মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০২৪
Online Edition

কলুষমুক্ত সমাজ কুরবানির আসল উদ্দেশ্য

ফখরুল ইসলাম খান

পৃথিবীর বিজ্ঞান ভূখন্ডের বিভিন্ন পরিবেশে ইসলামী উম্মাহর অধিবাস হওয়ার ফলে স্বভাবতই তাদেরকে অনুকূল-প্রতিকূল বিভিন্ন সমস্যা ও পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। কখনো তাদের জীবনে আসে গতি সজীবতা ও প্রাণচাঞ্চল্য। কখনো আবার নেমে আসে সীমাহীন নির্জীবতা অবসাদ ও হীনমন্যতা। কখনো শিকার হয় সংঘাত সংঘর্ষের এবং নিপীড়ন-নির্যাতনের। কখনো বা মুকাবিলা করে তাহজীব-তমদ্দুন ও সভ্যতা-সংস্কৃতির মতো গুরুতর সমস্যার কিংবা বৈষয়িক ও রাজনৈতিক  প্ররোচনা প্রলোভনের। জীবন কখনও হয় সম্পদ প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ: আবার কখনো চরম দৈন্য ও দারিদ্র্যপীড়িত। কখনো তাদের উপর চেপে বসে কোন স্বৈরাচারী ও জালিম শাসক। কখনো বা তাদের ভাগ্য নিয়ে পৈশাচিক খেলায় মেতে ওঠে রাজনীতির পাকা খেলোয়াড় দল। এমনি ধরনের আরো অসংখ্য সমস্যা জটিলতাও প্রতিকূলতা আছে তাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে। 

এ সকল সমস্যা, জটিলতা ও প্রতিকূলতার সকল মুকাবিলার জন্যই প্রয়োজন শক্ত ইমানের। উহার প্রতিটি সদস্য ও শ্রেণীকে ত্যাগ ও কুরবানি এবং আনুগত্য ও সম্পর্কের চেতনায় উদ্ধুদ্ধ করা। মানুষ বুদ্ধি সর্বস্ব কোন জীব নয়, নয় প্রাণহীন কোন যন্ত্র। বরং বুদ্ধি ও হৃদয় বিশ্বাস ও অনুভূতি এবং আনুগত্য ও প্রেমের সমন্বয়েই মানুষের পূর্ণতা। উপরোক্ত সমস্ত গুণাবলি পূর্ণতা লাভ করেছেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ) একজন পূর্ণ মানব বা ইনসানে কামেল। হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর গোটা জীবনই হচ্ছে ইশক ও মহব্বত এবং প্রেম ও সম্পর্কের এক অত্যুজ্জ্বল আদর্শ। হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর তাওহীদবাদী জীবন হলো মানবেতিহাসে এমন এক স্বর্ণোজ্জ্বল নতুন অধ্যায় যেখানে এসে মানবসভ্যতা ও ইতিহাস এক নতুন বাঁকে মোড় নিয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে আল্লাহ তায়ালা এক শাশ্বত বিধান চিরন্তন নেতৃত্বে ও ইমামতের সম্মান দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগের কথা।

আল্লাহর প্রিয় ইব্রাহিম (আঃ) স্বপ্ন দেখেন কুরবানি করতে। তিনি পশু কুরবানি করলেন একটির পর একটি। কিন্তু যে কুরবানি আল্লাহর নিকট গৃহীত হলো না, হযরত ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর নিকট থেকে নির্দেশ পেলেন এমন বস্তু কুরবানি করতে যা তিনি সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন। কি সেই জিনিস ? হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুতো তাঁর স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)। তবে কি তাঁর প্রতিপালক ইব্রাহিম ও হাজেরার পরম আদরের দুলাল ইসমাঈলের কুরবানিই চান? আল্লাহর নির্দেশ ছিল অতি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। সন্দেহের ও কোন অবকাশ ছিলনা তাতে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বিচলিত না হয়ে আল্লাহর নিদের্শের কথা শিশু পুত্র ইসমাঈলকে জানালেন। পুত্র ইসমাঈল উত্তরে বললেন-হে আমার সম্মানিত পিতা! আপনি যা স্বপ্নে দেখেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তা পালন করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীলদের মধ্যে অবশ্যই পাবেন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন, তেমনি পুত্র ইসমাঈল (আঃ) নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য সংকল্প ব্যক্ত করলেন। একেই বলে বাপ কা বেটা। মা হাজেরাও স্বেচ্ছায় আদরের সন্তানকে সাজিয়ে দিলেন। পিতা-মাতা, পুত্রের আল্লাহর পথের কুরবানির এ দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই প্রথম। অবশ্য হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর কুরবানির জন্য তাঁর বংশ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মর্যাদা সম্পন্ন বংশে পরিণত হয়েছিলেন। যে বংশে আবির্ভূত হয়েছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নবী। 

বালক ইসমাঈলকে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নিয়ে গেলেন মিনায় যেখানে বর্তমানে হাজীদের জন্য নির্দিষ্ট করা কুরবানির স্থান। প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কুরবানি করতে মনোবল ভেঙে যেতে পারে এমন আশংকায় ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর চক্ষুদ্বয় আবৃত্ত করলেন। যখন পুত্রকে কুরবানি করতে উদ্যত হলেন সাথে সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলা’মীন প্রিয় নবী দ্বয়ের আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের কুরবানি কবুল করলেন। আনুগত্য ও কর্তব্যপরায়ণতার পুরস্কারস্বরূপ একটি মোটা তাজা পশু (দুম্বা) পাঠিয়ে পুত্রের পরিবর্তে জবাই করার হুকুম প্রদান করলেন। সেই ঘটনাকে সমগ্র ঈমানদার লোকদের স্মরণ রাখার উদ্দেশ্যে সামর্থ্যবান ও মুসলমানদের উপর আল্লাহর কুরবানিকে ওয়াজিব করে দেন। সেই থেকে সারা বিশ্বে ঈদ উল আযহা বা কুরবানির ঈদ উদযাপিত হয়ে আসছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ঈদ উল আযহা এক ঐতিহ্যময় স্থান দখল করে আছে। ত্যাগ ও কুরবানির মাঝে যে এত আনন্দ, এত খুশী তা ঈদ উল আযহায় আমরা দেখতে পাই। অন্য কোন উৎসব বা আনন্দ অনুষ্ঠানে উৎসর্গের ভাব-গাম্ভীর্যের এতটা খুশির ঝলক দেখা যায় না। এজন্য ঈদ উল আযহাকে উৎসর্গের আনন্দ উৎসব বলা হয়। 

ঈদকে সত্যিকার অর্থেই আমরা একটা উৎসব বলতে পারি। দু’টি ঈদই মুসলমানদের বিশেষ উৎসব। মদিনা আসার পরপরই আমাদের মহানবী (স:) ঈদকে কেন প্রতিষ্ঠা করলেন সেটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং আমাদের ছোট ও বড় সকলেরই ভেবে দেখার বিষয়। মানুষের জীবনে আনন্দের একটা প্রয়োজন আছে: একটা দিক আছে। হজরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) হিজরত করে মদিনায় এসে দেখতে পান যে মদীনাবাসীরা (যাদের অনেকেই হিজরতের আগে ইসলাম কবুল করে মুসলমান হয়েছিল) দু’টি জাতীয় উৎসব পালন করে থাকে। পারসিক প্রভাবে শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ’ এবং বসন্তের পূর্ণিমায় ‘মিহিরজান’ নামে জাতীয় উৎসব দু’টি তারা বিভিন্ন ধরনের আনন্দ আহলাদ, খেলাধুলা ও কুরুচিপূর্ণ রঙ-তামাশার মাধ্যমে উৎযাপন করতো। এ দু’টি উৎসবের মূল উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য কী তা জানতে চাইলে তারা রাসূল (সা:)-কে জানায় ইসলামের আগে জাহেলিয়াতের যুগে তারা এ উৎসব দু’টি এই ধরনের হাসি-মশকরা ও আনন্দ-উাল্লাসের মাধ্যমেই উদযাপন করতো বিধায় একই প্রথা তাদের মধ্যে তখনো চালু রয়েছে। উল্লেখিত উৎসব দু’টির রীতি-নীতি, আচার ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণরূপে ইসলাম পরিপন্থী। শ্রেণি-বৈষম্য, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে কৃত্রিম পার্থক্য, ঐশ্বর্য, অহমিকা ও অশালীনতার পূর্ণ প্রকাশে অযাচিতরূপে দীপ্ত ছিল এ দু’টি উৎসব। ঐ সব উৎসবের সব দিনগুলো সেই রকমভাবে ঐতিহাসিকও নয়। তাৎপর্যময়ও নয়। অতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনুষ্ঠানগুলোও নৈতিক মানদন্ডে অতোটা উত্তীর্ণ নয়। আবার শালীনও নয়। শ্রেণি-বৈষম্য, অহমিকা ও অশালীন কর্মকান্ডে পরিপূর্ণ এই উৎসব উদযাপন প্রক্রিয়ায় শিউরে উঠলেন ইসলামের নবী (স:)। ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না এরূপ আপত্তিকর, অসামাজিক কর্মকলাপ। ইসলামের দৃষ্টিতে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালোর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য রয়েছে শুধু বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে, সৎ ও অসত্যের মধ্যে। তা ছাড়া আল্লাহ তায়া’লা মনোনীত একমাত্র দ্বীন, মহান ইসলাম ধর্মে অনুসারীদের অশ্লীল, রুচিহীন কোনো কর্মকান্ডে লিপ্ত হওয়ার কোনো অধিকারও নেই। ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন রাসুল (স:) এরশাদ করলেন, আল্লাহ তায়া’লা তোমাদের জন্য এ দু’টি দিবস অপেক্ষা শ্রেয়তর ও মহিমাময় দু’টি দিবস নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর সে পূণ্যময় দিবস দু’টি হলো ঈদু’ল ফিতর ও ঈদু’ল আযহা। অতএব আগের উৎসব দু’টি বন্ধ করে ঈদু’ল ফিতর ও ঈদু’ল আযহার নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানাদি পালন কর। চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল আরববাসী তথা মুসলমানদের ‘নওরোজ’ ও ‘মিহিরজান’ উৎসব উৎযাপন। ইসলামী আদর্শে উজ্জীবিত আরববাসী শুরু করলো ঈদু’ল ফিতর ও ঈদু’ল আযহা উৎসব উৎযাপন। শ্রেণি-বৈষম্য বিবর্জিত, পঙ্কিলতা ও অশালীনতামুক্ত সুনির্মল আনন্দ উপভোগ শুরু হলো ঈদু’ল ফিতরের পুণ্যময় দিবসে। জন্ম নিল একটি সুস্নিগ্ধ, প্রীতিঘন মিলন উৎসব। সেইসব দিক থেকেই তিনি ঐগুলির পরিবর্তে এই দুই ঈদ চালু করলেন। এতে এটা প্রমাণ করে যে, ইসলাম উৎসবের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করে। যার ফলেই এই ঈদ উৎসব হয়েছে। একজন মুসলমানের জীবনে প্রতি বছর শুধু দু’টি ধর্ম উৎসবই আসে ঈদু’ল ফিতর ও ঈদু’ল আযহা।

বর্তমানে আমাদের সমাজে কুরবানির আধ্যাত্মিক দিকটা অনেকাংশে কমে গেছে। এটা যেন একটা প্রথাগত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কত কড় পশু কুরবানি দিচ্ছেন, কত টাকা মূল্য দিয়ে কিনেছেন সেটি, ইত্যাদি গুঞ্জন সমাজের ঘরে ঘরে, হাটে-বাজারে, অফিস-আদালতে সর্বত্রই শোনা যায়।  কিন্তু এই কুরবানির আসল উদ্দেশ্য কী একথা আমরা বেমালুম ভুলে যাই। শুধু বড় বড় পশু জবাই করলেই কুরবানির হক আদায় হলো এমনটা ভাবার কোন অবকাশ নেই। যেহেতু কুরবানির উদ্দেশ্য মূলত বড় বড় পশু জবাই করা নয়। কুরবানির আসল উদ্দেশ্য আত্মার অন্তরালে বিরাজমান লোভের পশুকে জবাই করা। মনের কুমন্ত্রণা হিংসা-বিদ্বেষ, অহমিকা ইত্যাদি পশুত্বকে বধ করে মনোজগতকে পবিত্র করা এবং নিজেকে মুত্তাকী বা খোদাভীরু হিসেবে গড়ে তোলাই কুরবানির আসল উদ্দেশ্য। মানব ইতিহাসের সূচনালগ্নে থেকেই সত্য পথ হতে বিভ্রান্ত করার জন্য অবিরাম চেষ্টা করে আসছে ইবলিস শয়তান। মানুষের  ভিতরে সু ও কু দুটি প্রবৃত্তি বর্তমান। ইবলিস সর্বদা চেষ্টা করে চলছে কু প্রবৃত্তি উসকে দিয়ে মানুষকে সত্য পথ থেকে সরিয়ে দিয়ে নবী-রাসুলের পথ পরিহার করে চলতে। ফলে মানুষকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয় ইবলিস শয়তানের চ্যালেঞ্জ এর সাথে। শয়তানের এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় জয়ী হতে হলে মানুষকে ত্যাগ ও কুরবানির চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে। ঈদ উল আযহা উদযাপনের মধ্য দিয়েই আমরা এই আত্মত্যাগ তথা কুরবানির শিক্ষা লাভ করি। 

ইসলামি কৃষ্টি কালচার এবং আমাদের সংস্কৃতি সভ্যতাকে ঐতিহ্যময় ও অর্থবহ করে ঈদ। ঈদ সমাজের সার্বিক মানবতাবোধের উন্নতি ও জনকল্যাণকে নিশ্চিত করে। আত্মোৎসর্গের আনন্দ ঘন আবহে ঈদ আমাদের সমাজকে সৌন্দর্যময় করে তোলে। ঈদ উল আযহার এই খুশির দিনে আমরা ইসলামি সংস্কৃতির যুগান্তকারী সৌন্দর্যকে অবলোকন করি। একে অপরের প্রতি সহমর্মী হয়ে উঠি। আমাদের সাংস্কৃতিক সৌন্দর্যবোধকে আরো সার্থক হিসেবে দেখতে পাই। ত্যাগ ও কুরবানির এই অনুষ্ঠানকে সার্থক ও তাৎপর্যময় করে তোলার জন্য সমানভাবে সকল মুসলমানকে প্রত্যয়ী হওয়া প্রয়োজন। বর্ষ পরিক্রমায় ঈদ উল আযহা বার বার ঘুরে আসে ত্যাগের মহান বার্তা নিয়ে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর অনুসৃত পন্থায় বিশ্বের কোটি কোটি ঈমানদার মুসলমান মহান আল্লাহর পথে সাধ্যানুযায়ী কুরবানির নজরানা পেশ করেন। নিয়ত যদি বিশুদ্ধ হয় তাহলে কুরবানি কবুল হবেই। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। 

পবিত্র ঈদের সুন্দর ও সুখকর আনন্দের আবহে আমাদের সমাজ থেকে দূরীভূত হোক হিংসা-বিদ্বেষ এবং সকল প্রকার কলুষতা মুক্ত হোক সমাজের প্রতিটি মানুষ। মহান আল্লাহ পাক আমাদের কে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর আত্মত্যাগের ও কুরবানির মহান দৃষ্টান্ত অনুসরণ ও তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পথ চলার তাওফীক দিন।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ