ঢাকা, মঙ্গলবার 3 March 2020, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ৭ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও কাজী নজরুল ইসলাম

আখতার হামিদ খান: নজরুল ইসলামের কবিখ্যাতি আজ সর্বজনবিদিত, এমনকি বহির্বিশ্বেও বহু ভাষায় ব্যাপ্ত। কেননা, বাংলা সাহিত্যের বিপ্লবাত্মক কাব্যচেতনার তিনি প্রধানতম কবি। যদিও এটিই তাঁর প্রধান পরিচয় নয়। তিনি শুধু কবিতাতেই বিপ্লব-বিদ্রোহের কথা উচ্চারণ করেননি। সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যম-প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও সঙ্গীতেও তাঁর বিপ্লবাত্মক চেতনার বিপুল উপাদান ছড়িয়ে আছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, তাঁর অনন্য মৌলিক কীর্তির বিশ্লেষণ এ যাবৎ আমরা খুব কমই করতে পেরেছি। তাই দ্রষ্টব্য, তাঁর জীবন ও সাহিত্য কর্মের গবেষণায় এ যাবৎ বিষয় ও বক্তব্য প্রাধান্য পেয়েছে কম, বরঞ্চ কোন রচনা কোথায়, কার অনুরোধে কখন রচিত এবং কে তা উদ্ধার করেন এই বিতর্কেই অর্ধশতাধিক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে।

নজরুল নিছক রস সঞ্চারের জন্য সাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করেননি। জাতির প্রতি তাঁর একটি কমিটমেন্ট ছিলো। দেশকে বিদেশী শাসকদের হাত থেকে মুক্ত করা, গরিব মানুষের-শ্রমজীবী দেশবাসীর অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে অত্যন্ত সচেতনভাবেই আত্মনিয়োগ করে ছিলেন তিনি। বলতে কি, একবারে শূন্য হাতে শুরু হয়েছিলো তাঁর এই সংগ্রাম কলম ছিলো একমাত্র সঙ্গী। করাচির সেনানিবাস থেকে ছাড়া পেয়ে স্থায়ীভাবে কলকাতা এসে সরকারি চাকরির সুযোগ উপেক্ষা করে, সচ্ছল অর্থনৈতিক জীবনের হাতছানিকে মাড়িয়ে অনিশ্চিত সংগ্রামী জীবন-ই বেছে নিলেন কবি। দেশকে মুক্ত করার জন্য কেবল বিদ্রোহ ও সশস্ত্র সংগ্রামের কথাই বললেন না, সমাজের কুসংস্কার-বন্ধন, জরা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও মৌলবাদীদের ফতোয়াবাজির মর্মমূলেও কুঠারাঘাত করলেন।

‘আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, নজরুল চর্চা মানে কেবল জন্মজয়ন্তী পালনকে বোঝায় না। অথবা নজরুলের গানের প্রসার দ্বারাও নজরুল চর্চার ব্যাপকার্থের প্রতিনিধিত্ব দাবি করা চলে না।’

বাঙালি মুসলমান এই নজরুল ইসলামের রচনাতেই সেদিন প্রথম দেখতে পেয়েছে যে, তার মাতৃভাষা বাংলার সঙ্গে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফের ভাষা আরবি একই সঙ্গে উচ্চারিত হতে পারে। তার উপর সমকালে একমাত্র মুসলমান লেখক ছিলেন নজরুল ইসলাম, যে তাঁর স্বজাতি ও স্বধর্ম সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে দায়িত্বশীল থেকেও চূড়ান্তভাবে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তাঁর এসব ভূমিকা, সেইসঙ্গে সাম্যবাদী ধারার রাজনৈতিক আদর্শ, দলিতের মুক্তির ঘোষণা অথবা ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে হাইদরী হাঁক ১৯৪২ সালে কবির অসুস্থতার সঙ্গে সঙ্গেই যেন মিইয়ে গেল। এর কারণ যে কি, তার বহুরূপ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হতে পারে। তবে আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভীতি-অনিশ্চয়তা এবং যুদ্ধোত্তর দেশভাগের নানা সংকট, মধ্যবিত্ত বাঙালি, বৈশিষ্ট্যে যে আত্মকেন্দ্রিকতার সমাজে কবিকে নিয়ে ভাবার সময় সুযোগ খুব একটা হয়নি। কিন্তু দেশ ভাগের ২/৩ বছরের মধ্যে এইসব ঝক্কি-ঝামেলা কেটে যাবার পর বাঙালি সত্যি আর ত্রিশের দশকের মতো কবিকে নিয়ে মেতে উঠলো না। সমকালের বাঙালি নেতৃত্ব বা নজরুলপ্রেমীরা কোন অবস্থাতেই এই ভূমিকার জন্য ধন্যবাদর্হ নন।

চুরুলিয়ার দুখু মিঞা বালক বয়সে যে একদিন গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া অজয় নদীর প্রবাহের মতো জীবনকে জয় করতে বেরিয়ে ছিলো, সে আজ বাংলাদেশের জাতীয় কবি। বাঙালি জাতিসত্তার এক মহিমান্বিত মহানায়ক। জাতিসত্তার প্রভাবকে যে সীমান্ত কখনো বিপন্ন করতে পারে না তারও প্রমাণ নজরুল ইসলাম। এই নজরুল আজ তাই বাংলাদেশ ও ভারতের-পশ্চিমবাংলা, আসাম, ত্রিপুরা ও বিশ্বের সব প্রবাসী বাঙালির জাতীয় কবি।

এখানে উল্লেখ করা অপরিহার্য যে, বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবাংলা, আসাম, ত্রিপুরাসহ বিশ্বের প্রায় ত্রিশ কোটি বাঙালির অধিকাংশেরই সাহিত্য ও সাহিত্যিক সম্পর্কে, সাহিত্যিকের কর্তব্যবোধ সম্পর্কে স্বচ্ছ কোন ধারণা নেই। কারণ, ভূমিহীন নিরন্নের ক্ষেত্রে অশিক্ষা এবং উচ্চবিত্ত সমাজে সাহিত্য মার খায় বিত্তের জৌলুসের কাছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজেই মূলত সাহিত্য রচয়িতা ও ভোক্তার উপস্থিতি। কিন্তু সংখ্যায় এই শ্রেণীটি নগণ্য, ত্রিশ কোটির এক-তৃতীয়াংশেরও কম। নিম্নবিত্ত-অশিক্ষিত, জীবিকাই যার জীবন সংগ্রামের প্রধান ধর্ম, তার কাছে সাহিত্য তেমন কোন অপরিহার্য বিষয়ই নয়। সেই বাঙালি সমাজে আপামর হয়ে এই যে উঠে এলেন নজরুল ইসলাম। তার মূলে যতটা না ক্রিয়াশীল তাঁর সাহিত্য, তার চেয়ে বেশি তাঁর রাজনৈতিক-সামাজিক ভূমিকা ও সঙ্গীতের যুগান্তকারী আবেদন। নজরুল নিজেই বলেন, ‘অশিক্ষিত বাঙালি যে লিখতে পড়তে জানে না, সে গান বোঝে।’ সঙ্গীতের মাধ্যমেই তিনি তাদের জাগিয়ে তোলার ব্রত গ্রহণ করেন। সাহিত্যকে এই যে গণমুখী করে তোলা, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া- বাংলায় আর কোনো লেখকের কলমের এমন ধার সেদিন পরিলক্ষিত হয় না।

রবীন্দ্র যুগে, বাঙালি যখন তাঁর কলমের ঐশ্বর্যে গৌরবান্বিত। তখন নজরুলের উত্থানপর্বটি অনায়াস সাধ্য ছিলো না। কিন্তু প্রবল বিক্রমে নজরুল উঠে এলেন, রবীন্দ্রবলয়ের বাইরে সাহিত্য-সাংবাদিকতায় বিপ্লবাত্মক বিদ্রোহ চেতনার নতুন ধারা সৃজন, যুগ মনষ্কতার বিচারে যা রেঁনেসাসরূপী, নজরুলের এই স্বাতন্ত্র্য ও যুগ¯্রষ্টার গৌরবকে কেউ অস্বীকার করতে পারলেন না। রবীন্দ্রনাথও করেননি। বরং অসীম মমতায় অদ্যোপান্ত অনুপ্রাণিত করেছেন নজরুলকে। 

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে নজরুলকে বা নজরুল প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে টেনে আনা দূরভিসন্ধিমূলক। কারণ রবীন্দ্রনাথ নিজেই এই বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে গেছেন। ‘ধূমকেতু’ মামলায় কারারুদ্ধ তরুণ নজরুলকে ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি উৎসর্গ করে তার একটি কপি কারাগারে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘নজরুলকে আমি ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাঁকে ‘কবি’ বলে সম্বোধন করেছি। জানি তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এটা অনুমোদন করতে পারনি। আমার বিশ্বাস তারা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছে। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করনি, অবজ্ঞা ভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র। ... কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না, এও তোমাদের আবদার বটে। সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা অসির ঝনঝনায় যখন সেখানে ঝঙ্কার তোলে, ঐক্যতান সৃষ্টি হয়, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি! আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও এই সুর বাজত। .... আমি তাকে সমস্ত অন্তর দিয়ে অকুণ্ঠে আর্শীবাদ জানাচ্ছি। আরো বলো, কবিতা লেখা যেন কোন কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জোগাবার কবিও তো চাই।’

রবীন্দ্র-নজরুলকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারীদের মতো আরেকটি মহল নিজের মাথায় পাথর ভাঙ্গার মতো রবীন্দ্র ছায়ায় অবস্থান করেও রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও বিতর্কে লিপ্ত হয়। বাঙালি সমাজের এইসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহলের উদ্ধত অনাচার অতীতের সকল মাত্রাকে অতিক্রম করে। বিশ্বচেতনায় ধার বা আত্মসাতের কোন প্রশ্নই আসে না। চেতনাগত সাদৃশ্য থাকতেই পারে। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ বা ‘ঘরে-বাইরে’র মধ্যে এই সাদৃশ্য যদি পরিলক্ষিত হয়ই, তাতে দোষটা কি তা কেউ স্পষ্ট করে বলছেন না। আবার একথাও বলছেন না যে, রবীন্দ্রনাথ এগুলো অনুবাদ করে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন।

একইভাবে ‘বিদ্রোহী’ রচনার পর নজরুলকে নিয়েও টানা-হেঁচড়া কম হয়নি। কবি মোহিতলাল ছিলেন এই অনাসৃষ্টির হোতা। অথচ ‘মোসলেম ভারতে’ এই নজরুলের কবিতা পড়েই মোহিতলাল প্রথম বাংলা সাহিত্যের স্বারশ্বত ম-পে নজরুলকে স্বাগত জানিয়ে ছিলেন। একইভাবে ‘সবুজপত্রে’র প্রমথ চৌধুরী কর্তৃক নজরুলের অমনোনীত লেখাটি পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমে পেয়ে এবং ছেপে যে ‘প্রবাসী’ আরো চাই বলে মন্তব্য করেছিলো, হিন্দু রমণী প্রমীলাকে বিয়ে করায় সেই ‘প্রবাসী’সহ আরো কয়েকটি পত্রিকা চিরতরে নজরুলকে অপাঙক্তেয় ঘোষণা করে। আর কোনদিনই এরা নজরুলের লেখা ছাপেনি।

মৌলবাদী ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কলম ধারণ করায় শুরু থেকেই ‘মোহাম্মদী’ নজরুল ইসলাম ও ‘সওগাতে’র অব্যাহত নিন্দাবাদ করেছে। ‘সওগাত’ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন তাঁর ‘সওগাত-যুগে নজরুল ইসলাম’ গ্রন্থে জানাচ্ছেন, পশ্চাৎপদ ধ্যান ধারণার লালন ও প্রগতিবাদের বিরোধিতার কারণে বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষুন্ন হতে থাকায়- এক পর্যায়ে মোহাম্মদী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আপোষ করতে বাধ্য হয় এবং নজরুল ইসলামের লেখা ছেপেই সেদিন পত্রিকাটি তাঁর পড়ন্ত বাণিজ্যিক অবস্থাকে চাঙ্গা করে তোলে। এ প্রসঙ্গে ‘নজরুল এছলাম’ শীর্ষক মাসিক ‘মোহাম্মদী’র পঞ্চম বর্ষ, দ্বাদশ সংখ্যা ১৯৩২-এর সম্পাদকীয় প্রতিবেদনটি প্রাণিধানযোগ্য। দীর্ঘ প্রায় এক দশক অব্যাহতভাবে নজরুল ইসলামের বিরোধিতা ও নিন্দাবাদের পর দীর্ঘদিনের অনাচারকে ‘মোহাম্মদী’ তীব্র অভিমান হিসাবে উল্লেখ করে বলছে, ‘কবি ও সাহ্যিতিক হিসাবে নজরুল এছলাম বিপুল খোদাদাদ শক্তির অধিকারী, একথা বোধহয় কেহ অস্বীকার করিতে পারিবে না। তাঁহার প্রতিভা ও শক্তিমত্ততার প্রতিষ্ঠায় যে আনন্দ ও গৌরব, তাহা উপভোগ করার জন্য আমাদের প্রাণও দীর্ঘকাল হইতে ব্যাকুল হইয়াছিল। কিন্তু নিরঙ্কুশভাবে তাহা ভোগ করিবার সুযোগ আমাদের ভাগ্যে ঘটিয়ে উঠে নাই, তাহা নজরুলের প্রতি আমাদের এবং আমাদের ন্যায় অধিকাংশ সমাজ সেবকের একটা তীব্র অভিমান ছিল। .... এছলামের আদর্শ এবং মুছলমানের দরদ ও অনুভূতি আজ তাঁহার কণ্ঠকে যে মুখরিত করিয়া তুলিতেছে, তাঁহাকে অন্তরের অভ্যর্থনা জানাইবার জন্য নজরুলের এই শ্রেণীর গজল, সঙ্গীত ও কবিতাগুলি আমরা মোহাম্মদীতে ছাপিবার ব্যবস্থা করিতেছি। এই সংখ্যা হইতে তাহার সূত্রপাত করা হইল।’১

প্রবাসী গোষ্ঠীর সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’র প্রধান কাজই ছিলো নজরুলের বিরুদ্ধাচরণ ও ব্যঙ্গ বিদ্রুপ। এই সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেই নজরুল উঠে এলেন বাঙালি জাতিসত্তার ডাক দিয়ে মহানায়কের দৃপ্ত পদচারণায়।

এই প্রতিক্রিয়াশীল বিরুদ্ধবাদীরা সব জায়গাতেই তৎপর। এদেরই বশংবদরা রাজনৈতিক স্বার্থে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধায়, ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বর্জন করে। অথচ ধর্মের সবচেয়ে বড় শিক্ষাই হচ্ছে নিরপেক্ষতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান। যারা এসব উদ্যোগ নিচ্ছে, তাদের মধ্যে হিন্দু বা মুসলমান কোন বৈশিষ্ট্যেরই অস্তিত্ব নেই। কারণ এরা ছাত্রজনতার মিছিলের উপর ট্রাক তুলে দেয়, গুপ্তহত্যার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ খুন করে। কোন ধর্মেই এই শিক্ষা নেই। এগুলো এরা করেছে রাজনৈতিক স্বার্থে, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার অসৎ উদ্দেশ্যে।

পশ্চিমবাংলার বাঙালিরা বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করেও হিন্দির অব্যাহত আগ্রাসন মোকাবিলায় ক্লান্ত এই কবিপ্রেমিরা কিছু গান শোনা ছাড়া নজরুল চর্চার ধারে কাছেও যাননি। গোড়ায় গলদ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে সেহেতু অনাসৃষ্টির অভিযোগ আসছে না। ফলে কবি অসুস্থ হওয়ার পরপর নজরুল চর্চা ও অসুস্থ নির্বাক কবির জীবনে ১৯৪২ সাল থেকেই নেমে আসে অন্ধকার যুগ। মহাযুদ্ধ সংকটকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা গেলেও কিছুতেই দায় এড়ানো সম্ভব নয়। কারণ নজরুল চর্চা ব্যতীত আর সব কাজই কম বেশি চলেছে। একমাত্র নজরুল জন্মজয়ন্তী কমিটি কবির জন্মজয়ন্তী উদযাপন ছাড়া এসময় তেমন গুরুত্বপূর্ণ আর কোন কাজই করতে পারেনি।

আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, নজরুল চর্চা মানে কেবল জন্মজয়ন্তী পালনকে বোঝায় না। অথবা নজরুলের গানের প্রসার দ্বারাও নজরুল চর্চার ব্যাপকার্থের প্রতিনিধিত্ব দাবি করা চলে না। যদি সে গান হয় বাণী ও সুরের বিকৃতিতে পূর্ণ। এখানে যারা নজরুলের গানের চর্চা নিয়ে গর্ববোধ করেন, তাদের জন্য কবি স্বয়ং একটি দুঃসংবাদ রেখে গেছেন। মঞ্চ বা সভা-সমাবেশের কথা ছেড়েই দেয়া যাক। প্রতিদিন রেডিওতে নিজের গানের বাণী ও সুরের বিকৃতিতে ক্ষুব্ধ কবি সাপ্তাহিক ‘নবশক্তি’ পত্রিকার ২৩ আগস্ট ১৯২৯ সংখ্যায় লিখেছিলেন,‘ ... আমার নিজের দিক থেকে কিন্ত স্পষ্ট গোটা কতক কথা বলবার আছে এ নিয়ে। তার কারণ আমার গান প্রায় প্রত্যহই কোন না কোন আর্টিস্ট রেডিওতে গেয়ে থাকেন এবং আমার সৌভাগ্যবশত তা শুনেও ফেলি। এক উমাপদ ভট্টাচার্য মহাশয় এবং কদাচিৎ দু-একজন গাইয়ে ছাড়া অধিকাংশ ভদ্রলোক বা মহিলা আমার গান ও সুরকে অসহায় ভেবে (বা একা পেয়ে) তার পি-ি এমন করেই চটকান যে মনে হয় ওর গয়ালাভ এখানেই হয়ে গেল। সে একটা রীতিমতো সুরাসুরের যুদ্ধ।’২

কবির এই খেদোক্তিতে তাঁর গানের করুণাবস্থার সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আরো যে একটি নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাহলো নজরুল সঙ্গীতের প্রায় অধিকাংশ গবেষকেরই অভিমত যে, তাঁর গানের বাণী ও সুরের বিকৃতি শুরু হয়েছে ১৯৪২ সালে অসুস্থ হওয়ার পর। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। কবির জীবদ্দশাতেই বেসরকারিভাবে জাতীয় সংবর্ধনা পাবার আগেই নিয়মিত রেডিওতে তাঁর গান প্রচারিত হচ্ছে এবং সমতালে তার বাণী ও সুরের বিকৃতিও ঘটছে।

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সরকারি আনুকূল্য অর্জনের অভিযোগে প্রতিক্রিয়াশীলরা যতটা তৎপর ছিলো, নজরুলের ক্ষেত্রে তাদের ততটা তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়নি। তাদের দুর্ভাগ্য যে, নজরুল ইসলামের প্রায় সব বিখ্যাত ও উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় বইগুলোই শাসক ব্রিটিশরা বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করে। বইগুলো হচ্ছে, ‘যুগবাণী’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘দুর্দিনের যাত্রী’, ‘প্রলয়শিখা’ এবং ‘চন্দ্রবিন্দু’। শেষপর্যন্ত বাজেয়াপ্ত বা নিষিদ্ধ হয়নি কিন্তু এ উদ্দেশ্যে ইংরেজ সরকার চিহ্নিত করেছিলো এ ধরনের গ্রন্থগুলো হচ্ছে ‘অগ্নিবীণা’, ‘সর্বহারা’, ‘ফণি-মনসা’, ‘রুদ্রমঙ্গল’, ‘সঞ্চিতা’ ও ‘কুহেলিকা’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ