ঢাকা, মঙ্গলবার 24 March 2020, ১০ চৈত্র ১৪২৬, ২৮ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

করোনা নিয়ে মন্ত্রীদের মন্তব্যে জনমনে উষ্মা ও ক্ষোভের সৃষ্টি

স্টাফ রিপোর্টার : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের মন্তব্যে জনগণের মাঝে  আতঙ্কের মধ্যেও একটা উষ্মা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গতকাল সোমবার এক ব্রিফিংয়ে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই কথা বলেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন গবেষণা থেকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশে প্রায় লক্ষ লক্ষ লোক আক্রান্ত এবং বহু মানুষ এখানে মারা যাবে। আমরা প্রথম থেকে বলছিলাম যে, এই বিষয়গুলোকে নজর দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করবার জন্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা তো তারা গুরুত্ব দেননি। সরকারের মন্ত্রীরা এখনো বলছেন, আতঙ্কিত হবার মতো কিছু এখনো ঘটেনি। কেউকেউ বলছেন, তাদের সব ধরণের প্রস্তুতি রয়েছে। তারা তিন মাস আগে থেকে প্রস্তুত ছিলেনঅ অথচ দেশবাসী যার কোনো নজীর দেখতে পারছেন না। সরকার বলছে, এই পর্যন্ত ৩৩ জন আক্রান্ত হয়েছে। পরীক্ষা করার জায়গা তো শুধুমাত্র একটা- আইইডিসিআর। সেই জায়গায় পরীক্ষা হচ্ছে, সবাই পরীক্ষা করতেও পারছেন না। যার ফলে কতজন রোগী ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন, কত জন এর দ্বারা সংক্রামিত হয়েছেন সেটার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আমরা পাচ্ছি না। বিদেশ থেকে আসা ৬ লাখ প্রবাসী গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ায় ভাইরাসের সংক্রামণের সংখ্যা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারের উদাসীনতা ও প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করেন বিএনপি মহাসচিব।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় গুলশানে চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে আসেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি কয়েকটি ইলেক্ট্রনিক ও গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ইন্টারনেটে লাইফ সম্প্রচারে করোনাভাইরাস সংক্রামণের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর কথা বলেন। এই সময়ে তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন নসু ও চেয়ারপার্সনের প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তায় শায়রুল কবির খান উপস্থিত ছিলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রামণের ব্যাপকতায় পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতা দিবসের সকল কর্মসূচি বাতিল করেছে বিএনপি। তিনি বলেন, আপনাদেরকে জানাতে চাই যে, আমাদের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সারাদেশের দলের সকল কর্মসূচি আমরা বাতিল করেছি। কোনো রকমের জনসমাবেশ-সমাবেশ যেন না হয় তার জন্য নেতা-কর্মীদেরকে দৃষ্টি রাখার আহবান জানাচ্ছি। আমরা আমাদের দলের নেতা-কর্মীদের বলেছি যে, তারা যে যেই অবস্থায় আছে, নিজেদেরকে সাবধান রেখে জনগনের মধ্যে সচেতনতার কাজ করবেন এবং দলের কর্মীরা যেন নিয়ম মেনে চলেন, সাবধানে থাকেন-সেই বিষয়গুলো নিশ্চিত করবেন।
স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের দিন বিএনপি সকালে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং পরে শেরে বাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা  প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরে পুস্পমাল্য অর্পন করে থাকে। এছাড়া স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিএনপি ও তার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন আলোচনা সভা করে।
করোনাভাইরাসে মোকাবিলায় সরকারের ছুটি ঘোষণা ও বিভাগীয়-জেলা পর্যায়ে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, করোনাভাইরাসের চিকিৎসা এবং জনগনকে আইসোলেটেড করে রাখার যে ব্যাপারটা আছে- একজন থেকে আরেকজনকে আইসোলেটেড করে রাখা- এ ব্যাপারটাকে সরকারের গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিলো। যদিও তারা(সরকার) দেয়া শুরু করেছেন। এটা দেরিতে হলেও আমি মনে করি যে, বুঝতে পেরেছেন। বিলম্বে হলেও সরকার যে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছেন সেটা  তারা করেছেন। এখন এটাকে যেন নিবিড়ভাবে পরিচালনা করা হয় সেটা তাদেরকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বাংলাদেশ একটা ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এই দেশে এই ধরনের ছোঁয়াচে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে দেশে এবং বিশ্বে, এটা যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়। তাহলে এটা একটা ভয়াবহ রকমের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।
নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং জন হককিন্সের প্রকাশিত মেডিকেল রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা একটা আতঙ্কসৃষ্টিকারী একটা রিপোর্ট। বলা হচ্ছে যে, প্রায় ৫ লক্ষ লোক আক্রান্ত এবং বহু মানুষ এখানে মারা যাবে। আমরা প্রথম থেকে বলছিলাম যে, এই বিষয়গুলোকে নজর দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করবার জন্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা তো তারা গুরুত্ব দেননি। তাদের মন্ত্রীরা এমন এমন উক্তি করেছেন যা মানুষের এই আতঙ্কের মধ্যেও একটা উষ্মা ও ক্ষেদের সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী গতকালও বলেছেন, তারা তিন মাস আগে থেকে প্রস্তুত ছিলেন, যার কোনো নজীর আমরা দেখতে পারছি না। সরকার এই পর্যন্ত বলছে ৩৩ জন আক্রান্ত হয়েছে। পরীক্ষা করার জায়গা তো শুধুমাত্র একটা- আইইডিসিআর। সেই জায়গায় পরীক্ষা হচ্ছে, সবাই পরীক্ষা করতেও পারছেন না। যার ফলে কতজন রোগী ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন, কত জন এর দ্বারা সংক্রামিত হয়েছেন সেটার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আমরা পাচ্ছি না। বিদেশ থেকে আসা ৬ লাখ প্রবাসী গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ায় ভাইরাসের সংক্রামণের সংখ্যা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারের উদাসীনতা ও প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা সমালোচনা করেন বিএনপি মহাসচিব।
করোনাভাইরাস রোগীর চিকিৎসার হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি, চিকিৎসক-নার্সদের প্রশিক্ষন, তাদের বিশেষ পোষাক ও পর্যাপ্ত কিট সরবারহের দাবিও জানান তিনি। এখনো সময় আছে, অতি দ্রুততার সঙ্গে সরকার যদি হাসপাতালগুলোকে ইক্যুপট করে। প্রত্যেকটা জেলা হাসপাতালে যদি চিকিৎসক-নার্সদের পোষাক প্রদান করে, টেস্টিং মেটেরিয়াল দেয়া যায়, কিটস সরবারহ করা যায় তাহলে অন্ততঃ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যাবে। আমরা মনে করি প্রত্যেকটি হাসপাতালে একেকটা টিম থাকা দরকার, যে টিমের কাজ হবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেয়ার কাজটুকু করা।
করোনা ভাইরাসের কারণে গামেন্টর্স শিল্প রক্ষায় মালিক-শ্রমিকদের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থাগ্রহন এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য ভাতা প্রদানে সরকারের প্রতি দাবি জানান মির্জা ফখরুল। দেশের ৬৩জন বিশিষ্ট নাগরিকের দেয়া যুক্ত বিবৃতির প্রতি সমর্থনও জানান তিনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআর বলেছে, নতুন ছয়জনকে নিয়ে বাংলাদেশে মোট ৩৩ জন আক্রান্ত। যাদের মধ্যে পাঁচজন ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আক্রান্তদের মধ্যে গত ২৪ ঘন্টায় একজনের মৃত্যু হওয়ায় মুত্যুর মোট সংখ্যা দাঁড়াল ৩ জন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা আমাদের তরফ থেকে যতটা সম্ভব অথোরেটির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে যেন সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ রাখা হয় তার জন্য আমরা কথা বলেছি এবং তারা আমাদেরকে নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে সেটা তারা করছেন। আপনারা জানেন যে, তার পরিবারের থেকে আবেদন করা হয়েছে যে, সম্পূর্ণভাবে মানবিক কারণে তাকে চিকিৎসার জন্য মুক্ত করা হোক। আমরা যেটা পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছি যে, তাকে দ্রুত মুক্ত করা হোক।
এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে, করোনাভাইরাসের এই সময়ে সাংবাদিকদের চাকুরিচ্যুত করা হচ্ছে। এই সময়ে তাদেরকে কর্মচ্যুত করা অমানবিক ও অনৈতিকও বটে। আমরা আশা করব যে, গণমাধ্যমের যারা মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় আছেন তারা এই বিষয়টাকে অবশ্যই বিবেচনা করে এখন যাতে কেউ কর্মচ্যুত না হয় সেটা বিশেষভাবে দেখবেন। করোনা ভাইরাসের সংবাদ প্রকাশে জনসচেতনতায় গণমাধ্যমের ভুমিকার প্রশংসা করেন বিএনপি মহাসচিব।
কালো দিবসের বাণী: গতকাল এক বাণীতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়। এ দিনে সামরিক ফরমান জারি করে শহীদ জিয়ার পুণরুজ্জীবিত বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছিল। কেড়ে নেয়া হয়েছিল বাক, ব্যক্তি, বিবেক, মুদ্রণ ও সমাবেশের স্বাধীনতাসহ মানুষের সকল নাগরিক স্বাধীনতা।
বাণীতে বলা হয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহে স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারকে জোরালোভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চের এই দিনটিতে স্বৈরাচার এরশাদ অবৈধভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে ইতিহাসের নির্লজ্জ স্বৈরতন্ত্র কায়েম করে। এরশাদ কেবলমাত্র ক্ষমতা দখল করে ক্ষান্ত থাকেনি বরং জনগণের ওপর নিপীড়ণ নির্যাতন চালিয়ে দীর্ঘ ৯ বছর দেশবাসীকে এক চরম বিভিষিকাময় দূর্বিষহ অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করেছিল। অনৈতিক রাজনৈতিক কর্মকান্ড, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, সীমাহীন দুর্নীতিই স্বৈরাচারী শাসনের অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। ৯ বছর ছাত্র-গণআন্দোলন নিষ্ঠুরভাবে দমন করতে গিয়ে স্বৈরশাসকের পেটোয়া বাহিনী গুলি চালিয়ে হত্যা করে অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত জাতির জীবনে এক কলঙ্কময় অধ্যায় রচিত হয়েছিল। সেই স্বৈরশাসকের সাথে অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বর্তমান অগণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর আঁতাত পুনরায় বহুমাত্রিক গণতন্ত্রের পথচলাকে আটকিয়ে দিয়ে দেশের মানুষকে খাঁচায় বন্দী করে। দেশে এখন মানুষের বাক, ব্যক্তি, মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ সকল নাগরিক স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে অপহৃত করা হয়েছে। গণতন্ত্র চিরস্থায়ীভাবে দেশ থেকে বিদায় করে দেয়ার লক্ষ্যেই বারবার যিনি গণতন্ত্রকে স্বৈরাচারের বন্দীশালা থেকে মুক্ত করেছেন সেই আপোষহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আটক করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষকে নির্বাক করে রাখতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নির্দয়ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশে এক অসহনীয় ঘোর দুর্দিন বিরাজমান। এমতাবস্থায় আমি আজকের এই কালো দিনে দল, মত, শ্রেণী, পেশা নির্বিশেষে সকল পর্যায়ের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে বর্তমান দুঃসহ দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে সংগ্রামী অভিযাত্রায় সামিল হওয়ার আহবান জানাচ্ছি। বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সোচ্চার আওয়াজ তুলতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ