সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অশুভ শক্তিকে পরাজিত করতে সততা সাহস ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করুন  ---প্রধানমন্ত্রী 

 

স্টাফ রিপোর্টার: জননিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য অশুভ শক্তিকে পরাজিত করতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদস্যদের সততা, সাহস ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জননিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে আপনারা অশুভ শক্তিকে পরাজিত করতে সততা, সাহস ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করবেন এটাই আমাদের আশা।’

গাজীপুরের শফিপুরে আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে আনসার ও ভিডিপি’র ৪০তম জাতীয় সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি। 

এর আগে অনুষ্ঠানস্থলে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী শরিফ কায়কোবাদ। পরবর্তীতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪০তম জাতীয় সমাবেশ উপলক্ষে আয়োজিত কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

‘বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সাথে শান্তি বজায় রাখতে সক্ষমতা অর্জন করেছে’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের দেশের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ‘আমরা সবাইকে নিয়ে (দেশের উন্নয়ন) কাজ করার সুযোগ তৈরি করেছি। আপনাদেরও এখানে অনেক দায়িত্ব রয়েছে। আপনারাও দেশের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখতে পারেন।’ 

এসময় দেশের বৃহত্তম বাহিনী আনসার ও ভিডিপিকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে কাজ করলে আমার মনে হয় সেই দিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই আপনারা (আনসার বাহিনী) দেশের সর্ববৃহৎ বাহিনী হিসেবে আপনাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সততা, আন্তরিকতা ও সাহসিকতার সঙ্গে পালন করে জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে অশুভ শক্তিকে পরাজিত করতে সমর্থ হবেন।’

প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে আনসার বাহিনীর সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনেরও আহ্বান জানান। কেননা, তাঁর সরকার এক্ষেত্রে অবদান রাখতে সকলের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

‘দেশের সর্ববৃহৎ বাহিনী হিসেবে আপনাদের (আনসার) উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবেন,’ যোগ করেন শেখ হাসিনা ।

দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং এ পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে আনসার সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই একযোগে কাজ করলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ অচিরেই বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পারব-এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।’

এরআগে প্রধানমন্ত্রী সমাবেশ স্থলে এসে পৌঁছলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।

প্রধানমন্ত্রীকে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ থেকে অভিবাদন জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী একটি সুসজ্জিত খোলা জীপে চড়ে প্যারেড পরিদর্শন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন।

দৃষ্টান্তমূলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর ৮টি ক্যাটাগরিতে ১৪৩ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্যের মধ্যে ‘সেবা’ ও ‘সাহসিকতা’ পদক প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে মরহুম আনসার সদস্য গোলাম মোস্তফার সহধর্মিনীর হাতে তাঁর (গোলাম মোস্তফা) মরণোত্তর পদক তুলে দেন।

পরে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের পরিবেশনায় পরে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতি অন্ষ্ঠুান উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী এবং আসনার সদস্যদের দরবারেও যোগ দেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবন ও কর্ম তুলে ধরা নাটিকা, গীতিনাট্য এবং গম্ভীরা পরিবেশিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী এ উপলক্ষ্যে আনসার একাডেমি প্রঙ্গনে একটি গাছের চারা রোপন করেন এবং কেক কাটেন।

দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে এই বাহিনীকে সম্পৃক্ত করতে তার সরকারের পরিকল্পনার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আনসার ও ভিডিপি বাহিনীকে উন্নয়ন কাজে আরও সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। আপনারা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাবেন, আমি সে আশাই করছি।’

আনসার ও ভিডিপি’র প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাহসিকতা ও কর্মদক্ষতা বর্তমানে সর্বজন স্বীকৃত।’

তিনি বলেন,‘জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনসহ সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও মৌলবাদ নির্মূলে আনসার বাহিনী বিশেষ ভুমিকা রেখে যাচ্ছে।’

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ও জনসম্পৃক্ত একটি বৃহৎ শৃঙ্খলা বাহিনী উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন,এ বাহিনীর কার্যক্রম তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬১ লাখ।

তিনি বলেন,দেশের প্রতিটি গ্রামে বা মহল্লায় এ বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। কাজেই সরকারের যে কোন সচেতনতামূলক কার্যক্রম আনসার-ভিডিপি’র সদস্যদের মাধ্যমে খুব সহজেই তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ বাহিনীর প্রায় ৫০ হাজার অঙ্গীভূত আনসার সদস্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বিধান করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অনন্য ভূমিকা পালন করছে।’

তিনি বলেন, ‘বিমান বন্দরের নিরাপত্তায় এ বাহিনীর সদস্যরা ‘এভসেক’ (এভিয়েশন সিকিউরিটি) এর অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। দেশ ও জনপদকে নিরাপদ রাখতে ২টি মহিলা ব্যাটালিয়নসহ এ বাহিনীতে ৪২টি আনসার ব্যাটালিয়ন রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘পার্বত্য এলাকায় এ বাহিনীর ১৬টি ব্যাটালিয়ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে অপারেশনাল ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে। এছাড়া নব গঠিত আনসার গার্ড ব্যাটালিয়নের সদস্যরা কূটনৈতিক এলাকা, কূটনৈতিক ব্যক্তি এবং দেশের বিশিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

খেলাধুলায় আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের সফলতার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এ বাহিনীর সদস্যগণ খেলাধুলা ও দেশীয় সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে দেশের গ-ি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম বৃদ্ধি করেছে। সদ্য সমাপ্ত এসএ গেমস্- এ বাংলাদেশের অর্জিত ১৪২টি পদকের মধ্যে ৬৮টি পদক অর্জন করেছে এ বাহিনীর খেলোয়াড়গণ।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আনসার বাহিনীকে ১৯৯৮ সালে সর্বোচ্চ সম্মান জাতীয় পতাকা প্রদান ছাড়াও ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়েছে।’

‘আনসার ব্যাটালিয়ন আইন’ প্রণয়ন করার কার্যক্রম সরকার হাতে নিয়েছে এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স ও আ¤্রকানন এর নিরাপত্তার জন্য ২টি আনসার ব্যাটালিয়ন গঠনের কার্যক্রম প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

১টি গার্ড ব্যাটালিয়নসহ ৪টি আনসার ব্যাটালিয়ন গঠন, ব্যাটালিয়নের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করে জনবল বৃদ্ধি, আনসার ও ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, ঝুঁকি ভাতা বৃদ্ধিসহ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের ও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

পাশাপাশি বিগত বছরে বাহিনীর কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পদবীর ৯৬৬ জন আনসার সদস্য পদোন্নতি পেয়েছেন বলেও তিনি জানান।

দেশের জনগণের উন্নয়নের সরকারের নেয়া বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে সরকার প্রধান বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশের কাতারে আমরা প্রবেশ করেছি। সম্প্রতি বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। এসবই গত এগার বছরে আমাদের সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে সম্ভব হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ও শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দারিদ্র্যের হার আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।’

দেশের ৯৬ শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুৎ সুিবধার আওতায় এসেছে এবং ‘মুজিববর্ষে’ দেশের প্রত্যেক ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বালাই সরকারের লক্ষ্য বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘ মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্্েরারেল নির্মাণ, কর্ণফুলী টানেল স্থাপন – এ সবই আমাদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রার বহি:প্রকাশ। এছাড়া নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে।’

শেখ হাসিনা বলেন,‘এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আমাদের ধরে রেখে আরো সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী ভাষণের শুরুতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহিদ এবং সম্ভ্রমহারা দুই লাখ মা-বোন সহ মুক্তিযুদ্ধে শহিদ আসনার বাহিনীর ৬৭০ জন শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, ‘এ বাহিনীর গর্বিত সদস্য ভাষা শহিদ আনসার কমান্ডার আব্দুল জব্বার ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য জীবন বিসর্জন দেন।’

‘এ বাহিনীর ১২২৯ বীর সদস্য ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের আ¤্রকাননে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার প্রধানকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন,’বলেও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০২০-২০২১ সালকে তাঁর সরকার ঘোষিত ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে উদযাপনে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে ধন্যবাদ জানান।

একইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও জাতীয় সমাবেশ উপলক্ষে এ দিনের বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ প্রদর্শনের জন্য ও এই বাহিনীর সকল সদস্যকে আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানান।

অনুষ্ঠানে সাহসিকতা ও কল্যাণমুলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৪৩ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্যকে আট ধরনের পদক তুলে দেন শেখ হাসিনা। পদকগুলোর মধ্য রয়েছে বাংলাদেশ আনসার পদক, রাষ্ট্রপতি’র আনসার পদক, বাংলাদেশ ভিডিপি পদক, বাংলাদেশ আনসার সেবা পদক, রাষ্ট্রপতি’র আনসার সেবা পদক, বাংলাদেশ ভিডিপি সেবা পদক এবং রাষ্ট্রপতি’র ভিডিপি সেবা পদক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ