ঢাকা, বৃহস্পতিবার 26 March 2020, ১২ চৈত্র ১৪২৬, ৩০ রজব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

মুক্তি পেয়েছেন খালেদা জিয়া

অবশেষে মুক্তি পেলেন বেগম জিয়া -সংগ্রাম

# ম্যাডাম নেতা-কর্মী ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা এবং সকলকে ভালো থাকতে বলেছেন -মির্জা ফখরুল
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : দীর্ঘ প্রায় ২৬ মাস পর কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে সাড়ে ৫টার দিকে গুলশানে তার বাসভবন ‘ফিরোজা’য় পৌঁছেন। বাসায় ফিরে বেগম জিয়া সকল নেতা-কর্মী ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং সকলকে ভালো থাকতে বলেছেন। তিনি দেশবাসীকে কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য বলেছেন এবং ভয়াবহ যে মহামারী হচ্ছে সেজন্য সবাই যেন সচেতনভাবে ভালো চলার আহ্বান জানিয়েছেন। একইসাথে নিজেকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি করোনা ভাইরাস থেকে পরিবার ও জনগণকে নিরাপদ রাখতে কাজ করার পরামর্শ দেন।
বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাসপাতাল) প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গতকাল ছোটভাই শামীম ইস্কান্দরের জিম্মায় তাকে হস্তান্তর করা হয়। বাসায় অবস্থান করে চিকিৎসা নেওয়ার শর্তে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেওয়া হলো বিএনপির চেয়ারপার্সনকে। মুক্তি প্রক্রিয়া শেষ করার পর বিকেল সোয়া ৪টার দিকে খালেদা জিয়া লিফটে করে হুইল চেয়ারে নিচে নেমে আসেন। এসময় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও হাসপাতালের নার্স এবং আনসার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ডা. হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত মেডিকেল টিমের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। ৪টা ২০ মিনিটে নিজের ভাই শামীম ইস্কান্দরের গাড়িতে (ঢাকা-মেট্রো-ভ ১১-০৬৯২) করে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’র দিকে রওনা দেন খালেদা জিয়া। তার পাশে পরিবারের একজন নারী সদস্য ছিলেন। খালেদা জিয়া গাড়িতে ওঠার সময় গাড়ির চারপাশ ঘিরে নেতাকর্মীরা ‘খালেদা, খালেদা, জিয়া, জিয়া, আমার মা, আমার মা’ শ্লোগান দিতে থাকেন। দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, দুই বছর পর নেত্রীর মুক্তি আমাদের জন্য খুব আবেগের। আমরা একনজর ওনাকে দেখতে এসেছি।
জানা গেছে, খালেদা জিয়া বাসায় পৌঁছানোর পর তার চিকিৎসকরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তার শরীরের বিষয়ে কথা বলেছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন তারা। এরপর খালেদা জিয়া লন্ডনে থাকা তার ছেলে তারেক রহমান ও তার স্ত্রীর সঙ্গে অনলাইনে কথা বলেন। নিজের শারীরিক বিষয় নিয়ে পুত্রবধূ ডা. জোবায়দা রহমানের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এছাড়া আরাফাত রহমাম কোকোর স্ত্রী ও নাতনীদের সাথে কথা বলেন তিনি। বেগম জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরাও।
উল্লেখ্য, খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের কথিত দুর্নীতির মামলায় সাজা ভোগ করছেন। শারীরিক নানা সমস্যা নিয়ে তিনি প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন। শারীরিক অসুস্থতার কথা তুলে ধরে আইনজীবীরা একাধিকবার খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন করেন। প্রতিবারই তা নাকচ হয়ে যায়। গত মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংবাদ ব্রিফিং করে ছয় মাসের জন্য দণ্ড স্থগিত করে খালেদা জিয়াকে মুক্তির ঘোষণা দেন। এরপর আইন মন্ত্রণালয় থেকে সে বিষয়ক চিঠি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে গতকাল খালেদা জিয়ার কারামুক্তির নির্বাহী আদেশ পৌঁছে দেওয়া হয় কারা মহাপরিদর্শকের কাছে। সেখান থেকে জেল সুপার হয়ে বিএসএমএমইউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আদেশটি পেলে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়াকে তার ভাই শামীম ইস্কান্দার, বোন সেলিনা ইসলাম ও ছেলে তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান জামান আনতে যান।
গোলাপি রঙের শাড়ি পরিহিত বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া মাস্ক পরিহিত অবস্থায় বিএসএমএমইউর কেবিন ব্লক থেকে বের হন। চোখে ছিল রোদচশমা। তিনি বেরিয়ে আসার পরপরই হাসপাতালের ভেতরেই তাঁর গাড়িকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের প্রচণ্ড ভিড় জমে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যে নির্দেশনা, সে কথা কারও মাথায় ছিল বলে মনে হয়নি। তিনি বিএসএমএমইউ থেকে বের হওয়ার পর গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে নেতাকর্মীদের কেউ কেউ মোটরসাইকেলে এবং একটি বড় অংশ মানুষ হেঁটে এগোতে থাকে। কারও কারও হাতে ছিল হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড। নেতাকর্মীদের ভিড়ের কারণে খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়ি ধীরগতিতে এগোচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে একপর্যায়ে পুলিশ বিএনপির নেতাকর্মীদের মৃদু লাঠিপেটা শুরু করে।
স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সাক্ষাৎ: গতকাল রাতে ফিরোজায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বেগম খালেদা জিযার সাথে সাক্ষাত করেন। সাক্ষাৎ শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রামণে খালেদা জিয়া কিছুদিন কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। এসময় নেতা-কর্মীদেরও কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা শুধু ম্যাডামের সাথে দেখা করতে এসেছি। তিনি খুব অসুস্থ। চিকিৎসকরা তাকে দেখছেন। তার চিকি॥সার ব্যাপারটা নিশ্চিত করার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে এবং কিছুদিন অন্তত: ম্যাডামকে যেন কোয়ারেইটাইনে রাখা হয় অর্থাত অন্য কেউ যেন দেখা-সাক্ষাত না করে সেসব বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। এই সময়ে আমরা রাজনৈতিক কোনো আলোচনা করিনি। স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ তারা তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, শুকরিয়া আদায় করেছেন যে, তিনি ফিরে এসছেন বাসায়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আপনারা দেখেছেন যে, চেয়ারপার্সন তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। তারপরে তিনি সকল নেতা-কর্মী ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং সকলকে ভালো থাকতে বলেছেন। তিনি কোয়ারেইটাইনে থাকার জন্য বলেছেন এবং ভয়াবহ যে মহামারী হচ্ছে সেজন্য সবাই যেন আমরা সচেতনভাবে ভালো চলি এবং নিজেকে বাঁচিয়ে চলি সেকথা বলেছেন।
কয়দিন কোয়ারেইটাইনে থাকাবেন বেগম জিয়া এরকম প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটা চিকিৎসকরা ঠিক করবেন। রাত ৭টায় ফিরোজায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্য চেয়ারপার্সনের সঙ্গে দেখা করেন। এর আগে গুলশানে চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ফিরোজায় আসেন দলীয় প্রধানের সাথে দেখা করতে। মির্জা ফখরুলসহ স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
ফিরোজায় আসার পর খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক তার সাথে দেখা করে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে খোজখবর নেন। বিকাল সোয়া ৫টায় বিএনএমএমইউ থেকে মুক্ত হয়ে নিজের বাসায় আসেন খালেদা জিয়া। কিছুক্ষন বিশ্রামের পর ব্যক্তিগত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি টিম তার সাথে দেখা করে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত হন। চিকিৎসকরা হলেন, অধ্যাপক এফএফ রহমান, অধ্যাপক রজিবুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন।
নেতাকর্মীদের ভিড়: কারাবন্দী চিকিৎসাধীন দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন আর তাকে দেখতে যাওয়া হবেনা এমনটি কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি নেতাকর্মীরা। তাই দলীয় নির্দেশ উপেক্ষা করে নেত্রীকে দেখতে হাসপাতাল চত্বরে জড়ো হয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। দুই বছর যাবৎ বন্দী খালেদা জিয়াকে একনজর দেখার জন্যই হাজারো নেতাকর্মী ভিড় জমিয়েছেন সেখানে। খালেদা জিয়ার মুক্তির ঘোষণা আসার পরপরই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে হাসপাতাল বা গুলশানের বাসভবনের সামনে ভিড় না করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই নির্দেশ দেন তিনি। তবে তার এ নির্দেশ সেভাবে মানা হয়নি। হাসপাতাল চত্বরের পাশাপাশি গুলশানে চেয়ারপার্সনের বাসভবনের সামনে  অগণিত নেতাকর্মী অবস্থান নিয়েছেন। তারা দিনভর শ্লোগান দিয়ে গেছেন।
গতকাল বেলা ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল চত্বরে বিএনপির পেশাজীবী ডাক্তারদের সংগঠন ড্যাব, আইনজীবীরা আসতে শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মী হাসপাতালে চত্বরে সমবেত হন। ঢাকা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার বলেন,  নেত্রীকে দেখতেই এখানে এসেছি। হাসপাতাল চত্বরে ভিড় না করতে দলের নির্দেশনার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে বাশার খালেদা জিয়াকে দেখেই চলে যাওয়ার কথা জানান। স্বেচ্ছাসেবক দলের পল্লবী থানার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মোহাম্মদ সাব্বির হোসেন জানান, একটি কাজে এই এলাকাতেই এসেছিলেন, তাই নেত্রীকে দেখে যেতেই এসেছেন। এদিকে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বিএনপির নেতাকর্মীদের হাসপাতাল চত্বর ত্যাগ করার আহ্বান জানান বারবার। পুলিশ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের সতর্কতা উল্লেখ করলেও নেতাকর্মীরা সেখানেই অবস্থান করেছেন। মির্জা ফখরুলও নেতাকর্মীদের হাসপাতাল চত্বর ত্যাগ করতে বলেছেন বেশ কয়েকবার। তবে নেতাকর্মীদের সেদিকে লক্ষ্য ছিলনা।
শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার মুক্তির সময় বিকাল সোয়া চারটায় তাদের ভিড় এতটাই বাড়ে যে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং গণমাধ্যম কর্মীরাও তাদের স্বাভাবিক কাজ করতে হিমশিম খান। সোয়া চারটায় খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হলেও বিএসএমএমইউ থেকে তাকে বের করতেই প্রায় বিশ মিনিট লেগে যায়। পরে ফার্মগেট পর্যন্ত তারা খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সঙ্গে দৌড়াতে দৌড়াতে আসে।তবে ফার্মগেট এলাকা থেকে তাদের সরিয়ে দিয়ে এরপর খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে দ্রুত বাসার পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয় পুলিশ। পরে নেতা-কর্মীরা তার বাসার সামনে এসেও ভিড় করে।
প্রাণচাঞ্চল্য ফিরোজায়: জানা গেছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির খবরে মঙ্গলবার বিকেল থেকেই খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’য় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। খালেদা জিয়ার বসবাসের জন্য নতুন করে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে তোলা হয় ভবনটি। সেখানে কর্তব্যরতরা জানিয়েছেন, এমনিতেই ভবনটি নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখা হলেও এখন সেটি খালেদা জিয়ার বসবাসের জন্য একদম পরিপাটি করে রাখা হয়েছে। বুধবার দুপুর ১২টায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও ‘ফিরোজা’য় গিয়ে সবকিছুর দেখভাল করেন।
ফিরোজায় গাড়িটি পৌঁছার পর সেজ বোন সেলিমা ইসলাম, স্বামী রফিকুল ইসলাম, প্র্রয়াত সাইদ ইস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন ইস্কান্দার, জোবায়দা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান জামান বিন্দুসহ পরিবারের সদস্যরা তাকে ফুলের স্তবক দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। সেজ বোন ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর হাতে ভর করে তিনি গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে বসেন। ফিরোজায় খালেদা জিয়ার গাড়ি পৌঁছলে সেখানে কয়েক‘শ নেত-কর্মী সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিয়ে শু্ভচ্ছো জানায়।
এই সময়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান এজেডএম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, ঢাকা সিটি করপোরেশনের গত নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন, তাবিথ আউয়াল উপস্থিত ছিলেন।
ফিরোজাতে খালেদা জিয়া প্রবেশের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ম্যাডাম অসুস্থ। তার সাথে কথা বলে আমরা তার চিকিৎসকদের সাথে আলাপ কব আল্লাহ কাছে হাজার শুকরিয়া তাকে বাসায় নিয়ে আসলাম। তাকে বাসা নিয়ে তার সুস্থতার বিষয়ে চিকিৎসকদের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবো।
দুই বছরেরও বেশি সময়, সুনির্দিষ্টভাবে বললে দুই বছর এক মাস ১৭ দিন পর নিজ বাসভবন ‘ফিরোজা’য় পা রাখলেন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ সাত বছর যে ভবনটি থেকেই বিরোধী দলের রাজনীতির কলকাঠি নেড়েছেন, কারাবন্দী থাকায় দুই বছরেরও বেশি সময় সেই বাড়ি থেকেই দূরে থাকতে হয়েছিল তাকে। সরকারের নির্বাহী আদেশে ছয় মাসের মুক্তি পেয়ে সেই ‘ফিরোজা’তেই প্রত্যাবর্তন করলেন তিনি। গতকাল বিকেল সোয়া ৪টার দিকে গুলশান ২-এর ৭৯ নম্বর রোডের এনইডি-১ নম্বর বাড়ি ‘ফিরোজা’র পথে রওনা দেন খালেদা জিয়া। ঠিক এক ঘণ্টা পর বিকেল সোয়া ৫টায় সেখানে পৌঁছেছেন তিনি। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, যার জিম্মাতেই মুক্তি দেওয়া হয়েছে তাকে। এছাড়া পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য, বিএনপি মহাসচিবসহ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
সবাইকে নিয়ে যখন খালেদা জিয়া ‘ফিরোজা’য় পা রাখেন, সেখানে এক আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি হয়। খালেদা জিয়ার গাড়ির সঙ্গে হাসপাতাল থেকেই সঙ্গী হন দলীয় নেতাকর্মীরা। তারা গোটা রাস্তা শ্লোগান দিতে থাকেন। পথে কারওয়ান বাজারে পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের ওপর মৃদু লাঠিচার্জও করে। তবে সেখানে তেমন একটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এছাড়া আগে থেকে উপস্থিত থাকা নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়া, জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমানের নামে শ্লোগান দিতে থাকে।
এর আগে, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সকালে শেষবারের মতো ফিরোজায় ছিলেন খালেদা জিয়া। ওই দিন রাজধানীর বকশীবাজারের আলিয়া মাদরাসায় স্থাপিত বিশেষ আদালতে হাজির হয়েছিলেন তিনি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সেদিন তার পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন বিচারক। সাজা ঘোষণার পর আদালত থেকেই পুরান ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। শুরু হয় সাজার মেয়াদ। ওই দিন থেকেই শূন্য ছিল ‘ফিরোজা’, খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবন।
চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র: দুই বছরেরও বেশি সময় কারাভোগের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের প্রিজন সেলে কারাবন্দী ও চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বুধবার বিকেলে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। হাসপাতাল ত্যাগের আগে বিএসএমএমইউর মেডিসিন অনুষদের ডিন ও ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. ঝিলন মিয়া সরকারের নেতৃত্বে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা শেষবারের মতো তার শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র লিখে দেন।
দীর্ঘ কারাভোগের পর হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার আগে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে মেডিকেল বোর্ড প্রধান ঝিলন সরকার জানান, বেগম খালেদা জিয়া বেশ ভালো শরীর নিয়েই হাসপাতাল থেকে বাসায় যাচ্ছেন। আজ (বুধবার)  দুপুরে তার ডায়াবেটিস ছিল ৯ দশমিক ৩ এবং উচ্চ রক্তচাপ স্বাভাবিক ছিল।
তিনি বলেন, বেগম জিয়া মূলত আর্থ্রাইটিসজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এ কারণে তার হাঁটাচলায় কষ্ট হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে তারা অনেকবার আর্থ্রাইটিস রোগের আধুনিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত বায়োলজিক্যাল ড্রাগ (ইনজেকশন ও মুখে খাওয়ার ওষুধ) ব্যবহারের জন্য বেগম জিয়ার অনুমতি চাইলেও তিনি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এমন আশঙ্কায় ওই চিকিৎসা নিতে রাজি হননি। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা তার ব্যবস্থাপত্রে ওই বায়োলজিক্যাল ড্রাগ চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
ডা. ঝিলন জানান, এ বায়োলজিক্যাল ট্র্যাকটি ইনজেকশন এবং মুখে খাবার ওষুধ দুইভাবেই গ্রহণ করা যাবে। তবে এ চিকিৎসা শুরুর আগে তাকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়ার টিকা নিতে হবে। তারপর হয় ১৫ দিন পর পর একটি করে ইনজেকশন কিংবা মুখে খাওয়ার ওষুধ প্রতিদিন খেতে হবে। নতুন করে বায়োলজিক্যাল ড্রাগ চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ ছাড়া ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় দুপুর ও রাতে দুইবেলা ২৪ ও ২২ মিলিগ্রাম ইনসুলিন গ্রহণ এবং উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ওষুধ লিখে দিয়েছেন। তিনি বাসায় ফিরে ব্যক্তিগত চিকিৎসকসহ অন্যান্য চিকিৎসকদের সঙ্গে আলাপ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন।
মেডিকেল বোর্ড প্রধান জানান, তিনি আজ (গতকাল) সরাসরি বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যাননি। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে তিনি মুক্তি পেতে যাচ্ছেন এমন সংবাদে মেডিকেল বোর্ডের অন্যান্য বেশ কয়েকজন সদস্য গতকাল দুপুরে তাকে দেখতে যান। শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বোর্ড প্রধানকে অবহিত করেন।
ঝিলন সরকার জানান, তিনি পকেটে করে বোর্ড প্রধানের সিল নিয়ে যান। তিনি নিজ হাতে ব্যবস্থাপত্র লিখে সিল দিয়ে তা হাসপাতাল পরিচালকের কাছে জমা দেন। হাসপাতাল পরিচালক জেল কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র তুলে দেন। কারাবিধি অনুযায়ী কারা কর্মকর্তারা মুক্তি দানের পর খালেদার স্বজনদের কাছে চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র তুলে দেন।
কারাগার থেকে হাসপাতাল: খালেদা জিয়া কারাগারে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ড কারাগারে গিয়ে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। এরপর ৭ এপ্রিল বেলা ১১টা ২০ মিনিটে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নেওয়া হয়। ওইদিন কেবিন ব্লকের ৫১২ নম্বর কক্ষে অবস্থান করেন খালেদা জিয়া। ফের ফিরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারে। এরপর ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করতে ও চিকিৎসা সেবা শুরু করতে পাঁচ সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। দুইদিন পর ২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর ফের একই হাসপাতালে আনা হয় তাকে। ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় খালেদা জিয়াকে। তিনি সেখানে ৬২১ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে জানান খালেদা জিয়ার মেডিক্যাল বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জিলন মিয়া সরকার। তার পাশের ৬২২ নম্বর কেবিনটিতে কারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলরা অবস্থান করছিলেন।
বিএনপি ও চেয়ারপার্সনের পরিবারের পক্ষ থেকে অনেকবার খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতির কথা জানানো হয়। যদিও এই দাবি নিয়ে কয়েক দফায় উচ্চ আদালতে আপিল, রিভিউ আপিল করেও তাকে মুক্ত করতে পারেননি আইনজীবীরা। আর এ নিয়ে বরাবরই আইনজীবীদের সঙ্গে দলের নেতাদের বিরোধ ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে মুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তার বাসায় সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার ভাই-বোন ও বোনের স্বামী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাহী আদেশে তাদের পরিবারের স্বজনের মুক্তি কামনা করেন।
জানা গেছে, মুক্তির পর বেগম জিয়া কোথঅয় চিকিৎসা নেবেন সেটি ঠিক করতে মঙ্গলবার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছ। এক বৈঠকে পরিবারের সদস্যদের অনেকে তাকে বাসায় রেখে চিকিৎসা করার পক্ষে মত দেন। আবার অনেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নেয়ার পক্ষে মত দেন। এক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল ইউনাইডেটে ভর্তির কথা বলেন তারা। তবে এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার মতামতকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে লন্ডন থেকে স্কাইপে যুক্ত হন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ