ঢাকা, শনিবার 7 March 2020, ২৩ ফাল্গুন ১৪২৬, ১১ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

সামুদ্রিক অর্থনৈতিক সম্পদ আহরণে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে

মুহাম্মদ নূরে আলম: সামুদ্রিক অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্র সম্পদনির্ভর অর্থনীতি। সাগরের জলরাশি ও এর তলদেশের বিশাল সম্পদকে কাজে লাগানোর অর্থনীতি। যার অর্থ হল, সমুদ্র থেকে যাই আহরণ করা হোক না কেন, যদি সেটা দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়, তবে সেটা ব্লু -ইকোনমির বা সামুদ্রিক অর্থনৈতিক সম্পদ আহরণের পর্যায়ে পড়বে। দেশের মূল ভূখন্ডের সমপরিমান অথবা বেশি সম্পদ সমুদ্রে রয়েছে। সমুর্দের ৪টি ব্লকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিদেশী কোম্পানির সাথে চুক্তি হয়েছে। কিন্তু একটি কূপও খনন করতে পারেনি বাংলাদেশ, আর বাকি ২২টি ব্লক স্থবির হয়ে পড়ে আছে। এই বিশাল সম্পদ আহরণে বাংলাদেশ এখনও সক্ষমতা অর্জন করেনি। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় বাজেটের দশগুণ সম্পদ সমুদ্র থেকে আহরণ করছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত-মায়ানমার বসে নেই সম্পদ আহরণ শুরু করে দিয়েছে, বাংলাদেশ এখনও শুরুই করতে পারেনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রাথমিক গবেষণা পর্যন্ত নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। বাংলাদেশের মালিকানায় রয়েছে বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা। বিশাল এ জলসীমাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। বাংলাদেশের স্থলভাগে যে পরিমাণ সম্পদ বিদ্যমান তার সঙ্গে তুলনা করে বলা যায়, এই সম্পদের প্রায় সমপরিমাণ (৮১ শতাংশ) সম্পদ সমুদ্র তলদেশে আছে। দেশের সমুদ্র অর্থনীতি বিশেষজ্ঞগণ এমনই মতামত দিয়েছে। বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউট(নোয়ামি), বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই), সেভ আওয়ার সি’ এই সব প্রতিষ্ঠানের সূত্রে এই তথ্যগুলো জানাযায়।
২০১০ সালে অধ্যাপক গুন্টার পাউলি ভবিষ্যতের অর্থনীতির রূপরেখা প্রণয়নের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক আমন্ত্রিত হন। সেখানেই একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব মডেল হিসেবে ব্লু ইকোনমির ধারণা দেন। জেনে রাখা ভাল, বিশ্বের কাছে গুন্টার পাউলি টেকসই উন্নয়নের স্টিভ জবস হিসেবে পরিচিত। সমুদ্রের সুনীল জলরাশির অন্তরালে থাকা বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যার প্রধান বিষয়। তার ধারণা অনুযায়ী সমুদ্র অর্থনীতিতে, অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সাথে সাথে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে সাধারণ জনগণের সুযোগ-সুবিধা, ভাবতে হবে পরিবেশের কথা, থাকতে হবে উদ্ভাবনী এবং গতিশীল ব্যবসায়িক চিন্তা-ভাবনা।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জ্ঞান বৃদ্ধির মাধ্যমে সমুদ্র নির্ভর ঔষুধশিল্পও গড়ে তোলা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন জাতি সংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ঋঅঙ) অন্যতম পরিচালক ইন্দ্রয়োনো সয়েসিলো। তিনি আরো বলেছেন, ব্লু ইকোনোমি একাধারে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বিধান করতে পারে এবং জিডিপি বৃদ্ধি করে জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধশালী করতে পারে।
সমগ্র বিশ্বে ক্রমেই ব্লু-ইকোনমি জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশাল সমুদ্রজয়ের পর সমুদ্র অর্থনীতি ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশও। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ সমুদনির্ভর। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যে, তা পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করা গেলে সমুদ্র থেকে আহরিত সম্পদের মূল্যমান জাতীয় বাজেটের দশগুণ হবে। অপরদিকে অস্ট্রেলিয়া সমুদ্রসম্পদ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে থাকে। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যাবে ব্লু-ইকোনমির বদৌলতে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই মূল্যবান সম্পদ আহরণে কতটা সক্ষম আমরা?
বর্তমানে বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ৬৩২ বর্গকিলোমিটার।  এই সমুদ্রসীমা অগাধ প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার, যা আমাদের দেশের বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার সম্পূর্ণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম। কিন্তু বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ এখন পর্যন্ত প্রায় অনাবিষ্কৃত ও অব্যবহৃত। সমুদ্রসম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে শুধু মাছই রয়েছে প্রায় ৫০০ প্রজাতির। এছাড়াও শামুক, ঝিনুক, শ্যালফিস, কাঁকড়া, অক্টোপাস, হাঙ্গরসহ রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী, যেগুলো বিভিন্ন দেশে অর্থকরী প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাণিসম্পদ ছাড়াও ১৩টি জায়গায় আছে মূল্যবান বালু, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম। এগুলোতে মিশে আছে ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমেনাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইট। এসব সম্পদ অতি মূল্যবান। তা ছাড়া সিমেন্ট বানানোর উপযোগী প্রচুর ক্লে রয়েছে সমুদ্র তলদেশে।
২০১৮ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘টুয়ার্ডস এ ব্লু ইকোনমি: এ পাথওয়ে ফর সাসটেইনেবল গ্রোথ ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি সমীক্ষাতে বলা হয়েছে, সমুদ্র অর্থনীতির ব্যাপারে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বিত নীতি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেনি। এমনকি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশিদের আকৃষ্ট করার জন্য যে মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তাও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে বারবার আটকে গেছে। সমুদ্র বিজয় নিয়ে যতটা মাতামাতি হয়েছে, সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে ততটা উদ্যোগ কিন্তু পরিলক্ষিত হয়নি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১৭ সালে ব্লু ইকোনমি সেল নামে একটি ক্ষুদ্র প্রশাসনিক সেল গঠন ছাড়া তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
২০১৯ সালের সর্বশেষ তথ্যে বলা হচ্ছে, মাত্র ৪টি ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।  কিন্তু একটি কূপও বাংলাদেশ খনন করতে পারেনি। বাকি ২২টি ব্লক স্থবির পড়ে রয়েছে। বিদেশী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে উৎপাদন ও ভাগাভাগি চুক্তির আগে মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে হবে কি হবে না সেই তর্ক-বিতর্কের মধ্যেই আমরা এখনো আটকে আছি। বাকিরা কিন্তু আমাদের মতো বসে নেই। ২০১২ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে বিরোধের নিষ্পত্তির বছর দুয়েকের মাথায় শুধু গ্যাসের মজুত আবিষ্কারই না, বাংলাদেশের সীমানা ঘেঁষে তাদের ব্লক থেকে গ্যাস তোলাও শুরু করে দেয় মিয়ানমার। সেই গ্যাস নিজেদের কাজে ব্যবহার করার পাশাপাশি চীনে রপ্তানিও করছে এখন তারা। ভারতও বসে নেই। বঙ্গোপসাগরের ভারতীয় অংশে দেশটির সরকারি ও বেসরকারি তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো জোর অনুসন্ধান চালাচ্ছে ও বিপুল মজুতের আশা করছে।
২০১২ সালের ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের (পিসিএ) রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ-মিয়ানমার মামলায় মোট প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি সমুদ্র এলাকার দখল পায় বাংলাদেশ। সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের জন্য ১২ নটিক্যাল মাইল রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র এলাকা, ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল সীমানা এবং মহীসোপানে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ। এরপর ২০১৪ সালের ৮ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ সমুদ্র সীমানার আনুমানিক ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারের অধিকার পায় বাংলাদেশ। এতে করে বাংলাদেশের জন্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে উত্তরণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক সম্পদের গুরুত্ব ও অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়।
বাংলাদেশ যে অঞ্চলের মালিকানা পেয়েছে, সেখানে অন্তত চারটি ক্ষেত্রে কার্যক্রম চালানো হলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ কোটি মার্কিন ডলার উপার্জন করা সম্ভব।  এই ক্ষেত্র চারটি হলো তেল-গ্যাস উত্তোলন, মৎস্য সম্পদ আহরণ, বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও পর্যটন। বঙ্গোপসাগরে ৪৭৫ প্রজাতির মাছসহ ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি এবং বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক ও জৈব গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ আছে।  ২০১৭-১৮ সালে দেশে উৎপাদিত মোট ৪৩ লাখ ৩৪ হাজার মাছের মধ্যে সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টনই এসেছে সমুদ্র থেকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রাণিসম্পদ ছাড়াও ১৩টি জায়গায় আছে মূল্যবান বালু, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম। এগুলোতে মিশে আছে ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমেনাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইটের মতো মূল্যবান ধাতব উপাদান। তাছাড়া সিমেন্ট বানানোর উপযোগী প্রচুর ক্লে রয়েছে বাংলাদেশের সমুদ্র তলদেশে। বাংলাদেশের সমুদ্র সীমা দেশের মূল ভূ-খণ্ডের প্রায় সমান। অথচ দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের মাত্র ১৫.৪২% ভাগ অবদান সামুদ্রিক মাছের।  এ সমুদ্র এলাকায় বছরে ৮০ লাখ টন মাছ ধরার সুযোগ আছে। এদিকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার(এসডিজি) ১৪ নম্বর ধারায় টেকসই উন্নয়নের জন্য সামুদ্রিক সম্পদের অনুসন্ধান ও সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।  তাই ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি পূরণের লক্ষ্যে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের গুরুত্ব অপরিসীম।
 সেভ আওয়ার সি নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ২৫০ জাতের মিঠা পানির মাছ এর বিপরীতে সাগরে রয়েছে অন্তত ৪৭৫ প্রজাতির মাছ। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে প্রতিবছর ৮ মিলিয়ন টন মাছ ধরা পড়ে। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৭০ মিলিয়ন টন মাছ বাংলাদেশের মৎস্যজীবীরা আহরণ করে। যার সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত।  প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ি, সারা দেশে মোট মাছের উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৩৩ লাখ মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত কিছু জরিপ থেকে জানা যায়, নানা প্রজাতির মূল্যবান মাছ ছাড়াও সমুদ্রসীমায় নানা ধরনের প্রবাল, গুল্মজাতীয় প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির চিংড়ি, তিন প্রজাতির লবস্টার, ২০ প্রজাতির কাঁকড়া এবং ৩০০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন-বাংলাদেশের প্রতিবেশী ল্যান্ড-লকড দেশ যেমন, নেপাল আর ভুটানের যখন সমুদ্রে প্রবেশাধিকার দরকার হবে তখন তাদেরকে পোর্ট সুবিধা দিতে পারে বাংলাদেশ, যা ব্লু ইকোনমির অন্যতম অংশ। বাংলাদেশ তার ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। তিনি আরও বলেন, পলিসি লেভেলে কিছু অর্জন হয়েছে, যেমন মেরিটাইম এফেয়ার্স ইউনিট, যেটা সামগ্রিকভাবে মেরিটাইম রিসোর্স দেখছে।  আর একটা হল ব্লু- ইকোনমি সেল গঠন, যার কাজ হচ্ছে, মাছ থেকে শুরু করে আরো যেসব অনাবিষ্কৃত সমুদ্র সম্পদ আছে সেগুলো কিভাবে পরিবেশ বান্ধব করে সংগ্রহ করা যায় এবং কিভাবে সেগুলোর টেকসই ব্যবহার করা যায় তা খতিয়ে দেখা।   
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাউসার আহমেদ বলেন, সমুদ্রের তলদেশের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদ ব্যবহার করতে হলে যে পরিমাণ দক্ষ জনশক্তি দরকার, বর্তমানে বাংলাদেশে সেই পরিমাণ জনশক্তি নেই। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ থাকলেও প্রয়োজনীয় বাজেট না থাকার কারণে এই দুটি প্রতিষ্ঠানও সঠিকভাবে কাজ করতে পারছে না।
বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র সম্পদকে দুইভাগে ভাগ করা যেতে পারে। অপ্রাণিজ সমুদ্র সম্পদ ও প্রাণিজ সমুদ্র সম্পদ। অপ্রাণিজ সমুদ্র সম্পদ বলতে মূলত খনিজ ও খনিজ জাতীয় সম্পদকে বোঝায়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তেল, গ্যাস, চুনাপাথর ইত্যাদি। খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৭ ধরনের খনিজ বালি। এর মধ্যে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় জিরকন, রুটাইল, সিলিমানাইট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গ্যানেট, কায়ানাইট, মোনাজাইট, লিকোক্সিন ইত্যাদি। যার প্রত্যেকটি পদার্থই মূল্যবান, তবে মোনাজাইট অতিমূল্যবান পদার্থ। এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ পারমাণবিক বোমা তৈরিতে ও পারমাণবিক চুল্লিতে শক্তি উৎপাদক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের তথ্যমতে, দেশের সমুদ্র সৈকতের বালিতে মোট খনিজের মজুদ ৪৪ লাখ টন এবং প্রকৃত সমৃদ্ধ খনিজের পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন, যা বঙ্গোপসাগরের ১৩টি স্থানে পাওয়া গেছে। তাদের হিসেবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা থেকে প্রায় ১০ লাখ টন খনিজ বালু উত্তোলন করা যেতে পারে। এছাড়াও বঙ্গোপসাগরের তলদেশে রয়েছে ম্যাঙ্গানিজ নডিউল, ফসফরাস ডেপোজিট, পলিমেটালিক সালফাইড, অ্যাডাপোরাইট, ক্লেসার ডেপোজিট নামক আকরিক। এইসব আকরিক পরিশোধনের মাধ্যমে পাওয়া যাবে মলিবডেনাম, কোবাল্ট, কপার, জিঙ্ক, লেডসহ ইত্যাদি দুর্লভ ধাতু। এসব ধাতু জাহাজ নির্মাণ ও রাসায়নিক কারখানায় ব্যবহার করা যাবে। বাংলাদেশ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী অগভীর সমুদ্রের তলদেশে ভ্যানাডিয়াম, প্লাটিনাম, কোবাল্ট, মলিবডেনাম, ম্যাঙ্গানিজ ক্রাস্ট, তামা, সিসা, জিঙ্ক এবং কিছু পরিমাণ সোনা ও রূপা দিয়ে গঠিত সালফাইডের অস্তিত্ব রয়েছে। ১ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরে এসব মূল্যবান সম্পদ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের প্রায় ৩০ থেকে ৮০ মিটার গভীরে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ‘ক্লে’র সন্ধান পাওয়া গেছে।  প্রাপ্ত তথ্যে বলা হচ্ছে, বিশ্বের ৪৩০ কোটিরও বেশি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তু।  পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া সমুদ্রসম্পদ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে থাকে। ২০২৫ সালে এ খাত থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে সে দেশের সরকার। এছাড়াও চীন, জাপান, ফিলিপাইন সহ বেশ কিছু দেশ ২০০ থেকে ৩০০ বছর আগেই সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতির দিকে মনোনিবেশ করেছে। অন্যদিকে বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকাণ্ড হচ্ছে সমুদ্রকে ঘিরে। 
আন্তর্জাতিক সমুদ্র সম্পদ গবেষকরা বহুকাল আগে থেকেই বঙ্গোপসাগরকে বিভিন্ন ধরনের সম্পদের খনি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে যে খনিজ সম্পদ রয়েছে তা পৃথিবীর আর কোনও সাগর, উপসাগরে নেই বলেও ধারণা অনেকের। আরো বহু বছর আগে মণি, মুক্তা, সোনা, রূপা, তামা, প্রবালসহ বিভিন্ন ধরনের মহামূল্যবান ধনরত্ন এখানে রয়েছে ধারণা করে, ভারতবর্ষের পৌরাণিকে বঙ্গোপসাগরের নাম দেওয়া হয়েছিল রত্নাকাগার। এছাড়া সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরের অগভীর ও গভীর তলদেশে মহামূল্যবান ধাতু ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আর বাংলাদেশের পাশেই প্রতিবেশী ভারত কৃষ্ণা গোধাবেরি বেসিনে ১০০ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কারের কথা জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংস্থা ওএনজিসি-তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কর্পোরেশন লিমিটেড।
এবার বলা যাক, প্রাণিজ সম্পদের কথা। মৎস্য সম্পদ, সামুদ্রিক প্রাণী, সামুদ্রিক আগাছা, লতা, গুল্মতেও ভরপুর বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় রয়েছে ৪টি মৎস্যক্ষেত্র। যেখানে প্রায় ৪৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাছাড়া আরও আছে ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ৭ প্রজাতির কচ্ছপ, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ৩ প্রজাতির তিমি, ১০ প্রজাতির ডলফিন, প্রায় ২০০ প্রজাতির সি উইড (এক ধরনের সামুদ্রিক ঘাস) রয়েছে বলেও মনে করেন অনেক গবেষক। কিন্তু বর্তমানে মাছ ধরতে বাংলাদেশের জেলেরা দেশী নৌযান নিয়ে মাত্র ২০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জেলেদের কাছে সমুদ্রসীমার বড় একটা অংশই অজানা। ৫০ কিলোমিটারের বেশি দূরে যাবার মতো মাছ ধরার কোনও নৌযানই নেই বাংলাদেশের। এই সমস্যার সমাধান করা নিশ্চয়ই কঠিন কিছু নয়।
বঙ্গোপসাগরে আছে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক আগাছা। এসব আগাছা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরি করা যায়। এসব আগাছার মধ্যে ইসপিরুলিনা সবচেয়ে মূল্যবান। চীন, জাপান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মানুষ এগুলোকে খাদ্য হিসেবে খেয়ে থাকে।  তবে সমুদ্র সম্পদ আহরণ কিন্তু সহজ কোনও বিষয় নয়। সমুদ্রে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, খনন, আহরণ সবই প্রযুক্তিগত বিষয়। বিশেষজ্ঞ গবেষকদের মতামত হলো: একটি জরিপ কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা, যেখান থেকে তথ্য মিলবে। জরিপের প্রয়োজনে বিদেশী দক্ষ সংস্থার পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। সমুদ্র নির্ভর শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারে পর্যাপ্ত বাজেটও বরাদ্দ করা জরুরী। সমুদ্র বিজ্ঞানের বিকাশে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ সংক্রান্ত বিভাগ খোলা ও আলাদা গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করার ব্যবস্থা নেয়া।  বিদেশি বিনিয়োগকারিদের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্লু ইকোনোমি ঘিরে শিল্প প্রতিষ্ঠায় আকৃষ্ট ও আগ্রহী করা। চীন ও জাপান এরইমধ্যে ব্লু ইকোনমিতে বাংলাদেশকে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের পরিকল্পনার কথাও ভেবে দেখা দরকার।
অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের স্থলভাগের আয়তন যেখানে মাত্র ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের সামান্য বেশি, সেখানে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার ওপর অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অর্জন যে আমাদের কত বড় সৌভাগ্য, তা কি আমরা উপলব্ধি করতে পারছি? দুঃখজনক বিষয় হলো, এই বিজয় অর্জনের ছয় বছর অতিক্রান্ত হলেও যথাযথ অগ্রাধিকার দিয়ে আজও এই বিশাল সমুদ্রসীমা থেকে সম্পদ আহরণ জোরদার করা যায়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ