ঢাকা, বুধবার 25 March 2020, ১১ চৈত্র ১৪২৬, ২৯ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

মুক্তি পাচ্ছেন খালেদা জিয়া

# সরকারের সিদ্ধান্তে স্বস্তি, তবে শর্তে আপত্তি বিএনপির
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: কথিত দুর্নীতি মামলায় ৭৭৪ দিন কারাভোগের দুই শর্তে মুক্তি পাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালদা জিয়া। সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর দণ্ড স্থগিত করে তাকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গুলশানের নিজ বাসভবনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, খালেদা জিয়ার বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে সরকার সদয় হয়ে দণ্ডাদেশ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শর্ত হল- এই সময়ে খালেদা জিয়াকে ঢাকায় নিজের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে। অন্যটি হলো তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। ২৫ মাস সাজা ভোগের পর এমন এক সময়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হল, যখন নভেল করোনা ভাইরাসের মহামারীতে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বজুড়ে চলেছে উদ্বেগ- উৎকণ্ঠা। নানা বিধিনিষেধে বাংলাদেশও রয়েছে প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায়। জানা গেছে, সার্বিক কার্যক্রম শেষে আজ বুধবার বেগম জিয়া বাসায় যেতে পারেন।   
কথিত জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ড নিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দী আছেন খালেদা জিয়া। প্রথমে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হলেও গত বছর ১ এপ্রিল থেকে তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মুক্তির বিষয়টি জানানোর সময় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির কারাবন্দী চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার দণ্ডাদেশ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে তাকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেওয়ার আবেদন করেন বেগম খালেদা জিয়ার ভাই-বোনসহ পরিবারের সদস্যরা। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। 
আইনমন্ত্রী আরো বলেন, কিছুদিন আগে খালেদা জিয়ার ভাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি দরখাস্ত এবং আমার কাছে একটি দরখাস্ত করেছিলেন যে বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেওয়ার জন্য। সেখানে তিনি লন্ডনে উন্নত চিকিৎসা করানোর কথা বলেছিলেন। এরপর খালেদা জিয়ার ভাই শামীম ইস্কান্দার, বোন সেলিমা ইসলাম, বোনের স্বামী রফিকুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই বিষয়ে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেখানেও এই আবেদনটির ব্যাপারে তারা কথা বলেছিলেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলেছিলেন, নির্বাহী আদেশে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন।
মুক্তি পেলেও খালেদা জিয়াকে কিছু শর্ত পালন করতে হবে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারার উপধারা ১-এ খালেদা জিয়ার সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত রেখে তাকে ঢাকাস্থ নিজ বাসায় থেকে তার চিকিৎসা গ্রহণ করার শর্তে। এই সময় দেশের বাইরে গমন না করার শর্তে মুক্তি দেওয়া জন্য আমি মতামত দিয়েছি। সেই মতামত এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ হচ্ছে, আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে এই দুই শর্ত সাপেক্ষে তার দণ্ডাদেশ স্থগিত রেখে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য।
খালেদা জিয়ার বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে দণ্ডাদেশ স্থগিত করা হয়েছে বলেও জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, এইখানে কিন্তু বলা হচ্ছে না যে তিনি হাসপাতালে গিয়ে তার চিকিৎসা নিতে পারবেন না। হাসপাতালে ভর্তির ব্যাপারে তার কন্ডিশনের ওপরে দেখা যাবে। সেই জন্যই উল্লেখ করা হয়েছে যে বাসায় থেকে তার চিকিৎসা করানোর। এই কারণে বেগম খালেদা জিয়ার বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে সরকার সদয় হয়ে তার দণ্ডাদেশ স্থগিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। হাসপাতালে নিশ্চয়ই যেতে পারবেন। হাসপাতালে যদি ভর্তি হতে হয়, তাহলে বাংলাদেশের সবচেয়ে মানসম্পন্ন হাসপাতালে তিনি আছেনই। সেখানে তো তার চিকিৎসা চলছেই। হাসপাতালে তাকে ভর্তি হতে হবে, সেটা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যাবে। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, তিনি ঢাকায় তার নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করবেন। এবং ওই সময় তিনি দেশের বাইরে গমন করতে পারবেন না। যখন থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে মুক্তি দেবে, তখন থেকে দণ্ডাদেশ স্থগিত কার্যকর হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বিদেশে পাঠানো মানে তাকে ‘সুইসাইডের’ মুখে ফেলা।
মির্জা ফখরুলের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া: বিএনপি চেয়ারপার্সনের মুক্তির খবরে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমি এইমাত্র জানতে পেরেছি। মিডিয়ার মাধ্যমেই হেনেছি। এখন আমি উত্তরার বাসা থেকে গুলশানে চেয়ারপার্সনের অফিসে যাচ্ছি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে আলোচনা করে পরবর্তীতে প্রক্রিয়া আমরা জানাব।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের চেয়ারপার্সনের মুক্তির বিষয়ে সরকার শর্ত দিয়েছে। খালেদা জিয়া বিদেশে যেতে পারবেন না। বাসায়ই তার চিকিৎসা নিতে হবে। এর চাইতে আমরা তেমন বেশি কিছু জানি না। আমরা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের (তারেক রহমান) সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।
মহাসচিব বলেন, এখন আমাদের নেতাকর্মীদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা শান্ত হয়ে থাকবেন। আপনার যাতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না হন এ বিষয়ে সতর্ক থাকবেন। এই মুহূর্তে যেটা করা দরকার সেটি হলো- সবাই স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হবেন। সবাই মিলে আমাদের এই করোনা মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া দেশে কীভাবে চিকিৎসা করবেন জানি না। এ বিষয়ে আমরা সবাই কথা বলছি।
মির্জা ফখরুল বলেন, যে অর্ডারটা (আদেশ) হয়েছে, সেটা দেখে তার ওপর ভিত্তি করে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। এই মহামারির সময় জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যের ডাক আমরা সব সময় দিয়েছি, কিন্তু তারা (সরকার) সাড়া দেননি। খালেদা জিয়ার এই কারামুক্তিকে আমরা কতটুকু ইতিবাচকভাবে দেখব, সেটা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।
খালেদা জিয়াকে ছয় মাসের শর্তসাপেক্ষে মুক্তির সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশনেত্রীর মুক্তি নিয়ে সারাদেশের মানুষ উদ্বিগ্ন ছিল। তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন, অন্তত ছয় মাসের জন্য হলেও তিনি মুক্ত থাকবেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে চিন্তিত এই জন্য, দেশের বাইরে যেতে না পারলে তার চিকিৎসার কী হবে। সে সুযোগ নেই দেখলাম। তবে বিএনপির মহাসচিব জানান, তারা নেতাদের সঙ্গে ও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
স্থায়ী কমিটির বৈঠক: খালেদা জিয়ার মুক্তির ঘোষণার পর গতকাল রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠক করেছে বিএনপি। বৈঠকের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বেগম জিয়ার মুক্তির ঘোষণায় দেশবাসীসহ বিএনপি স্বস্তিবোধ করছে।  তিনি বলেন, এটা(শর্তসাপেক্ষে মুক্তি) আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। বোধগম্য নয় এজন্য যে, পরিবার যে আবেদনটা করেছিলো তাকে উন্নত চিকিতসার জন্য মুক্তি। যাই হোক তারপরেও বিএনপি নেতা-কর্মীরা, দেশের মানুষ স্বস্তিবোধ করছেন দীর্ঘকাল পরে আজকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার যেটা প্রাপ্য আইনগতভাবে, সাংবিধানিকভাবে এই সাময়িকভাবে হলেও মুক্তি পেয়েছেন। আমরা আশা করি তিনি ঠিক সময়মতোই কারাগার থেকে বেরুতে পারবেন।”
নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমি দেশের মানুষ ও নেতা-কর্মীদের কাছে এই আবেদন রাখতে চাই, দীর্ঘদিন ধরে আপনারা আন্দোলন করেছে, সংগ্রাম করেছেন দেশনেত্রী গণতন্ত্রের মাতা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য। মুক্তি পেলে সবাই আবেগে আপ্লুত হবে তাকে এক নজর দেখার জন্য, তার কাছে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করবেন। কিন্তু আজকে সমগ্র বিশ্বে ভয়ংকর মহামারীতে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ যারা আক্রান্ত হয়েছেন, বেশিরভাগ দেশে লক ডাউন করা হয়েছে। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে উনি যদি বেরিয়ে আসেন আমাদের নেতা-কর্মী সবাইকে আমরা আবেগের বশবর্তী না হয়ে ম্যাডামের স্বাস্থ্যের জন্য, ম্য্ডাামের জীবনের জন্য, অন্যান্য সকলের নিরাপত্তার জন্য আমরা শান্ত থাকতে এবং দূরে থাকতে আহবান করছি। পিজি হাসপাতালের সামনে তারা জমায়েত না হোন, তারা সমাবেশ না করেন।
তিনি বলেন, আমি আবারো বলছি, পিজি হাসপাতালের সামনে এবং ম্যাডামের বাসার সামনে দয়া করে কেউ ভিড় করবেন না। এতে ম্যাডামের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আপনারা জানেন যে, উনি অত্যন্ত অসুস্থ, উনি ডায়াবেটিকস রোগী, আর্থারাইটিসে ভোগেছেন, ৭৫ বছর বয়স, উনার এজমারও সমস্যা আছে। এসব সমস্যাগুলো করোনাভাইরাসের জন্য মারাত্মাক সমস্যা অর্থাত সবচেয়ে ভারগানেবল হয়ে যায়। আবারো অনুরোধ থাকবে নেতা-কর্মীর প্রতি আপনারা স্বস্তি পেয়েছেন। আমাদেরকেও দায়িত্বশীল হয়ে পালন করতে হবে।
উন্নত চিকিৎসার বিষয়ে আপনাদের চিন্তা জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আপনারা জানেন যে, ম্যাডামের ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা চিকিৎসা আগে থেকে করেছেন, উনারা আছেন। আমরা তাদের সাথে যোগাযোগ করছি এবং তাকে সুষ্ঠু চিকিৎসার ব্যবস্থা বাসায় শুরু করা যায় যেটাও আমরা ব্যবস্থা রাখছি।  ম্যাডাম হাসপাতালে চিকিৎসা নেবেন না বাসায় চিকিৎসা নেবেন সেটা তার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। সেটা এখন আমরা জানি না। তার সাথে আমরা এখনো যোগাযোগ করতে পারি নাই।
খালেদা জিয়ার মুক্তিতে আপনাদের অনুভূতি কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা কিছুটা আবেগ আপ্লুত তো বটেই, কিছুটা স্বস্তিও বোধ করছি। আবার কিছু আমরা আতঙ্কিতবোধ করছি এই  ভয়ংকর সময়ে তার এই মুক্তি তার কোনো ক্ষতি না ঘটে।
খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমে আসার পর সন্ধ্যায় গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। লন্ডন থেকে স্কাইপেতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বৈঠকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নাল আবেদীন, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুসও উপস্থিত ছিলেন।
স্বস্তির পাশাপাশি শর্তে আপত্তি: বিএনপির কারাবন্দী চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিতে খুশি দলটির শীর্ষ নেতারা। তারা মনে করছেন, এটা পুরো জাতির জন্য একটি স্বস্তির সংবাদ। তবে এ মুক্তি অনেক দেরিতে হলো। আর ছয় মাস বাড়িতে থাকা ও বিদেশ যেতে না পারার যে শর্তারোপ করা হয়েছে, তাতে আপত্তি নেতাদের। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, যদি প্রয়োজন হয়, তবে খালেদা জিয়াকে বিদেশ যেতে দেওয়া উচিত। এটা তার অধিকার। কোনো নেতা বলেছেন, বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রিত না হলে তার আরও আগেই মুক্তি পেতেন খালেদা জিয়া। সরকারের সব কাজে ঢিলেমির অভিযোগও করেছেন কোনো কোনো নেতা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, সম্প্রতি মুক্তির জন্য নতুন করে কোনো আবেদন করা হয়নি। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্তকে তাদের কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। খন্দকার মোশাররফ আরও জানান, অনেক আগেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ছিল। সরকার যেহেতু করোনা থেকে সব বিষয়েই সিদ্ধান্ত দেরিতে নেয়। এখন দেরিতে নেওয়াতেই সময়টা এসে গেছে, তাই মুক্তির কথা বলেছে। তিনি বলেন, আমরা সব সময়ই আশাবাদী ছিলাম। আগে আইনের মাধ্যমে হয়নি, পরিবার আবেদন করেছিল। এত দিন পরে সরকারের বোধোদয় হয়েছে। দেশ যখন বড় সংকটের সমানে, সে সময় তাদের বোধোদয় হয়েছে। এটা আশ্চর্যের কিছু না, প্রত্যাশা অনেক আগেই ছিল। বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রিত না হলে আরও আগেই হতো।
খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে একটা স্বস্তির বিষয়। আমীর খসরু বলেন, ওনার শরীর ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুরো জাতির মধ্যে একটা শঙ্কা কাজ করছিল। তার ওপরে এখন করোনার ভীতি তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়ার ঝুঁকি এবং জাতি যে ঝুঁকিতে পড়েছে, তা থেকে একটা স্বস্তি মিলবে। এখন মানুষ নিজের অস্তিত্ব নিয়েই চিন্তা করছে। দেরিতে হলেও তিনি চিকিৎসার সুযোগটা পেয়েছেন, এটা সমস্ত জাতির প্রত্যাশা ছিল। ওনার সুস্থ হয়ে ওঠাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। দেশের রাজনীতির সুস্থতার জন্য তার মতো এক নেত্রী অপিরহার্য। তিনি গণতন্ত্রের জন্য বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু কখনোই আপস করেননি।
খালেদা জিয়া নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে পারবেন। তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। অন্য হাসপাতালেও চিকিৎসা নিতে পারবেন না। এ বিষয়ে আমীর খসরুর বক্তব্য, ওনার স্বাস্থ্যের জন্য যদি দরকার হয়, তবে তাকে এ সুযোগ দিতেই হবে। সবাই তো বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করছে। তার জন্য আইন ভিন্ন হবে কেন? তার চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে বাইরে যাওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা সবাই এ সুযোগ নিয়েছেন। প্রতিনিয়ত গেছেন। স্বাস্থ্যের অধিকার সবারই আছে। এটা সাংবিধানিক অধিকার। শুধু তার না, সকলেরই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান খালেদা জিয়ের মুক্তিতে খুশি। তিনি বলেন, ইটস ওকে। আমরা তো মুক্তি চাচ্ছিলাম। এটা ভালো সিদ্ধান্ত, আমি খুশি। বিষয় হলো, বাসায় থাকতে হবে। বাইরে যেতে পারবেন না। এটা কেন করল, এটা বুঝতে পারছি না। উনি অসুস্থ, তা সবাই জানে। অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার দরকার হলে যেতে পারবেন না, এ ধরনের বিধিনিষেধ যুক্তিসংগত? যদি দরকার হয়, উনি পারবেন না কেন?
সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে চান কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে প্রবীণ নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘অবশ্যই।’ তবে নজরুল ইসলাম খানের কথা, ‘এখন যে সময়ে তাকে ছাড়া হচ্ছে, যখন চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার সুযোগও সীমিত। আকাশপথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বন্ধ। আগে মুক্তি দিলে একটা অপশন থাকত। উনি যাবেন কী যাবেন না, সেটা পরের ব্যাপার। আগে এ মুক্তি দিলে তার সুযোগটা থাকত। এখন হয়তো তাকে, এখন সেল্ফ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। সময়টা এখন বিপক্ষে।
খালেদা জিয়া এমনিতেই মুক্তি পেতেন বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, উনি মুক্তি পেতেনই। এটা প্রমাণ হলো যে সরকারই আটকে রেখেছিল। তারাই মুক্তি দিল, যা হয়তো আদালতেই হতো।
হাসপাতালে নেতাকর্মীর ভীড়: কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাজা নির্বাহী আদেশে স্থগিত রেখে তাকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক এ সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিলে তা গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভিড় জমিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকরা। করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে জনসমাগম এড়ানোর নির্দেশনা থাকলেও সেটি আমলেই আনছেন না তারা। গতকাল দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই মর্মে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র পক্ষ থেকে নির্দেশ প্রদান করা যাচ্ছে যে, বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যেন বিএসএমএমইউ (পিজি) হাসপাতালের সামনে ও গেটের ভেতরে জমায়েত না হন, এই জমায়েতের কারণে চলমান করোনাভাইরাস মহামারির ভয়াবহ বিপর্যয়ের সময়ে বেগম খালেদা জিয়াসহ হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা এবং জমায়েত হওয়া দলীয় নেতাকর্মীরা উচ্চ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাই সকল নেতাকর্মীকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনা এবং করোনাভাইরাসের মরণছোবল থেকে দেশবাসীসহ বিশ^বাসীকে রক্ষার করতে মহান রাব্বুল আলামীন এর নিকট দোয়া করার জন্য অনুরোধ জানানো হলো। 
গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের সামনে গিয়ে দেখা যায়, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল এবং যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত রয়েছেন হাসাপাতালের সামনে। তারা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে দলের চেয়ারপার্সনের মুক্তিতে তারা খুব আনন্দিত।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, টেলিভিশনে দেখতে পেলাম, ম্যাডামকে আজ মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। সেটা দেখে ছুটে এসেছি। আমি মনে করি সারাদেশে আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উদ্বেগ, সেটার কিছুটা হলেও অবসান হবে। বিশ্বজুড়ে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের নেত্রী  মুক্তি পাচ্ছেন, সেটা আমাদের কিছু হলেও স্বস্তি দিচ্ছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জাহিদ হোসেন বলেন, চেয়ারপার্সন মুক্তি সংক্রান্ত সুপারিশ ফাইল আইন মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করি আজই (মঙ্গলবার) ম্যাডাম মুক্তি পাবেন। তিনি বলেন, ম্যাডামকে এখান থেকে বিশেষায়িত হাসপাতাল নাকি বাসায় নেবে, এ বিষয়ে এখনো দল বা পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন বলেন, দীর্ঘদিন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে বন্দী ছিলেন আজ সেটা থেকে মুক্তি পেয়েছেন এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। আমরা দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে গেছি এই মুক্তি সেই আন্দোলনের প্রাথমিক বিজয় বলে আমরা মনে করি। আমরা জানি তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ অত্যন্ত অসুস্থ। খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন এটাই আমাদের এখন একমাত্র প্রত্যাশা।
বিএনপি'র সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। এমনকি তার পরিবার থেকেও সরকারকে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছিল যে মানবিক কারণে হলোও তাকে যেন মুক্তি দেওয়া হয়। এতদিন সরকার এটি আমলের না নিলেও বিশ্বব্যাপী যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়েছে হয়তো সেটাকে বিবেচনায় রেখে তারা বেগম জিয়ার সাজা স্থগিত করে তাকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। সাথে সাথে আমি নেতাকর্মীদের আহ্বান জানাব তারা যেন অতি উৎসাহিত হয় এমন কিছু না করেন যাতে এই মহামারী-সংক্রামিত হয়। আল্লাহর কাছে দোয়া করব আল্লাহ যেন সহি সালামতে দেশনেত্রীকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন।
ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেন, আমরা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। আমরা মনে করি আমাদের সেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রাথমিক বিজয় এটা। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, নেতাকর্মীরা ভিড় করলেও হাসপাতালের কর্মীরা বারবার তাদের স্থান ত্যাগ করতে বলছেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাদের সরে যেতে বলছেন। তবে নেতাকর্মীরা বলছেন, কোনো ঝুঁকিই এখন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। হাসপাতালে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপার্সনের মুক্তির বিষয়ে তারা এখনো কিছু  জানেন না।
ফাইল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে: জানা গেছে, কারাবন্দী বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ছয় মাসের মুক্তি সংক্রান্ত ফাইল আইন মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে। এখন এ বিষয়ে একটি সার-সংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার অনুমোদনের জন্য সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে পাঠানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনসাপেক্ষে খালেদা জিয়া আজল বুধবারের মধ্যে মুক্তি পেতে পারেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহিদুজ্জামান বলেন, আমরা কিছুক্ষণ আগে আইন মন্ত্রণালয়ের ফাইলটি পেয়েছি। এখন আমরা সামারি (সার-সংক্ষেপ) করে তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিলে মুক্তির আদেশ কারাগারে পৌঁছে যাবে। এরপর তিনি (খালেদা জিয়া) মুক্তি পাবেন।
আজকের (গতকাল) মধ্যে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার পর বেগম জিয়ার মুক্তি সম্ভব কিনা- জানতে চাইলে সচিব বলেন, আশা করি, দেখা যাক। জেল কোড অনুযায়ী যে ব্যবস্থা নেয়ার সেটা তো নিতে হবে। আমরা তো আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত পেয়েই গেলাম, এখন প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদন বাকি আছে। তিনি বলেন, আমাদের কাজ আমরা করেছি, আজকে না হলে, আগামীকাল নাগাদ আশা করি তিনি মুক্তি পেয়ে যাবেন।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, আশা করি, বেগম খালেদা জিয়া আজ (মঙ্গলবার) রাতের মধ্যেই মুক্তি পাবেন। ব্যারিস্টার খোকন বলেন, আমার যে অভিজ্ঞতা, সরকার যেভাবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আজকে রাতেই তার মুক্তি হতে পারে। যদি সরকার যদি চায়। বিএনপির এ যুগ্ম মহাসচিব বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাই আমার ধারণা এরপর খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আইন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় খুব তাড়াতাড়ি কাজ করবেন। আমরা আশা করছি, খালেদা জিয়া আজ রাতেই মুক্তি পাবেন। তিনি বলেন, আমি আশা করি, বেগম খালেদা জিয়া বের হয়ে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করবেন। যদি আমরা সবাই মিলে কাজ করি তাহলে ভালো হবে। আশা করি, এ বিষয়ে খালেদা জিয়া কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারবেন। খোকন বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো না। তিনি উঠতে পারেন না। বুঝতে পারেন না। একা একা খেতে পারেন না। এই সময় তার মুক্তির ঘোষণাকে আমরা স্বাগত জানাই।
ফিরোজাতেই উঠবেন: সরকারের সিদ্ধান্তে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি পাওয়ার পর গুলশানে নিজের বাসভবন ‘ফিরোজা’তেই উঠবেন বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, খালেদা জিয়াকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছেন তিনি। আর এই সময়ে অবশ্যই খালেদা জিয়া তার নিজ বাসভবনে অবস্থান করবেন এবং চিকিৎসা গ্রহণ করবেন। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি চেয়ারপার্সনের ভাই শামীম ইস্কান্দর জানান, তার বোন মুক্তি পাওয়ার পর নিজের বর্তমান বাসভবন ফিরোজাতেই উঠবেন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের কথা তুলে ধরবেন। একইসঙ্গে সরকারের এই সিদ্ধান্তে পরবর্তী করণীয় কী হবে, তা নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে কথা বলবেন। তবে, তা প্রচার হবে অনলাইনে। বিএনপির দলীয় অফিসিয়াল ফেসবুকে তা প্রচার হবে বলে জানান তিনি।
জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আসলে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া কোথায় থাকবেন তা এখনও ঠিক করা হয়নি। আলোচনা করে তা ঠিক করা হবে। গুলশানে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে খালেদা জিয়াকে হাসপাতাল থেকে গুলশানে নেওয়া হবে। সেই প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
কাঠগড়ায় নেতারা: দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে খালেদা জিয়া কারাগারে ছিলেন দীর্ঘ দুই বছরেরও বশেী সময়।  প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে দেশের প্রধান দুই দলের একটির নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি দেশেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন দশককাল, সেই নেত্রীর শেষ বয়সে দীর্ঘদিনের কারাবাস মেনে নিতে পারছিলেন  না কর্মীরা। কথিত দুর্নীতির সাজায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্বের দুই বছর পর হলেও এতদিনে তাকে ‘বের করতে না পারার জন্য’ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের দায়ী করেছেন তৃণমূলের কর্মীরা। সরকারের সঙ্গে ‘যে কোনোভাবে বোঝাপড়ার’ মাধ্যমে নেত্রীকে কারাগার থেকে মুক্ত করার কথাও বলেছেন তাদের কেউ কেউ। আর দলটির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, তারা এ বিষয়ে কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছেন না।
জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। প্রথম ১৩ মাস ছিলেন পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে। সেখানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত বছরের ১ এপ্রিল চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে নিয়ে আসা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। গৃহকর্মী ফাতেমাকে নিয়ে গতকাল পর্যন্ত ওই হাসপাতালের কেবিন ব্লকে আছেন তিনি। আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত খালেদা জিয়া ‘গুরুতর অসুস্থ’ এবং এখন তিনি অন্যের সাহায্য ছাড়া হাঁটা-চলা, এমনকি খেতেও পারেন না বলে স্বজনদের ভাষ্য। এভাবে চলতে থাকলে খালেদার জীবনশঙ্কা তৈরি হবে বলে মিডিয়ার কাছে অভিযোগ করেছেন তারা।
ওই হাসপাতালে খালেদা জিয়ার সুষ্ঠু চিকিৎসা হচ্ছে না অভিযোগ করে তাকে বিশেষায়িত কোনো বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার দাবি করে আসছিলেন বিএনপি নেতারা। তবে তাদের দাবি নাকচ করে সরকারের মন্ত্রীরা বলেছেন, দেশের সেরা হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে খালেদা জিয়ার, রাজনৈতিক কারণে তার অসুস্থতা নিয়ে বাড়িয়ে বলছেন দলের নেতারা। খালেদা জিয়াকে নিয়ে দলটির নেতাদের উদ্বেগ নাকচ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, হাসপাতালে ‘রাজার হালেই’ আছেন বিএনপি নেত্রী।
কারাগারে যাওয়ার পর থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে গত দুই বছরে মানববন্ধন, প্রতীকী গণঅনশন, গণঅবস্থান, বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ, গণস্বাক্ষরতা অভিযান, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি বিএনপি পালন করলেও সুবিধা করতে পারেনি। সর্বশেষ খালেদা জিয়ার বন্দীত্বের দুই বছর পূর্তিতে সারা দেশে মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহফিলের পাশাপশি দেশের বিভিন্নস্থানে সমাবেশ করেছে দলটি। খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় লিফলেট বিতরণ করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। সরকারের পক্ষ থেকে যা-ই বলা হোক না কেন, তাতে ভরসা পাচ্ছেন না বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা। অবিলম্বে নেত্রীর মুক্তির ব্যবস্থা করতে দলের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আসছিলেন তারা। পুরান ঢাকার পান দোকানি বিএনপিকর্মী আলী আক্কাস বলেন, ৩৭ বছর ধরে আমি বিএনপির রাজনীতি করি, কখনও নেতা হইনি। আমি মনে করি, ম্যাডাম বিএনপির জীবনীশক্তি, কর্মী-সমর্থকদের মনের শক্তি। তাকে নেতারা দুই বছরেও কেন মুক্ত করতে পারলেন না, জানি না। আমি নেতাদের কাছে একটাই আবদার করতে চাই, যেভাবেই হোক সরকারের সাথে একটা লাইন করে ম্যাডামকে বের করে আনুন, তার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
খালেদা জিয়ার বিষয়ে নেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গুলিস্তান হকার্স মার্কেটের ফুটপাতের শার্ট বিক্রেতা বিএনপি কর্মী মো. হাফিজ। নারায়ণগঞ্জের এই বাসিন্দা বলেন, যারা নেতা তাদের কাজটা কী? কেন সরকারের সাথে তারা ম্যাডামের মুক্তির ব্যাপারে একটা কিছু করতে পারলেন না? জানি, এই সরকারের দয়া-মায়া বলে কিছু নাই। তারা কোর্ট-কাচারিকে বন্দি করে রেখেছে। কিন্তু এ রকম পরিস্থিতিতে কীভাবে একটা রাস্তা পাওয়া যাবে, তা তো নেতাদেরই ঠিক করতে হবে।
খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে এ রকম বহু কর্মসূচি পালন করেছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বারবার বলেছেন,  দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে বে আইনিভাবে বিচার ব্যবস্থাকে করায়ত্ত্ব করে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় সাজা দিয়েছে এবং এখন তাকে তার সাংবিধানিক যে প্রাপ্য জামিন পাওয়া সেটাও দিচ্ছে না। আমরা বার বার আদালতে গিয়েছি কিন্তু সেটা কী হয়েছে আপনারা সবই জানেন, দেখছেন। আমরা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলনের মধ্যে আছি, আমরা আন্দোলন করছি। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সর্বশেষ জামিন আবেদন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ খারিজ করে দেওয়ার পর আপাতত আইনি পথে তার মুক্তির সুযোগ ছিলনা। কিন্তু গত ২৪ জানুয়ারি হাসপাতালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে এসে তার বোন সেলিমা ইসলাম এ বিষয়ে সরকারের কাছে ‘বিশেষ আবেদন’ করার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা এখনও আবেদন করিনি। আমরা ভাবছি আবেদন করব। তবে এখনও ঠিক করিনি এটা। কারণ তার যে শরীরের অবস্থা। এভাবে চলতে গেলে বেশি দিন উনাকে জীবিত অবস্থায় আমরা বাসায় নিয়ে যেতে পারব না। যে কোনো সময়ে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এরপর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন ছিল, আবেদন করলে ‘প্যারোলে মুক্তি’ পেয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য মুক্তির সুযোগ পেতে পারেন খালেদা জিয়া।
এর আগেও একবার খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন তাদের নেত্রীর শারীরিক অসুস্থতা বিবেচনায় প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে কথা তুললে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছিলেন, ওই আবেদন করলে বিবেচনা করে দেখবেন তারা।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাঁচ মামলাসহ মোট ৩৬টি মামলা রয়েছে বলে জানান তার অন্যতম আইনজীবী মাহবুবউদ্দিন খোকন। দুর্নীতির মামলাগুলো হল- জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলা, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা, নাইকো মামলা, গ্যাটকো মামলা ও বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি মামলা। এসব মামলার সবগুলোই দায়ের হয়েছিল ২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। সে সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের এই মামলাগুলোর মধ্যে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় এরইমধ্যে দণ্ডিত হয়েছেন খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে খালেদার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হলেও আপিলে তা বেড়ে ১০ বছর হয়েছে। অপরদিকে ওই বছরই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড হয় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর। তার দুর্নীতির বাকি তিনটি মামলা এখনও বিচারাধীন। এর বাইরে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ২০১৪-১৫ সালে বিএনপির আন্দোলনে নাশকতার বিভিন্ন ঘটনা, মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহ ও ভুয়া জন্মদিন পালনের অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিরুদ্ধে আরও ৩১টি মামলা রয়েছে।
খালেদা জিয়ার ৩৮ বছরের রাজনৈতিক জীবনে মামলায় সাজা নিয়ে টানা দুই বছরের বেশী কারাবাস এবারই প্রথম হলেও আরও একবার প্রায় এক বছর তিনি কারাবন্দি ছিলেন। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে গ্রেপ্তার হয়ে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষ কারাগারে ছিলেন তিনি। এর আগে আশির দশকে এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৭ সালে খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাসায় গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে পূর্বানী হোটেলে দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় খালেদা জিয়াকে আটক করেছিল পুলিশ, সেই প্রথম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন।
২০১০ সালের নভেম্বরে সেনানিবাসের বাড়ি ছাড়ার পর গুলশান এভিনিউয়ের ৭৯ নম্বর সড়কের যে বাড়িতে উঠেছিলেন খালেদা জিয়া, তারই নাম ‘ফিরোজা’। বিএনপি প্রধান কারাগারে যাওয়ার আগের দিন ২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারিও নেতা-কর্মীদের পদচারণায় সরগরম ছিল এই বাড়ির সামনের সড়ক। তবে তার অনুপস্থিতিতে এটি ছিল একেবারেই নির্জন, নিঃশব্দ একটি বাসা। প্রধান ফটক বন্ধ। চার নিরাপত্তাকর্মী পালাক্রমে পাহারা দেন এই শূন্য বাড়িটি। বাসায় গত দুই বছর ধরে কেউই থাকেন না বলে জানান তারা। দোতলা বাড়ির সবগুলো দরজা-জানালা বন্ধ। বাসার সামনের ছোট সবুজ প্রাঙ্গণটি ঠিক আগের মতোই রয়েছে। একজন নিরাপত্তাকর্মী বলেন, এখন এই বাসায় কেউই থাকেন না। বলতে গেলে একেবারেই শূন্য। তবে গেল জানুয়ারি মাসের শেষদিকে ম্যাডামের ছোট ছেলে মরহুম কোকো স্যারের স্ত্রী সিঁথি আপাসহ (শর্মিলা রহমান সিঁথি) তার দুই মেয়ে এসেছিলেন বিদেশ থেকে, এই বাসায় ছিলেন ১২ দিন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি তারা চলে গেছে বিদেশে। অনেক দিন ধরে এই বাড়ির গ্যাস লাইন ও টেলিফোন সংযোগ বিছিন্ন রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে সেই অপেক্ষার অবসান হচ্ছে। মুক্তি পেয়েই ‘ফিরোজা’তেই উঠবেন বেগম খালেদা জিয়া। আবারো পরবারের সদস্য ও নেতাকর্মীদের পদচারণায় সরগরম হয়ে উঠবে এই বাসাটি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ