শুক্রবার ০১ ডিসেম্বর ২০২৩
Online Edition

ভেঁপু

জহির টিয়া 

‘ভাইয়া, আমি ভেঁপু নিব। ওই ছেলেপেলেরা যেমন করে বাজাচ্ছে ; আমিও তেমন করে বাজাতে চাই।’ বলেই গুনগুন করে কান্না শুরু করে দিল ছোটো ফজলি আমটি।  

বড় ফজলি আমটি ধমক দিয়ে বলল, ‘চুপ কর। ভেঁপু নিবি? তোকেও হয়তো একদিন ভেঁপু হতে হবে। ওই ছেলেপেলেরা একদিন আমাদেরও তো ভেঁপু বানিয়ে বাজিয়ে বেড়াতে পারে।’ 

এবার ছোট আমটি কান্নার সুর কিছুটা কমিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, তবে আমি ভেঁপু হতে চাই। তাহলে ওদের সাথে ঘুরে বেড়াতে পারব। আর কত এক জায়গায় শুয়ে-বসে থাকব। আর ভালো লাগছে না।’ 

‘বললাম না, চুপ কর। এখনো ভেঁপু হবার বয়স হয়নি তোর।’ রাগান্বিত কণ্ঠে বলল বড় আমটি। 

‘কখন বয়স হবে ভাইয়া?’ পুরোপুরি কান্না থামিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল বাচ্চা আমটি।

‘বয়স হলেই যে ভেঁপু হতে পারবি। সেই গ্যারেন্টি তোকে দিতে পারব না।’ 

‘না, ভাইয়া। আমি ভেঁপু'ই হতে চাই। অন্য কিছু হতে চাই না।’ 

‘সময়-ই বলে দিবে তুই কী হতে পারবি! এখন চুপচাপ শুয়ে থাক।’ 

এক সন্ধ্যায় ঘন-কালো মেঘ ওঠল আকাশ জুড়ে। তা দেখে বড় আমটির বুক কেঁপে উঠল। বড় আমটি ছোটো ভাইদের ডেকে বলল, ‘তোরা পাঁচ ভাই রইলি। শক্ত করে ডালটি ধরে রাখিস। এই ডালে তো আর কেউ নাই। আমাদের বাবা-মা তো আমাদের জন্মের কিছুদিন পরেই ঝরে পড়েছে। সেসময় তাদের কেউ কুড়িয়ে নিয়ে যায়নি। ফলে মাটিতে পড়ে থেকে শুকিয়ে শুকিয়ে পচেগলে শেষ হয়েছে। আকাশের দিকে তাকা। যে কালো মুখ করে মেঘ উঠেছে নিশ্চয় ঝড় হতে পারে। আর আমি সেই ঝড়ে, ঝরে যেতে পারি। এখনো তোদের বয়স হয়নি। ঝরে পড়ার।’  ‘ভাইয়া, তুমি ঝরে পড়লে তো আমাদের দেখার মতো কেউ থাকবে না। আমরা পাঁচ ভাই অভিভাবক হারা হয়ে যাবো।’  ‘একদিন তোদেরও ঝরতে হবে রে সোনা ভাইয়েরা। তবে বয়স হয়ে ঝরলে কিছুটা হলেও ভালো থাকবি।'

‘ঝরে পড়ার পর, কী হলে সবচেয়ে ভালো হবে ভাইয়া?’  ‘আসলে কার কী ভাগ্যে আছে বলা তো যায় না। কেউ আচার হতে পারিস, কেউ আমচুর, কেউ পেকে খাবার, কেউ জুস, কেউ ভেঁপু, কেউবা আঁটি হতে গাছও হতে পারিস।’ 

‘কোনটা হতে পারলে সবচেয়ে ভালো হবে ভাইয়া?’ 

‘গাছ। গাছ হতে পারলে এই গাছের মতো তোরও অনেক আম ধরবে। সবার উপকারে আসবি। আর আচার হলে লবণ, মরিচ, তেল মেখে চুববে চুববে হয়ে ডুবে থাকবি। তাতে অনেক কষ্ট ! যদি আমচুর হোস তবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবি। সেখানেও কষ্ট। আগুনে পুড়তে হতে পারে।’ 

‘আর জুস হলে, ভাইয়া?’ 

‘বোতলে থাকতে পারবি। তারপর মানুষের খাবার হবি। আর যদি ভেঁপু হোস, তাহলে পিচ্চি ছেলেপেলেরা আনন্দ করে বাজিয়ে বেড়াবে। এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতে পারবি।’  ‘ভাইয়া, তাহলে আমি ভেঁপুই হবো।’ ছোট আমটি হাততালি দিয়ে বলে উঠল। 

এমন সময় প্রবলবেগে বাতাস ধেয়ে এলো। আর গাছের ডাল-পালাগুলো উল্টোপাল্টা হয়ে অনেক আম ঝরে পড়ল। সেই সাথে বড় আমটিও ঝরে পড়ল। বড় আমটি মাটিতে গড়াগড়ি করতে করতে বলল, ‘সোনারা শক্ত করে ধরে থাক। জানি না আর তোদের সাথে দেখা হবে কি-না।’ 

তখন ছোট আমটি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ‘ভাইয়া, তুমি যাচ্ছো যাও। চিন্তা করো না। আমি ভেঁপু হয়ে তোমাকে একদিন ঠিকই খুঁজে নিব।'

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ