ঢাকা, মঙ্গলবার 3 March 2020, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ৭ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

ইসলামে পতিতার জানাযা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ:

রাজবাড়ী জেলার দৌলতদিয়া রেলস্টেশন মসজিদের ইমাম হলেন মাওলানা গোলাম মোস্তফা। তিনি দীর্ঘদিনের সমাজে প্রচলিত প্রথা ভেঙে দৌলতদিয়া ফেরীঘাট এলাকায় অবস্থিত পতিতাপল্লীর একজন যৌনকর্মীর নামাযে জানাজা পড়িয়েছেন গত ২রা ফেব্রুয়ারী। এর আগে যৌনপল্লির মৃতদের নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো অথবা রাতের আধারে কবর দেওয়া হতো। জানাযায় ইমামতি করার কারণে ইমামকে ঐ এলাকায় চরম সমালোচনার সম্মুখিন হতে  হয়েছে। এমনকি তিনি ভবিষ্যতে আর কখনো কোনো যৌনকর্মীর নামাযে জানাজা পড়াবেন না মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, ‘এইখানে তো সমালোচনা হচ্ছে। গ্রামের লোক, দোকানদার সবাই আমার সমালোচনা করছে। এতোদিন জানাজা হয় নাই, আমি কেন হঠাৎ করে জানাজা পড়াইলাম?’ আসলে ইসলামি শরীয়ায় একজন যৌনকর্মী বা পতিতার জানাজা দেওয়া যাবে কি-না এ প্রসঙ্গটি আজ তীব্রভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দিয়েছে। 

সালাতে জানাজা হচ্ছে মৃত ব্যক্তির জন্য দু’আ। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে এ সালাত আদায়ের পর অনেক মানুষ আবার মুনাজাত বা দু’আ করতে ইমাম বা আলেম-উলামাদের চাপ দিয়ে থাকেন (সালাতের চারটি অর্থ রয়েছে, দু’আ, তাসবীহ, রাহমত ও ইস্তেগফার)। অনেক আলেম জানাযা শেষে অবিদ্যার কারণে অথবা মানুষের অনুরোধে আবার দু’আও করান। তিনি হয়তো ভাবেন যে, দু’আ সকলেই করান সুতরাং আমিও করি। দু’আ খারাপ তো কিছু না। কিন্তু ইসলামে ইবাদত হতে হয় আল কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী। সুন্নাহর বিপরীতে হলেই এটা ‘বিদআত’ হয়ে যায়; যা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। রাসূল সা. বলেছেন- ‘আমি যা করি নাই; (ধর্মের ভেতরে) তা পরিত্যাজ্য।’ 

ইসলামী শরীয়াতের নীতি অনুযায়ী, মানুষ যতই পাপিষ্ট হউক তার জন্য দু’আ চাইতে হবে। বিশেষ করে মরে গেলেতো অবশ্যই দু’আ করতে হবে। হাদীসে এসেছে- ‘দু’আ হলো ইবাদতের মগজ।’ তাই একজন মৃত মানুষ মুসলিম হলে অবশ্যই তার জন্য জানাযার সালাত পড়তে হবে; পড়া উচিৎ। পতিতালয়ে যারা দেহ ব্যবসা করে থাকেন, তারা কাজটি চরম অন্যায় করছেন, হারাম এবং ঘৃণিত বা নিষিদ্ধ কাজ করছেন; এতে কোনো সন্দেহ নেই। আবু মাসউদ আনসারী রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন- ‘কুকুরের মূল্য, পতিতার উপার্জন ও গণকের পারিতোষিক নিষিদ্ধ’ (বুখারী, হাদীস নং-২২৮২)। অন্য হাদীসে এসেছে- নবী (সা.) লা’নত বা অভিসম্পাত করেছেন উল্কি অঙ্কণকারিণী, উল্কি গ্রহণকারিণী, সূদ গ্রহীতা ও সুদ দাতাকে। তিনি কুকুরের মূল্য ও পতিতার উপার্জন ভোগ করতে নিষেধ করেছেন (বুখারী -৫৩৪৭)। অতএব পতিতাবৃত্তি খুবই ঘৃণিত কাজ; এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তাদের অধিকাংশের এ পথে আসার পেছনে একটি কারণ  ও বাস্তবতা থাকে। যেই বাস্তবতাটা তাকে কখনো সমাজ থেকে দূরে ঠেলে দেয়, কখনো তারা চক্ষু লজ্জায় পরিচিতদের থেকে দূরে সরে যায়। অধিকাংশ পতিতা সর্বহারা হয়ে পরিশেষে কোন একটি নিষিদ্ধ পল্লীতে আশ্রয় খুঁজে নেয়। জন্মসূত্রে কেউ পতিতা হয়ে জন্মায় না। এই স্বপ্ন নিয়েও কোনো বালিকা বেড়ে ওঠে না; যে সে ভবিষ্যতে পতিতা বৃত্তিতে জড়াবে। সমাজ ও বাস্তবতার নির্মমতা তাকে নিষিদ্ধ পল্লীতে নিক্ষেপ করে। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কি একা এ অপরাধটি করছে? না, পুরুষরাও এ অপরাধের সমান অংশিদার; যারা সেখানে গমন করে থাকে। গমনকারী পুরুষদের এ কাজটিও অত্যন্ত ঘৃণিত; তারাও হারাম করছে; এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আামাদের বুঝতে হবে, হারাম কাজে লিপ্ত হলেই মানুষ কিন্তু ‘কাফির’ হয়ে যায় না। যদিও আজকাল কিছু আলেম-উলামা কথায় কথায় ভিন্ন মতাবলম্বী বা প্রতিপক্ষকে ‘কাফির’ ফতোয়া দেওয়াকে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন (নাউজুবিল্লাহ)। হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্যায়ভাবে কাউকে ‘কাফির’ বললে সে প্রকৃত পক্ষে কাফিরের পর্যায় না হয়ে থাকলে নিজের দিকে ফিরে আসে। অর্থাৎ নিজেই কাফির হয়ে যায়। যারা পতিতালয়ে দেহ ব্যবসা করে উপার্জন করে থাকে বা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে; তাদের বড় একটা অংশ কিন্তু বাধ্য হয়েই ওখানে যান। বিভিন্ন প্রতারণা বা কারো চক্রান্তের শিকার হয়ে এ নিষিদ্ধ জগতে নিজেদের জড়িয়ে নেন আজীবনের জন্য। অতএব পতিতারা তাদের এ ঘৃণ্য কাজের দরুণ ‘কাফির’ হয়ে যায় না। কাজ যেটা করছে নি:সন্দেহে অন্যায় করছে। এমনকি যারা স্বেচ্ছায়ও যায়, তারাও কাবিরা বা বড় গুনাহের কাজ করছে। দয়াময় আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান যদি থেকে থাকে, মুসলিম যদি হয়ে থাকে; অপরাধ করলেও ইসলাম থেকে তারা কিন্তু খারিজ হয়ে যান নি। তাছাড়া পতিতারা নিজেদেরকে অপরাধী মনে করে থাকে। তারা অনেকেই তাদের এ নীচু ও হীন-কদর্য কর্মকা-ের জন্য নিজেদের অপরাধী ভাবে; অনুতপ্ত ও ভেতরে ভেতরে লজ্জিত হয়ে দিনাতিপাত করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনেকেই আযানের শব্দ শুনলে মাথায় কাপড় দেয়, আলেম-উলামা দেখলে রাস্তার একপাশে সরে যায় (যদিও এর কোনো শরয়ী ভিত্তি নেই)। তাই শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী তাদের মৃতে্যুর পর তাদের নামাজে জানাজা পড়তে হবে; পড়াতেও হবে। শুধু তাই নয়, নামাযে জানাজা পড়ানো ও নামাযে অংশগ্রহণ করা ‘ফরজে কেফায়া’ হিসেবে শরীয়াতে ঘোষিত হয়েছে। তবে, এ ধরনের ব্যভিচারের মতো পাপকাজে যারা লিপ্ত, বা যারা আত্মহত্যা করে মারা যায়, তাদের জানাজার ব্যাপারে ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞদের ঐক্যমত্য অভিমত হলো, জানাজায় মান্যবর কোনো আলেম উপস্থিত থাকতে পারবে না। সাধারণ শ্রেণির লোকজনই এ ধরনের ব্যক্তির জানাজা ও দাফন-কাফন সম্পন্ন করবে। ওলামায়ে কেরাম এই অভিমতটা এজন্য দিয়েছেন যে, এখান থেকে এ ধরনের পাপের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য লোকেরা যেন শিক্ষা গ্রহণ করে এবং পাপ কাজ থেকে ফিরে আসে।

যারা পতিতাদের নামাজে জানাজা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তারা ঐ সমস্ত লোকদের ব্যাপারে কি বলেন- যারা ব্যভিচারকে ব্যক্তি স্বাধীনতা মনে করেন, বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ককে অপরাধ মনে করেন না। তাদের জানাযা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিৎ। কারণ অপরাধবোধ নিয়ে অপরাধ করলে বেঈমান হয়ে যায় না; কিন্তু অপরাধকে অপরাধ মনে না করলে বেইমান হয়ে যায়।

দৌলতদিয়ার মতো এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশে নতুন নয়। যারা নামায পড়েন না, তাদের নামাযে জানাজায় ইমামতি কে করবে এই নিয়ে চলে অনেক বাদানুবাদ। মৃত ব্যক্তির জীবদ্দশায় তার কাছে স্থানীয় ইমাম হয়তোবা কখনো দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে যাননি; কিংবা লোকটিও নিজের উদ্যোগে সালাতের গুরুত্ব অনুধাবন করে নিয়মিত সালাত আদায় করেননি কিন্তু নিয়মিত নামায পড়েনি এই অপরাধে তার নামাযে জানাজা পড়ানো নিয়ে ছোট বেলায় ইমামদের গড়িমসি করতে আমরা দেখেছি। পাশাপাশি ঐ সমাজেরই সুদখোর, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, আতঙ্কবাদী লোকটির ব্যাপারে সকলে থেকেছে নির্বাক। যারা যাকাত ও হজ্ব ফরজ হওয়ার পরও বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো অথবা উত্তরাধিকার সম্পত্তি কেবল মাত্র ছেলেদের নামে লেখে দিয়ে জঘন্য অপরাধ করেছে বা বোনদের ঠিকমতো উত্তরাধিকার সম্পত্তি দেয়নি কিংবা লোকটি ছিলো ব্যক্তি জীবনে চরম দুর্নীতিবাজ। সমাজে প্রভাবশালী হওয়ায় এ সকল লোকদের মৃত্যুর পর এ দৃশ্য অনেকটা দেখা যায় না। এসব ইমামরা অনেকেই আবার মাহফিল করে থাকে। সেখানে সামান্য টাকার লোভে প্রধান অতিথি বানায় কতিপয় এসব ধর্মমোড়ল বিত্তশালী মদখোর, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদেরকে। কারণ তারা পয়সাওয়ালা। তাদের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান এক রকম, আর গরীব-অসহায়দের জন্য কি ধর্মীয় বিধান ভিন্ন রকম? অসহায় গরীব লোকদের জন্য যতসব অনিয়মের বাস্তবায়ন চলছে! অথচ সমাজের অনেক অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে রয়েছে ঐ প্রভাবশালী মহল। অনেক সময় মহান আল্লাহকে অস্বীকারকারী বড় ধনাঢ্য ব্যক্তিটির নামাযে জানাজা পড়িয়ে আলেমরা গর্ব করে বলেন অমুকের জানাজা আমি পড়িয়েছি। তাৎক্ষণিক সুবিধা পেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন এবং পরবর্তীতে ভিন্ন আঙ্গিকে অন্য সুবিধা নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে পরিকল্পনার জাল বুনেন। কিভাবে মাদ্রসার জন্য চাঁদা নেওয়া যায় তারও একটি ছক আঁকেন।

আসলে অজ্ঞতা সর্বক্ষেত্রেই আপদ বয়ে আনে কিন্তু ধর্মীয় ক্ষেত্রে অবিদ্যা ও অজ্ঞতা বা সঠিক জ্ঞানের অভাব সবচেয়ে বেশী ভয়ঙ্কর হয়। যা শুধু সুবিধাবাদী ধর্মব্যবসায়ীদেরই সুযোগ তৈরি করে না বরং সঠিক ইসলামী চিন্তা- চেতনার দ্বারকেও রুদ্ধ করে তোলে। মুক্ত চেতনায় কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী চলার পথে শক্তিশালী দেয়াল নির্মাণ করে দেয়। যার ফলশ্রুতিতে অনেক সময় সঠিক আক্বীদাহ বিশ্বাসকে বেঠিক; পক্ষান্তরে বেঠিক ও ভ্রান্ত পথটাকে সঠিক মনে হয় জনসাধারনের কাছে।

এভাবে অবিদ্যা ও অজ্ঞতা ধর্মকে সঠিক অবস্থান থেকে জানা ও অনুধাবনের ক্ষেত্রে এবং মানুষের কাছে এর বিধানাবলী প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে। সকল মুসলমানের জন্য জানাজা আদায় করা ফরজে কেফায়া। কিছু মানুষ আদায় করে দিলে সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়। আর যদি কেউ আদায় না করে তবে সকলকেই আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে; জবাবদিহিতার জন্য। এটা ইসলামের একটা বিধান। নামাজ পড়া, যাকাত দেওয়া, হজ্ব ও অন্যান্য বিধান প্রত্যেকটি পৃথক এক একটি বিধান। তেমনিভাবে অবৈধ যৌনাচার শরীয়াতে নিষিদ্ধ। এর থেকে বেঁচে থেকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে দৈহিক মিলন ও স্ত্রীসম্ভোগ ইসলামী শরীয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল কুরআন এর প্রত্যেকটি নির্দেশনাই সকল মুসলমানের জন্য ফরজ। হাদীসের বিশুদ্ধগ্রন্থ বোখারী শরীফে এসেছে, প্রত্যেক মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের পাঁচটি হক রয়েছে। সালামের উত্তর দেয়া, কোন মুসলমান অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া, মুসলমানের জানাজা আদায় করা, কেউ নিমন্ত্রণ করলে সাড়া দেয়া এবং কেউ হাঁচি দিলে তার উত্তর দেয়া। অন্য হাদীস শরীফে স্পষ্ট আছে- ‘যে ব্যক্তি কালিমা বলবে এবং এটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাসূল (সা.) এর কথা শুনে সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, যদি সে ব্যভিচার করে, তবুও কি সে জান্নাতে যাবে? বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত মোহাম্মদ (সা.) তাঁর সাহাবাদের বললেন, হ্যাঁ যদি সে যেনা বা ব্যভিচারও করে, তবুও সে জান্নাতে প্রবেশ করবে (যদি এ বিশ্বাসের ওপর মৃত্যুবরণ করে)। তাছাড়া মানুষের কৃতকর্মের ফলাফল নির্ধারণ করার ক্ষমতা মহান আল্লাহর হাতে; কোনো মানুষের কাছে নয়। বিচারকের চেয়ারটি আল্লাহ তায়ালার জন্যই বরাদ্দ। তাই অপরাধীকে তার পাপের শাস্তি তাকে পেতে হবে। আর সেই শাস্তি দিবেন মহান আল্লাহ তাআলা। আমরা বিচারক নই। জঙ্গি বিভ্রান্ত যুবকদের মতো রাষ্ট্রীয় আইনকে ব্যক্তি নিজের হাতে তুলে ইসলামী চেতনা দেখালে তো আর হবে না। তাই পতিতাদেরকে দূরে ঠেলে না দিয়ে দ্বীনের পথে ডাকি, তাদের পাপীষ্ট হওয়ায় যেহেতু সমাজের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ অসন্তুষ্ট ও ইমামতি করার কারণে ইমামের প্রতিও রুষ্ট; তার অর্থ দাঁড়ায় আমরা চাই ঐ নিষিদ্ধপল্লীর মানুষজন পরকালে স্বর্গে থাকুক, নিষিদ্ধ কাজ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। তাই না? কেনইবা তারা এ অবৈধ ও চরম ঘৃণিত পেশাকে জীবিকা অর্জনের মাধ্যম বানিয়েছে? তাই পুরুষরা যেনো সেখানে আর না যায়। এ সাধু লোকজন ওখানে গমন না করলে যৌনপল্লিও থাকবে না। নামাযে জানাজা নিয়ে দ্বিধাও তৈরী হবে না। যারা নিয়মিত অনিয়মিতভাবে বিভিন্ন বয়সী ঐ নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হতে ওখানে গমন করে, তাদের নামাজে জানাযা কি পড়ানো হয় না? আমার প্রশ্ন। তাহলে উপস্থিত থাকেন বা কারা পড়ান তাদের জানাযার নামাজ? নাকি মানুষ তাদের এমন ঘৃণিত ও জঘন্য কর্মকাণ্ড জানে না বলে তারা সাধু! তাদের মৃত্যুর পর নিষ্পাপ শিশুদের মতো তাদের পরিণত করে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালার দরবারে ইমামসহ সকলে দু’আ করেন। এটা কি এ জন্য যে, পুরুষদের নিষিদ্ধ পল্লীতে গমনের খবর কেউ জানে না বলে? আবার যে নারীরা ঐ ঘৃণিত পেশা গ্রহণ করেছেন, এর পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতারণা, দারিদ্রতা, যৌতুক, ট্রাফিকিং ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের নেশা কাজ করে। অবলা নারী বাধ্য হয়ে এ পেশা নিয়তি হিসেবে মেনে নেয়। এ ঘৃন্য কদর্য অবস্থার মোড়ক থেকে বের হতে শত প্রচেষ্টার পরও সে আর বের হতে পারে না। সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র ও সমাজ এবং সমাজের রীতিনীতি এর জন্য দায়ী। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে আজ, ব্যাংক হয়ে পড়েছে লুটেরাদের কারণে দেওলিয়া, শেয়ার মার্কেটের টাকা কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে অভিজাত শ্রেণীর করায়ত্বে। ধর্মীয় আলেম-উলামাগণ নিজেরা নিজেদের মাঝে অনৈক্যের দেয়াল তৈরী করছে প্রতিনিয়ত। শরীয়াতের ফরজ-ওয়াজিব কোনো বিষয় কোনো অনৈক্য নাই; নেই কোনো মতভেদ। কেবলমাত্র সুন্নাত, মুবাহ, মুস্তাহাব, মানদুব ও ইস্তেহসান নিয়ে হাজারও ভাগে বিভক্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের উলামাগণ। এ অসহয় অবলা নারীদের জন্য ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বা ধর্মীয় ব্যক্তিদের কোনো দায় কি নেই?! বিত্তবানরা তাদের রিহেভিলিয়েট করতে পারেন। উলামারা তাদের কাউন্সিলিং করতে পারেন; সুস্থ-সুন্দর জীবনে ফিরে আনতে ভূমিকা পালন করতে পারেন। এরা আমাদের সমাজেরই অংশ। কেবল ঘৃণা করে আমি মনে করি তাদের উপর আমরা অবিচার করে থাকি। তাদের এ পরিস্থিতির জন্য পুরুষরা বিশেষ করে সমাজ কোনো অংশেই কম দায়ী নয়। আসুন তদের জন্য সাধ্য মতো কিছু করি। দুর্নীতি করে যারা সম্পদের পাহাড় গড়েছে তারা অন্তত: এ যৌনপল্লিতে এ অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য বাস্তবমুখি কর্মসূচী গ্রহণ করতে পারে। তাহলে অন্তত: পরকালে সৃষ্টিকর্তার সামনে জবাবদিহি করাটা সহজ হবে।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ