বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বরিশাল জেলার ঐতিহাসিক মসজিদ -মাহমুদ ইউসুফ

বাংলাদেশের পুরাতাত্ত্বিক ঐতিহ্য নিয়ে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে। অতীতেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও চলবে। এ গবেষণায় প্রাচীন বাংলা সম্পর্কে বেরিয়ে আসছে জানা-অজানা অনেক এক্সক্লুসিভ তথ্য। বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে আরো অনেক দুর্লভ তথ্য হয়ত ভবিষ্যতে গবেষকরা উ ঘাটন করতে সক্ষম হবেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এক্ষেত্রে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গৃহীত কর্মপন্থা আজও দেশের সর্বত্র প্রসারিত হয়নি। বিশেষ করে বরিশাল অঞ্চলে অত্যন্ত গরীবি হাল। বৃহত্তর বরিশালে ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহের মধ্যে শুধু সুজাবাদ কেল্লা, মাধবপাশার দুর্গাসাগর ও মির্জাগঞ্জ মসজিদবাড়িয়ার মসজিদের পরিচয়ই দেশবাসী জানে। অথচ সমগ্র বরিশালের শহর বন্দর, প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য পুরাকীর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এসব স্থাপনাসমূহের কোনটা ধ্বংসের মুখে, আবার কিছু কিছু স্থানীয় সচেতন অধিবাসীরা স্বউদ্যোগে সংস্কার করে রক্ষা করেছে। অনেক কীর্তি অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হয়েছে। আবার নদীর ভাঙনেও বিলুপ্তি ঘটেছে। কালের করালগ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়া বরিশাল জেলার ঐতিহাসিক মসজিদসমূহের পরিচিতি নিয়েই আজকের এই নিবন্ধ। চরামদ্দি মুগা খান মসজিদ: বরিশাল শহর থেকে ১০ কিমি পূর্বদিকে চরামদ্দি ইউনিয়নে মুগা খান জামে মসজিদ অবস্থিত। ধারণা করা হয় মুঙ্গা খান সতের শতাব্দির শেষের দিকে অথবা আঠার শতকের প্রথমলগ্নে মসজিদটি নির্মাণ করেন। মুঙ্গা খানের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে মুগা খান জামে মসজিদ। মুগা খান জামে মসজিদ বরিশালের আকর্ষণীয় স্থাপত্যরাজির মধ্যে অন্যতম। অনিন্দ্য সুন্দর মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট। মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বৃহৎ। মেঝ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট। মসজিদের ঠিক ওপরে একই সারিতে অবস্থিত। মূল মসজিদটি আয়তাকার। উত্তর দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য ৩৬ ফুট, পূর্ব পশ্চিমে প্রস্থ ১৮ ফুট। দেয়ালের প্রশস্ততা ৩৫ ইঞ্চি। ইট, চুন, সুরকি দিয়ে নির্মিত। মসজিদের পূর্বদিক দিয়ে ৩টি খিলান প্রবেশ পথ আছে। দরজার উপরিভাগ অলঙ্কৃত। এর উচ্চতা ৬ ফুট, চওড়া ৩ ফুট। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দু'টি জানালা আছে। আলো বাতাস প্রবেশের জন্যই এরূপ ব্যবস্থা। জানালার উপর-নিচের দৈর্ঘ্য সাড়ে ৪ ফুট এবং চওড়া ৪ ফুট। পশ্চিম দেয়ালে একটি মিহরাব। এর উপরিভাগ ফুল পাতার নকশায় আচ্ছাদিত। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় অলঙ্করণের ছাপ রয়েছে। মসজিদটির প্রধান আকর্ষণ ভিতরের চার দেয়ালের মাঝবরাবর এক ফুট চওড়া বেড় দিয়ে তার ভিতর কুরআনের আয়াত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সূরা ফাতিহা, ইখলাস, আর রহমান প্রভৃতি সুন্দরভাবে লিখিত। এ মনোমুগ্ধকর শিল্পকর্মটি মসজিদের অভ্যন্তরকে নান্দনিক ও চিত্তাকর্ষক করে তুলেছে। শিল্পীর এ নিপুণ কলাকৌশল যে কোন দর্শককে মুগ্ধ করে। সেই আমলের একটি রেহাবিও মসজিদের ভিতরে সংরক্ষিত আছে। রেহাবির মধ্যাংশে ক্যালিওগ্রাফি স্টাইলে সূরা ইখলাস লিখিত। মসজিদের পূর্ব ও পশ্চিমপাশের দেয়ালের ওপরে রয়েছে ৪টি করে ৮টি মিনার। গম্বুজ ও মিনারের শিরোভাগে একটি করে পিতলের কলস সংযুক্তি ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৪টি কলস লক্ষ্য করা যায়। ৫টি চুরি হয়ে গেছে, ২টি ঢিলে হয়ে যাওয়ায় খুলে রাখা হয়েছে। কলসগুলোতে এক সময় স্বর্ণের প্রলেপ ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু কালের স্রোতে তা মুছে গেছে। ২০০১ সালে মসজিদ সংলগ্ন ক্বেরাতুল কোরআন হাফিজিয়া মাদরাসা স্থাপিত হয়। মাদরাসার বর্তমান ছাত্রসংখ্যা ৪৫। কয়েকবছর আগে পূর্ব, উত্তর, দক্ষিণদিকে মসজিদের জায়গা সম্প্রসারণে করা হয় এবং মূল মসজিদের সংস্কার করা হয়। সংস্করণের ফলে প্রাচীন চিহ্ন কিছুটা লোপ পেয়েছে। মসজিদের মূল অংশসহ বর্তমান আয়তন দাঁড়িয়েছে ৪৯*৪০ ফুট। মসজিদের চার শতাধিক মানুষ একই সাথে সালাত আদায় করতে পারে। তবে প্রধান অংশে দুই সারিতে ৫০ জনের মত মুসুল্লি একত্রে দাঁড়াতে পারে। মসজিদের উত্তর-পূর্ব পাশেই রয়েছে দ্বিতল একটি ছোট ভবন। ইমাম, মোয়াজ্জেনের থাকার জন্য এ ভবন নির্মাণ করেন মুগা খান। মসজিদের দক্ষিণ পাশে গোরস্তান। এখানে শায়িত আছেন মুঙ্গা খান, দক্ষিণ বাংলার বিখ্যাত দরবেশ ইয়াকীন শাহ, দানবীর হাজী আছমত আলী খানসহ অনেকে। মসজিদের পূর্ব ফটক বরাবর আঙিনা। এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। আঙিনার পূর্ব দিকেই পুকুর। শান বাঁধানো ঘাট রয়েছে পুকুরে। পুকুরটি মুঙ্গা খান নিজ তত্ত্বাবধানে খনন করেন। পুকুরটি আয়তনে ছোট হলেও নানা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। সূচনালগ্নে এর চারপাশ উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। তবে বর্তমানে দেয়াল নিশ্চিহ্নপ্রায়। ভগ্নাবশেষ অবশিষ্ট আছে। সবচেয়ে আজ ব্যাপার হলো মসজিদের তলদেশও পাকা করা হয়েছিল। এর কারণ সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায়নি। তবে বর্তমানে পুকুরের নিম্নভাগের পাকা ফ্লোরের ওপর কাদামাটির আস্তরণ পড়েছে। তাই পাকা অংশ দেখতে হলে কর্দমাক্ত মাটি উঠিয়ে আরো গভীরে যেতে হবে। কসবা মসজিদ: বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার অধীন কসবা নামক স্থানে একটি অতি আকর্ষণীয় আয়তাকার নয় গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ আছে। এটি বরিশাল বিভাগের বৃহত্তম প্রাচীন মসজিদ। আয়তাকার মসজিদটির অভ্যন্তরে দুই সারি খিলান দ্বারা তিন ভাগে বিভক্ত। খিলানগুলো পাথরের স্তম্ভ থেকে উপরে ওঠেছে। অভ্যন্তর নয়টি ভাগে বিভক্ত এবং প্রতিটি ভাগে একটি করে গম্বুজ আছে। কসবা মসজিদের স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য খান জাহান আলী কর্তৃক নির্মিত স্থাপত্যকীর্তি দ্বারা প্রভাবান্বিত। যেমন চার কোণায় চারটি গোলাকার কৌণিক সংলগ্ন স্তম্ভ বা টাওয়ার যা নিচ থেকে উপরে সরু হয়ে গেছে, বক্রাকার কার্নিশ, সাদামাটা দেয়াল ইত্যাদি। দেয়ালের প্রশস্ততা ৬ ফুট। কৌণিক স্তম্ভগুলো সমান্তরাল বেড়ি বা মোল্ডিং দ্বারা বিভক্ত। উত্তর দক্ষিণে একটি করে ও পূর্বদিকে মিহরাব বরাবর তিনটি খিলানসম্বলিত দরজা রয়েছে। পশ্চিম দেয়ালে তিনটি অর্ধগোলাকার মিহরাব দেখা যায়, যার মধ্যে মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বৃহৎ। বহিঃপ্রাচীরের পশ্চিম দিকে একটি বাড়তি দেয়াল বা প্রজেকশন আছে। গম্বুজগুলো পেটেনটিভের সহায়তায় নির্মিত। বাগেরহাটের মসজিদ কুঁড়ের সাথে এর সাদৃশ্য রয়েছে। কোন শিলালিপি না থাকায় নির্মাণের সঠিক তারিখ সম্পর্কে অবিহত হওয়া যায়নি। তবে পনের শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত হয়েছে ধারণা করা যায়। হেনরী বেভারিজ বাকেরগঞ্জের ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বিবিচিনি অপেক্ষা একটি অতীব সুন্দর ইমারত এবং এতে চারটি পাথরের স্তম্ভ রয়েছে; এর দু'টি খুবই শীর্ণ এবং প্রচলিত প্রবাদ অনুযায়ী ভক্তদের হাতের সংস্পর্শে এগুলো এরূপ হয়েছে'। ড. আহমদ হাসান দানী মুসলিম আর্কিটেকচার ইন বেঙ্গল গ্রন্থে লিখেছেন, ‘কসবা গৌরনদী থানার একটি প্রাচীন গ্রাম। এখানে পনের শতকের প্রথমভাগে রাস্তার পশ্চিম পাশে ছবি খান কর্তৃক নির্মিত বলে একটি মসজিদ আছে। কিন্তু মসজিদ সর্বদিক দিয়ে খুলনার মসজিদ কুঁড়ের মসজিদের মত। মসজিদের চারদিকে গোলাকৃতি মিনার আছে। ছাদে তিন সারিতে পাথরের স্তম্ভে ভর করে ৯টি গম্বুজ আছে। খান জাহান আলীর নির্মিত মসজিদের সাথে সাদৃশ্য আছে বলে এ মসজিদটি পনের শতকের মধ্যভাগে নির্মিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়'। কসবা মসজিদের উত্তরদিকে হযরত দূত মল্লিকের মাজার অবস্থিত। মাজার প্রতিষ্ঠাকাল ১ জ্যৈষ্ঠ ৮৯০ (১৪৮৩)। মাজার সংরক্ষণের জন্য সম্রাট জাহাঙ্গীর লাখেরাজ সম্পত্তি দান করেছেন।। এ দানপত্রে সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের খোদিত পাঞ্জা কসবার কাজী পরিবারের রক্ষিত আছে। কারাপুর মিয়াবাড়ি মসজিদ: সপ্তদশ শতাব্দির শেষার্ধে নির্মিত অনিন্দ্য সুন্দর মসজিদ দেখা যায় বরিশালের কারাপুরে। এটি শহর থেকে ১১ কিমি পশ্চিমে অবস্থিত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ঢাকায় কারতালাব খান ও মুসা খান মসজিদটি যেভাবে উঁচু প্লাটফর্ম বা তাহাখানার উপর নির্মিত হয়েছিল এটিও অনুরূপ স্থাপত্য কৌশলে স্থাপিত হয়। এর ফলে এর সৌন্দর্য বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। মূলতঃ মুঘল আমলের আয়তাকার তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের অনুকরণে এটি নির্মিত। পূর্ব দিকে তিনটি খিলানসম্বলিত প্রবেশপথ রয়েছে। চার কোণায় অষ্টভূজাকৃতি কৌণিক টাওয়ার ছাড়াও প্রবেশপথের উভয় পাশে ক্ষুদ্রাকৃতি মিনার শোভা বৃদ্ধি করছে। ভাটিখানা জোড় মসজিদ: বরিশাল শহরের ভাটিখানা রোড সংলগ্ন গাউস্বারে পাশাপাশি এক সময় ৩টি ছোট ছোট মসজিদ ছিল। প্রত্যেকটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট। স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে এগুলো আল্লাহর মসজিদ, ফাতিমা (রাঃ) এর মসজিদ ও গাজীর মসজিদ নামে পরিচিত ছিল। মসজিদের কোন শিলালিপি না থাকায় এর সঠিক নির্মাণ তারিখ সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায় না। তবে স্থানীয় লোকজনের মতে, আঠার শতকের শেষের দিকে এটি নির্মিত হয়। ৩টি মসজিদের মধ্যে গাজীর মসজিদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। স্বাধীনতার সময় অন্য মসজিদ দু'টি সংযুক্ত করে একটি মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়। তখন এর নামকরণ করা হয় জোড় মসজিদ। মসজিদের আয়তন ৫৪*১৫ ফুট। অভ্যন্তর ভাগের আয়তন ৪৮*১০ ফুট। বর্তমানে মসজিদটি পূর্ব দিকে প্রসারিত করে বড় আকারে নির্মাণ করা হয়েছে। তবে দুই গম্বুজ বিশিষ্ট মূল জোড় মসজিদ আগের মতই আছে। মসজিদের পূর্ব পার্শ্বেই রয়েছে একটি দীঘি। দীঘি ব্যবহারের জন্য রয়েছে শান বাঁধানো ঘাট। দীঘি ও ঘাট মসজিদ সমসাময়িককালের নির্মিত। ফকির বাড়ি জামে মসজিদ: বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্রে ফকির বাড়ি রোডে এ মসজিদটি অবস্থিত। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মূল মসজিদটির পূর্ব দিকে দু'টি প্রবেশ পথ রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে জানালা আছে। বাংলা ১২১৭ সালে (ঈসায়ী ১৮১০) শাহ আবদুল করিম বক্স বাগদাদী মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের আয়তন ৪০*৩০*২৫ ফুট। বর্তমানে মসজিদটি পূর্বদিকে প্রসারিত করে আয়তন বাড়ানো হয়েছে। মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে রয়েছে একটি গোরস্তান। গোরস্তানে ওই মহান বুজুর্গ চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। কমলাপুর মসজিদ: কসবার সন্নিকটে কমলাপুর নামক স্থানে আরো একটি আকর্ষণীয় মসজিদ আছে। আয়তন ২৯ ফুট ৬ বর্গইঞ্চি। তিন গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকার মসজিদটিতে কোন ড্রাম ব্যবহৃত হয়নি। যার জন্য গম্বুজগুলো বেশি উঁচু মনে হয় না। মাঝের গম্বুজটি বড়। গম্বুজের চূড়া অলঙ্কৃত। মসজিদের চার কোণায় চারটি গোলাকার সংলগ্ন স্তম্ভ বা টাওয়ার রয়েছে যা সমান্তরাল মৌল্ডিং দ্বারা বিভক্ত। পূর্বদিক থেকে তিনটি খিলান পথ রয়েছে অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য। কিবলার দিকে তিনটি অবতলাকৃতি মিহরাব রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকের প্রাচীরের জানালা আছে। ভিতরে আলো বাতাস প্রবেশের জন্যই এ ব্যবস্থা। শিলালিপি হারিয়ে যাওয়ায় নির্মাতা ও নির্মাণের তারিখ সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত হওয়া সম্ভব নয়। ধারণা করা হয় মাসুম খান ও সুফী খান নামক দুই ভাই নির্মাণ করেন। কসবা ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামে আরো পাঁচটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এগুলো মোগল যুগের মসজিদ বলে ধারণা করা হয়। তাছাড়া সুলতানি আমলেও অনেক মসজিদ নির্মিত হয়। তবে সেগুলো কালের গহবরে চিরতরে হারিয়ে গেছে। শিয়ালগুনী মসজিদ: বাকেরগঞ্জের শিয়ালগুনী গ্রামে অবস্থিত। সুলতান নুসরত শাহের (১৫১৮-৩২) আমলে জনৈক নুসরত গাজী কর্তৃক নির্মিত বলে জানা যায়। এক সময় মসজিদটি নানা রকম লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশা দিয়ে অলঙ্কৃত ছিল। এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির শিলালিপি কোন এক ঝড়ে ভেঙ্গে গেছে। কথিত আছে যে, সূচনালগ্নে মসজিদের পাশে পিলখানা বা হাতিশালা ছিল। মোঃ বাকের জামে মসজিদ: মোঃ বাকের-এর বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি। তবে সম্ভব তিনি ঢাকার নবাব নাজিমের কোন কর্মচারী ছিলেন। আঠার শতকে বরিশালে এসে কাউনিয়ায় বসতি স্থাপন করেন। জনশ্রুতিতে জানা যায়, অত্র এলাকায় ইসলাম প্রচারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৭৯০ সালে এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তখন মসজিদটি এক গম্বুজবিশিষ্ট ছিল এবং আয়তন ছিল ১৮*১৫ ফুট। মসজিদের আশেপাশে একই সময় তিনি সাতটি পুকুর খনন করেন। এগুলো আজও টিকে আছে। মসজিদটির বর্তমান অবস্থান জানকী সিং রোডে। ইহা কাউনিয়া দরগাহ বাড়ি মোঃ বাকের জামে মসজিদ নামে পরিচিতি। ২১৭ বছরের পুরনো এ মসজিদটি প্রকৃত অবয়বের অস্তিত্ব নেই। গম্বুজটিও রক্ষা পায়নি। এটি সংরক্ষণের ফলে সম্পূর্ণ নতুন আকৃতি লাভ করেছে। পূর্বদিকে আয়তন বাড়ানো হয়েছে। উত্তর দিকে রয়েছে একটি বারান্দা। মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে রয়েছে তিনটি সমাধি। কানাই শাহ, লালন শাহ ও শহীদ আলম শাহ'র মাজার হিসেবে খ্যাত। মসজিদের শিলালিপিতে লেখা আছে, ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম'। কলেমা তাইয়েবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ। আবুবকর, উমার, উসমান, হায়দার। ১২০২ হিজরী মুহাম্মদ বাকের'। চর আইচা মীরাবাড়ি জামে মসজিদ: বরিশাল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে স্রোতস্বিনী কীর্তনখোলা নদী। পূর্ব ও দক্ষিণ দিক দিয়ে নদী পার হলেই চর আইচা গ্রাম। এখানে রয়েছে একটি পুরাতন মসজিদ। নির্মাণ তারিখ সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায় না। তবে স্থানীয় লোকদের মতে এর বয়স প্রায় তিনশ' বছর। মসজিদটি বেশি বড় নয়। বর্গাকৃতি মসজিদটির দৈর্ঘ্য মাত্র সাড়ে ১২ ফুট। দেয়ালের চওড়া ২২ ইঞ্চি। মসজিদের নির্মাণ উপকরণ টালি, ইট, চুন, সুরকি। মসজিদের চার কোণায় আছে ৪টি অষ্টকোণাকার পিলার। এর ওপরে এক সময় ছিল মিনার। বর্তমানে নেই। মসজিদের ওপরে একটি বিশালাকার গম্বুজ। চূড়া কলসাকৃতি। গম্বুজটি পুরো ছাদ দখল করে আছে। অষ্টকোণাকৃতি ড্রামের ওপর গম্বুজ নির্মিত। ভূমি থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৩৫ ফুট। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে দুটি ক্ষুদ্র জানালা। মসজিদটি বহুযুগ ধরে জঙ্গলের মধ্যে পতিত অবস্থায় ছিল। তখন সাপসহ বিভিন্ন জীব-জন্তুর নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয় এটি। গত শতাব্দির ষাটের দশকে ঝোপঝাড় কেটে এটি পরিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে সংস্কার করা হয়। বর্তমানে পূর্ব দিকে আয়তন বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত অংশের আয়তন ১৮*১৫ ফুট। মোট ৬০-৭০ জন মুসল্লি একত্রে সালাত আদায় করতে পারে। তবে মূল অংশে ২০-২২ জনের বেশি দাঁড়ানো সম্ভব হয় না। এ মসজিদটির দক্ষিণ পার্শ্বে আরো একটি ছোট মসজিদ রয়েছে। তবে সেটি ধ্বংসপ্রায়। দুটি মসজিদের পাশাপাশি অবস্থান বিধায় ইহা জোড় মসজিদ নামে পরিচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ