ঢাকা, রোববার 22 March 2020, ৮ চৈত্র ১৪২৬, ২৬ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

আমানতের প্রবৃদ্ধি না বাড়ায় ব্যাংকগুলোতে দেখা দিয়েছে টাকার সঙ্কট

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। ব্যাংকগুলোর ৯ শতাংশ ঋণের সুদহার কার্যকর করতে হবে আগামী ১ এপ্রিল থেকে। এ ঋণের সুদহার কার্যকর করতে গিয়ে বেশির ভাগ ব্যাংকই গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এতে আমানতকারীরা ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বেশি মুনাফার আশায় নানা খাতে বিনিয়োগ করছেন তারা। এ কারণেই আমানতের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। আমানতের প্রবৃদ্ধি না বাড়ায় ব্যাংকগুলোতে এরই মধ্যে টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই ব্যাংকগুলো তাদের সঙ্কট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রেপোর মাধ্যমে ধার নিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গড়ে ১০ হাজার কোটি টাকারও ওপরে ধার নিচ্ছে সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলো। এটা অব্যাহত থাকলে সামনে ব্যাংক খাতে টাকার সঙ্কট আরো বেড়ে যাবে। এর পাশাপাশি সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অধিকমাত্রায় ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ দেয়ার মতো ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ হাতে থাকবে না। এতে চাপে পড়ে যাবে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর।
পরিস্থিতি উন্নতি না হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আরো কমে যাবে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। কাঙ্খিত হারে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রেও বাধাগ্রস্ত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ইতোমধ্যে ঋণের সুদহারে সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়নে আমানতে ৬ শতাংশ সুদহার কার্যকর করেছে অধিকাংশ ব্যাংক। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে এ হার কার্যকর হয়। গবর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) প্রতিনিধিদল এ তথ্য জানিয়েছে। সংগঠনটির নতুন চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। বৈঠক শেষে জানানো হয়, ব্যাংক আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করেছেন তারা। এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা চেয়েছেন এমডিরা। এ ছাড়া এসএমই ঋণ সিঙ্গেল ডিজিটের বাইরে রাখার আবেদন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে লিখিত সুপারিশ দেয়ার পরামর্শ দেন গবর্নর।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়নে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ শতাংশের বেশি সুদে আমানত গ্রহণ করবে না কোন ব্যাংক। মেয়াদি স্কিম ছাড়া সব ধরনের আমানতের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে। তবে যেসব আমানতের মেয়াদ শেষ হবে, সেগুলোর মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। বৈঠক প্রসঙ্গে এবিবি চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখার জানান, কোন ব্যাংক ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিল আবার কোন কোন ব্যাংক ৭ শতাংশে আমানত নিল, এতে বাজারে অসমতা সৃষ্টি হবে। আমরা ধাপে ধাপে আমানতের সুদহার কমাতে শুরু করেছি। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, সরকারের আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে। সেই অনুসারে আস্তে আস্তে আমানতের সুদহার কমাচ্ছি। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ এপ্রিল থেকে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে নিয়ে আসব। এটি বাস্তবায়নে আমরা কাজ শুরু করেছি। তাই আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করেছি যেন সবাই আমানতের সুদহার ৬ শতাংশের নামিয়ে আনতে পারি।
এদিকে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণের সুদহার নামাতে ব্যাংককারদের দাবি অনুযায়ী সরকারের আমানতের সুদহার নির্দিষ্ট করে সম্প্রতি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এতে সরকারের নিজস্ব অর্থের ৫০ শতাংশ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে রাখার বিধান রাখা হয়েছে। ব্যাংকের সুদহার বেঁধে দেয়ার পর আমানতকারীদের সবাই যাতে সরকারি ব্যাংকের দিকে ঝুঁকে না পড়েন, তা ঠেকাতে বেসরকারি ব্যাংকে ডিপোজিটে মুনাফা আধা শতাংশ বেশি করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখলে সর্বোচ্চ সুদ পাবে ৬ শতাংশ। আর এ অর্থ যদি সরকারি ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখে তাহলে সর্বোচ্চ সুদ পাবে সাড়ে ৫ শতাংশ। অর্থাৎ বেসরকারি ব্যাংকে সুদ বেশি পাবে আধা শতাংশ।
এদিকে ব্যাংকগুলোতে আমানত সংকটের অন্যতম কারণ হলো সরকারের অধিক হারে ঋণ গ্রহণ। জানা গেছে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরের গত ৮ মাস ৫ দিনেই সরকার এই ঋণ নিয়েছে ৫৩ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।
এ অস্বাভাবিক ঋণ নেয়ার কারণ হিসাবে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, কাঙ্খিত হারে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। আবার ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে থেকেও আগের মতো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। উন্নয়ন ব্যয় ঠিক রাখতে সরকার বাধ্য হয়েই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি মাত্রায় ঋণ নিচ্ছে। ঋণ নেয়ার এ ধারা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরো চাপে পড়ে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি অনুযায়ী বেসরকারি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ধারে কাছেও যেতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত বছরের ৫ মার্চ সরকারের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণের স্থিতি ছিল ৮৯ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সরকারের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে হয়েছে ৭১ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা বা প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা।
আবার অর্থবছরের হিসাবে, গত অর্থবছরের শেষ দিনে অর্থাৎ ৩০ জুনে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। আর ৫ মার্চ পর্যন্ত ঋণের স্থিতি বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের হিসাবে ৮ মাস ৫ দিনে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে ৫৩ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। অথচ পুরো অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, যে হারে ঋণ নেয়া হচ্ছে এই একই হারে ঋণ নিলে বছর শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ ১ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ নিয়েছিল প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা, সেখানে চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে নেমেছে মাত্র ৭ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে গত বছরের চেয়ে এক-চতুর্থাংশ ঋণ পেয়েছে সঞ্চয়পত্র থেকে।
এ দিকে কাঙ্খিত হারে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত জানুয়ারি মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ, যেখানে গত বছরের জানুয়ারিতে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সামনে রাজস্ব আদায়ের চলমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ব্যয় ঠিক রাখতে সরকারকে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বেশিমাত্রায় ঋণ নিতে হবে।
এদিকে আগামী ১ এপ্রিল থেকে সব ঋণের ক্ষেত্রে (ক্রেডিট কার্ড ছাড়া) এটি কার্যকর হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এরই মধ্যে বেশিরভাগ ব্যাংক আমানতের (এফডিআর) সুদহার কমাতে শুরু করেছে। ব্যাংকগুলো এখন আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ হারে নিচ্ছে। যারা এখনো কার্যকর করেনি তারা চলতি মাসের মধ্যেই তা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার কথা হচ্ছে প্রায় দুই বছর ধরে। বিভিন্ন সময়ে অর্থমন্ত্রী, ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসসহ (বিএবি) সংশ্লিষ্টরা এ ঘোষণা দিয়ে আসছিলেন। যদিও ঋণের সুদহার না কমে উল্টো আরও বাড়ে। এ অবস্থায় ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন প্রধানমন্ত্রীও। সর্বশেষ আগামী ১ এপ্রিল থেকেই ক্রেডিট কার্ড ছাড়া দেশের সব ধরনের ব্যাংকঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই সুদহার কমানোর বিষয়টি দেখভাল করছেন। সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে রাখার বিষয়েও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এদিকে এনবিআরের একটি প্রজ্ঞাপন নিয়ে ব্যাংক এমডিদের অসন্তোষ রয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন ধরনের ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয় স্কিমের সুদের ওপর উৎসে কর কর্তন ও জমাদান বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে নেয়া ধার বা কলমানির সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর কর্তনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমানতকারী টিআইএনধারী হলে ১০ শতাংশ অন্যথায় ১৫ শতাংশ হারে কর কর্তন করতে বলেছে এনবিআর। এছাড়া সব ধরনের কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত ফান্ডের (পেনশন, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ অন্যান্য ফান্ড) আমানতের সুদের ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমানতের সুদ প্রদান অথবা হিসাবে ক্রেডিট করার সময় উৎসে কর কর্তন প্রযোজ্য হবে বলেও নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এক্ষেত্রে শুধু চূড়ান্ত প্রদানের সময় কর কর্তন না করে প্রতিবার সুদ ক্রেডিট প্রদানকালে উৎসে কর কর্তন ও জমাদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এনবিআরের এ প্রজ্ঞাপনকে ব্যাংক ও গ্রাহকদের স্বার্থবিরোধী বলে দাবি করেছেন ব্যাংক নির্বাহীরা। এ নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন তারা।
ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করেন, সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দিতে গেলে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাবে। আর মুনাফা কমে গেলে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতায় বিরূপ প্রভাব পড়বে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খেলাপি ঋণ না কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিট তথা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণের জন্য চাপ দেওয়ার কারণে এর বড় আঘাতটা আসবে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। কারণ, এটা করতে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় কমানোর প্রয়োজন হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সবাই ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন না। ব্যাংকিং খাতে যাদের প্রভাব আছে, কেবল তারাই ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন।' তিনি উলেস্নখ করেন, এটা করতে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় কমানোর প্রয়োজন হবে। এতে বড় আঘাতটা আসবে অল্প আয়ের মানুষের ওপর। সীমিত আয়ের সঞ্চয়কারীর ক্ষতির মুখে পড়বেন।
তিনি বলেন, ঋণে ৯ শতাংশ সুদের কথা বলে আমানতকারীদের কাছ থেকে কম সুদে ডিপোজিট নেওয়ায় আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আসল কথা হলো সাধারণ ভোক্তা বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন না। একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে গিয়ে উল্টো এসএমই ও অন্যান্য খাতে ঋণের সুদ হার আরও বাড়তে পারে।
এদিকে করোনা ভাইরাস ব্যাংকিং খাতকে আরও সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। করোনা ভাইরাসে ব্যবসাবাণিজ্যে স্থবিরতা সৃষ্টি হওয়ায় ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ সুবিধার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে আগামী জুন পর্যন্ত কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও ঋণের শ্রেণিমানে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে এ নির্দেশ দিয়ে এক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে বর্তমানে কোনো ঋণগ্রহীতা যদি ৩০ জুন পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন, তা হলে তাকে খেলাপি করা যাবে না। তবে যদি কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা এই সময়ের মধ্যে ঋণ শোধ করেন, তাকে নিয়মিত ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, করোসাভাইরাসের কারণে ব্যবসাবাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য চীনের হুবেইপ্রদেশের উহান শহর থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। বাংলাদেশে এ ভাইরাসে এখন পর্যন্ত দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ জন। করোনার কারণে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হওয়ায় ব্যবসাবাণিজ্যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। এই জন্য এ খাতে সংকট দেখা দিয়েছে। এক অঙ্কে আনার বিষয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, জোর করে নির্দেশনা দিয়ে ব্যাংকের সুদহার ৬-৯ বাস্তবায়ন করা কঠিন। দেশের মূল্যস্ফীতিই তো ৬ শতাংশ। সুতরাং আমানতকারীকে ৬ শতাংশ সুদ দেয়া হলে ব্যাংকে কেউ টাকা রাখবে না। দীর্ঘদিন ধরেই আমানতের প্রবৃদ্ধি কমছে। ব্যাংকগুলো ঋণ দেয় আমানতের ওপর ভিত্তি করে। আমানত কমে গেলে সে তো ঋণ দিতে পারবে না। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি অনেক দিন ধরেই কমছে। আমানত কম হলে ব্যাংকগুলো আরো তারল্য সংকটে পড়বে। সুতরাং এসব বিষয়ে সঠিক একটি দিকনির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা দিলে সে সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামত সুস্পষ্টভাবে জানানো দরকার।
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতা অর্জন তো দূরের কথা, ব্যাংকিং খাতের টিকে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। খারাপ ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে, সরকার মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট শুরু করেছে। ৯-৬ শতাংশ বেঁধে দিচ্ছে। মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট কোনো দিন ভালো ফল আনে না। একটা ব্যবসাকে তার নিজের মতো চলতে দিতে হবে। বাধা-ধরা নিয়মের মধ্যে ১৯৭০ সালে ছিলাম আমরা, এখন আবার সেখানেই ফিরে যাচ্ছি। তিনি বলেন, ২০২০ সাল ব্যাংকিং খাতের জন্য কি নিয়ে এসেছে তা নিয়ে আমরা সবাই চিন্তিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ