে পড়ছে বাঁকখালী নদীতে। এরপর তা গিয়ে মিশেছে সমুদ্রে। এছাড়া এসব ড্রেন থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। মশার উৎপত্তিও এসব ড্রেন। শহরে ঘুরে দেখা গেছে, বার্মিজ স্কুলের সামনে সড়ক, টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের সামনের সড়ক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে ময়লার বিশাল ডাম্পিং। যা পর্যটকদের জন্য চরম বিব্রতকর।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছর কক্সবাজারে প্রায় ১০ লাখ পর্যটক আসেন। এর মধ্যে পর্যটন মৌসুমেই আসেন প্রায় ছয় লাখ। মূলত পর্যটন মৌসুমে ছুটির দিনগুলোতে ওভারলোডেড হয়ে যায় এই সৈকত ও শহর। এদের থাকা ও খাওয়ার জন্য রয়েছে প্রায় সাড়ে চার শ' হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট। এখান থেকে প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে। যার বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত সাগরে গিয়ে পড়ছে। এছাড়া স্থানীয় বাঁকখালী নদীতে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। সাগরের পানি দূষিত হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে বিপুল সম্ভাবনার কথা বলা হলেও দূষণের ফলে তা খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, বাঁকখালী নদীর উজানে ৩৫০ থেকে ৫০০ মিটার প্রসস্ততা থাকলেও মোহনায় তা সর্বোচ্চ ৫০ মিটার। এখানে পৌরসভার বর্জ্য ফেলে, তার ওপর নদী ড্রেজিংএর মাটি ফেলে হাউজিং প্রকল্প করা হয়েছে। এভাবেই পরিবেশের ক্ষতি করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পর্যটন বিশেষজ্ঞ মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনে প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। এই সম্পদগুলো হলো- পানি, মাটি, বাতাস, পাহাড়, গাছ-পালা, পশুপাখি। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই পর্যটন শহরে সবকিছুই হুমকির মুখে পড়েছে। শতভাগ ইকো ট্যুরিজম হয়তো আমরা করতে পারবো না, তবে রেসপন্সিবল ট্যুরিজম অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এটা আমাদের জীবন মরণ প্রশ্ন। তিনি বলেন, পৃথিবীর বহু সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে দূষণের ফলে। যেভাবে চলছে তাতে একদিন এই কক্সবাজারকেও পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি টেকনিক্যাল বিষয়। এখানকার প্রশাসনের সেই সক্ষমতা নেই। পর্যটন বোর্ডকে এখানে এগিয়ে আসতে হবে। শিগগিরই এটার একটা বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি হোটেল-মোটেল এর ওপর চাপ কমিয়ে বিকল্প 'কমিউনিটি ট্যুরিজম' ধারণার বিকাশ ঘটাতে হবে। তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে কী পরিমাণ পর্যটক এক দিন অবস্থান করতে পারবে, তা নির্দিষ্ট করতে হবে। এরপর অবশ্যই এটার লাগাম টানতে হবে।
মোখলেছুর রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি বিচ বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশের সম্পদ। কারণ কোন জায়গাকে পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণার পর সে জায়গায় এককভাবে কোন দেশের মালিকানায় থাকেনা। ফলে এই বিচ যাতে কোনরকম ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। এই বিচের জীবনচক্র যত দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারবো ততদিন এর সুবিধা পাব। বিজ্ঞানীরা বলছে মাটির চাইতে সমুদ্রের তলদেশে সম্পদের পরিমাণ বেশি, ফলে সমুদ্রের সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী মুকিম খান, যিনি কলাকতলী মেরিনড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, অন্যান্য শহরের তুলনায় কক্সবাজার অপরিচ্ছন্ন বেশি। এখানকার পৌরসভার গাফিলতি রয়েছে। আমরা ট্যাক্স দেই পৌরসভাকে। অথচ আমাদেরকেই লাখ লাখ টাকা খরচ করে বর্জ্য ফেলে দিয়ে আসতে হয়। এই দায়িত্ব ছিল মূলত পৌরসভার। তিনি বলেন, আগে কোন নির্দেশনা না থাকায় বরাদ্দ পাওয়া প্লটের পুরোটাতেই স্থাপনা তৈরি হয়ে গেছে। তাই এখন কেন্দ্রিয়ভাবে বর্জ্য শোধনাগার বা এসটিপি করা উচিত।
সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশের সেন্ট্রাল চেয়ারম্যান এ. এন. এম. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, এই কক্সবাজারের তলদেশ থেকে আর বিশুদ্ধ মিষ্টি পানি পাওয়া যাচ্ছে না। হোটেল-মোটেলের তরল বর্জ্য কিছুটা সমুদ্রে যাচ্ছে, আর কিছুটা মাটির নিচের পানিতে মিশে যাচ্ছে। আমরা এই শহরের বিভিন্ন নলকুপের পানি পরীক্ষার জন্য পরিবেশ অধিদফতরে পাঠিয়েছিলাম। তারা বলেছেন, এটা পরীক্ষা করার মতো গবেষণাগার তাদের নেই। তিনি বলেন, পৌরসভার কঠিন বর্জ্য রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়িতে ফেলার কথা ছিল, কিন্তু তারা ওখানে না নিয়ে শহরের কাছাকাছি বাঁকখালী নদীতে ফেলে দিচ্ছে। এই নদীর পানি এখন চরম দূষিত। আশপাশে নলকুপ থেকে আর স্বচ্ছ পানি উঠছে না।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানান, রামুতে একটি বর্জ্য প্লান্ট রয়েছে, একটি গাড়িতে ওখানে ময়লা নেয়া হয়। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। এজন্য সদর উপজেলার পিএমখালীতে ৩৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে প্লান্ট স্থাপন করা হচ্ছে। এটি হলে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটা সমাধান হবে। তবে এখানে বড় সমস্যা হলো সুয়ারেজ সিস্টেম না থাকা। আমরা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এখনও পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই।
পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (প্ল্যানিং) সোলায়মান হায়দার বলেন, পরিবেশগতভাবে সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। পরিবেশ রক্ষায় কেউ নিজের দায়িত্ব পালন করে না। হোটেল মালিকরা ও দোকানদাররা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভালো ভাবে করে না। কিন্তু ব্যবসা করবে অথচ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করবে না এটা কিভাবে হয়? এমনকি রেসপন্সিবল বিহেভিয়ার বিষয় পর্যটকরাও সচেতন না থাকায় পর্যটন কেন্দ্রগুলো চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন তিনি।
তিনি বলেন, টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে যাওয়ার সময় পর্যটকরা পাখিকে চিপস খাওয়ানো নামে প্যাকেটটা নদীতে ফেলে দেয়। এমনকি সেন্টমার্টিন এর বীচে পর্যটকরা গিয়ে সাইকেল বা মোটরসাইকেল নিয়ে নামে। এভাবে বীচ টা নষ্ট করে দিচ্ছে। হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা রাতে আলো জ্বালিয়ে রেখে জীববৈচিত্র্য নষ্ট করছে। এ ব্যাপারে তিনি সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করার অনুরোধ করেন।
বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক এস এম জহির উদ্দিন আকন বলেন, দেশের পর্যটন শিল্প টিকে আছে প্রকৃতির ভিত্তির ওপর। তাই পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখতে হলে আগে রক্ষা করতে হবে প্রাণ ও প্রকৃতি। বিশেষ করে সাগরে পর্যটন ও সমুদ্র অর্থনীতিতে এগিয়ে যেতে হলে সমুদ্রের ইকোসিস্টেম ধরে রাখতে হবে। সমুদ্রের প্রাণীদের তাদের পরিবেশে বাঁচতে দিতে হবে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোর এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা মেজবাউল আলম বলেন, সমুদ্র এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এ পরিস্থিতির জন্য জনসচেতনতা মূলক প্রচারণা বাড়াতে হবে।
সেভ আওয়ার সি’র পৃষ্ঠপোষক আতিকুর রহমান বলেন, পর্যটকদের ফেলে রাখা বর্জ্য সমুদ্রে চলে যায় ফলে সমুদ্রের প্রাণীগুলোর সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে সমুদ্রের সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে।
সমুদ্র অর্থনীতি গবেষক ডক্টর দিলরুবা চৌধুরী বলেন, পৃথিবীতে ব্লু ইকোনমি থেকে অর্থনীতি আসছে পাঁচ থেকে ছয় ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা যদি ব্লু ইকোনমি কে আরো বেশি এগিয়ে নিতে চাই পারি তাহলে এটা বেড়ে ১০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। পর্যটন থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আয় করছে আমেরিকা। আমাদের দেশেও ট্যুরিজম এর সঙ্গে অনেক সেক্টর সম্পৃক্ত হয়েছে। ট্যুরিজম দিয়ে আমাদের জিডিপিতে কন্ট্রিবিউশন আরও বাড়াতে পারি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ