ঢাকা, বুধবার 11 March 2020, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৫ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

জিম্বাবুয়েতে সন্তান স্কুলে না গেলে মা-বাবার জেল-জরিমানা

সংশোধিত নতুন আইনে ১২ বছর স্কুলে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে                              -ছবি এএফপি

১০ মার্চ, এএফপি, বিবিসি : স্কুলে ঝরে পড়া ঠেকাতে অভিনব শাস্তির বিধান করেছে জিম্বাবুয়ে। সন্তান স্কুলে না গেলে ব্যর্থতার দায়ে শাস্তি পেতে হবে মা-বাবাকে। সে ক্ষেত্রে তাঁদের দুই বছর পর্যন্ত কারাভোগ করতে হতে পারে।

খবরে বলা হয়েছে, দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে জিম্বাবুয়েতে স্কুল থেকে শিশুদের ঝরে পড়ার হার বাড়ছে। কোনো কোনো স্থানে ২০ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না। এ অবস্থায় ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে দেশটির সরকার। নতুন আইনে সন্তান স্কুলে না গেলে মা-বাবার দুই বছর পর্যন্ত কারাভোগ অথবা ২৬০ ডলার (২২ হাজার টাকার বেশি) জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্কুলের বেতন দিতে না পারলে অথবা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে স্কুল থেকে বহিষ্কার করাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে আইনটিতে।

জিম্বাবুয়ে দুর্বলতা মূল্যায়ন কমিটির (জিমভ্যাক) তথ্য অনুসারে গত বছর দেশটিতে বেতন দিতে না পারায় ৬০ শতাংশ শিশুকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়।

জিম্বাবুয়ের মরহুম প্রেসিডেন্ট স্বাধীনতাকামী নেতা রবার্ট মুগাবের ১৯৮০ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পরে নেয়া শিক্ষানীতি প্রশংসা কুড়িয়েছিল। মুগাবে নিজেও শিক্ষক ছিলেন। তিনি যে নীতি গ্রহণ করেন, এতে জিম্বাবুয়ের কৃষ্ণাঙ্গ অধিবাসীদের জন্য স্কুলে যাওয়ার বড় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, শত শত স্কুল নির্মাণ হয়েছিল। আর এই উদ্যোগের ফলে শিক্ষার হারে জিম্বাবুয়ে হয়ে ওঠে আফ্রিকার শীর্ষ দেশ। নব্বই দশকে বিনা মূল্যে শিক্ষাব্যবস্থার সমাপ্তি টানা হয় এবং এরপর থেকে দেশটিতে শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

সংশোধিত নতুন আইনে ১২ বছর স্কুলে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আগের প্রস্তাবের চেয়ে পাঁচ বছর বেশি সময় যুক্ত করা হয়েছে এতে।

জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারে থেকে প্রতিবেদক শিংগাই নিয়োকা বলেছেন, অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে মা–বাবাকে বাধ্য করার এই প্রচেষ্টাকে বেশ সাহসী পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে। তবে কারও কারও মতে, স্কুলের তীব্র সংকটের মধ্যে বিনামূল্যে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সরকার নতুন আইনের মাধ্যমে দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। স্কুল থেকে বিপুলসংখ্যক শিশুর ঝরে পড়ার কারণের মধ্যে গর্ভধারণ করা, বাল্যবিবাহ, বাড়ি থেকে স্কুলের দীর্ঘ দূরত্ব এবং আগ্রহের অভাবও রয়েছে। মা–বাবাকে খাবার কিনতে সংগ্রাম করতে হয় বলে তাঁরা শিক্ষায় কম খরচ করেন।

জিম্বাবুয়েতে এলাকা ভিত্তিতে সরকার পরিচালিত স্কুলে বছরে খরচ লাগে ৩০ থেকে ৭০০ ডলার।

রাজধানীর ইপওয়ার্থের মতো দরিদ্র এলাকায় অস্থায়ী স্কুল রয়েছে। এগুলো বাড়িতে বা আঙিনায় করা হয়। ওই স্কুলগুলো নিবন্ধিত নয়, অবৈধ। তবে সেখানে খরচ অনেক কম। মাসে মাত্র তিন ডলার।

এ ধরনের একটি স্কুল পরিচালনা করেন ইউনিস মারোনগা। তিনি বলেন, এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের বেতন ও ইউনিফর্মের ব্যাপারে শিথিলতা আছে। শিক্ষার্থীরা যখন পারে, তখন বেতন দেয়। বসার জন্য কোনো বেঞ্চ বা ডেস্ক নেই। শুধু শিক্ষকের জন্য একটি পাঠ্যবই থাকে।

বেসরকারি সংস্থা এডুকেশন কোয়ালিশন অব জিম্বাবুয়ের কর্মকর্তা লিবার্টি মাতসিভ বলেন, সরকারি স্কুলের সংকট থাকায় এই ধরনের নিবন্ধনহীন স্কুলের সংখ্যা বাড়ছে। এমন প্রায় দুই হাজার স্কুল আছে।

এলিজাবেথ চিবান্দা নামের একজন মা জানান, তাঁর খাবারের ব্যবসা বন্ধ হয়ে পড়লে তিনি তাঁর আট বছর বয়সী মেয়েকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে বাড়িতেই বসে থাকে, কিছু করে না। কিন্তু আমি আমার চারপাশে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া ওর বয়সী শিক্ষার্থীদের দেখলে লজ্জা পাই। তারও স্কুলে থাকার কথা ছিল।’ ছয় বছর বয়সী ছেলেকেও এ বছরের জানুয়ারি মাসে স্কুলে ভর্তি করাতে পারেননি বলে জানান। তিনি বলেন, ‘ছেলের কাছে এমন ভান করি, যেন তার স্কুলে পড়ার বয়সই হয়নি।’

গত বছর রবার্ট মুগাবে মারা যান। এর আগে ২০১৮ সালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। আশা করা হয়েছিল, সেনাসমর্থিত উত্তরসূরি ইমারসন নানগাগোয়া দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করবেন। তবে পরিস্থিতি খারাপ থেকে আরও খারাপ হয়েছে। বিদেশি মুদ্রা, খাদ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং ওষুধের তীব্র সংকটে রয়েছে জিম্বাবুয়ে। একসময়ের প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী দেশটি এখন খরার কবলে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ