ঢাকা, মঙ্গলবার 3 March 2020, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ৭ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

সংবাদপত্রের গুরুত্ব¡¡

 

মুহম্মদ মতিউর রহমান:

আধুনিক যুগে সংবাদ পত্রের গুরুত্ব¡ অপরিসীম। প্রতিদিন ভোরে বাড়ির দোরগোড়ায় হকার সেদিনের দৈনিক পত্রিকাটি পৌঁছে দেয়। নিদ্রাভঙ্গ শেষে প্রাতঃক্রিয়া সম্পাদন, ফজর নামাযের পর এক কাপ গরম চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার আগেই সেদিনের পত্রিকার জন্য মন-প্রাণ আনচান করতে থাকে। হাতে পাওয়া মাত্রই প্রত্যেক সচেতন নাগরিক দু’চোখ ভরে পত্রিকার সর্বাঙ্গে দৃষ্টি বুলিয়ে সেদিনের বড় বড় খবরের হেডিংগুলোয় এক নজর চোখ বুলিয়ে তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একে একে সবগুলো খবর পড়ে শেষ করে প্রাত্যহিক কাজকর্ম শুরু করেন। 

এভাবে দৈনিক পত্রিকা আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে এবং এর প্রতি আমাদের আকর্ষণ দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে-বিদেশে নানা সংকট মুহূর্তে সর্বশেষ সংবাদ জানার জন্য মনে আকুলতা সৃষ্টি হয়। ইলেকট্রিক মিডিয়ার বদৌলতে ত্বরিৎ আমরা সে খবর পাচ্ছি। তবে বিস্তারিত খবরের আশায় আমরা এখনও পত্রিকার উপরই নির্ভর করি। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের খবর মানুষের মনে ভাল-মন্দ নানাবিধ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এ প্রতিক্রিয়া কখনো মনে শিহরণ জাগায়, কখনো বেদনা ও হতাশার অনুভূতি জাগ্রত করে, কখনো কৌতূহল উদ্দীপন করে, আবার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার নতুন নতুন  দিগন্ত উন্মোচন করে। এভাবে একটি পত্রিকা আমাদের জীবনকে নানাভাবে দোলায়িত করে। সংবাদপত্র একদিকে যেমন আমাদের মনে বৈচিত্র্যময় আনন্দ-বেদনা-বিস্ময়-কৌতূহল উৎপাদন করে, অন্যদিকে তেমনি আমাদেরকে জ্ঞানালোকে সমৃদ্ধ, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সচেতন ও স্বীয় কর্তব্য নির্ধারণে সাহায্য করে। চলমান পৃথিবীর সাম্প্রতিকতম অবস্থার সাথে জীবনকে খাপ খাইয়ে চলতে সাহায্য করে। 

বর্তমান বিশ্বে সংবাদপত্র এক অতি শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম। সংবাদপত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর ক্ষুদ্র-বৃহৎ নানা খবর যেমন পরিবেশিত হয়, তেমনি সারা বিশ্বের বিভিন্ন জনপদ, দেশ, ও সমাজের জনমত এতে বিধৃত হয়। সংবাদপত্রের দুটি প্রধান দিক বা বিভাগ রয়েছে। একটি খবর পরিবেশন, দ্বিতীয়টি জনমত গঠন। নীতিগতভাবে এ উভয় ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষতা বজায় রাখার উপর গুরুত্ব¡ দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়, তবে এর ব্যতিক্রমও প্রায় সর্বক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয়। খবর পরিবেশন ও জনমত সৃষ্টি এ উভয় ক্ষেত্রে অনেকেই দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিরপেক্ষতার নীতি বিসর্জন দিয়ে থাকেন। কখনো ব্যক্তি স্বার্থে, কখনো জাতীয়, দলীয় বা গোষ্ঠী স্বার্থে, আবার কখনো রাজনৈতিক-কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নিরপেক্ষতা বিসর্জিত হয়। 

প্রতিটি সংবাদপত্রের মালিক পক্ষ সাধারণত কখনো ব্যক্তি স্বার্থে, কখনো নিজস্ব দলীয়, গোষ্ঠী বা আদর্শিক বিবেচনায় সংবাদপত্রের নিরপেক্ষ নীতি বিসর্জন দিয়ে থাকে। কোন মালিক যদি ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, পুঁজিপতি বা অর্থলোভী হয়, সেক্ষেত্রে স্বভাবতই পত্রিকাটি তার মালিকের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ সংরক্ষণ বা তা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে খবর ও বিভিন্ন ধরনের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক আচরণ করে। কোন মালিক যদি কোন রাজনৈতিক দলের অনুসারী বা আদর্শের অনুসারী হন, তাহলে সে পত্রিকাটি সাধারণত মালিকপক্ষের রাজনৈতিক, আদর্শিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের কারণে নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে থাকে। এভাবে ব্যক্তিগত, দলীয়, গোষ্ঠী বা জাতিগত ভিন্ন স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতার কারণে সংবাদ-কর্মীগণ নিরপেক্ষতার নীতি বিসর্জন দিয়ে থাকেন।

একসময় জার্মানীর একনায়ক রুডল্ফ হিটলার ঘোষণা করেন যে, পৃথিবীতে একমাত্র জার্মান জাতিই খাঁটি আর্যগোষ্ঠী এবং পৃথিবীর অন্য সকল জাতির চেয়ে শ্রেষ্ঠতর। অন্যসব জাতি নিম্নশ্রেণীর পর্যায়ভুক্ত। এ নীল রক্তের অহমিকা তাঁর মধ্যে এমন দম্ভ ও গর্ব-অহংকার সৃষ্টি করে যে, তিনি মনে করেন জার্মান জাতি পৃথিবীর সকল জাতির উপর আধিপত্য বিস্তার করার অধিকারী। তাঁর এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ অভিলাষ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তিনি জার্মানীর সামরিক বাহিনীকে বিশ্বজয়ী সামরিক শক্তিতে পরিণত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁর সামরিক বাহিনীকে তিনি এমনভাবে প্রশিক্ষিত করে তোলেন যে, দেশ ও জাতির স্বার্থে এবং স্বৈরাচারী হিটলারের হুকুম মান্য করতে তারা জীবন বিসর্জন দিতেও সর্বদা প্রস্তুত থাকে। রাজকোষ উজাড় করে হিটলার তাঁর সামরিক বাহিনীকে আধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত করে তোলেন। এরপর একে একে পার্শ্ববর্তী ইউরোপীয় ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ আক্রমণ করে সেগুলোকে জার্মান সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত করে নেন। 

এভাবে সারাবিশ্বে জার্মানীর আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে হিটলার জাপান, রাশিয়া, ফ্রান্স, বৃটেন ইত্যাদি বড় বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আক্রমণ করে বসে। সারা বিশ্ব বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। সর্বত্র যুদ্ধের ভয়াবহতা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি শুভ হয় নি, আক্রান্ত রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যবদ্ধভাবে জার্মানীর মোকাবেলা করে হিটলারের অশুভ অভিলাষ গুঁড়িয়ে দেয়। অবশেষে তিনি পরাজিত ও আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হয়ে আত্ম-হননের পথ বেছে নেন। এভাবে বিশ্বের নিকৃষ্টতম স্বৈরাচারী শাসক, চরম অহংকারী ও নিষ্ঠুর সামরিক নেতার নির্মম জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তার মৃত্যুর আগে তিনি কয়েক হাজার ইহুদীকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এটা ছিল এক নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ। 

এ বিষয়টি উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো, একজন মানুষ কীভাবে এত বড় স্বৈরাচারী, অহংকারী, দাম্ভিক ও বিশ্বজয়ের অস্বাভাবিক আকাক্সক্ষার বশবর্তী হতে পারে এবং একব্যক্তির জঘন্য অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য সমগ্র জাতি কীভাবে তার পিছনে জীবন উৎসর্গ করার মনোভাব নিয়ে ঐক্যবদ্ধ

হয়ে দাঁড়ায় এবং অন্য জাতিকে পরাভূত করে তাদের উপর আধিপত্য বিস্তারে উন্মত্ত দানবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং শেষ পর্যন্ত নিজেকে সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিঃশেষ করে ফেলে। এটা মানুষের দম্ভ, অহংকার ও চরম ঔদ্ধত্বপূর্ণ আচরণের নিকৃষ্টতম প্রকাশ। এর কারণ ও পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এক বলিষ্ঠ, কার্যকর প্রচারযন্ত্র এর পিছনে সুপরিকল্পিতভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ নিরলসভাবে কাজ করেছে। জার্মানীর তৎকালীন সংবাদপত্র ও সকল ধরনের প্রচারযন্ত্র হিটলারের অশুভ অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য সাগ্রহে কাজ করেছে। সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রচারযন্ত্র সমানভাবে শানিয়ে নিয়ে হিটলার তাঁর উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য কাজ করেছেন। ফলে সমগ্র জার্মান জাতি এক অদম্য আবেগে তাড়িত হয়ে হিটলারের পিছনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উন্মাদের মতো হাজার হাজার মানুষ হত্যা, সমগ্র বিশ্বে অশান্তির দাবানল প্রজ্বলিত করে শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই সে প্রজ্জ্বলিত প্রতিহিংসার অগ্নিশিখায় দগ্ধীভূত হয়েছে। এভাবে তারা বিশ্বের ইতিহাসে এক কলংকময় অধ্যায় রচনা করে গেছে। 

আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, আরবদেশে বৃহৎ শক্তিবর্গের সহযোগিতায় অবৈধ ক্ষুদ্র ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে তারা আজ পর্যন্ত নিজেদের কর্তৃত্ব, আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রতিনিয়ত আরবদেরকে তাদের বাস্তুুভিটা থেকে উচ্ছেদ, তাদের উপর নৃশংস হত্যাকান্ড, নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ চরম মানবতাবিরোধী কার্যক্রমে সেদেশের সংবাদপত্র ও বিভিন্ন প্রচারযন্ত্রের এক বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে। মূলত স্বীয় ধর্মীয়-জাতিগত আদর্শ ও আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে তারা এমন এক আবেগ ও মানসিক প্রস্তুতি সৃষ্টি করেছে যে, কোনরূপ যুক্তি ও মানবিক বিবেচনাই তাদের জাতীয় নীতিতে স্থান পায় নি। ফলে পার্শ্ববর্তী আরব দেশসমূহ এমনকি বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করে প্রতিনিয়ত তারা তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পৈত্রিক বাস্তুভিটা থেকে আরবদেরকে উৎখাত করছে। তাদের সকল স্থাপনা ভেঙ্গে মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, বিধ্বস্ত জনপদের উপর গড়ে তুলছে হানাদার ইহুদীদের সুরম্য অট্টালিকা ও আধুনিক জনপদ। বস্তুতান্ত্রিক উন্নতি, সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামরিক প্রস্তুতি ও বৃহৎ শক্তিবর্গের কূটনৈতিক সহযোগিতার চেয়েও এক্ষেত্রে সেদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও প্রচার মাধ্যমের ভূমিকাই সর্বাধিক। তৎসঙ্গে পৃথিবীর সর্বাধিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদীদের মালিকানাধীন প্রচার মাধ্যমসমূহ সে অপতৎপরতায় ইন্ধন যুগিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বের একক পরাশক্তি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালেও আমরা একই অবস্থার প্রতিফলন লক্ষ্য করি। আমেরিকা সমগ্র বিশ্বে তার আধিপত্য বিস্তার ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে অন্য সকল দেশের উপর খবরদারী করে থাকে। মাত্র গত তিন দশককালে আমেরিকা অন্যান্য মিত্র-শক্তির সহায়তায় একে একে আফগানিস্তান, ইরাক, ইরান, কুয়েত, সিরিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন দেশে নির্লজ্জ আক্রমণ চালিয়ে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে এক অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি করেছে। বিগত কয়েক বছরে ঐসব দেশে আমেরিকার নেতৃত্বে অবলীলাক্রমে বর্বরোচিত আক্রমণ পরিচালিত হচ্ছে, অসংখ্য নিরীহ লোক প্রতিদিন সেখানে মৃত্যুবরণ করছে, অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছে। ধ্বংস হয়েছে সেখানকার জনপদ, অসংখ্য অট্টালিকা, স্থাপনা, প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তি তথা সভ্যতার সকল নিদর্শন। মানবতা তথা বিশ্ব-শান্তির জন্য চরম বিপজ্জনক বৃহৎ শক্তির দাপটে বিশ্ব শান্তি বিপন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের এ মানবতাবিরোধী কার্যক্রমে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পিছনে যে শক্তি বা কৌশল বিশেষভাবে কাজ করেছে তাহলো-ইহুদী-প্রভাবিত সেখানকার শক্তিশালী সংবাদপত্রসমূহ ও বিভিন্ন ধরনের প্রচার-মাধ্যম। এ প্রচার মাধ্যম এতই শক্তিশালী যে, সমগ্র বিশ্ব যেখানে তাদের নিন্দায় উচ্চকণ্ঠ, আমেরিকার প্রভাবশালী মহল তা স্বচ্ছন্দে উপেক্ষা করে চলেছে। সারা বিশ্বে যুদ্ধ, হত্যা, মানবতাবিরোধী সকল কার্যক্রমে অশুভ ও উচ্চাকাংক্ষী রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে সাথে সংবাদমাধ্যমও সমভাবে দায়ী।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত  সোভিয়েত রাশিয়া, চীন, পুর্ব-ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার দু’একটি দেশে সমাজতন্ত্রের যে অভ্যূদয় ঘটে, সে অভ্যূদয়ের কাল থেকে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, বিস্তার, প্রচার ও সংহত করার ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট প্রচারযন্ত্রের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সে সময়কার প্রতিটি সমাজতান্ত্রিক দেশের প্রচারযন্ত্র ছিল সম্পূর্ণরূপে সরকার-নিয়ন্ত্রিত। কমিউনিজমের কুফল নয়, তার ধ্বংসযজ্ঞ নয়, মানবতা-বিরোধী নির্দয় আচরণ নয়, কেবল তার কল্পিত স্বর্গরাজ্য গড়ার অলীক স্বপ্ন ও সাফল্যের ফাঁপানো জয়গাঁথা বর্ণনা করে কমিউনিজমের প্রচার-প্রসারকে ত্বরান্বিত করাই ছিল সেসব দেশের সংবাদপত্র ও প্রচারযন্ত্রের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ফলে লৌহ-যবনিকার অন্তরালে সংঘটিত মানবিক চরম বিপর্যয়, লক্ষ লক্ষ বিপণ্œ মানুষের করুণ মৃত্যু ইত্যাদি কোন কিছু সম্পর্কেই বহির্বিশ্ব অবগত হতে পারতো না। সমাজতন্ত্রের মতো একটি অসাড়, মানবতা ও গণতন্ত্র-বিরোধী আদর্শ দীর্ঘ সত্তর বছরকাল জগদ্দল পাথরের ন্যায় সে দেশের বুকে চেপে বসেছিল তার মূলে সেদেশের নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র ও প্রচার-মাধ্যমের বিশেষ ভূমিকা ছিল।

আমাদের দেশের ইতিহাস, সামাজিক-রাজনৈতিক উত্থান-পতনের দৃশ্য পর্যালোচনা করলে সংবাদপত্রের ভূমিকা ও গুরুত্ব¡ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপমহাদেশে উনবিংশ শতকের শুরু থেকে বাঙালি হিন্দু নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে কতিপয় সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বাংলা ভাষায় প্রথম যে পত্রিকা প্রকাশিত হয়, তার নাম ‘বেঙ্গল গেজেট’। এর সম্পাদক ছিলেন গঙ্গাধর ভট্টাচার্য। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কবি ঈশ্বরগুপ্তের সম্পাদনায় ‘সংবাদ প্রভাকর’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পরে এটি দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয় এবং এর সম্পাদক হন যথাক্রমে রামচন্দ্রগুপ্ত ও গোপাল মুখোপাধ্যায়। ১৮৩১ খৃস্টাব্দে বেনী মাধব দে’র সম্পাদনায় ‘সার সংগ্রহ’ নামে পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৮৩৮ খৃস্টাব্দে পার্বতীচরণ দাস সম্পাদিত ‘সংবাদ মৃত্যুঞ্জয়’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৮৪০ খৃস্টাব্দে ইংরাজি ও বাংলা ভাষায় সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদক ছিলেন জন ক্লার্ক মার্শম্যান, রবিনসন, রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও চন্দ্রনাথ বসু। ১৮৪৩ খৃস্টাব্দে অক্ষয়কুমার দত্ত সম্পাদিত ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৮৪৬ খৃস্টাব্দে ঈশ্বরগুপ্তের দ্বিতীয় পত্রিকা ‘পাষ- পীড়ন’ প্রকাশিত হয়। ১৮৪৭ খৃস্টাব্দে ঈশ্বরগুপ্তের তৃতীয় পত্রিকা ‘সাধুরঞ্জন’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু এ দু’টি পত্রিকাই বেশি দিন টিকেনি। ১৮৫০ খৃস্টাব্দে মদনমোহন তর্কালঙ্কার ও মতিলাল চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘সর্বশুভকরী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৮৬৭ খৃস্টাব্দে সি, স্মিথ এর সম্পাদনায় ‘এডুকেশন গেজেট’ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এর সম্পাদক হন যথাক্রমে প্যারীচরণ সরকার ও ভূদেব মুখোপাধ্যায়। এরপর ‘অমৃত বাজার’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যশোর জেলার অমৃত বাজার গ্রাম থেকে শিশির কুমার ঘোষের সম্পাদনায় পত্রিকাটি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এ পত্রিকার একটি ইংরাজি সংস্করণ কলিকাতার বাঘবাজার থেকে প্রকাশিত হয়। শুরুতে এ দু’টি পত্রিকা ছিল সাপ্তাহিক, পরে দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। ১৮৭৮ খৃস্টাব্দে হেমন্তকুমার ঘোষের সম্পাদনায় ‘আনন্দ বাজার’ প্রকাশিত হয়। ১৮৮১ খৃস্টাব্দে ‘বঙ্গবাসী’ প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে যোগেন্দ্র চন্দ্র বসু, কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৮৮২ সালে ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যথাক্রমে এর সম্পাদক ছিলেন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, কৃষ্ণ কুমার মিত্র ও শিবনাথ শাস্ত্রী। ১৮৯০ খৃস্টাব্দে সাপ্তাহিক ‘হিতবাদী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদনা করেন যথাক্রমে কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য্য, যজ্ঞেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথ নাথ মিত্র, কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় ও যোগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।

হিন্দুদের সম্পাদিত উপরোক্ত পত্রিকাসমূহ হিন্দু নবজাগরণে বিশেষ প্রেরণা সৃষ্টি করে। তবে হিন্দু সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও হিতসাধনের চেষ্টা থাকলেও বাঙালি মুসলিম নবজাগরণে এদের কোন ভূমিকা নেই। বরং মুসলিম-বিদ্বেষ সৃষ্টি, মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য বিকৃতিকরণ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানারূপ ষড়যন্ত্র করাই ছিল কোন কোন পত্রিকার প্রধান কাজ। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় যে, ঐসময় দেশ পরাধীন ছিল। ইংরাজদের শাসন-শোষণ ও ভেদ-নীতির কারণে জনগণ বিশেষত মুসলিম সমাজ নিপীড়িত-বঞ্চিত হয়। কিন্তু, এসব পত্রিকা স্বাধীনতার পক্ষে কিংবা ইংরাজ শাসকদের শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনরূপ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। বরং বহুক্ষেত্রে যেমন ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ ও তৎকালীন বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন ও হিন্দু জমিদার এবং ইংরাজ নীলকরদের অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে অধিকাংশ পত্রিকা কোন উচ্চবাচ্য করেনি।

অপরদিকে, বাঙালি মুসলিম সমাজ একদিকে ইংরাজদের বিদ্বেষমূলক আচরণ, নিপীড়ন ও বৈমাত্রেয়সুলভ ব্যবহার এবং অন্যদিকে হিন্দু সমাজের নিগ্রহ-বঞ্চনা ও দুর্বহ অত্যাচারে নিষ্পিষ্ট হয়। ১৮৫৭ খৃস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের পর মুসলিম সমাজের উপর উপরোক্ত দ্বিমুখী আক্রমণ আরো তীব্রতর হয়। অত্যাচার-নিপীড়ন-বঞ্চনা যত ভয়াবহ হয়, সে দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের জন্য মুসলিম সমাজ ততই ব্যগ্র-ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মুসলিম সমাজের পশ্চাদপদতার জন্য অশিক্ষা এবং ইংরাজদের প্রতিহিংসা ও অসহযোগিতাই ছিল প্রধান কারণ। অধঃপতিত অবস্থা থেকে উত্থানের জন্য মুসলিম সমাজ ঐসময় থেকে শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে শুরু করে। শিক্ষিত মুসলিমগণ ক্রমান্বয়ে সরকারি চাকুরী লাভ করে। এভাবে ধীরে ধীরে শিক্ষা-সাহিত্য ও সরকারি চাকুরীর ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি লাভের পর তারা সংবাদপত্র প্রকাশে এগিয়ে আসে। ঐসময় মুসলিম সমাজের উন্নয়নে ও নবজাগরণে মুসলিম সাংবাদিক ও সংবাদপত্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৬ সালে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জন্ম, এরপর দেশব্যাপী স্বদেশী আন্দোলন, ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী, ১৯১৯-২২ সালে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন পাশ, ১৯৩৭ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা গঠন, ১৯৩৯-৪৫ সময়কালে সংঘটিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ, ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ মম্বন্তর, ১৯৪৬ সালে গণভোট অনুষ্ঠান, হিন্দু-মুসলিম রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ও ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান ও স্বাধীন ভারতের প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বড় বড় সব ঘটনার পিছনে সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

উনবিংশ শতকে মুসলিম নবজাগরণের সুচনালগ্নে মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মুসলমানদের সম্পাদনায় যেসব পত্রিকা বিশেষ গুরুত্ব¡পূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ১৮৪৩ সালে মৌলভী মোহাম্মদ আলীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘জগদুদ্দীপক ভাস্কর’ পত্রিকা। ১৮৪৬ সালে মৌলভী মোহাম্মদ আলীর সম্পাদনায় ‘জ্ঞানদীপক’ নামে আরেকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৮৮৯ সালে মুনশী আবদুর রহিমের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘সুধাকর’, ১৮৯১ সালে আবদুর রহিমের সম্পাদনায় মাসিক ‘মিহির’ ও মুনশী রেয়াজ উদ্দীনের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘ইসলাম প্রচারক’, ১৮৯১ সালে মুনশী রেয়াজ উদ্দীন আহমদ ও আবদুর রহিমের যৌথ সম্পাদনায় ‘মিহির ও সুধাকর’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন টাঙ্গাইলের জমিদার নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী। নওয়াব আলীর পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মুনশী আবদুর রহিমের সম্পাদনায় পরবর্তীতে ‘মোসলেম হিতৈষী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এরপর রেয়াজ উদ্দীনের সম্পাদনায় ১৯০৫ সালে ‘সোলতান’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৯০৭ সালে স্বদেশী আন্দোলনের যুগে আর একটি শক্তিশালী পত্রিকা ‘মোসলেম সুহৃদ’ প্রকাশিত হয়। ১৯১২ সালে কবি মোজাম্মেল হক ও আবদুল হাকিমের সম্পাদনায় ‘মোসলেম হিতৈষী’ পুনঃপ্রকাশিত হয়। এর কিছুদিন পর ফুরফুরার পীর আবু বকর সিদ্দিকের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং আবদুল হাকিমের সম্পাদনায় ‘হানাফী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত এ পত্রিকাটি চালু ছিল। রেয়াজ উদ্দীনের সম্পাদনায় ১৯০৫ সালে প্রকাশিত সোলতান পত্রিকা, ১৯০৭ সালে প্রকাশিত, ‘মোসলেম সুহৃদ’, ১৯১১ সালে প্রকাশিত মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত ‘মোহাম্মদী’, ১৯১২ সালে মোজাম্মেল হক ও আবদুল হাকিমের সম্পাদনায় পুনঃপ্রকাশিত ‘হাবলুল মাতীন’ (এর ফারসি সংস্করণের সম্পাদক মঈদুল ইসলাম, বাংলা সংস্করণের সম্পাদক মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও ইংরাজি সংস্করণের সম্পাদক আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী), ১৯২০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত ‘নবযুগ’ (এ পত্রিকার সম্পাদনার সাথে বিভিন্ন সময় জড়িত ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কমরেড মুজাফফর আহমেদ, ফজলুল হক শেলবর্ষী, ওয়াজেদ আলী ও আবুল কাসেম), ১৯২১ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত ‘দৈনিক সেবক’, ১৯২২ সালে ‘দৈনিক সেবক’ বন্ধ হওয়ার পর আকরম খাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মোহাম্মদী’, কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত স্বল্পস্থায়ী ‘ধূমকেতু’ অতঃপর আকরাম খাঁর পরিচালনায় ও আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘দৈনিক আজাদ’ ১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পটভূমিতে ইংরজি ‘দি মোসলমান’ পত্রিকার সম্পাদক মৌলভী মজীবুর রহমানের ও আবুল মনসুর আহমদের সহযোগিতায় প্রকাশিত ‘দৈনিক খাদেম’, ১৯২৬ সালে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সম্পাদনায় ‘দৈনিক ছোলতান’, কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় ‘লাঙ্গল’, কমরেড মুজাফফর আহমদের সম্পাদনায় ‘গণবাণী’ এবং আবুল মনসুর আহমদের সম্পাদনায় ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ (এ পত্রিকার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নবাব আলী চৌধুরীর পুত্র হাসান আলী চৌধুরী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী) প্রকাশিত হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুসলিম জাতীয়তাবাদ আন্দোলন, স্বরাজ আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন ও বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে উপরোক্ত বিভিন্ন সাময়িক ও দৈনিক পত্রিকার ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক গুরুত্ব¡পূর্ণ। বাঙালি হিন্দুর নবজাগরণের সূত্রপাত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে। এর প্রায় অর্ধশত বছর পর বাঙালি মুসলিম নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটে। এ সময় থেকে বাঙালি মুসলমানগণ ধীরে ধীরে ইংরাজি শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসর হতে থাকে। ইংরাজি শিক্ষিত মুসলিম যুবকেরা অনেকেই সরকারি চাকরি লাভ করে ও সে সাথে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এগিয়ে আসে। বাঙালি মুসলমানদের এ নবজাগরণের সূচনালগ্নে ও তার উত্তরণে মুসলমানদের পরিচালিত ও সম্পাদিত উপরোক্ত মাসিক সাপ্তাহিক ও দৈনিক সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ গুরুত্ব¡পূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সংবাদপত্রের এ গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে সংবাদপত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আরো বেশি দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলে সর্বদা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সক্ষম হন নি, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বিক জনকল্যাণের বিষয়কে তারা অনেকেই ব্যক্তিগত, দলীয় ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের নিকট জলাঞ্জলি দিয়ে থাকেন। এ নেতিবাচক আত্মহননের পথ থেকে সংবাদপত্র ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে, জনস্বার্থে ও জাতীয় স্বার্থে তাদেরকে সকল সংকীর্ণ স্বার্থ বিসর্জন দিতে হবে। সত্যকে সত্যরূপে এবং মিথ্যাকে মিথ্যারূপে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার সাহসী ভূমিকা পালনে সকলকে সদা-তৎপর থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা শুধু কোন বিশেষ শ্রেণীর জন্য নয়, সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য তা সমভাবে প্রযোজ্য। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়নিষ্ঠা ও জাতীয় স্বার্থ-চিন্তা আমাদের সকল সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান দিতে পারে এবং জাতীয় উন্নতি-অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এ কারণে সত্যনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ, সাহসী সংবাদপত্রের প্রয়োজন উত্তরোত্তর অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। 

দুর্ভাগ্যবশত, ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সর্বদাই সত্যনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও সাহসী সংবাদপত্রকে নিজেদের জন্য হুমকী মনে করেন। ফলে তাদেরকে প্রতিনিয়ত ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষু ও নৃশংস আচরণের শিকার হতে হয়। তবু অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় সংবাদপত্রকে তার স্বাধীন নিরপেক্ষ সত্যনিষ্ঠ সাহসী ভূমিকা অব্যাহত রাখার কোন বিকল্প নেই। কেননা, যেকোন সভ্য ও সম্ভাবনাময় জাতির অগ্রগতি অব্যাহত রাখার জন্য এটা অপরিহার্য। এজন্য বিজ্ঞজনেরা সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের পঞ্চম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ-অর্থাৎ আইন বিভাগ (Legislative), প্রশাসন (Administrative), বিচার (Judiciary), প্রতিরক্ষা (Defence)-রাষ্ট্রের এ গুরুত্বপূর্ণ চার স্তম্ভের পরে পঞ্চম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসাবে আখ্যায়িত করে থাকেন। রাষ্ট্রের অন্যান্য স্তম্ভ যখন অদক্ষতা, নিষ্ক্রিয়তা  ও অযোগ্যতার পরিচয় দেয়, তখন এ পঞ্চম স্তম্ভ সেগুলোকে যথাযথভাবে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে উৎসাহ, পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে থাকে। তাই জাতীয় উন্নয়নে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ