শুক্রবার ০১ ডিসেম্বর ২০২৩
Online Edition

বড় ফুপির বাড়ি   

মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ

শোয়াইব দাদা-দাদী, মা-বাবার সঙ্গে বড় ফুপির বাড়ি বেড়াতে এসেছে। গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার আগে আগে পৌঁছেছে। ফুপি তার আসার আগেই কত কিছু তার জন্য তৈরি করে রেখেছে। কিন্তু তার দীর্ঘ ঘুম ভাঙেনি। তাছাড়া, কয়েকদিন যাবত তার শরীরটা ভালো নেই। ঠান্ডা জ্বর লেগেই আছে। শরীর লেকলেকে হয়ে যাচ্ছে। ফোনে বড় ফুপির সাথে বলছে, তার মুখে রুচি নাই। বাবা ওষুধ এনেছে। খেয়েছে। ফুপি বলছে, ওষুধ খাও রুচি হবে...।

সন্ধ্যায় এসেছে। এখনো ঘুম ভিঙেনি। রাত দশটা বেজে গেছে। অঘোরে ঘুমাচ্ছে। অসুস্থ শরীর। এ জন্য কেউ ডাকেনি।

বড় ফুপির বাড়িতে লোকজন কম। ফুপি একাকি কাটান। ফুপা কাজে বাড়ির বাইরেই বেশি থাকেন। কিন্তু আজ বাড়ি ভর্তি লোক। গমগম করছে। মা-বাবা, ছোট ভাই, ছোট বোন, ভাবি সবাই এসেছে। ভূতুরে বাড়িটি যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আরো মজা হতো যদি ভাইপো ঘুমিয়ে না পড়তো। সারা বাড়ি সারা ঘর তন্ন তন্ন করে হাঁটাহাঁটি করতো। আধো আধো স্বরে নানা কিছু জিগাইতো। তবু বাড়িটিতে প্রাণের ছোঁয়ায় ভরে গেছে। ফুপির মন আনন্দে উদ্বেলিত।

ফুপা বাড়ি ফেরে রাত দশটায়। গাড়ির শব্দ পেয়ে গেটের দরজা খোলে। বাড়ি ঢুকেই জানতে চায়, শোয়াইব এসেছ? শোয়াইব কই? আম্মা? আব্বা? সবাই এসেছে?

শোয়াইব এসে যে ঘুমাইছে , এখনো ঘুম ভাঙেনি। ওর বাবার সাথে শুয়ে আছে।

ওই তো .... ঘুম ভাঙছে। দেখো... দেখো,  তোমার ফুপা। তোমার লাইগা নাম.. নাম.. নিয়ে আসছে। ( নাম নাম - মানে মজার খাবার) । আধো আধো ঘুমে ফুপার দিকে তাকায়। ফুপা কোলে নিতে চায় কিন্তু ওর বাবার কোল ছাড়তে চায় না। কান্না জুড়ে দেয়। চিৎকার দিয়ে ওঠে। আচ্ছা থাক... থাক। ও কোলেই থাক। আমরা পরে এক সাথে খাবার খাবো।

ফুপা জামা কাপড় ছাড়ে। খাবার রুমে যায়। শোয়াইব ফুপার সাথে খেতে বসে। কিন্তু সে একাকি খাবে না। খুত খুত করে কাঁদে।

মায়ের হাতে খাবে। বড় ফুপি বলে আমি খাইয়ে দেই? না, খামু না। ওই... নেবু খামু। আচ্ছা খাও। এখানে বসো,  তোমার ছোট ফুপি খাইয়ে দিক? না, খামু না। আম্মা......? তার মা  বাইরে বিদ্যুৎ এর আলোতে বসে বসে মাছ কাটছে। পাশে পাশে একটি বিড়াল হাঁটাহাঁটি করছে। ও গুলো রেখে সরতেও পারছে না। মাছ বিড়ালে নিয়ে যাবে। এদিকে শোয়াইব কাঁদছে। মাকে ছাড়া খাবে না।

মাছ কেটে ফ্রিজে রেখে কাছে আসে। ছেলেকে কোলে নেয়। নানা মন ভুলানো কথা বলে বলে ভাতগুলো খাওয়ায়। শোয়াইব পঁচা...। বিলাই ভালা। ভাত খাও? নাই লে বিলাই রে দিয়া দিমু...।

ওই দেখো বিলাইর পেটে আরেকটা ছোট বিলাই আছে...। ( বিলাই মানে বিড়াল)

তুমি সকালে তারে নিয়া খেলবা। না, আমি খেলমু না। নাডি দিয়া পিটান মারমু। মারলে কামুর মারবে...?

এই তো ... আর এক মুট ভাত। শোয়াইব খাইয়া ঘুমাবে । খাও.... খাও

ভোরের আলো ফোটেনি। শোয়াইবের ঘুম ভেঙে গেছে। বাবার কোলে চড়েই ঘরের বাইরে উঠোনে প্রস্রাব করে। আবার বিছানায় যায়। শুয়ে থাকে। বেশীক্ষণ থাকে না। বেড়াবে। তাকে নিয়ে বেড়াতে হবে। ছোট ফুপি পলিন তাকে নিয়ে গেইট পেরিয়ে পাশের বাড়ি বেড়াতে যায়। হাত ধরে বেড়ায়। এ ঘর যায়। ও ঘর যায়।

বড় ফুপি নুডুল্স রাঁধে। সবাই মিলে নাস্তা করে। নিজের বাড়ির মতো এখানে শোয়াইবের খেলার সাথীরা তো নেই। তাই তার কাছে বড়িং লাগে। ছটফট করে। সানি, নিলয়, সমাপ্তি কেউ পাশে নেই। নেই ছুটাছুটির বড় আঙিনা। নেই প্রশস্ত গৃহ। নেই তার ব্যবহারের খেলা সরঞ্জাম।

ফুটবল, ঘড়ি, গাড়ি, সাইকেল, ছবির বই, পেনসিল, সাউন্ড বক্স, আব্দুল বারীর ভিডিও, দুধের ফিডার, পানি- জোস খাওয়ার মগ ইত্যাদি ইত্যাদি।

বড় ফুপির বাড়ি খেলার জন্য পেয়েছে স্প্রে বোতল। ওটাতেই সে খুশি। খেলবে। মাটিতে নামবে। কিছুটা রৌদ্র।  ঠান্ডা কমছে। তার মা তাকে মাটিতে নামিয়ে দেয়। স্প্রে বোতলে পানি ভরে গাছের গোড়ায় দেয়। বড় ফুপির বাড়ির উঠোনের চারদিকে নানা ফুলের গাছ। বিশেষ করে পাতাবাহারের গাছ সারি সারি। ওগুলোতেই শোয়াইব স্প্রে করে পানি দিতে থাকে। তার খুব আনন্দ লাগে।

খাবার রান্না হয়েছে। ও বাইরে বসেই খাবে। গাছের গোড়ায় পানি দেয় আর খাবার খায়। তার যে কি আনন্দ.... ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

দুপুর পর্যন্ত একটানা ধুলোবালি পানি দিয়ে খেলে। গায়ের জামা কাপড় খুলে উদোম শরীরে। মা দুপুরে গোসল করিয়ে পরিষ্কার জামা কাপড় গায়ে দিয়ে ঘুম পাড়ান। বিছানায় শুয়ে অল্পক্ষণেই ঘুমিয়ে পড়ে। দুই তিন ঘন্টা পর ঘুম ভাঙে। বড় ফুপি পোলাও গোশত রান্না করে। খেতে দেয়। ও কলিজা খাবে। কলিজার টুকরা হাতে নিয়ে পুরোটাই মুখে পুরে দেয়। মা প্লেটে পোলাও কলিজাসহ ছেলেকে খাওয়াতে বসে। না, ও মাছ দিয়ে খাবে। গোশত খাবে না। মাছই তাকে দেয়া হয়। দৌড়ে আর খায়। স্থির হয়ে খেতে চায় না। বড় চঞ্চল। 

যাবার বেলা। বড় ফুপিকে বলে ‘ ফি আমানিল্লাহ'। ফুপি বলে, আমাকে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাবে? না, দাদি আর ছোট ফুপিকে নিবো। আপনি রাতে ফুপার সাথে যাবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ