ঢাকা, সোমবার 23 March 2020, ৯ চৈত্র ১৪২৬, ২৭ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

করোনা মোকাবিলার প্রস্তুতিতে ঘাটতি!

স্টাফ রিপোর্টার : করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রায় তিন মাস সময় পেয়েছিল। তবে নেয়া হয়নি তেমন প্রস্তুতি, ছিল না তেমন কোনো পরিকল্পনা। দুর্বল ব্যবস্থাপনার জেরে বিদেশ ফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইন ঠিকমতো মনিটরিং না করায় স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে করোনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
 প্রথম ধাপে গাফিলতির পর দ্বিতীয় ধাপেও অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অনুপাতে যে পরিমাণ হাসপাতাল, নমুনা পরীক্ষার কিট, আইসিইউ ও চিকিৎসকসহ অন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জাম দরকার, তার কোনো জোগাড় নেই। এর ওপর এককভাবে সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানকে নমুনা পরীক্ষার দায়িত্ব দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করা হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কয়েকটি বিশেষ হাসপাতাল তৈরির কথা বললেও তা কবে বাস্তবায়ন ও কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়েও কাটছে না সংশয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (২০ মার্চ সকাল ৮টা থেকে ২১ মার্চ সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন চার জন। এ পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ জন, মারা গেছেন দুই জন। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন ৪০ জন, হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন ১৫ হাজার ১৭২ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে যখন কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়েছে, তখনও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিদেশ থেকে কিট আনার কথা বলছেন, চিকিৎসকদের সুরক্ষায় পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সরকারি একটি হাসপাতাল চিকিৎসকদের নিজেদের পিপিই কিনে নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে পিসিআর মেশিনের সংকট। রোগী যখন বেড়ে যাবে, তখন একমাত্র আইইডিসিআরের পক্ষে এত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করার মতো অবস্থা থাকবে না। তাই এ নমুনা পরীক্ষায় আরও প্রতিষ্ঠানকে সংযুক্ত করা দরকার।
দেশে করোনা আক্রান্তদের জন্য প্রথমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালকে তৈরি করা হয়। পরে তালিকায় যোগ হয় মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও নয়াবাজার মহানগর হাসপাতাল।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী শনিবার জানান, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ও শেখ হাসিনা বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটকেও প্রয়োজনে কাজে লাগানো হবে।
এদিকে চিকিৎসা সেবা দেয়ার প্রস্তুতি দেখতে রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কেবল ওয়ার্ডজুড়ে বেড পেতে রাখা হয়েছে, নেই কোনও যন্ত্রপাতি। অথচ এ রোগে আক্রান্ত একটি বড় অংশের জন্য প্রয়োজন হবে আইসিইউ সাপোর্ট।
প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক বলেন, যে হাসপাতালে অন্যান্য রোগী থাকে, সে হাসপাতালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসাই করা উচিত নয়। কারণ, সেখানে তো অন্যান্য রোগীরা থাকেন, সেখান থেকে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা সংক্রমিত হবেন। যা হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। যেসব হাসপাতালে মূলত রোগী কম থাকে সেসব হাসপাতালে এই রোগীদের রাখা দরকার, যাতে তাদের থেকে অন্য রোগীরা সংক্রমিত না হন।
আক্রান্ত রোগীদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে, রাখতে হবে কোয়ারেন্টিনে, বলেন মুগদা হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জাতির সঙ্গে ‘মশকরা’ করছেন বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করে চিকিৎসকরা বলেন, কোনও প্রস্তুতিই নেওয়া হয়নি, কোনো সরঞ্জাম কেনেনি, প্রস্তুতি বিষয়টি কী, তা-ই মন্ত্রী হয়তো জানেন না। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে কী কী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি কোনও উত্তর দেননি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন মহানগর জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ডা. প্রকাশ চন্দ্র রায় বলেন, মহানগর জেনারেল হাসপাতালকে আইসোলেশন কেন্দ্র করার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে আমরা বেশ কিছু সরঞ্জাম, চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধপত্র ও ডাক্তারদের ব্যক্তিগত প্রটেকশনের জন্য জিনিসপত্র চেয়েছি। তবে এসব উপকরণ স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে এখনও আমাদের দেওয়া হয়নি। প্রথম অবস্থায় আইসোলেশন কেন্দ্রের কথা বলা হলেও এখন বলা হচ্ছে এতে বহির্বিভাগ চিকিৎসাও দেয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনও রোগী মারাত্মক অবস্থায় চলে গেলে তাকে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) রাখতে হয়, অথচ আমাদের আইসিইউ নেই। যে সময় আছে সেই সময়ের মধ্যে আইসিইউ প্রতিস্থাপনেরও কোনও সম্ভাবনা দেখছি না।
আমাদের গোড়াতেই গলদ ছিল মন্তব্য করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, শুরুতে দেখেছি তাপমাত্রা মেপে যাত্রীদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের কোনও নিবন্ধন হয়নি, এজন্য কারও কাছে কোনও ডাটা নেই।
একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে আসার পর তাদের ‘কাউন্সেলিং’ করা দরকার ছিল উল্লেখ করে ডা. জাহিদ বলেন, বিদেশ থেকে যারা এসেছেন তারা বলেছেন, আমি সুস্থ। কিন্তু দেশের স্বার্থে সুস্থ মানুষকেও আলাদা করে রাখতে হতে পারে- এ কনসেপ্টই তাদের নেই। এখানে তাদের দোষ নেই, আমরা যারা দায়িত্বে ছিলাম, তারা কেউ কথাই বলিনি, বোঝাবো কীভাবে?
তবে এখনও সময় আছে, মন্তব্য করে তিনি বলেন, সারা দেশে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা সব ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন করা হোক। জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ভাড়া নিয়ে সেগুলোকে সাময়িক কোয়ারেন্টিন সেন্টার বানানো সম্ভব। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হোক। একইসঙ্গে যেসব সরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্য সেবাদানকারী যেমন ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ানদের জন্য পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট পাঠানো হয়নি, যত দ্রুত সম্ভব তা সরবরাহ করা হোক।
করোনাভাইরাসের কিটের অভাব রয়েছে কিনা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, খুব দ্রুত এক লাখ কিট ও ১০ লাখ পিপিই সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব উপকরণ সংগ্রহ হলে কোনও সেবা কেন্দ্রে পিপিইর কোনও অভাব হবে না বলে দাবি করেছে অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫০০ পিপিই দেওয়া হয়েছে, সিএমএসডি (সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোরস ডিপো) ১০ হাজার পিপিই সংগ্রহ করেছে, গত ১৯ মার্চ দুই হাজার কিট এসেছে বলেও জানান তিনি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, ‘বাংলাদেশে কোনও পদ্ধতিই ঠিকমতো কাজ করছে না। বাংলাদেশে প্রস্তুতি এবং কার্যক্রম এখন পর্যন্ত একমাত্র আইইডিসিআরের হাতে। এই রোগ নির্ণয়ের সুবিধা-সংবলিত আরও কয়েকটি ল্যাবরেটরি এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) তাদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সরকার তাদের কোভিড-১৯ শনাক্তের অনুমতি দেয়নি। এতে করে জনগণের দুর্ভোগ বেড়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, যদি রোগী বেশি হয় তাহলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সতর্কতার অংশ হিসেবে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেওয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ