মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০২৪
Online Edition

একের পর এক বিষবৃক্ষ

একটি ডাকঘর পুড়ে গেলে কী হয়? খবর হয়, ক্ষতি হয়, হয়তো আরও অনেক কিছু হয়। কী হয়, কতটা হয়- এগুলো অনেক সময় আপেক্ষিক বিষয় হয়ে ওঠে। বিষয়গুলো আসলে ব্যক্তির অবগতি ও উপলব্ধির তারতম্যের সাথে জড়িত। আসলেই একটি ডাকঘর পুড়ে গেছে। ফিলিপাইনের ম্যানিলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ডাকঘরটি অনেকের কাছেই পরিচিত। এটি তৈরি হয়েছিল ১৯২৬ সালে। এর সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ অনেক ইতিহাস জড়িত রয়েছে। ২০১৮ সালে এই ভবনটিকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে ফিলিপাইনের জাতীয় যাদুঘর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ২২ মে সোমবার আগুনে পুড়ে ঐতিহাসিক এই ডাকঘরটি ধ্বংস হয়ে যায় বলে জানায় বার্তা সংস্থা এএফপি।

আগুন লাগার কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে এতে আহত হয়েছেন সাতজন। আগুনের শিখা ঐতিহাসিক ম্যানিলা সেন্ট্রাল পোস্ট অফিস ভবনটিকে গ্রাস করে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের ৮০টির বেশি ট্রাক পাঠানো হয়। সাত ঘণ্টার অবিরত প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পোস্টমাস্টার জেনারেল লুইস কার্লোস বলেন, পাঁচতলা ভবনটির নিচতলা থেকে ওপর পর্যন্ত পুরোটাই পুড়ে গেছে। আগুন লাগার কারণ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যুরো জানায়, রাজধানী ম্যানিলার সব অগ্নিনির্বাপক ট্রাক কাজে লাগানো হয়। এ অগ্নিকাণ্ডে ৫৮০ কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ১৯২৬ সালে নির্মিত পোস্ট অফিসটিকে এক সময় ম্যানিলার সবচেয়ে সুন্দর ভবন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় জাপানের কাছ থেকে এই ভবনের দখল নেয় মার্কিন সেনারা। ওই সময় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে ১৯৪৬ সালে এটি পুনঃনির্মাণ করা হয়। দুর্ঘটনার সময় ভবনটির চিঠি, পার্সেল, পোস্ট অফিসের স্ট্যাম্পসহ গুরুত্বপূর্ণ বহু জিনিসপত্র ছিল। 

১৯২৬ সালে নির্মিত ডাকঘরটি ২০২৩ সালে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেল। আমাদের প্রিয় এই পৃথিবীতে প্রায় শত বছরের সাক্ষী ছিল এই ডাকঘরটি। ডাকঘরটি ম্যানিলার সবচেয়ে সুন্দর ভবন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন সময়ও সে পার করেছে। জাপানের কাছ থেকে তার দখল কেড়ে নেয় মার্কিন সেনারা। আর দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ তো ছোট কোনো বিষয় নয়। এই যুদ্ধে মানুষ মরেছে, প্রকৃতি ধ্বংস হয়েছে। আণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে আমেরিকা। বোমার অদ্ভুত নাম ‘লিটল বয়’, ‘ফ্যাটম্যান’। যার মন্দ প্রতিক্রিয়া এখনো লক্ষ্য করা যায় জাপানে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। বিজয়ীরা সেই উদ্যোগ নিয়েছে। আর যে ইতিহাস লেখা হয়েছে, তার রচয়িতাও বিজয়ীরাই। কথাতো অনেক বলা হয়েছে। নতুন সভ্যতার কথা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কথা, শান্তির কথা। তৈরি হয়েছে জাতিসংঘ, আরও অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বে কর্মতৎপরতা আছে, প্রতিযোগিতা আছে। এমন বাতাবরণে ব্যস্ত মানুষ, ব্যস্ত নেতারা ভুলে যান যে সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারে চাতুর্য ও ইহলৌকিক দৃষ্টিভঙ্গিই সবকিছু নয়। প্রকৃতি জগতের মত মানব সমাজেও প্রয়োজন ভারসাম্য এবং ইনসাফ ও নৈতিকতার দর্শন। মানবিক জীবনদর্শন ছাড়া মানুষ সমাজ সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে কেমন করে? মহান স্রষ্টা মানববান্ধব পৃথিবী সৃষ্টি করেই যতি টানেননি। মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেছেন আসমানি কিতাবও, যাতে রয়েছে ইহকাল ও পরকালে মুক্তির নিদের্শনা। মানবজাতির বড় একটা অংশ বিষয়টি উপলব্ধি করলো না। তারা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির চর্চা বাড়ালো, সম্পদ আহরণ ও ভোগে মত্ত হলো। ইহলৌকিকবাদী মানুষ তো পরকালের জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী নয়। ইহলৌকিকবাদী মানুষ ব্যস্ত থাকে সম্পদ আহরণে ও ভোগবিলাসে। নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষ ভ্রান্ত জীবনদৃষ্টির কারণে সম্পদ আহরণ প্রতিযোগিতায় নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। সম্পদ তো থাকে বিভিন্ন দেশে। আবার দেশ দখলে প্রয়োজন হয় মারণাস্ত্র। ফলে সাম্রাজ্যবাদী নেতারা এখন মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। এমন অমানবিক প্রতিযোগিতার কেতাবি নাম ভূ-রাজনীতি। এমন ভূ-রাজনীতির নেতৃত্বে রয়েছে পরাশক্তিবর্গ। তারা গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন বলয়। বলয়ের নেতারা গড়ে তুলেছেন রাজনীতির নানা রঙ্গমঞ্চ। আগের মত সবক্ষেত্রে এখন দেশের ভূমি দখল হয় না; দেশের নীতি দখল করা হয়, নেতাদের দখল করা হয়। তাদের রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করতে বাধ্য করা হয়। অভিনয়ের পান্ডুলিপিটাও ওনারা রচনা করে দেন। অভিনয়ে ভুল করতে কিংবা কখনো দ্বিমত পোষণ করলে চরম মূল্য দিতে হয়। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এমন রূপ কোনো অস্পষ্ট বিষয় নয়। তবে এ নিয়ে কথা কম হয়। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেন, তবে হালে পানি পান না। সভ্যতার শাসকদের অনুগ্রহ ও অনুমোদন ছাড়া কোনো বিষয় এখন প্রতিষ্ঠিত হবে কেমন করে? বিশ্বব্যবস্থা বলে একটা কথা আছে না?

একটি ডাকঘর নিয়ে লেখা শুরু করেছিলোম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঐতিহাসিক সেই ডাকঘর ভবনটি জাপানের কাছ থেকে দখল করে নেন মার্কিন সেনারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব সভ্যতায়, বিশ্বব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ম্যানিলার ডাকঘরটি একসময় দেশের সবচেয়ে সুন্দর ভবন হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু সেই ভবনটি ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেল এই মে মাসেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে সভ্যতা ও বিশ্বব্যবস্থা নির্মিত হয়েছে তাতে পুড়েছে, ধ্বংস হয়েছে অনেক কিছুই। ধ্বংসের লেলিহান শিখা জ¦লছে এখনো। ইউক্রেনে কিসের আগুন জ¦লছে? ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়ায় যুদ্ধের কারণ কী? কাশ্মীর সংকটের সমাধান হচ্ছে না কেন?  বিভিন্ন দেশে এখন যেসব রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে, তার সাথে পরাশক্তির কোনো সম্পর্ক নেই তো? পাকিস্তানে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জনপ্রিয় নেতা ইমরান খান তো এই সংকটের জন্য কোনো কোনো পরাশক্তির ইন্ধনের কথা বলছেন। বর্তমান সভ্যতার জন্য বড় লজ্জার বিষয় হলো ফিলিস্তিন সংকট। ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনীরা ফিলিস্তিনে বসবাস করতে পারছেন না। রাষ্ট্র গঠন করতে পারছেন না। নিজ বসতভিটা থেকে প্রতিনিয়ত তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। উড়ে এসে জুড়ে বসে ইহুদীরা ইসরাইল রাষ্ট্র গঠন করেছে পরাশক্তির প্রশ্রয়ে। রাষ্ট্রটি সন্ত্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যখন-তখন ইসরাইলী সেনারা গুলী করে হত্যা করছে ফিলিস্তিনী নাগকিরদের, শিশুরাও বাদ যাচ্ছে না। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর সভ্যতার শাসকরা অনেক বিষবৃক্ষ রোপণ করেছেন, ইসরাইল রাষ্ট্র তেমন একটি বিষবৃক্ষ, যার বিষক্রিয়া পৃথিবীর মানুষ লক্ষ্য করছে। আর একটি বিষবৃক্ষ হলো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এর বিষক্রিয়া থেকে পরাশক্তিবর্গ রক্ষা পাবে তো?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ