ঢাকা, শুক্রবার 27 March 2020, ১৩ চৈত্র ১৪২৬, ১ শাবান ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

লকডাউনে থমকে গেছে ঢাকার জীবন বিপদে নিম্ন আয়ের মানুষ

ইবরাহীম খলিল : মহামারিতে রূপ নেওয়া নভেল করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে জনগণকে ‘ঘরে’ রাখার প্রাণপণ চেষ্টায় প্রায় অচল হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা দিবসের ছুটির সাথে সাপ্তাহিক আর সাধারণ ছুটিতে সুনসান নিরব ছিল রাজধানী ঢাকা। বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার আগে অনেকে ঢাকা ছাড়তে পারলেও যারা রাজধানীতে রয়েছে গেছেন তারা এখন ‘গৃহবন্দি’। বলতে গেলে রাজধানীর রাজপথ-অলিগলি এখন প্রায় জনশূন্য। মাঝেমধ্যে জরুরি প্রয়োজনে বের বের হওয়া কিছু যানবাহন আর রিকশার ঘণ্টার আওয়াজ কানে আসে। 

১০ দিনের সাধারণ এই ছুটির প্রথম দিন রাজধানীতে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া মানুষদের ঘরে ফেরাতে কঠোর অবস্থান নিতে দেখা গেছে পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের। নগরীর প্রতিটি মোড়ে ও সড়কে টহল দিয়েছেন তারা। যারাই বাইরে বের হয়েছেন, তাদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে লাঠিপেটার ঘটনাও ঘটেছে। অযথা ঘোরাফেরা করতে বের হওয়া ব্যক্তিদের লাঠিপেটা করতেও দ্বিধা করেনি পুলিশ সদস্যরা। তারা জানিয়েছেন, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যারা অযথা ঘর থেকে বের হচ্ছেন, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগে তাদের ঘরে ফেরানো হচ্ছে।

গাড়িতে টহল দেওয়ার পাশাপাশি হেঁটেও দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিভিন্ন থানার পুলিশ সদস্যরা। গণপরিবহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় কোথাও বাস চলাচল করতে দেখা যায়নি। তবে স্বল্প সংখ্যায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চলতে দেখা গেছে। রাস্তায় কাউকে পাওয়া গেলেই কেন বের হয়েছেন জানতে চাইছেন পুলিশ সদস্যরা। যৌক্তিক কারণ দেখাতে না পারলে তিরষ্কার করা হয় তাদের। সেইসঙ্গে বাসায় ফিরতে বাধ্য করা হয় তাদের। প্রয়োজনে লাঠিপেটা করে রাস্তা থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়।

পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টহল দিতে দেখা গেছে। মানুষকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘরে অবস্থান করার জন্য মাইকে আহ্বান জানিয়েছেন তারা। যেসব দোকানপাট খোলা ছিল; সেগুলোও তদারকি করেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, রাজধানীসহ সারাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনী কাজ করছে।

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গতকাল দুপুরে দুটি টহল গাড়িসহ আসেন মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ। সেসময় এক পুলিশ সদস্য মাইক হাতে করোনা প্রতিরোধে সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। কয়েকজন পুলিশ সদস্য রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির চালক ও পথচারীদের বাইরে বের হওয়ার কারণ জানতে চান। যৌক্তিক কারণ দেখাতে না পারায় তখনই তাদের ঘরে ফেরানো হয়। কয়েকটি মোটরসাইকেলও থামানো হয় সেসময়। এর চালকেরা কোনও কারণ ছাড়াই বাইরে বের হন, তাদের লাঠিপেটা করে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

মোহাম্মদপুরের কাঁটাসুর থেকে সলিমুল্লাহ সড়কে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন আশরাফ। ফেরার পথে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের টহল গাড়ির সামনে পড়েন তিনি। বাসা থেকে বের হওয়ার যৌক্তিক কারণ দেখাতে না পারায় পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হন তিনি। আশরাফ বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে সলিমুল্লাহ রোডে গিয়েছিলাম। ওখান থেকে ফেরার সময় পুলিশ আটকেছিল। আর বের হওয়া যাবে না।’ একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘কিছু মানুষ কোনও কারণ ছাড়াই রাস্তায় বের হচ্ছে। ফাঁকা শহর দেখতে বের হচ্ছে তাদের লাঠিপেটা করা হচ্ছে। যাতে অন্যরাও সতর্ক হয়, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যেন কেউ বাইরে না বের হয়।’

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. জাবেদ পাটোয়ারী কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। রাস্তায় যাতে লোকজন না বের হতে পারে সে ব্যাপারে পুলিশ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। 

এদিকে ঢাকায় ‘অবরুদ্ধ’ এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। নাটোরের আব্দুল খালেক স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন হাজারীবাগ বৌ বাজার এলাকায়। গতকাল সকাল ৮টায় রিকশা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। দুপুর পর্যন্ত যাত্রী পান মাত্র একজন। ইনকাম ৬০ টাকায়। মালিবাগ রেল গেইটের কাছে বস্তির বাসিন্দা ঠেলাগাড়ি চালক রূপচান বলেন,সব কিছু স্যার ব্লক হয়ে গেছে। এভাবে ছোট্ট রুমে কতক্ষণ বসে থাকা যায়। এখন সকাল ১১টা বাজে। দুইবার রেল গেইটের কাছে গেলাম। কোনো মানুষজন দেখিনি। কিভাবে দিন যাবে জানি না।এই অবস্থা চললে কিভাবে আমরা ঢাকায় থাকব? বাস বন্ধ না থাকলে ঢাকার বাইরে চলে যেতাম, কিন্তু সেই উপায়ও নাই। মগবাজার মোড়ে সকাল ৬টা থেকে বসে থেকেও একজন যাত্রীও পাননি রিকশাচালক রহিম উদ্দিন। তিনি জানান,সকাল থেকে একটা ক্ষেপও পাই নাই। উঠেন, যা পারেন দিয়েন। মগবাজার থেকে মালিবাগ মোড়ে কত ভাড়া দেত হবে জানতে চাইলে রহিম বলেন, “২০/২৫ টাকা দিয়েন। অথচ চারদিন আগেও রহিম এই দূরত্বে ৪০ টাকায় যাত্রী নিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন মার্কেটের বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে স্বামী ও তিন সন্তানসহ চুপচাপ বসেছিলেন ফুল বিক্রেতা কুলসুম। ওদের পাশে দাঁড়িয়ে ও বসে আরও কয়েকজন শিশু। ওরাও নীলক্ষেত মোড়ে লুচনি বিক্রি করতো। ফুল বিক্রেতা কুলসুম বলেন, ‘পেটে তো নিষেধ মানে না। গত দুদিন রোজগার বন্ধ। হাতে থাকা কিছু টাকা দিয়া পোলাপাইনরে রুটি কলা কিইন্যা খাওয়াইছি। আইজ পরিচিত এক সাহেব এখানে থাকতে কইছে। কিছু চাউল, ডাল, তেল আর আলু দিবো। এগুলো নিতেই আইছি।’

নয়াপল্টনের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী আবদুল খালেকের ভাষায় পরিস্থিতি অনেকটা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মতো। “১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রের পরেরদিনও এমন আমি দেখিনি। ঢাকাকে এখন নিঝুম ভুতড়ে শহর মনে হচ্ছে। ২৫ মার্চের কালরাত্রের পর যেভাবে শহর ছেড়ে মানুষ চলে গেছে গ্রামে, এখন অনেকটা তেমনই। কাকরাইলের মোড়ের কাছে একটি ভবনের নিরাপত্তকর্মী আমানউল্লাহ জানান, সশস্ত্র বাহিনী নেমেছে বলে রাস্তা-ঘাটে মানুষজন নেই, সবাই ভয়ের মধ্যে আছে। বাড়ির মালিক বলে দিয়েছে ভাড়াটিয়ারা বাড়ির বাইরে যেতে পারবেন না। 

মানুষকে ঘরে রাখার চেষ্টায় পুলিশের ও সিটি করপোরেশনের গাড়ি থেকে দুজনকে এক সঙ্গে ঘুরতে এবং প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে। রমনা বিভাগের পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল্লাহেল কাফি বলেন, “দুজনকে এক সঙ্গে ঘোরাফেরা করতে নিষেধ করা হচ্ছে। অতি প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে। পুলিশের প্রত্যেকটা ডিউটিরত গাড়ি থেকে এই মেসেজ দেওয়া হচ্ছে। নিত্যপণ্য  ছাড়া আর কোনো দোকান খোলা রাখা যাবে না এই বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। 

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ