ঢাকা, মঙ্গলবার 3 March 2020, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ৭ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

রসুল (স.)-এর জ্ঞানালোক ও  আধুনিক দর্শন

 

আহমদ মনসুর:

জ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন “বিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকেই সমস্ত পৃথিবীতে নেমে আসে ভাঙ্গা গড়ার একটা প্রচণ্ড আবহ। অর্থনীতি, সমরনীতি, রাষ্ট্রনীতি, বিজ্ঞান সর্বত্র বৈজ্ঞানিক চিন্তার ধারার প্রভাবে মানুষের জীবন দর্শন ও মূল্যবোধ সম্পর্কে র্প্বুতন ধারণা ও প্রত্যয় বিপন্ন হয়ে যায়। ধ্বসে যায় মানবিক মূল্য চেতনার ভিত্তিভূমি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এ পরিস্থিতিকে করে তোলে আরও জটিল ও আসন্ন বিপর্যয় সম্ভব। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালপ্রবাহে আধুনিক মানুষের কাছে সনাতন মূল্যবোধ ও প্রবাহমান জীবন প্রত্যয় তাৎপর্য, ভেঙ্গে যায় পূর্বতন মানবিক প্রত্যয় ও প্রমূল্য।” এ সব তত্ত্ব ও মতবাদের প্রভাব বিস্তার লাভ করে সাহিত্য, দর্শন ও ধর্ম সব কিছুর উপরে। বিশেষ করে এর প্রভাব মানবিক প্রত্যয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ধ্বংস করে মানুষকে চরম অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারে ও সন্দেহের বিবরে নিক্ষেপ করেছে। আজ তাই কারো কারো মনে সন্দেহ জাগছে রসুলের জ্ঞান সীমা নিয়ে। বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় পুলকিত বিশ্ব বৈশ্বিক বিপন্নতার মাঝে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানের প্রিজম দিয়ে রসুল (স.)-এর জ্ঞানের বর্ণালীকে বিশ্লেষণের বৃথা প্রচেষ্টা চলছে। রসুল (স.)-এর হাদিসে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সূত্র ও আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনের তত্ত্ব অনুসন্ধানে যারা ব্যস্ত  তারা একটি মহাসত্যকে এড়িয়ে আংশিক সত্যের কাল্পনিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রসুল (স.)-এর জ্ঞান সীমাকে তুচ্ছতার সীমায় আবদ্ধ করার হীন চক্রান্তে লিপ্ত। 

এই বিশ্বসংসারে মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন মেধা ও প্রতিভা দিয়ে মানুষকে পাঠান হয়েছে। একই ব্যক্তির মাঝে বিভিন্ন জ্ঞানের সমাহার সাধারণ ঘটনা নয়।  তাইতো যুগ যুগ ধরে মানব সমাজে শত শত বৈজ্ঞানিক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, পরমাণুবিদ, জ্যোতির্বিদ, গায়ক, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, অর্থনীতিবিদ প্রভৃতি হাজারো ধরনের পেশার ও ধারার মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। প্রতিটি বিষয়ের বিশেষজ্ঞগণ তার ক্ষেত্র নিয়েই ব্যস্ত, অন্যের সীমানায় পদার্পণের সুযোগ বা সময় নেই। মানুষের এই বিচিত্র সংসারে নবী রসুলদের কর্মধারা আলাদা। তাঁদের আগমন ঘটেছে মানুষদেরকে হেদায়েতের পথে পরিচালনার জন্য,আল্লাহ প্রদত্ত ভারসাম্য পূর্ণ এক জীবন ব্যবস্থা বা দীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।  এ দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য যে ধরনের প্রচুর নির্ভুল জ্ঞানের প্রয়োজন, দেশ ও কালের চাহিদা অনুযায়ী সে জ্ঞান নবী রসুলদেরকে দিয়েই আল্লাহ তাঁদেরকে জগতে পাঠিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর ঘোষণা-

“তাদেরকেই আমি  কিতাব, বিচার শক্তি ও নবুয়্যত দান  করেছি। অতএব, যদি এরা আপনার নবুওয়ত অস্বীকার করে,তবে এর জন্য এমন সম্প্রদায় নির্দিষ্ট করেছি, যারা এতে অবিশ^াসী হবে না।” (আল আনয়াম- ৮৯। অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে-

আল্লাহ কাউকে কিতাব, হেকমত ও নবুওয়ত দান করার পর সে বলবে যে, ‘তোমরা আল্লাহকে পরিহার করে  আমার বান্দা হয়েও যাও’- এটা সম্ভব নয়। বরং তারা বলবে, ‘তোমরা আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও, ... ... 

“আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন রসুল পাঠিয়েছি এই পয়গাম সহ যে, আল্লাহর ইবাদত করো এবং খোদাদ্রোহী শক্তি থেকে দূরে থাক। (নাহল-৩৬) 

“তিনিই তার রসুল কে হেদায়েত ও সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তাকে অন্য সমস্ত ধর্মের উপরে বিজয়ী করেন। (আল ফাতহ- ২৮)।  

নবী রসুলদের এই  বিশেষ দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য যে ধরনের জ্ঞান ও যোগ্যতা প্রয়োজন ছিল তাই তাদেরকে দেয়া হয়েছিল। মহান রব্বুল আলামীন রসুল (স.)কে দেয়া জ্ঞান সম্পর্কে ঘোষণা করেন, “হে নবী ! আমি আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি। অতঃপর যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছিলাম, তারা একে মেনে চলে এবং এদেরও (মক্কাবাসীদের) কেউ কেউ এতে বিশ^াস রাখে। কেবল কাফেররাই আমার আয়াত সমূহ অস্বীকার করে। (৪৬)

আপনি তো এর পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করেননি, এবং স্বীয় দক্ষিণ হস্ত দ্বারা কোন কিতাব লিখেননি। এরূপ হলে মিথ্যাবাদীরা অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করত। (৪৭) ( আনকাবুত)। 

এই কিতাবের জ্ঞান ছাড়াও রসুল (স.)কে দেয়া হয়েছে অদৃশ্য জগতের জ্ঞান, যা নবুওয়্যতী দায়িত্ব পালনের জন্য একান্ত প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর ঘোষণা-

... ... ‘তোমাদেরকে সরাসরি অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞান দান করা আল্লাহ তায়ালার নীতি নয়। বরং এ কাজের জন্য তিনি নবীদের মধ্য থেকে কাউকে ইচ্ছামত মনোনিত করেন। কাজেই আল্লাহ ও তার রসুলের প্রতি ঈমান আনো।... ...” (আলে ইমরান-১৮৯)।

মানুষকে হেদায়েতের পথে পরিচালনার জন্য খোদার  পৃথিবীতে তার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য যে জ্ঞান দরকার তা সব কিছুই আল্লাহ তাঁর প্রিয় রসুলকে প্রদান করেছেন। এ বিরাট কাজের জন্য প্রয়োজন যে অদৃশ্য জ্ঞান, একমাত্র রসুল (স.)কেই তা প্রদান করা হয়েছে। মানুষের ঈমান প্রতিষ্ঠার সহায়তার জন্য প্রকৃতি জগতরূপ তত্ত্ব গ্রন্থের যে বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করা হয়েছে তা সরাসরি আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান, যে কারণে তা নির্ভুল ও বিশাল। 

নবী রসুলগণ ব্যতিত অন্য কাউকে ওহীর জ্ঞান দেয়া হয়নি। মানুষ জ্ঞান অর্জন করে অভিজ্ঞতা, যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ প্রভৃতির মাধ্যমে যা জ্ঞানের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রদানে ব্যর্থ। কিন্তু রসুল (স.)-এর প্রতি যে ওহীর জ্ঞান আল্লাহর পক্ষ থেকে  এসেছে তা নিশ্চিত ভাবে নির্ভুল ও তার সীমাও বিশাল। 

আধুনিক কালে জ্ঞান বিজ্ঞান যতই সামনে এগিয়ে আসছে ততই রসুল (স.)-এর জ্ঞানের বিশুদ্ধতা ও ব্যাপকতার ধারণা বিস্তৃত হচ্ছে। অবশ্য কিছু পণ্ডিতেরা রসুলের জ্ঞান তথা হাদিস শাস্ত্রের মধ্যে ভুল আবিষ্কারের চেষ্টা করে থাকেন। বিশ্বব্যবস্থাপনার পিছনে যে গভীর পরিকল্পনা রয়েছে তার প্রতি তারা দৃষ্টি না রেখেই বাহ্যিক ভাবে হাাদস বিশ্লেষণ করে রসুলের জ্ঞান সীমাকে সঙ্কুচিত ও সন্দেহজনক করে মানুষের সামনে পেশ করার চেষ্টা করেন। এ কাজে তারা রসুলের মানবীয় বৈশিষ্ট্যের প্রতি লক্ষ্য আরোপ করতে নারাজ। কিন্তু রসুল (স.) মানুষকে নির্ভুল ধারণা দিতে তার জ্ঞান সীমাকে স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রাকৃতিক জগতের একটি কাজের ফল উল্টা হলে সে প্রসঙ্গে রসুল বলেন “আমিও একজন মানুষ মাত্র। আমি তোমাদেরকে দীন সম্পর্কে যখন কোন আদেশ দেই, তা পালন কর। আর যখন নিজের ইচ্ছা থেকে কিছু বলি, তখন আমি একজন মানুষ বৈ কিছু নয়।- আমি আন্দাজে একটি কথা বলেছিলাম ঃ তোমরা আমার ধারণা-অনুমান ভিত্তিক কথা গ্রহণ করো না। অবশ্য আমি যখন খোদার তরফ থেকে কিছু বলি, তা গ্রহণ করো। কারণ আমি খোদার প্রতি কখনো মিথ্যা আরোপ করি না। নেহায়েত দুনিয়াবী ব্যাপারে তোমাদেরই জ্ঞান বেশি।”

নবী করীম (স.) স্পষ্ট করে বলেছেন যে-“যখন নিজের ইচ্ছা থেকে কিছু বলি তখন আমি একজন মানুষ বৈ কিছু নই।” এ কথা সত্য যে, নবী দীন সম্পর্কে যা বলেন তা নির্ভুল, গায়েব সম্পর্কে যা বলেন তাও নির্ভুল। কিন্তু এ ছাড়া বস্তু জগতের সাথে সম্পর্কিত তাঁর জ্ঞানকে সন্দেহাতীত ভাবে নির্ভুল মনে করা জরুরী নয়। তবে এ সব ব্যাপারেও নবীর জ্ঞানকে নির্ভুল মনে করা অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ, যিনি খোদার কাছ থেকে দীন সম্পর্কিত, গায়েব সম্পর্কিত নির্ভুল জ্ঞান লাভ করলেন তিনি নির্ভুল জ্ঞান উৎসের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।

যেহেতু নবী রসুলগণের প্রতি শুধুমাত্র কিতাবই নাজিল হয়নি বরং বিভিন্ন ভাবে তাদেরকে তাদের অন্তরকে হিকমাহ দিয়ে উজ্জ্বল করা হয়েছে, সে কারণে নবী রসুলদের জাগতিক জ্ঞানের বিশুদ্ধতা সাধারণ জ্ঞানের মানুষের বিশুদ্ধতা থেকে অনেক অগ্রবর্তী। 

রসুল (স.) যে জ্ঞানের ভা-ার বিশ^মানবতার সামনে উন্মোচন করেছেন তা প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে জন্ম দিয়েছে লক্ষ লক্ষ দার্শনিক, মুফাস্সির, মুহাদ্দিস, ফকীহ, উলামা, ও ইসলামী জ্ঞানের প-িত। এ সব ক্ষুদ্র জ্ঞান ধারা যে অসীম জ্ঞান ধার থেকে জন্ম নিয়েছে তা সবাই স্বীকার করে রসুল (স.)-এর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রকাশ করে আসছেন। 

রসুল (স.)-এর জ্ঞান সীমার অসীমতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা রসুলের জ্ঞানের সাথে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের তুলনা করে তার সত্যতা যাচাই করতে সক্ষম হই। এ ব্যাপারে দ’ুএকটি কথা নিয়ে আলোচনা করা যথেষ্ট না হলেও মুক্ত মনের চিন্তাশীলদের জন্য রসুলের জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে ধারণা অর্জনের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। 

প্রথমে শুরু করা যাক রাষ্ট্র চিন্তার ইতিহাস পর্ব নিয়ে। সমাজের উত্থান পতন সম্পর্কে রাষ্ট্র চিন্তার ইতিহাসে বিভিন্ন কথা বলা হয়েছে। মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে বিভিন্ন দার্শনিক রাষ্ট্রের উত্থান পতন তথা বিবর্তন ধারা নিয়ে প্রচুর আলোচনা করেছেন। কিন্তু একটি জাতি, সমাজ, রাষ্ট্রের একক ভাবে উন্নতি বা বিপর্যয় ঘটা সমাজ বিবর্তন ধারার বিরোধী কথা, তা সহজ ভাবে ফুটে উঠেছে রসুল (স.)-এর একটি সহজহ সরল হাদিসে। হজরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল (স.)-এর আদবা নামক একটি উটনী ছিল। দৌড় বা প্রতিযোগিতায় সেটাকে অতিক্রম করা যেত না বা পরাভূত করা যেত না। অবশেষে এক বেদুইন তার উঠতি বয়সের এক উটে চড়ে আসল। রসুল (স.)-এর উটনীর দৌড় প্রতিযোগিতায় সেটি আগে চলে গেল। মুসলমানদের নিকট বিষয়টি বেশ কষ্ট দায়ক অনুভূত হল। রসুল (স.) তা অনুভব করতে পারেলেন। তিনি বল্লেন, “আল্লাহর বিধান হল দুনিয়ার বুকে কোন জিনিস উন্নতি ও উচ্চ শিখরে আরোহণ করার পর আল্লাহ সেটাকে অবনমিত করেন। (বোখারী)। 

পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যাপারে এটি চরম সত্য প্রতিজ্ঞা। আমরা যদি রাষ্ট্রের উত্থান পতনের দিকে তাকাই তবে হাদিসটির সত্যতা এবং রসুল (স.)-এর জ্ঞানের গভীরতার এক ব্যাপক ধারণা আমাদের মাঝে পয়দা হয়।

ইতিহাসের মুখবন্ধ পুস্তকে ১৩ শত শতাব্দীতে ইবনে খলদুন রাষ্ট্রর উত্থান পতন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে বলেছেন, যে কোন রাষ্ট্র তিন যামানার বেশি টিকে না। তার অর্থ একটি যামানাকে ৪০ বৎসর ধরলে ১২০ বৎসরের বেশি একটি রাষ্ট্র তার সকল গৌরব নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। ইবনে খলদুনের প্রায় এক শতাব্দী পরে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সূচনায় নিকোলো ম্যাকিয়াভেলী তার ইতিহাস চেতনার অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করেন যে, ইতিহাস পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনের ধারা চক্রাকারে আবর্তিত হয়। তিনি সরল রেখাকৃতি একটানা ঊর্ধ্ব বা নিম্নগামী পরিবর্তনের প্রবণতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তার মতে রাষ্ট্রের উত্থান পতন ঘটে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। তিনি মনে করেন মূল রূপে প্রত্যাবর্তনের প্রবণতার মধ্যে রাজনৈতিক মুক্তি সূচিত হয়। ম্যাকিয়াভেলীর মত ফরাসী দার্শনিক জাঁ বোঁদা রাষ্ট্রের উত্থান পতনের স্বাভাবিক গতি ধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। ধ্বংস এবং ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে বিবর্তন বা ক্রম বিকাশের একটি ধারণা বোঁদার দার্শনিক প্রত্যয়ের ভিত্তি মূলে ব্যাপ্ত ছিল। তিনি মনে করেন, মানুষের জীবনের মতো রাষ্ট্রের ক্ষয় এবং ধ্বংস অনিবার্য। এই ক্ষয় এবং ধ্বংসের মধ্য দিয়েই অব্যাহত থাকে রাষ্ট্রের উন্নতি ও প্রগতির ধারাবাহিকতা। 

বিশ্ব স্রষ্ট্রা রাব্বুল আলামীনের ইতিহাসের গতি বৈচিত্র্য নিয়ন্ত্রণের বিধান অনুযায়ী অবিরাম ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়েই সমাজ জীবন অতিক্রম করছে। এই দ্বন্দ্ব শাশ্বত এবং ইহা সৃষ্টির গতির বৈচিত্র্যের কারণ। এই গতি বিচিত্রতার অন্যতম উদ্দেশ্য আল্লাহর প্রতি ঈমানের পরীক্ষা গ্রহণ। তাই আল্লাহ ইরশাদ করেন, “তিলকাল আইয়ামু নুদায়েলুহা বাইনান নাস -আর আমি এ দিন গুলিকে মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন ঘটিয়ে থাকি। এ ভাবে আল্লাহ জানতে চান কারা ঈমানদার। ( আল ঈমরান)। 

প্রকৃতি রাজ্যেও এই শাশ^ত বিধানকে ভাববাদী দার্শনিক হেগেল তার দ্বান্দি¦ক ভাববাদ এবং বস্তুবাদী দার্শনিক মার্কস দ্বান্দি¦ক বস্তুবাদের ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করে তার আলোকেই ইতিহাসের ব্যাখ্যায় এগিয়ে আসেন। যদিও হেগেল ও মার্কসের দ্বান্দি¦ক ত্রয়ীন্বয়, অন্বয়, ও সমন্বয় ইতিহাসের গতি বৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ তবু এ গুলি রসুলের জ্ঞানগর্ভ বাণীর ব্যাখ্যায় অনেকটা সহযোগিতা করে। 

ইতিহাসের গতি বিশ্লেষণের পাশাপাশি রসুল (স.) মানব চরিত্র বিশ্লেষণের যে ধারণা মানুষকে উপহার দিয়েছেন তা জীবন দর্শনের এক বিরাট জ্ঞানসমূদ্র। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল (স.) এরশাদ করেন, “সেই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন, তোমরা যদি গুনাহ না করতে তা হলে আল্লাহ তোমাদের তুলে নিয়ে যেতেন এবং তোমাদের জায়গায় এমন এক জাতিক আনতেন, যারা গুণাহ করে আল্লাহর কাছে মাফ চাইতো, অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে মাফ করে দিতেন।”

এ হাদিস খানিতে একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, সে সর্বদা বিনয়ী হয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পিত হবে। ঔদ্ধত্য নয়, বিনয়ী হয়ে অপরাধের স্বীকৃতি প্রদান করে অপরাধ থেকে বিরত থাকার প্রচেষ্টা চালান প্রকৃত মুমিনের কাজ। একটি জাতির বেঁচে থাকার মূল শক্তি ন্যায় অন্যায় বোধে উজ্জীবিত হয়ে অন্যায় থেকে বেঁচে থাকা। যারা ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য অনুধাবন না করে শুধু মাত্র অন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে চায়, সে সমাজ ধ্বংস হতে বাধ্য। এ ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা- “তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নেও তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। এ ব্যাপারে তারা তোমাদের মত হবে না।”  

উপরে বর্ণিত হাদিস খানায় মানব চরিত্র সম্পর্কে কোরআনের শিক্ষাই প্রতিধ্বণিত হচ্ছে। কোরআনে সুস্পষ্টভাবে এরশাদ হয়েছে- “মানব প্রকৃতির ও সেই সত্তার শপথ, যিনি উহাকে সুবিন্যস্ত করেছেন। উহার পাপ ও উহার সতর্কতা (তাকওয়া) তাহার প্রতি ইলহাম করেছেন।” এই আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে,আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি কালেই মানুষের প্রকৃতিতে পাপ ও পুণ্যের উভয়ের প্রবণতা ও ঝোঁক রেখে দিয়েছেন।  যে কারণে মানুষ পাপ ও পুণ্য উভয় ধরনের কাজ করতে সক্ষম। তবে যারা এই কর্ম স্বাধীনতার কারণে পাপে পতিত হবার পরেও ফিরে আসবার যোগ্যতা রাখে তারাই প্রকৃত খাঁটি বান্দা।

রসুল (স.)-এর উপরোক্ত হাদিস খানাতে একটি গভীর দার্শনিক দিক ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষকে তাঁর খলিফা হিসেবে কাজ করতে হবে বলে তাকে কার্যে স্বাধীনতার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন তা হলে মানুষ কখনই ভুল করতে পারত না। কিন্তু তিনি চাননি যে, মানুষ পুণ্য কাজে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে পরিণত হোক। যে সৃষ্টির সেরা, বাধ্যতামূলক ভাবে সে ধার্মিক হলে তার শ্রেষ্ঠত্ব থাকে না। তাই শ্রেষ্ঠত্ব তো তার জন্যই যে স্বয়ংক্রিয় ভাবে নয় বরং জ্ঞান ও হিকমাহ প্রয়োগ করে স্বাধীন ভাবে কাজ করবে। ভুল হবার উপলব্ধি হলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। মানুষকে এই স্বাধীনতা প্রদান, আবার মানুষের অন্যায়কে ক্ষমা করা উভয়ই আল্লাহর দয়ারই রূপ মাত্র। তাই যারা আল্লাহর প্রদত্ত বিধানেরর আওতায় কাজ করবে স্বাধীন ভাবে, আবার ভুল হলে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসবে তারাই  যোগ্য মুসলিম। এমন বান্দারা পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখে। 

রসুল (স.)-এর পবিত্র হাদিস খানাতে মানব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ও একটি জাতির স্থায়িত্বের মূল শক্তির উ’ৎসের সন্ধান দেয়া হয়েছে। সে সত্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান দর্শন ক্লান্ত। কোন কোন দার্শনিক মানব চরিত্রের একটি দিক দেখেই মানুষ সম্বন্ধে এমন ধারণা পোষণ করেছেন যা মানবতার জন্য অপমানজনক। যেমন মেকিয়াভেলী মানুষকে অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল, ভীরু, শঠ ও লোভী রূপে চিহ্নিত করেছেন। তিনি আরও মনে করেন যে, স্বাধীন ভাবে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্মুখীন হলে দেখা যায় বিভ্রান্তি এবং বিশৃঙ্খলা মানুষকে আচ্ছন্ন করে।। ভালর চেয়ে মন্দের দিকে তার প্রবণতা অধিক। বাধ্য না হলে মানুষ  সুপথে পরিচালিত হয় না। ম্যাকিয়াভেলীর এ দর্শনে মানুষ সম্পর্কে এক জড়বাদী ধারণা পেশ করা হয়েছে। যে কারণে তিনি শাসককে সিংহের মত বলবান এবং শৃগালের মত ধূর্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। 

মানুষের স্বভাব সম্পর্কে বুর্জুয়া ফরাসী দার্শনিক কেলভীনের ধারণা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। তিনি মনে করেন মানুষ পুরাপুরি খারাপ। সে এতই খারাপ যে, অপরের উপকার তো দূরের কথা উপকারের চিন্তাও করতে পারে না। সুকাজ যদিও বা তার আচরণে প্রকাশ পায় তা হলে সেটা ভ-ামী ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্তরে অন্তরে এক দুর্বৃত্ত সে। কেলভীনের এ ধারণাই আচরণ এবং নীতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশাসনের উপরে অত্যধিক জোর দিয়েছেন। তার নিয়ম ভঙ্গের শাস্তি ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর। যে কারণে একটি নিষ্ঠুর সমাজ উপহার দেয়া ছাড়া তিনি আর কিছুই দিতে পারেননি। 

ম্যাকিয়াভেলী ও কেলভীনের চিন্তার বিপরীত মানুষের স্বভাব সম্পর্কে একটি ভারসাম্য চিন্তা পেশ করেন ষোড়শ শতাব্দীর অন্যতম রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা নায়ক  ফ্রান্সিসকো সুয়ারেজ। তাঁর বিশ^াস, সমস্ত প্রকৃতি জুড়ে এবং মানুষের স্বভাবে এমন কতগুলি নীতি বিদ্যমান যা কোন ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত আচরণের প্রেরণা, আবার কোন ক্ষেত্রে অন্যায় আচরণের প্ররোচনা। সুতরাং ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য ঈশ^রের খেয়াল খুশির ফলশ্রুতি বলে তিনি মনে করেন না। 

ষোড়শ শতাব্দীর ফরাসী দার্শনিক জ্যাঁ বোঁদা মানুষের স্বভাব সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলীর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তিনি মানুষের স্বভাব সম্পর্কে প্রচলিত নৈরাশ্যমূলক ধারণার মূলে আঘাত হানেন। মানুষের ভবিষ্যৎ যে আশাব্যঞ্জক এবং মানুষ যে প্রগতির অভিমুখে ধাবিত এসব মত প্রকাশ করে রসুল (স.) কর্তৃক প্রচারিত ‘ লাক্কাদ খালাক্নাল ইনসানা  ফি আহসানি তাক্ওিম’- মানুষের চরিত্র সম্পর্কে প্রকাশিত এ তথ্যের স্বীকৃতি প্রদান করে দেখালেন যে রসুল (স.)-এর অন্তরে সমস্ত দার্শনিক জ্ঞান আল্লাহ তায়ালা প্রদান করেছিলেন। আর সেই জ্ঞানই হিকমাহ নমে পরিচিত। 

রসুল (স.)-এর জ্ঞানের বিশালতা ফুটে উঠেছে আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ইতিহাসে। র্প্বূ-নিবর্ন্ধতার তত্ত্ব (Doctrine of predetermination) বিশেষ ভাবে আলোচিত হওয়ায় প্রমাণ হয়েছে যে, রসুল (স.) প্রদত্ত তকদীর বাদ পূর্ব- নির্বন্ধতার তত্ত্বের সমস্ত ত্রুটির উর্ধ্বে বিরাজ করছে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  দার্শনিকরা পূর্ব- নির্বন্ধতার তত্ত্বের যে ধারণা

পেশ করেছেন তা খুবই ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু এ সব তত্ত্বের মোকাবেলায়  রসুল (স.) প্রদত্ত র্প্বূ- নির্বন্ধ বা ‘তাকদীর’ -এর যে ধারণা পেশ করা হয়েছে  তা অনেক ঊর্ধ্বের ও পূর্ণতা প্রাপ্ত।

ফরাসী দার্শনিক কেলভীনের রাষ্ট্রচিন্তার মূল ভিত্তি তার পূর্ব- নির্বন্ধতার তত্ত্ব এবং মানুষের সম্পর্কে নৈরাশ্যবাদী ধারণা যা ইতিপূর্বে আলেচিত হয়েছে। তার মতে পূর্ব -নির্বন্ধতার উৎস হল আল্লাহর ইচ্ছা যা এক অনমনীয় নিয়ম দ্বারা মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রিত। খোদা প্রদত্ত এই নিয়ম মেনে চলা ছাড়া মানুষের আর বিকল্প নেই।

কেলভীনের পূর্ব-নির্বন্ধতার এই ধারণা একটি দেশের জনসধারণকে তার শাসকদের প্রতি নিষ্ক্রিয় আনুগত্য করার শিক্ষা দেয়। ফলে নাগরিকগণ শাসকদেরকে আল্লাহর প্রতিনিধি মনে করেন এবং ন্যায় অন্যায় সর্বক্ষেত্রে শাসকদের প্রতি প্রজাদের বাধ্য থাকার কর্তব্যকে অপরিহার্য মনে করে। এতে সমাজে শান্তি থাকে না। বরং শাসককুলকে আরও অত্যাচারী হতে সাহায্য  করে। কেলভিনের পূর্ব -নির্বন্ধতার তত্ত্ব সমকালীন বিকাশশীল পূুঁজিবাদী অর্থনীতির ধর্মীয় অভিব্যক্তি। 

বিপরীত পক্ষে পূর্ব-নির্বন্ধতার তত্ত্বকে ইসলামে তাকদীর বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা মানুষকে একটি প্রত্যয়শীল ও সত্যের প্রতি আনুগত্যশীল সত্তায় প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে। তকদীর সম্পর্কে রসুল (স.)-এর বাণী হজরত আলী থেকে বর্ণিত, রসুল (স.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার স্থান জাহান্নাম অথবা জান্নাতে পূর্ব থেকে নির্ধারিত হয়নি। লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রসুল! তা হলে আমরা আমাদের ভাগ্যলিপির উপরে নির্ভর করে আমল ছেড়ে দেই না কেন? রসুল (স.) বললেন, আমল করে যাও। যাকে যেটার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সে সেটা করার সামর্থ লাভ করবে। যে ব্যক্তি সৌভাগ্যবান সে সৌভাগ্যের কাজ করার শক্তি পাবে। আর যে ব্যক্তি দুর্ভাগ্যবান সে ব্যক্তি দুর্ভাগ্যের কাজ করার শক্তি পাবে।

রসুল (স.)-এর হাদিসটি মানুষের কর্মোদ্দীপনা যোগায়। তাকদীরের উপর নির্ভর করে কর্ম থেকে বিরত থাকা এক ভুল সিদ্ধান্ত। এমন আশা করাটাই বিবেক সম্পন্ন যে, যেমন কাজ হবে ফসল হবে তার অনুরূপ। রসুলের এ হাদিসখানা মানব জীবনের এক বিরাট রহস্যময় অনাবৃত দিককে উন্মোচন করে মানুষকে কর্মের তাগাদা দিয়ে তাকদীরের ব্যাপারে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তাগিদ দিয়েছে। কারণ, এ এমন এক নিগুঢ় রহস্য যা উন্মোচন করা মানব জ্ঞানের বাইরে এবং যে রহস্য অবগত হওয়া মানব জীবনের যাত্রাপথে অপ্রয়োজনীয়ও বটে। রসুল (স.) ফরমান, নিষ্প্রয়োজন ও অসংলগ্ন ব্যাপার এড়িয়ে যাওয়া ইসলামের জন্য কল্যাণকর। 

পুর্ব-নির্বন্ধতার তত্ত্ব বা তাকদীর নিয়ে প্রাচীন কাল থেকে মেটাফিজিক্যাল জগতের বিভিন্ন দার্শনিক বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। যেমন আমরা দেখতে পাই সক্রেটিস ইচ্ছার স্বাধীনতা, প্লেটো মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নিবারণ ক্ষমতা সমর্থন করেছেন। এরিষ্টটল ইচ্ছাকৃত ও বাধ্যতামূলক কাজে পার্থক্য দেখিয়ে মানুষকে কিছুটা স্বাধীন এবং কিছুটা অধীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। আবার কান্ট, ফিক্টে, এবং হেগেলের মত বড় বড় দার্শনিকগণ স্বাধীনতার দিক বেশ ঝোঁক প্রকাশ করেছেন। এদের মোকাবেলায় হবস বলেন, মানুষ নিজের সহজাতপ্রবৃত্তি ও স্বভাবের হাতে পুরাপুরী বন্দী ও বাধ্যগত। ডেকাটের্  যিনি মন ও দেহকে অথবা আত্মা ও বস্তুকে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস বলে মনে করেন, তিনি বস্তু জগতের সর্বত্র কেবল অক্ষমতা ও অধীনতাই ক্রিয়াশীল দেখতে পান। দার্শনিক লক ইচ্ছার স্বাধীনতাকে নিরর্থক এবং ডেকার্ডের দর্শনে যে স্বাধীনতাবাদের বক্তব্য পায়ো যায় তাকে ভ্রান্ত বলেন। এ ভাবে অধীনতাবাদের সমর্থনে মতামত প্রকাশ করেন ডারউইন, রাসেল, ওয়াসেল ও তার অনুগামীরা উত্তরাধিকার বিধান বা Laws of Heredity  প্রকাশ করেন। 

পশ্চিমা দার্র্শনিকদের পূর্ব-নির্বন্ধতার তত্ত্ব ইসলামের তাকদীর বাদ থেকে অনেক আলাদা। তবে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলী পূর্ব-নির্বন্ধতত্ত্ব সম্পর্কে যে কথা বলেছেন তাতে রসুল (স.)-এর তাকদীর সম্পর্কিত হাদিসের মর্মবাণী আংশিক প্রতিধ্বনিত হয়েছে।  তিনি বলেন, ‘এ আমার খুব জানা, বহু লোক এ পর্যন্ত বলে আসছেন এবং এ’মতে বিশ্বাস করেন যে পার্থিব ঘটনাবলী সৌভাগ্য এবং ঈশ্বরের দ্বারা এমন ভাবে নিয়ন্ত্রিত যে জ্ঞান বুদ্ধি প্রয়োগের দ্বারা মানুষ তার কোন পরিবর্তন করতে পারে না এবং তার বিরুদ্ধে কোন প্রতিকারও নেই বলে তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা অর্থহীন। সুতরাং ঘটনাবলী দৈবের কাছে সপে দেয়া হোক। সমকালীন এ অভিমত প্রবল, যে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে বা দৈনন্দিন জীবনে ঘটেছে তা পূর্ব থেকে অনুমান করা মানুষের অসাধ্য। যখন এসব কথা ভাবি, তখন সময়ে সময়ে আমিও এ মতের অংশীদার হই। যা হোক, যাতে আমাদের মুক্ত ইচ্ছা সম্পূর্ণ ভাবে নির্বাপিত না হয় ( তার জন্য আমি মনে করি যা সত্য হতে পারে তা হল আমাদের আচরণের অর্ধেকটা চালিত হয় সৌভাগ্যের দ্বারা, কিন্তু অপর অর্ধেক সে আমাদের দ্বারা চালিত হতে দেয়। তাকে তুলনা করব একটা অশান্ত নদীর সঙ্গে যখন সে বিক্ষুব্ধ অবস্থায় সমতল ভূমি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। গাছপালা বাড়ি ঘর উপড়িয়ে ফেলে, এ পারের মাটি ও পারে স্তুপাকার করে, প্রত্যেকেই পালিয়ে যায় এর সামনে থেকে, প্রতিরোধ অক্ষম যাবতীয় বস্তু তার রোষের কবলে পড়ে, তবু সে যখন শান্ত থাকে মানুষ তার বিরুদ্ধে বাঁধ নির্মাণ করতে পারে এবং রাস্তা উচু করে বাঁধাতে পারে  যাতে কোন খানে গিয়ে পড়তে পারে অথবা তীব্র বেগ এতটা উদ্দাম ও ভয়ঙ্কর না হয়ে উঠতে পারে।  ঠিক একই রকম হল সৌভাগ্য। তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ব্যবস্থা না করা হলে সে তার ক্ষমতা প্রদর্শন করে এবং সে জানে তার বিরুদ্ধে কোন বাঁধ বা আত্মরক্ষামূলক প্রাচীর নির্মিত হয়নি, সেখানে তার রোষ চালিত করে।” (prince ch.xxv p.91) 

রসুল (স.)-এর পূর্বে কত জ্ঞানী এ জগতে এলেন, এলেন কত শত তাফসীরকারক, মুহাদ্দিস, ফকিহ, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, মনোবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইত্যাদি। তাঁরা রসুলের হাদিস নিয়ে চিন্তা গবেষণা করেছেন, ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেউই তাঁর জ্ঞান সীমাকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়নি, আর হবেও না কোন দিন। কারণ প্রভু তাঁকে বিশ^ জ্ঞান ভা-ারের চাবি কোরআন ও হিকমাহ দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং রব্বুল আলামীন। অনন্ত অসীম জ্ঞানাধার তাঁর জ্ঞানের উৎসমুল। তাই তাঁর জ্ঞানের সাথে সীমিত জ্ঞানের অধিকারী মানুষের জ্ঞান তুলনা করা ও প্রচেষ্টা জ্ঞানের ক্ষেত্রে নেহায়েত পরিশ্রমী পদচারণা ব্যতিত কিছু নয়। আজ যারা মানবতাবাদ, বস্তুবাদ, জড়বাদ, প্রকৃতিবাদ সহ বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করে মুক্তির পথ খুঁজে বেড়ায় তারা যদি উদার চিত্তে রসুলের জ্ঞানের অতলান্ত পরাবারে ঝাঁপ দিতেন তা হলেই তারা সামনে দেখতে পেতেন সমৃদ্ধ ও মুক্তির রত্নরাজী, প্রশস্ত, উজ্জ্বল ও সহজ পথ সিরাতুল মুস্তাকীম। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ