ঢাকা, সোমবার 16 March 2020, ২ চৈত্র ১৪২৬, ২০ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বাতাসে দোলে সূর্যমুখী দোলে কৃষকের মন

খুলনা অফিস : খুলনার আড়ংঘাটা বাইপাস সড়কের উত্তর পাশে লক্ষ্য করতেই চোখ আটকে যায় সূর্যমুখী ফুলে। ফাগুন হাওয়ায় দোল খাওয়া ফুল যেন কাছে ডাকছে। রয়েছে মৌমাছির গুঞ্জন। কিছুটা কাছে গিয়ে দেখা যায় এ ভর দুপুরে কয়েকজন যুবক সেখানে সেলফি তুলছে। আড়ংঘাটা মোড়লডাঙ্গার সাফিয়া বেগম তখন স্বামীকে নিয়ে ফুলের ভারে নুয়ে পড়া গাছ সোজা করছেন। তখনও ফুলের সাথে একাকার হয়ে ছবি তুলছে নগরীর সার্কিট হাউজ মোড় এলাকার নাসিম সৈকত এবং পূর্ব বানিয়াখামার এলাকার মো. ফেরদৌস হোসেন। তারা জানায়, কয়েকদিন ধরে সোস্যাল মিডিয়ায় সূর্যমুখী ফুলের ছবি দেখছি। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অনেক খোঁজাখুঁজি করে পেলাম এখানকার ঠিকানা। মন ভরে ছবি তুলছি। আর পোস্ট করছি সোস্যাল মিডিয়ায়। অনেক লাইক আর কমেন্টস পাচ্ছি। শহরের পাশে এমন মনোরম পরিবেশে সূর্যমুখী যেন মাথা উঁচিয়ে তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। আর কাছে ডাকছে।

খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এ জেলায় ১৯ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষাবাদ হয়। উৎপাদন হয় ৩৮ মেট্রিক টন। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৯ মেট্রিক টন, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ১ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ২ মেট্রিক টন, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে (খরিপ-১) ১৪ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ মেট্রিক টন এবং একই অর্থবছরে (রবি) ৩২ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। সাফিয়া বেগম জানান, এ বছর আমি প্রথম এ ৩৩ শতাংশ জমিতে ফুলের চাষাবাদ করেছি। প্রথমদিকে মন খারাপ ছিল। কি হবে কে জানে। ভেবেছিলাম এবার বুঝি ফাউ কষ্ট করলাম। কিন্তু যখন ফুল আসতে শুরু করলো। সেই ফুল হালকা বাতাসে দুললে মনের ভেতরেও আনন্দের দোল খায়। চাঁদ রাতে ফুলের দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে আসে। এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসে এখানে। ফুলের সাথে ছবি তোলে। সারাদিন শুধু বলতে হয়, ক্ষেতের ভেতরে নামবেন না। ফুল ছিঁড়বেন না। এখন আর কষ্ট লাগে না। মানুষজন আসে ভালোই লাগে। ফলন ভালো হয়েছে। আগামীতে আরও বেশি জায়গায় সূর্যমুখীর চাষাবাদ করবো। ২০১৯ এর ডিসেম্বরের ১২ তারিখ বীজ রোপণ করেছি। আশা করছি মার্চের শেষ দিকে ফলন ঘরে তুলতে পারবো। এ ক্ষেতে প্রায় ৬ হাজারের ওপরে গাছ রয়েছে। দিঘলিয়া উপজেলাধীন আড়ংঘাটা সরদার ডাঙ্গা ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাবিহা শারমিন জানান, গোপালগঞ্জ, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও পিরোজপুর কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষক সাফিয়া বেগমকে সূর্যমুখীর বীজ, সার সরবরাহ করা হয়েছে। ফলন ভালো হয়েছে। তার দেখাদেখি অনেক কৃষক আগামীতে সূর্যমুখী ফুলের চাষাবাদ করতে আগ্রহী হচ্ছে।

খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মো. নজরুল ইসলাম জানান, সূর্যমুখী বীজে লিনোলিক এসিড বিদ্যমান। উন্নতমানের  তেল থাকে। হৃদরোগীদের জন্য সূর্যমুখীর তেল খুবই উপকারী। সূর্যমুখীর খৈল গরু ও মহিষের উৎকৃষ্টমানের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর বীজ ছাড়ানোর পর মাথাগুলো গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। গাছ ও পুষ্পস্তবক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সূর্যমুখী সাধারণত সব মাটিতেই জন্মে। তবে দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পঙ্কজ কান্তি মজুমদার জানান, ভোজ্যতেল হিসেবে সূর্যমুখী ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে বাংলাদেশে। আমদানির মাধ্যমেই দেশে এর চাহিদা পূরণ হচ্ছে। 

সূর্যমুখী তেল সাধারণত আমদানি করা হচ্ছে সাইপ্রাস, মালয়েশিয়া, আরব আমিরাত, ভারত, ইতালি, ওমান ও সিঙ্গাপুর থেকে। প্রথমে উচ্চবিত্তরা এর ভোক্তা হলেও বর্তমানে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যবিত্তরাও এ তেল কিনছেন। 

খুলনায় দৌলতপুর অয়েল মিল এবং সাতক্ষীরায় বেশ কিছু সরিষার মিল সূর্যমুখী থেকে তেল উৎপাদন শুরু করেছে। বর্তমানে কৈয়া বাজারের পাশে ন্যাচারাল এগ্রো প্রসেস সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠানও সূর্যমুখী থেকে তেল উৎপাদন শুরু করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ